রবিবার, ০৮-ডিসেম্বর ২০১৯, ০৪:৪৯ অপরাহ্ন

ট্রেন দুর্ঘটনা: নজর দেয়া হোক সমস্যার গভীরে

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর, ২০১৯ ১০:২৯ অপরাহ্ন

এস আরেফিন: সড়কপথে দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে সবচেয়ে আরামদায়ক, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ বলতে দেশে বেছে নেয়া হয় রেলপথকেই। তবে আমরা যে রেলপথকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করি সে পথেও সামান্য ভুলে কখনো কখনো ঘটে যায় বড় অঘটন। আর এই ভুলের কারণেই শত শত মানুষকে দিতে হয় প্রাণ। তবে যে কোনো দুর্ঘটনার নেপথ্যে সাধারণত অসচেতনতা কিংবা দায়িত্বে অবহেলা বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। গত ১২ নভেম্বর রাতে সিলেট হতে চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস এবং চট্টগ্রাম হতে ঢাকাগামী তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের সংঘর্ষ ঘটে। আর এই দুর্ঘটনার নেপথ্যেও রয়েছে অসতর্কতা এবং দায়িত্বে অবহেলা। রেলওয়ে স্টেশন, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তূর্ণা নিশীথা ট্রেনটিকে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনের আউটারে থামার জন্য সংকেত দেওয়া হয়েছিল। আর উদয়ন এক্সপ্রেস কসবা রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশ করার পথে ট্রেনটিকে মেইন লাইন ছেড়ে ১ নম্বর লাইনে আসার সংকেত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু উদয়নের ছয়টি বগি প্রধান লাইনে থাকতেই তূর্ণা নিশীথার চালক সিগন্যাল অমান্য করে ট্রেনটির মাঝামাঝি ঢুকে পড়ে। ফলে উদয়নের তিনটি বগি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত ও শতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। এর ২ দিন পরই সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়ে আগুন লেগে চালকসহ আরও ২৫ জন আহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার পর নিয়মানুযায়ী তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং বহু ক্ষেত্রেই তদন্ত হয় নামকাওয়াস্তে। অনেক ক্ষেত্রেই সেই সকল তদন্ত রিপোর্ট হিমঘরেই পড়ে থাকে। এই ক্ষেত্রেও দুর্ঘটনা তদন্তে রেলের পক্ষ হতে মোট চারটি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের পক্ষে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, দুর্ঘটনার কারণগুলি সঠিকভাবে চিহ্নিত করে যদি তা প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়ার কাজটি যথাযথভাবে পালন করা হয়ে থাকে তাহলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটে কী করে? 
যদিও বেশিরভাগ দুর্ঘটনার জন্য চালকরাই দায়ী কিন্তু এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একটি সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত থাকে অনেকগুলি মাথা। চালকের পাশাপাশি গার্ড, স্টেশন মাস্টার, পয়েন্টম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের দায় এড়াবার সুযোগ নেই। সিগন্যাল অমান্য করার মতো ভুল ছাড়াও লাইনে পাথর না থাকা, সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটি, লাইন ক্ষয়, স্লিপার নষ্ট, লাইন ও স্লিপার সংযোগস্থলে লোহার হুক না থাকা প্রভৃতি কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। বিষয়টি রেল কর্তৃপক্ষের অজানা নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও এসব দিকে গুরুত্বসহকারে নজর না দেওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্যমতে, সারাদেশে মোট রেলপথ রয়েছে ৪ হাজার ৪৪৩ কিলোমিটার। এই রেলপথে সাড়ে তিন শতাধিক ট্রেনে প্রতি বৎসর গড়ে চলাচল করছে ৪২ লক্ষাধিক যাত্রী। প্রশ্ন হলো, এই বিপুলসংখ্যক যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে কতটুকু নিষ্ঠা ও দায়িত্বের সাথে কাজ করছে আমাদের রেলওয়ে? দেখা যাচ্ছে, একের পর এক নতুন প্রকল্প হাতে নিলেও রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সবচেয়ে কম। রক্ষণাবেক্ষণের যে অবকাঠামো রয়েছে, তাও ন্যূনতম পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে না। যেইটুকু বরাদ্দ রয়েছে, তা দিয়েও ঠিকমতো দেখভাল করা হয় না। বরং একটি দুর্ঘটনা ঘটলে কিছুদিনের জন্য কর্তৃপক্ষ নড়ে চড়ে বসেন। এই সংস্কৃতি হতে আমাদের বের হতে হবে। মনে রাখতে হবে, নাগরিকদের প্রতি সবচেয়ে বড় সহায়তা হবে রেলওয়েকে ছোট-বড় সব ধরনের দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা। এ জন্য সংশ্নিষ্টদের দায়িত্বশীলতা ও সতর্কতার বিকল্প নেই।