শনিবার, ২৩-জানুয়ারী ২০২১, ০৪:২৯ পূর্বাহ্ন

অন্ধকারে অগ্নিশিখা বেগম রোকেয়া

shershanews24.com

প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর, ২০২০ ১০:০৫ অপরাহ্ন

ড. শারমিন ইসলাম: শিয়ালদহ স্টেশনের প্লাটফরমে ভরা সন্ধ্যার সময় এক ভদ্রলোক ট্রেনের অপেক্ষায় পায়চারি করিতেছিলেন। কিছু দূরে আর একজন ভদ্রলোক দাঁড়াইয়া ছিলেন। তাঁহার পার্শ্বে বিছানা ইত্যাদি ছিল। পূর্বোক্ত ভদ্রলোক কিঞ্চিত ক্লান্তি বোধ করায় উক্ত গাদার উপর বসিতে গেলেন, তিনি বসিবা মাত্র বিছানা নড়িয়া উঠিল। তিনি তৎক্ষণাৎ সভয়ে লাফাইয়া উঠিলেন। এমন সময় সেই দণ্ডায়মান ভদ্রলোক দৌড়াইয়া আসিয়া সক্রোধে বলিলেন ‘মশায় করেন কি? আপনি স্ত্রীলোকদের মাথার উপর বসিতে গেলেন কেন? বেচারা হতভম্ব হইয়া বলিলেন, মাপ করবেন মশায়! সন্ধ্যায় আঁধারে ভালোমত দেখিতে পারি নাই, তাই বিছানার গাদা মনে করিয়া বসিয়াছিলাম। বিছানা নড়িয়া উঠায় আমি ভয় পাইয়াছিলাম যে, একি ব্যাপার।’
    এটি উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের একটি সত্য ঘটনা। সময়টা ছিল বাঙ্গালী মুসলিম সমাজ তথা সমগ্র ভারতীয় মুসলিম সমাজের জন্য এক চরম ক্রান্তিলগ্ন। বৃটিশ শাসকের অধীনে মুসলিম সমাজ আর্থ-সামাজিকভাবেও ছিল বিপর্যস্ত। তাছাড়া ইসলামের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণে মুসলিম সমাজে নানাবিধ কুসংস্কারের প্রভাবও লক্ষণীয় যার ফলশ্রুতিতে পর্দার দোহাই দিয়ে উপরোক্ত ঘটনায় বর্ণিত মেয়েটিকে এভাবে নাস্তানাবুদ করা হয়েছে। মেয়েরা তখন পণ্যদ্রব্যের মত ব্যবহৃত হত। তারা তাদের ব্যক্তিগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার হতে ছিল নিদারুণ বঞ্চিত। যুগসন্ধির এ রকম এক কঠিন ক্ষণে জন্মগ্রহণ করেন বাংলার কিংবদন্তী নারী, মহান সমাজ সংস্কারক নারী জাগরণের পথিকৃত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২)।
    মানুষের চিন্তাচেতনা, আবেগ-অনুভূতি, আচার-আচরণ ইত্যাদি সাাজিক পারিপার্শ্বিকতার নির্মাতা নাকি পারিপার্শ্বিক সমাজ কাঠামোই মানুষের চালিকাশক্তি এ নিয়ে দার্শনিকদের মধ্যে বিতর্ক আছে। আমরা সে বিতর্কে যাব না। বস্তুত: এ জগতে একশ্রেণীর মানুষ জন্ম নেয় এবং গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে জীবনপাত করে একদিন পরপারে চলে যায়। আরেক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা তাদের সময়ের তুলনায় অনেক বেশী অগ্রসর এবং পুরাতন ঘুণেধরা সমাজর যা কিছু অসংগতি আছে তা তাদেরকে নাড়া দেয় প্রবলভাবে। মানুষের ক্লান্ত অবদমিত আত্মচেতনাকে আলোকস্পর্শে জাগিয়ে তোলাই যেন এদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য। বেগম রোকেয়া তাঁদেরই একজন।
    ১৮৮০ সালে রংপুর জেলার অন্তর্গত পায়রাবন্দ গ্রামে বেগম রোকেয়ার জন্ম। তাঁর পিতা জহীর মোহাম্মদ আবু আলী সাবের সম্ভ্রান্ত ভূ-স্বামী ছিলেন। তাঁর দুই পুত্র আবুল আসাদ ইব্রাহীম সাবের ও খলীল সাবের এবং তিন কন্যা করিমুন্নেসা, রোকেয়া ও হোমেরা। রোকেয়ার দুই ভাই ছিলেন ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত এবং জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ইব্রাহীম সাবেরের ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে করিমুন্নেসা ও রোকেয়া ইংরেজি শিক্ষায় যথেষ্ঠ বুৎপত্তি লাভ করেন। আনুমানিক ১৩ বৎসর বয়সে বিহারের অন্তর্গত ভাগলপুরের সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সাথে তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তিনি ছিলেন পেশায় ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট। পরবর্তীতে রোকেয়ার জ্ঞানচক্ষু দিনে দিনে আরও বেশী উন্মেচিত হয় অত্যন্ত উদারচেতা ও মননশীল স্বামীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও সহযোগিতার কারণে।
    প্রকৃতপক্ষে, উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের কিংবদন্তী মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার পরিচয় আমাদের সামনে দু’ভাবে প্রতিভাত হয়। কিছু ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীর (?) রচনায় রোকেয়ার যে ভাবমূর্তি ফুটে ওঠে তাতে মনে হয় তিনি অত্যন্ত টিপিক্যাল অর্থে নারীবাদী, পুরুষ বিদ্বেষী পাশ্চাত্যবাদী ও ইসলাম বিদ্বেষী ছিলেন। আবার, কুরআন হাদীসের যথার্থ জ্ঞান বর্জিত বিছু ইসলামপন্থী তার লেখার বিরোধিতা করেছেন। আসলে দু’টো দৃষ্টিভঙ্গিই একপেশে। সত্যিকার অর্থে তিনি একজন বড় ইসলামী চিন্তাবিদ, শিক্ষানুরাগী ও সর্বোপরি সমাজ সংস্কারক ছিলেন। যুগসন্ধির এক কঠিন সময়ে আত্মপরিচয় উদ্ধারের মহান ব্রত মনে প্রাণে গ্রহণ করেছিলেন বেগম রোকেয়া। তিনি তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার নানা অসংগতি, নর-নারীর বৈষম্য, অবরোধ প্রথা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ত্রুটি, কৃষক ও কৃষি ব্যবস্থার সংস্কার, কুটির শিল্পের অবক্ষয় প্রভৃতি বিষয়ে অত্যন্ত সুগভীর আলোচনা করেছেন। এছাড়া সম্ভাব্য প্রতিকার ও সংশোধনের উপায় ও নির্দেশ করেছেন।
    শিক্ষা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও সম্ভাবনাকে জাগ্রত করে। এর মাধ্যমেই মানুষের সৃজনশীলতা ও চিন্তাশক্তি বিকশিত হয় এবং বুদ্ধিবৃত্তি শাণিত হয়। অথচ তৎকালীন বাংলার মুসলিম নারীদেরকে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল যা রোকেয়াকে করেছিল দারুণভাবে বিচলিত। মুসলমানদের কাছে তাঁর প্রশ্ন, ‘মুসলমান যাঁহারা স্বীয় পয়গম্বরের নামে কিংম্বা ভগ্ন মসজিদের একখন্ড ইস্টকের অবমাননায় প্রাণদানে প্রস্তুত হন, তাঁহারা পয়গাম্বরের সত্য আদেশ পালনে বিমুখ কেন? কন্যাকে শিক্ষা দেওয়া আমাদের প্রিয় নবী (সা.) ফরয (অবশ্য পালনীয় কর্তব্য) বলিয়াছেন, তবু কেন তাহারা কন্যার শিক্ষায় উদাসীন?”
    অত্যন্ত বিচক্ষণ, আত্মপ্রত্যয়শীল ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রোকেয়া মনেপ্রাণে অনুধাবন করেছিলেন যে, শিক্ষার বিমল জ্যোতির প্রভাবে নারী মনে সচেতনতা ও আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হয়ে উঠতে পারে এবং সমাজে নারী তার নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়। তাঁর মতে, অনেকে মনে করেন, নারীদের উচ্চ শিক্ষার প্রয়োজন নাই, তারা শুধু অন্ত:পুরে থেকে রান্নাবান্না, সেলাইকর্ম ও দুই চারটা উপন্যাস পাঠ করতে পারলেই যথেষ্ট। কিন্তু ডাক্তাররা বলেন, যেহেতু মাতার দোষ গুণ নিয়ে সন্তান জন্ম নেয়, কাজেই মাতা সুশিক্ষিত হওয়া অত্যাবশ্যকীয়।
নারী শিক্ষা বিস্তারের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার উদ্দেশ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল। এটিই কলিকাতার বুকে প্রথম মুসলিম বালিকা বিদ্যালয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা সেটা রোকেয়া সেখানে কুরআন শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছিলেন। সাথে ইংরেজি শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থাও এতে ছিল। কুরআন শিক্ষা বলতে তিনি শুধু আরবী শব্দ আবৃত্তি বুঝাননি, কুরআনের অর্থ অনুধাবণ করে তা নিজেদের জীবন পরিচালনার কাজে লাগানোর কথা বুঝিয়েছিলেন। এ জন্য তিনি সরকারকে বাধ্যতামূলক আইন পাশের পরামর্শ দেন। একটি সুন্দর উপমার সাহায্যে তিনি কুরআনের অর্থ হৃদয়ঙ্গমের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন এভাবে,
“যদি কেউ অসুখ হলে ডাক্তার দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে Prescription নেয় কিন্তু সেই Prescription অনুযায়ী ঔষুধ না খেয়ে বরং সেটা মাদুলী রূপে গলায় ঝুলিয়ে রাখে আর রোজ ৩ বার পাঠ করে, তাতে তার কি কোন উপকার হবে?
তেমনি আমরা যদি কুরআন শরীফের অর্থ না বুঝে অনর্গল পড়ি আর অতি যত্নের সাথে কাপড়ের থলিতে উচ্চস্থানে তুলে রাখি তাতে আমাদের কি কোন কাজে আসবে? ............ প্রকৃত কথা এই যে, প্রাথমিক শিক্ষা বলিতে যাহা কিছু শিক্ষা দেওয়া হয়, সেই সমস্ত ব্যবস্থাই কুরআনে পাওয়া যায়। আমাদের ধর্ম ও সমাজ অক্ষুণ্ন রাখিবার জন্য কুরআন শিক্ষা একান্ত প্রয়োজন।
নারীর উপর পুরুষের অন্যায় প্রভুত্ব রোকেয়াকে পীড়িত করেছিল এবং সামাজিক কুপ্রথার আশু পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে তিনি নারী জাতিকে নতুন করে জেগে উঠার আহ্বাণ জানিয়েছেন। মূলত: ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে প্রভু বলে কেউ নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেন,
“হে মানব জাতি আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি মাত্র এক জোড়া নারী-পুরুষ থেকে। পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করে দিয়েছি বিভিন্ন জাতি ও গ্রোত্রে যেন তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার (এজন্য নয় যে, তোমরা পরষ্পরকে অবজ্ঞা করবে)। নি:সন্দেহে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ। অবশ্যই আল্লাহ সকল ব্যাপারে পূর্ণজ্ঞানী এবং উত্তমরূপে অবহিত।”৪
প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ (সা:) ১৫০০ বছর পূর্বে মদীনার বুকে যে ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করেছিলেন সেখানে নারী-পুরুষ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাজে সমভাবে অংশ নিয়েছিল। “কিন্তু শত শত বছরের আবর্তনে মুসলিম নারীর এই ঐতিহ্যময় কর্মকান্ড তার উন্নত নীতিমালা ও বিধিবিধানগুলো আস্তে আস্তে নানাবিধ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে জরাজীর্ণ ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে। কালক্রমে ১৪০০ হিজরীর প্রথম দিকে এসে তা’কিম্ভূত-কিমাকার রূপ ধারণ করে। এ সময় পাশ্চাত্যের উপনিবেশবাদী সভ্যতা সংষ্কৃতির সাথে ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এর স্বাভাবিক ফলশ্রুতিতে দু’টি বিপরীতমুখী ধারার সৃষ্টি হয়। একটি ধারা হঠাৎ করে চোখ ঝলসানো আলোকছটায় দিশেহারা নারী প্রগতির নামে ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি বিমুখ হয়ে কান্ডজ্ঞানহীনভাবে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে তার সকল ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দোষগুণসহ প্রগতির সোপান হিসাবে গ্রহণ করে। দ্বিতীয় ধারার অনুসারীরা পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির পুরোপুরি প্রত্যাখান করে। তার ভাল ও কল্যাণকর বিষয়গুলোর প্রতি নজর না দিয়ে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া যাবতীয় ভাল-মন্দ, রীতি-নীতি, আচার-আচরণ ইত্যাদি রক্ষণশীলতার সাথে আঁকড়ে ধরে।”
 বেগম রোকেয়ার উদ্দেশ্য ছিল অধ:পতিত মুসলিম জাতিকে এই দুই এর মধ্যবর্তী একটা পন্থা অবলম্বনের তাগিদ দেয়া তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়,
“আরবে স্ত্রী জাতির প্রতি অধিক অত্যাচার হইতেছিল, আরববাসীগণ কন্যা হত্যা করিতেছিল, তখন হযরত মুহাম্মদ (সা:) কন্যাকূলের রক্ষকস্বরূপ দন্ডায়মান হইয়াছিলেন। তিনি কেবল বিবিধ ব্যবস্থা দিয়াই ক্ষান্ত থাকেন নাই। স্বয়ং কন্যা পালন করিয়া তিনি আদর্শ দেখাইয়াছেন তাঁহার জীবনে যাতে ফাতেমাময় করিয়া দেখাইয়াছেন কন্যা কিরূপ আদরণীয়া। সে আদর, সে স্নেহ জগতে অতুলনীয়। ্আহা তিনি নাই বলিয়া আজ আমাদের এই দুর্দশা।”
বেগম রোকেয়া সারাজীবন তৎকালীন বাংলার নারী সমাজকে ইসলাম প্রদত্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখার বিরুদ্ধেই সোচ্চার ছিলেন। তিনি মহিলাদেরকে অন্ত:পুরের ভয়াবহ দুর্বিসহ জীবন থেকে বের করে আনতে চেয়েছিলেন। আবার তিনিই অশালীন পোষাকের বিরুদ্ধে ও শালীনতার পক্ষে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন।
“বোরকা” প্রবন্ধে রোকেয়া পর্দা অর্থে শালীনতা ও সুরুচি বুঝিয়েছেন এবং নারী সমাজকে শালীনতা বজায় রেখে সমাজের সব কাজে এগিয়ে যাবার দিক নির্দেশনা দান করেছেন। “উন্নতির পথে” শীর্ষক রম্যরচনাটি পড়লেও পাঠকদের মনে এ ধারণাই জন্মাবে।
তৎকালীণ ভারতবর্ষে মুসলিম সমাজে প্রচলিত অবরোধ প্রথার কঠোরতা দেখে রোকেয়া গভীরভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন। তৎকালীণ সমাজের ভয়াবহ চিত্র রোকেয়ার কতগুলো সত্য ঘটনা নিয়ে লিখিত “অবরোধ বাসিনী” রচনা থেকে ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায়।
“এক বাড়ীতে আগুণ লাগিয়াছিল। গৃহিনী বুদ্ধি করিয়া তাড়াতাড়ি সমস্ত অলংকার একটা হাত বাক্সে পুরিয়া লইয়া ঘরের বাহির হইলেন, পরে আসিয়া দেখিলেন, সমাগত পুরুষেরা আগুন নিবাইতেছেন। তিনি তাহাদের সম্মুখে বাহির না হইয়া অলংকারের বাক্সটি হাতে করিয়া ঘরের ভিতর খাটের নিচে গিয়া বসিলেন। তদাবস্থায় পুড়িয়া মরিলেন কিন্তু পুরুষের সম্মুখে বাহির হইলেন না। ধন্য। কুল কামিনীর অবরোধ।”
সমাজ সংস্কারক রোকেয়া তৎকালীণ সমাজ ব্যবস্থার নানা অসংগতি দূর করার উদ্দেশ্যে প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে মুসলিম নারীদের সংঘবদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ নামক সংগঠন। নারী সমাজ সংক্রান্ত সমুদয় সমস্যা যেমন বিবাহ, তালাক ইত্যাদি সম্বন্ধীয় যাবতীয় বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে নারীদের সচেতন করে তোলাই এই সমিতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল। প্রকৃতপক্ষে এই প্রতিষ্ঠান থেকে বহু বিধবা নারী আর্থিক সাহায্য লাভ করেছে, অভাবগ্রস্থ মেয়েরা এর অর্থে শিক্ষা লাভ করেছে। বহু বয়:প্রাপ্ত দরিদ্র কুমারী এই সংস্থা হতে আর্থিক সাহায্য লাভের মাধ্যমে সৎপাত্রস্থ হয়েছে।
নারী-পুরুষের সামাজিক সাম্যকে তিনি শুধু তত্ত্ব হিসেবে বুঝাতে চাননি। নারী ও পুরুষ নিয়ে সৃষ্ট সমাজকে তিনি একটি আঙ্গিক সমগ্র (Organic Whole) বলে বিশ্বাস করেন। কোন সমাজের অর্ধাংশের পাশ্চাদপদতা, বিপর্যয় ও বুদ্ধিগত অপকর্ষ গোটা সমাজেরই অন্ধকারাচ্ছন্নতা ও স্থবিরতার নামান্তর। যেহেতু রোকেয়া নিজে বিপর্যস্ত অর্ধাংশের অন্তভুক্ত সে জন্যে নিজের কর্মপ্রেরণা ও সাহিত্যের মাধ্যমে তাকে সর্বাত্মক অধ:পতনের গহ্বর থেকে উদ্ধার করতে চেয়েছেন। কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ ও প্রগতি। গৃহকোণে লালিত কুসংস্কার ও গোঁড়ামিকে উৎপাটিত করে প্রগতিশীলতার পথে আহ্বাণ জানিয়েছেন রোকেয়া। মুক্ত বুদ্ধি ও স্বচ্ছ যুক্তিই তাঁর সহায়। রোকেয়ার মতে, বুদ্ধি যেখানে নিস্প্রভ, সেখানেই অন্যায় আর অবিচার, বুদ্ধি যেখানে ভুল পথে পরিচালিত সেখানেই অসভ্যতা আর বর্বরতা।
সমাজ থেকে দারিদ্র দূরীকরণেও রোকেয়ার বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গী লক্ষ্য করা যায়। তাঁর মতে, কিছু সৌভাগ্যশালী ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গই ভারতের অধিবাসী নয়, গরীব চাষারাই সমাজের মেরুদন্ড। তাদের দু:খ যাতে দূর হয় সে জন্য সরকারকে সবিশেষ চেষ্টা করতে হবে। চাষার আর্থিক অবস্থার উন্নতি কল্পে রোকেয়া পাট চাষের উপর জোর না দিয়ে তার পরিবর্তে কার্পাসের চাষে বেশী মনোনিবেশ করার জন্য সরকারকে পরামর্শ দেন। এছাড়া তিনি চরকা ও এন্ডি সূতার প্রচলন বহুল পরিমাণ করার আহবাণ জানান।
সামাজিক কুপ্রথার সংস্কার ও মঙ্গল অনিবার্য হলেও যে সহজসাধ্য নয় এ কথা রোকেয়া জানতেন। তবু নিরলস মহান আত্মত্যাগী রোকেয়া আজীবণ সংগ্রাম করে গেছেন একটি সুন্দর, উন্নত ও ভারসাম্যময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করার ব্রত নিয়ে। তিনি তাঁর রচনায় বিধবা বিবাহের ক্ষেত্রে হিন্দু আইনের চেয়ে মুসলিম আইন যে কত উদার তা দেখিয়েছেন। সাথে তিনি মুসলমানদেরকে দোষারোপ করেছেন এই বলে যে, হিন্দুরা তাদের ধর্মীয় আইনের সংষ্কার সাধন করতে সচেষ্ট। অথচ মুসলমানরা মুসলিম মেয়েদের বিধবা বিবাহের ক্ষেত্রে এত সুবিধা দেয়া সত্ত্বেও তা লুফে না নিয়ে বরং গড্ডালিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়ে চলেছে। হিন্দু আইনের চেয়ে মুসলিম আইনের শ্রেষ্ঠত্ব তিনি এভাবে তুলে ধরেন যে, হিন্দু স্ত্রীকে মৃত স্বামীর সাথে পুড়িয়ে মারার ব্যবস্থা আছে। তারা এখন সহমৃতা না হলেও জীবন্মতা বলা যায় কারণ বিধবাকে শুধু দ্বিতীয়বার বিবাহ হতে বিরত থাকলেই চলবে না স্বামীর মৃত্যুর পর তাকে সর্বপ্রকার সুখাদ্য ত্যাগ করে শুধুমাত্র ফলমূল খেয়ে জীবনপাত করতে হবে। পক্ষান্তরে, ইসলাম নারীকে পুনর্বিবাহের অনুমতি দিয়েছে। বিধবার প্রতি কোনরকম অত্যাচার করা হয় না। তার খাদ্য সামগ্রীর ব্যাপারে কোনরকমন বিধি নিষেধ নেই।
 যৌতুক প্রথা এক ধরনের সামাজিক কুপ্রথা বা সামাজিক ব্যাধি। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় যৌতুক প্রথা মহামারীর ন্যায় ছড়িয়ে পড়েছিল যা রোকেয়াকে করেছিল দারুণভাবে উদ্বিগ্ন ও ব্যথিত এবং তিনি মনেপ্রাণে এর সংষ্কার চেয়েছিলেন। ‘পদ্মরাগ’ উপন্যাসে তিনি বলেন, “কন্যা পণ্যদ্রব্য নহে যে তাহার সঙ্গে মোটর গাড়ী ও তেতালা বাড়ী ফাউ দিতে হইবে।”
ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক সুদ গ্রহণ ও প্রদান দুটোই সমান পাপ। এ বিষয়েও রোকেয়ার সচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর নির্জলা সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত “বলিগর্ত” নামক লেখায় যেখানে তিনি বলিগর্তের জমিদার খাঁ বাহাদুর কশাই উদ্দিন খটখটের দরিদ্র প্রজাদের নিকট হতে উচ্চহারে সুদ গ্রহণকে তীব্রভাবে কটাক্ষ করেছেন।
এমনিভাবে রোকেয়া সমাজে বিদ্যমান নানা অত্যাচার, অবিচার ও অসংগতির বিরুদ্ধে সোচচার বাণী উচ্চারণ করে সুন্দর ভারসাম্যময় একটা সুখী সমাজ কাঠামোর স্ব্প্ন দেখেছেন। তিন্তু তৎকালীন কিছু সমাজপতি রোকেয়ার বক্তৃতা-বিবৃতি ও লেখনীকে সহজভাবে গ্রহণ করেননি। তাঁর ভাষায়, “আমি কার সিয়ং ও মধুপুর বেড়াইতে গিয়া সুন্দর সুদর্শন পাথর কুড়াইয়াছি। উড়িষা ও মাদ্রাজে সাগর তীরে বেড়াইতে গিয়া বিচিত্র বর্ণের বিবিধ আকারের ঝিনুক কুড়াইয়া আনিয়াছি। আর জীবনের পঁচিশ বৎসর ধরিয়া সমাজ সেবা করিয়া কাঠমোল্লাদের অভিসম্পাৎ কুড়াইয়াছি।”
হুমায়ুন আজাদ তার ‘নারী’ গ্রন্থে রোকেয়াকে অভিহিত করেছেন নারীবাদী ও অস্বাভাবিক পুরুষ বিদ্বেষী বলে এ ক্ষেত্রে তিনি মনে করেন পশ্চিমা নারীবাদী মেরি ওলস্টোনক্র্যাফটের মধ্যেও নাকি এত তীব্র মাত্রায় পুরুষ বিদ্বেষ ও দ্রোহিতা দেখা যায়নি।
এর জবাবে বলা যায়, আক্ষরিক অর্থে নারীবাদী বলতে যা বুঝায় রোকেয়া তা ছিলেন না। নারী জাতির ধর্মপ্রদত্ত সম্মান, মর্যাদাবোধ ও আইনগত অধিকারের কথা উচ্চারণ করলেই যদি কেউ নারীবাদী হয়ে যান, তাহলে যে কোন মহিলা লেখিকাই নারীবাদী হতে বাধ্য। কারণ সব মহিলাই চাইবেন তার সমগোত্রীয়দের যথাযথ স্বার্থ সমুন্নত রাখতে ও এর পক্ষে লেখনী ধারণ করতে। তাছাড়া রোকেয়া পাশ্চাত্যবাদী ও পুরুষ-বিদ্বেষী ছিলেন, এ কথাও ঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে কোন লেখকের লেখনী সমালোচনার ক্ষেত্রে দু’টো রীতি পরিলক্ষিত হয়, প্রথমত: অত্যন্ত সতর্কতার সাথে academically সমালোচনা করা এবং দ্বিতীয়ত: সমালোচনার খাতিরে সমালোচনা করা। হুমায়ুন আজাদ এক্ষেত্রে দ্বিতীয় রীতিটি অবলম্বন করেছেন তা না হলে তিনি রোকেয়া ও ওলস্টোনক্র্যাফটকে একই কাতারে দাঁড় করাতেন না। বস্তুত: তিনি সবসময়ই মূল সত্য থেকে দূরে সরে অতিকথনে অভ্যস্ত। কোন লেখক-লেখিকাকে মূল্যায়ন করার সময় আমাদের উচিত তাঁকে তাঁর সময়ের প্রেক্ষাপটে বিচার করা কারণ প্রত্যেকটি দার্শনিক থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশ ও মনীষার স্ফুরনের ওপর তাঁর শিক্ষা ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব থাকে। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত দাশনিক বার্ট্টান্ড রাসেলের একটি কথা প্রাণিধানযোগ্য।

তিনি বলেন, “Philosophens arc both effects and causes: effects of their social circurnstacnes and of the politics and institutions of their time, causes (if they are fortunate) of beliefs which mould the politics and institutions of later ages.”

আমরা ইতিমধ্যেই বেগম রোকেয়ার সময়কার একটা ভয়াবহ চিত্র অবলোকন করেছি। সেই বীভৎস আঁধার যুগে কিভাবে নারীকে সর্বপ্রকার দাসত্বের কবল থেকে মুক্ত করা যায় এটিই ছিল রোকেয়ার ধ্যান-ধারণা, চিন্তাচেতনার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি যদি নারী হয়ে নারীদের দুর্বিসহ অবরোধের কবল থেকে মুক্ত করতে চান, তাদেরকে শিক্ষার আলো দেখাতে চান, তাহলেই কি নারীবাদী হয়ে যান? নারীদেরকে এই ঘোর অমানিষা থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে তিনি হয়ত পুরুষদেরকে একটু মৃদু তিরষ্কার করেছেন, তার মানে এই নয় যে, পুরুষ জাতি তার কাছে ঘৃণার পাত্র ছিল। তাহলে তিনি তাঁর স্বামী সাখাওয়াত হোসেনের পূর্ণ স্মৃতি রক্ষার্থে কোলকাতায় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করে তাঁর স্বামীকে চিরস্মরনীয় করে রাখতেন না।

পরিশেষে বলা যায়, রোকেয়া সত্যিকার অর্থেই ইসলামের একজন মহান পুর্নজীবনদানকারী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। যে ক’জন মনীষী আপন ব্যক্তিত্ব ও স্বাতন্ত্র্যে স্বজাতির হৃদয়ে প্রোজ্জ্বল আসন দখল করে আছেন রোকেয়া তাদের মধ্যে অন্যতম। বন্ধ দুয়ার মুক্ত করে নারীর জন্য সহজ স্বাভাবিক জীবন স্পন্দনের ক্ষীণ হলেও যে ধারা তিনি সৃষ্টি করেছিলেন তা আজো বহমান। বস্তুত: বর্তমান যুগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্যের কারণে মানুষ আজ অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। আবার একদিকে দরিদ্র দেশসমূহের অন্তজ্বালা, অন্যদিকে যান্ত্রিক সভ্যতার প্রসার, এ দুয়ের মাঝখানে সমকালীন পৃথিবীর মানুষ হারিয়ে বসেছে নীতি বোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ। এ পরিস্থিতিতে যথার্থ মানুষ হিসেবে টিকে থাকতে হলে, জাতি হিসেবে অগ্রগতি অর্জণ করতে হলে আমাদের অবশ্যই উদ্যোগী হতে হবে। সমন্বিত অর্থনৈতিক ও নৈতিক কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। এক কথায় অন্ন-বস্ত্রের অনুসন্ধানের পাশাপাশি সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের আদর্শে উজ্জীবিত হতে হবে। উনবিংশ শতাব্দীর সেই ক্রান্তিলগ্নে এই প্রয়োজনের প্রতিই দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন বেগম রোকেয়া। রোকেয়ার বাণী থেকে সমকালীণ মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করুক এবং ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ অশান্ত পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি ও অনাবিল সুখ প্রতিষ্ঠিত হোক এই আশাই করছি। বেগম রোকেয়ার চিন্তা-চেতনার, দৃষ্টিভঙ্গির সঠিক বিশ্লেষণ হোক, তিনি তাঁর সঠিক পরিচয়ে পরিচিত হউন, ভবিষ্যৎ রোকেয়া গবেষকদের কাছে এই নিবেদন। (লেখক- গবেষক ও সহযোগি অধ্যাপক, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ)।

 
তথ্য নির্দেশ:
১।    আব্দুল কাদের সম্পাদিত, রোকেয়া রচনাবলী, ঢাকা ১৯৮৪, পৃ ৪৮৮
২।    ঐ, পৃ ২৭৯
৩।    ঐ, পৃ ২৮২
৪।    সূরা হুজরাত, আয়াত ১৩
৫।    আব্দুল হালীম আবু শুককাহ, রসূলের (সা:) যুগে নারী স্বাধীনতা, অনুবাদ-মাওলানা আব্দুল মুনয়েম, অধ্যাপক আবুল কালাম পাটওয়ারী, মাওলানা মুনাওয়ার হোসাইন, প্রকাশনায় ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফেডারেশন অব স্টুডেন্টস, অর্গানাইজেশন ও ইন্টারন্যাশনাল ইনষ্টিটিউট অব ইসলামিক থটস, ঢাকা ১৯৯৫, পৃ ৮৫
৬।    নবনূর, আশ্বিন, ১৩১১, পৃ ২৮৭।
৭।    আব্দুল কাদের সম্পাদিত রোকেয়া রচনাবলী, ঢাকা ১৯৮৪, পৃ ৪৭৯-৭৯।
৮।    ড, হাসনা বেগম, মুক্তবুদ্ধি, বেগম রোকেয়া ও নারী অধিকার, সাহিত্য পত্রিকা, ১৩৮৯, পৃ ১১৪-১৬
৯।    আব্দুল কাদের সম্পাদিত রোকেয়া রচনাবলী, ঢাকা ১৯৮৪, পৃ ৪৫৩
১০।    ঐ, পৃ ১৩৬-৩৭।
১১।    B.Rassel, History of Western Philocophy, London, 1962, P-7