বুধবার, ২০-জানুয়ারী ২০২১, ১০:৪০ পূর্বাহ্ন

বিদায় করোনার বছর ২০২০

shershanews24.com

প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৮:৫০ অপরাহ্ন

জসিম উদ্দিন: করোনা প্রথম শনাক্ত হয় ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর। অবশ্য তখনো চীন এই ভাইরাসের অস্তিত্ব স্বীকার করেনি। বাকি বিশ্বের মানুষ ভাইরাসটির উৎপত্তির জন্য চীনকে দায়ী করেন। চীনা চেহারার মানুষদের এ জন্য ভর্ৎসনা করা হয়। এশিয়ার মানুষের ওপরও লাঞ্ছনা নেমে আসে। এর আগে কয়েকটি ভাইরাসের জন্য আফ্রিকা মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের লোকদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছিল। করোনা ২০২০ সালে চরিত্র বদলে ইউরোপ ও আমেরিকায় থাবা বিস্তার করে। উন্নত দেশগুলোতে যেভাবে এটি হানা দিয়েছে এবার মনে হয়েছে সত্যিকার অর্থে এটি ধনীদের রোগ। তবে অন্য ধনী বিশ্বের বাসিন্দারা দরিদ্র পিছিয়ে পড়া বাকি বিশ্বের মানুষের কাছে তাচ্ছিল্যের শিকার হননি। এই ভাইরাস মানুষের জনমিতিতে কোনো প্রভাব ফেলেনি। জন্ম মৃত্যুহারে কোনো নতুন মাত্রা যোগ করেনি। তবে এটি সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ওলট-পালট করা প্রভাব ফেলেছে। এতে লাভবান হয়েছেন স্বৈরাচারী শাসক ও ধনীরা।

করোনাকে অতিমারী বলা হচ্ছে। আমরা বাংলাদেশের অধিবাসীদের ওপর এর প্রভাব একটু তলিয়ে দেখতে পারি। বাংলাদেশে প্রতি বছর এক হাজার মানুষের মধ্যে সাড়ে ৫ শতাংশের বেশি মানুষ মারা যান। কয়েক দশক আগে এ মৃত্যুহার আরো বেশি ছিল। আমরা যদি আরো পেছনে যাই তাহলে দেখতে পাবো আরো বেশি হারে প্রতি বছর মানুষ মারা গেছেন। কখনো তা বর্তমান হারের চেয়ে ৫ গুণের বেশি। যেসব কারণে মানুষের বৃদ্ধির হার ছিল নগণ্য। কখনো জনসংখ্যা একই জায়গায় স্থির হয়ে থাকত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মহামারীর মড়কের পর জনসংখ্যা কমেও যেত। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় এমন চিত্র দেখা গেছে।

অসুখ-বিসুখ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা যেকোনো কারণে একজন মানুষের মৃত্যু হতে পারে। সেই হিসেবে দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর বাংলাদেশের এক কোটি মানুষের মধ্যে ৫৫ হাজার মানুষ মারা যান। যদি ধরা হয়, এখন বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি; তাহলে ২০১৯ বা আজ শেষ হতে যাওয়া ২০২০ সালে ৯ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ মারা গেছেন। জনমিতি নিরীক্ষণকারী গ্লোবাল ইকোনমি ডটকম, জাতিসঙ্ঘ ও বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে কমবেশি বাংলাদেশে প্রতি বছর মারা যাওয়া মানুষের হার এমনই।

দেশে করোনায় প্রথম কেউ আক্রান্ত হওয়ার রেকর্ড এ বছরের ৮ মার্চ। তখন থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭ হাজার ৪৫২ জন সরকারি হিসাবে করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন। করোনাকালীন মোট দশ মাসে যা দিনের হিসাবে ৩০০ দিন। গড় হিসাবে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন করোনায় মারা গেছেন ২৫ জন। অন্য দিকে স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিন গড়ে বাংলাদেশে দুই হাজার ৫৬১ জন মানুষ মারা যাচ্ছেন। এতে স্পষ্ট যে, প্রতিদিন মানুষ মৃত্যু হারে করোনা নতুন কোনো মাত্রা যোগ করেনি।

ভীতি ছিল ঢাকার বস্তি নিয়ে। শহরের ২০টি বস্তি নাকি ‘করোনার কেন্দ্র’ হয়ে উঠবে। কারণ ঘনবসতির পাশাপাশি বস্তির অনেক লোক একই রান্নাঘর, টয়লেট, পানির উৎস ভাগাভাগি করে ব্যবহার করেন। এর সাথে রয়েছে এক রুমে পুরো পরিবারের বসবাস, খোলা পয়ঃনিষ্কাশন, অনিষ্কাশিত খোলা আবর্জনা। রয়েছে বস্তিবাসীর আর্থিক অনটন। তাই করোনা বিস্তারের হটস্পট হবে এগুলো। চার মাস পরে ডেইলি স্টার বস্তিগুলোর করোনা পরিস্থিতি নিয়ে একটি সরেজমিন রিপোর্ট করে। প্রতিবেদক রাজধানীর প্রধান বস্তিগুলো ঘুরেছেন। সেখানকার মানুষের সাথে কথা বলেছেন। জনপ্রতিনিধি ও স্বাস্থ্যসেবা দানকারী এনজিওকর্মীদের সাথেও কথা হয়েছে। প্রতিবেদনে অনেক উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। একটি কেসও এমন উল্লেখ করা যায়নি যে, করোনায় সংক্রমিত হয়ে কেউ শ্বাসকষ্টে ভুগছেন কিংবা গুরুতর লক্ষণ তাদের অনেকের মধ্যে রয়েছে।

ডেইল স্টার ‘ঢাকার বস্তি যেখানে কোভিড রহস্যজনকভাবে নীরব’ শিরোনাম খবরটি প্রকাশ করে। ব্যাপারটিকে আমরা আশ্চর্যজনক মনে করছি আমাদের ‘পূর্ব ধারণা’ থেকে। আমাদের কাছে মেইন স্ট্রিম মিডিয়া ও বিশেষজ্ঞরা যে খবর পাঠাচ্ছেন সে অনুযায়ী এটি রহস্যময়। প্রকৃতপক্ষে করোনাকে আমরা যদি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখতে পেতাম এর বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে পারতাম। আমরা সাধারণত ঘটে যাওয়া ঘটনা দিয়ে এর আসন্ন ফল কী হতে পারে তা নির্ধারণ করি। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা সঠিক হয় না। এর পরও বিভিন্ন বিপরীতমুখী ঘটনার যোগফল তৈরি করে তাকে ভাগ করে ‘গড়’ নির্ণয় করি। ফলে সব সময় আমরা ঘটনার প্রকৃত তাৎপর্য অনুমান করতে ব্যর্থ হই। কোভিড-১৯ মোকাবেলার ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে।

করোনায় বৈশ্বিক মৃত্যুহার বিশ্লেষণ করলেও আমরা একই প্রবণতা দেখতে পাবো। ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বমোট ১৭ লাখ ৭১ হাজার ৯৮২ জন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার রেকর্ড রয়েছে। প্রতিদিনে বিশ্বে মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুহার আগে উল্লেখ করা বাংলাদেশের মতোই। অর্থাৎ বছরে সারা বিশ্বে প্রতি এক হাজার মানুষে সাড়ে ৫ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়। ধরে নেয়া যেতে পারে, সাড়ে ৭০০ কোটি মানুষের মধ্যে ২০২০ সালে করোনায় মারা গেছেন ১৮ লাখ মানুষ। এটি বিশ্ব জনমিতিতে মাত্রাগত কোনো তফাৎ সৃষ্টি করেনি। পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব করলে দেখা যাবে বছরে প্রতি হাজারে মৃত্যুহার সাড়ে ৫ বা তার আশেপাশে রয়েছে। করোনাকালে প্রাণঘাতী বিভিন্ন রোগে মানুষের মৃত্যুহার বিভিন্ন সময় প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ডায়াবেটিস হৃদরোগ বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার ও যক্ষ্মায় একই সময় অনেক বেশি মানুষ মারা গেছেন।

ঠাণ্ডাজনিত রোগে করোনার চেয়ে মৃত্যু অনেক বেশি। বর্তমান সময়ে করোনায় যাদের মৃত্যু হয়েছে বলে খবর বেড়িয়েছে; তাদের অনেকের অন্যান্য রোগ ছিল । করোনার প্রাদুর্ভাব না হলে তাদের বলা হতো ডায়াবেটিস হৃদরোগ ঠাণ্ডাজনিত রোগে মারা গেছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে কিংবা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। মানবসমাজে বিদ্যমান বড় বড় রোগব্যাধি করোনার চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ হলেও করোনার মতো ভীতি ছড়ায়নি। করোণার মাত্রাতিরিক্ত প্রচারণা অনেকের জন্য উচ্চ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষ যদি এগুলোকে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে না পারে তাহলে তাদের ক্ষতির মাত্রা দিন দিন বাড়তে থাকবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবসাবাণিজ্য সামাজিক মেলামেশার জন্য মানুষ ভর করেছেন অনলাইন প্লাটফর্মে। মহামারী শুরুর প্রথম তিন মাসে জুমের প্রতিষ্ঠাতা ইরিক ইউয়ান কামিয়েছেন এক হাজার ৭০০ কোটি ডলার। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসায়ীরা আরো কিভাবে ফুলে ফেঁপে উঠছে ওয়াশিংটন কেন্দ্রিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজ অ্যান্ড ক্লিয়ারওয়াটারের প্রতিবেদনে জানা গেছে। তাদের হিসাবে মার্চে করোনা শুরু থেকে তিন মাসের মধ্যে ধনীরা ৫৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার কামিয়ে নিয়েছেন। আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের সম্পত্তি বেড়েছে চার হাজার ৮০০ কোটি ডলার। মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান নির্বাহী বালমারের সম্পদ বেড়েছে এক হাজার ৫৭০ কোটি ডলার। মার্ক জাকার বার্গের সম্পদ বেড়েছে ৯১০ কোটি ডলার। ঠিক একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে চার কোটি আমেরিকান বেকার হয়ে গেছেন বলে রিপোর্ট করেছে।