শুক্রবার, ০৩-এপ্রিল ২০২০, ০১:৪৩ পূর্বাহ্ন
প্রসঙ্গ: প্রশাসনে যোগ্য কর্মকর্তার পদায়ন

‘অবসর’ এক আতংকের নাম

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০৫:৩৯ অপরাহ্ন


একরামুল হক: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সম্প্রতি অত্যন্ত আক্ষেপ, হতাশা ও অনুযোগের সুরে তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘সহকর্মীদের সঙ্গে প্রবাস থেকে কথা বলতে গিয়ে বুঝলাম তাদের বেশিরভাগই অপরিচিত কল ধরেন না, মেসেজ পড়ে দেখেন না বা উত্তর দেন না। আমরা কি এ সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারি না?’
দুঃখটা শফিউল আলম চেপে রাখতে পারেননি, যদিও এটি তারজন্য লজ্জাস্কর। তিনি এখনো বাংলাদেশ সরকারেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ, বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হিসেবে নিউইয়র্কে কর্মরত আছেন। তারপরও কেন তাকে এতো অবহেলা! আসলে কেবিনেট সেক্রেটারি, আর বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক এক কথা নয়। এটা হয়তো শফিউল আলম বুঝতে পারেননি। তাই এতোটা রিএ্যাক্ট করেছেন। 
দীর্ঘ চার বছর কেবিনেট সেক্রেটারি পদে ছিলেন মোহাম্মদ শফিউল আলম। তারমধ্যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও কাটিয়েছেন এক বছর। কেবিনেট সেক্রেটারি হওয়ার আগে ভূমিসচিব, রাষ্ট্রপতির সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, ডিসিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে কেবিনেট সেক্রেটারি পদে থাকাকালে এই চার বছরে নিজের চতুর্পাশ্বে সারাক্ষণ লোকজনকে ঘুরঘুর করতে দেখেছেন। তাঁর আনুকূল্য পাবার জন্য সচিবরা পর্যন্ত মুখিয়ে থাকতেন। এখন এ রকমের অবহেলা, তাতে খারাপ লাগতেই পারে?
বস্তুত, শুধু শফিউল আলমের ক্ষেত্রেই নয়, কমবেশি সকল সরকারি কর্মকর্তার ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটে থাকে। অবসরের পর সরকারি কর্মকর্তাদের যে, কোনো মূল্যই থাকে না, এটা তারা ভালো করেই জানেন। আর এ কারণেই চাকরির বয়স শেষ হয়ে এলে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয়। তাঁর জীবনের যে আর কোনো মূল্যই থাকছে না- এই ভেবে অস্থির হয়ে পড়েন। পদ ফিরে পাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন। স্বপদে বহাল থাকতে না পারলে অন্য কোনো না কোনো পদের জন্য ধর্না দেন, চেষ্টা-তদবির করেন। ঘুষ-দুর্নীতিতেও জড়িয়ে পড়েন অনেকে। এমনকি এসব কারণে দীর্ঘদিন থেকে অনুসরণ করা নিজের নীতি-নৈতিকতাও লোপ পায় অনেকাংশে। এদের কাছ থেকে তখন আর ভালো কিছু আশা করাও যায় না। উপরের মহলকে তোষণ বা তেলনীতি এবং নিজের আখের গুছিয়ে নেয়ার ধান্দায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন এরা। 
বাংলাদেশ সচিবালয়ে দীর্ঘদিন ধরে পেশাগত কাজ করার সুবাদে অনেক ক্ষমতাবান সচিবকে অবসরের পর ছোটখাটো কাজে এসে নাজেহাল হতে দেখেছি। দেখা গেছে, ইতিপূর্বে তিনি যে দফতরে অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে কাজ করেছেন, তার দাপটে বাঘে-মহিষে একসঙ্গে জল খেয়েছে সেই দফতরের পিওন-ও তাকে পাত্তা দিচ্ছে না। আর এ কারণেই সরকারি কর্মকর্তারা পদে থাকতে পেনশন বেনিফিটের কাগজপত্র চূড়ান্ত করে নেন। যাতে অবসরের পর এ নিয়ে পিওন-কেরানির হাতে হেস্তনেস্ত হতে না হয়। গত মাসে সাবেক সচিবরা সরকারের ‘থিংক ট্যাংক’ হওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছেন সেটি এমন একটি হতাশা থেকেই। যদিও কেউ কেউ বলছেন, নিছক সময় কাটানোর জন্য ‘ক্লাব’ বা ‘ফোরাম’ ধরনেরই কিছু একটা করতে চান তারা। কিন্তু ক্লাব তো তাদের আছেই- অফিসার্স ক্লাব। বাংলদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের সবচে’ বড় ক্লাব এটি। তবে অবসরের পর এই অফিসার্স ক্লাবেও তেমন একটা দাম পাওয়া যায় না। খেলাধুলা করে বা আড্ডা দিয়ে সময় কাটানো যায়, কিন্তু পদে থাকাকালে যতটা গুরুত্ব পাওয়া যায়, চতুর্দিক থেকে অন্য কর্মকর্তারা এসে ভীড় করেন সেই কদর আর পাওয়া যায় না।
কয়েকদিন আগে এমন একজন সিনিয়র সচিবের সঙ্গে সাক্ষাত হয়েছিল অফিসার্স ক্লাব ভবনে, চাকরিতে থাকাকালে যিনি দীর্ঘদিন মহা কর্মব্যস্ত ছিলেন। তখন এত ব্যস্ত ছিলেন যে, তার সঙ্গে কোনো বিষয়ে ধীরস্থিরভাবে কথা বলা একেবারেই অসম্ভব ছিল। শুধু অফিসই নয়, যেখানেই যেতেন অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ছাড়াও সরকারি কর্মকর্তারাও তাকে ঘিরে ধরতেন নানা তদবির, সমস্যা-সংকট নিয়ে। গত ৩১ ডিসেম্বরের পর থেকে তার অবসর জীবন শুরু হয়েছে। প্রচুর সময় এখন তাঁর হাতে। দীর্ঘ আলাপে কোনো সমস্যা হবে না। তাই আগে থেকে এপয়েন্টমেন্ট করেই তার সঙ্গে সাক্ষাত করতে গিয়েছিলাম।
সিনিয়র সচিব সোহরাব হোসাইনের কথা-ই বলছি। তাঁর সঙ্গে পরিচয় আমার অনেক দিনের। এক সময় বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমেদের এপিএস ছিলেন। তখন থেকেই পরিচয়। সৎ, সাহসী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অত্যন্ত মিশুক স্বভাবেরও বটে। যে কারণে পছন্দ করতাম আমি। ২০০৯ সালে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের পিএস হিসেবে যোগ দেন সোহরাব হোসাইন। মন্ত্রী এবং পিএস দু’জনই একই রাজনীতির ধারক। নুরুল ইসলাম নাহিদ নির্লোভ বাম রাজনীতির ধারক হিসেবে শিক্ষাখাতের দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন, এটাই ছিল সবার প্রত্যাশা। প্রথমদিকে তিনি সেরকমেরই পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন। আর সেই কারণে ২০১০ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড নিয়ে সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছেপেছিলাম। শীর্ষকাগজের দীর্ঘ দেড় দশকের ইতিহাসে দুটি প্রশংসাসূচক প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের একটি ছিল নুরুল ইসলাম নাহিদের এবং অন্যটি তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর তখনকার কর্মকাণ্ড নিয়ে। অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে এ দু’টি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। নুরুল ইসলাম নাহিদ ছিলেন সিলেট সফরে। সেখান থেকে ফোন দিয়ে আমার সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বললেন। তার দফতরে চা-এর দাওয়াত দিলেন। কিন্তু তিনি ২০১৮ সাল অর্থাৎ মন্ত্রী থাকা পর্যন্ত কখনো সেই চা চক্রের দাওয়াতে আর যাওয়া হয়নি আমার। 
বস্তুত ভালো কাজের উৎসাহ দেয়ার জন্যই শিক্ষামন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রীকে নিয়ে ওই সময় পর পর দুটি ইতিবাচক প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছেপেছিলাম আমি। প্রায় একই সময়ে তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান খানের বিষয়েও একটি প্রতিবেদন ছাপা হয় শীর্ষকাগজে। মতিয়া চৌধুরী এবং নুরুল ইসলাম নাহিদের একই রাজনীতির ধারক আব্দুল মান্নান খানও। ছাত্র রাজনীতি, মূল রাজনীতিতে তাকে কখনো লোভের কাছে নীতি বিসর্জন দিতে দেখা যায়নি। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি তো নয়-ই। আইন পেশার মাধ্যমে কোনোরকমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। যে কারণে সবার ধারণা ছিলো, আব্দুল মান্নান খানের হাতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত খাতের দুর্নীতি অনেকাংশেই কমবে বা নিয়ন্ত্রিত হবে। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরবেন তিনি। এ খাতের অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা দূর হবে। সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে যখন আবদুল মান্নান খানের কিছু গুরুতর অপকর্ম নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছাপা হলো সেই সময় আমাকে ঘনিষ্ঠ অনেকেই এই বলে তিরষ্কার করেছেন যে, একজন ভালো লোকের বিরুদ্ধেও আপনারা প্রতিবেদন ছাপলেন! আমি বলেছিলাম, শীর্ষকাগজে যা ছাপা হয়েছে বাস্তব অবস্থা তারচেয়েও বেশি। তাঁরাই আমাকে পরে বলেছেন, আপনি যা লিখেছেন তারচেয়েও বেশি অপকর্ম করছেন আব্দুল মান্নান খান। পরবর্তীতে লাগামহীন অপকর্মের কারণে সবার কাছেই ধীকৃত হয়েছেন এই বাম নেতা। সম্ভবতঃ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে তিনি এবং তার স্ত্রীই সবচেয়ে বেশিবার দুদক হাজিরা দিয়েছেন এ পর্যন্ত। যেহেতু ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের নেতা, তাই দুদক খুব বেশি কিছু করতে পারছে না, কিন্তু হেস্তনেস্ত ইতিমধ্যে তাকে কম হতে হয়নি! হয়তো কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে আমৃত্যু এই হেস্তনেস্ত চলতেও পারে। 
যে কথা বলার জন্য বাম রাজনীতিকদের প্রসঙ্গ এই লেখায় টেনে আনা হলো সেই সচিব সোহরাব হোসাইনের কথায়-ই আসা যাক। আগেই বলেছি, এক সময় তাঁকে আমি আদর্শ কর্মকর্তা হিসেবে মনে করতাম। সম্ভবত সেই দুর্বলতা থেকেই গত কয়েক বছরে মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং শিক্ষাখাতের দুর্নীতি নিয়ে শীর্ষকাগজে অনেক প্রতিবেদন ছাপা হলেও সচিব সোহরাব হোসাইন প্রসঙ্গে একটি বাক্যও লেখা হয়নি। যদিও অনিয়ম-অপকর্ম সবই হয়েছে সচিব সোহরাব হোসাইনের হাত দিয়ে বা তার জ্ঞাতসারে। 
শিক্ষাখাতে যেহেতু তিনি সবচেয়ে দীর্ঘকাল কাজ করেছেন এবং তার সময়ে অনেক ঘটনা ঘটেছে তাই এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেয়ার জন্যই এই অবসর সময়ে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নিলাম। অফিসার্স ক্লাবে যেতে বললেন। সন্ধ্যার পরে ক্লাবের চার তলার পূর্ব পার্শ্বের লবিতে গিয়ে দেখি, একা বসে সিগারেট ফুঁকছেন। (চলবে)