বুধবার, ০৮-জুলাই ২০২০, ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন

পাসপোর্ট রঙ্গ

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৪ মার্চ, ২০২০ ০৮:৪১ অপরাহ্ন

আহমেদ আরিফ: আম্মুর পাসপোর্টের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যাবার পরও আবেদন জমা নেয়নি চট্টগ্রামের পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা। জমা না নেওয়ার একমাত্র কারণ, জমির দলিল সাথে নেয়া হয়নি। চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের পাসপোর্ট বানাতে জমির দলিল লাগবে এমন কোন তথ্য পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেয়া নেই। কিন্তু, চট্টগ্রামের পাসপোর্ট অফিসের নিয়ম নাকি আবেদনকারীর জমির দলিল ছাড়া পাসপোর্টের আবেদন গ্রহন করা হবেনা! পাসপোর্ট বানাতে জমির দলিল কেন লাগবে কিংবা কোন ভদ্র মহিলার নামে যদি জমি না থাকে তখন কি হবে এইসব প্রশ্ন করা অবান্তর। তাই পাসপোর্টের আবেদন জমা না দিয়েই বাসায় ফিরতে হয়েছিল অসুস্থ আম্মুকে।

কয়েকদিন পর আবার অনলাইনের আবেদন ফরম, এনআইডির সত্যায়িত কপি, জমির দলিল, এলাকার চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট, বিদ্যুৎ বিলের কপি সহ একগাদা কাগজ নিয়ে আবার পাসপোর্ট অফিসে। ডেস্ক কর্মকর্তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ফরম দেখে আবেদনের ফরমে দুটি 'ভুল' (!) আবিস্কার করলেন।

প্রথম ভুল, আম্মুর বাবার নামের আগে 'মৃত' কেন লেখা হয়নি! অথচ  পাসপোর্টের আবেদনের ফরমে স্পষ্ট লেখা আছে কারো বাবা/স্বামী মৃত হলে নামের আগে 'মৃত' লেখা যাবেনা। দ্বিতীয় ভুল, আবেদনের ফরমে আম্মুর মৃত বাবার পেশার অপশনে 'শিক্ষক' দেওয়া হয়েছে কেন?

অনলাইনে ফরম পূরনের সময় বাবার পেশা Mandatory. নানা ৩৬ বছর শিক্ষকতা করেছেন। তাই পেশার জায়গায় 'শিক্ষকতা' দিয়েছি। পেশার জায়গায়  'মৃত' দেওয়ার কোন অপশন অনলাইনে যেহেতু নাই সেহেতু পেশা শিক্ষকতা দেয়াটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু, পাসপোর্ট অফিসের একটাই কথা, আবেদনকারীর বাবা যেহেতু মৃত তাই 'শিক্ষকতা' লেখা যাবেনা। Unemployed লিখতে হবে। পাসপোর্ট আবেদনের ফরমে কিংবা ওয়েবসাইটের নির্দেশনায় কোথাও উল্লেখ নেই আবেদনকারীর বাবা মৃত হলে বাবার পেশা Unemployed লিখতে হবে।

Unemployed বাংলা অর্থ কি মৃত? কিংবা Unemployed লেখা থাকলে বোঝা যাবে আবেদনকারীর বাবা মৃত?তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম আমরা অশিক্ষিত বাঙাল। পাসপোর্ট অফিসের শিক্ষিত 'স্যার'দের কাছে Unemployed এর বাংলা অর্থ 'মৃত'। চাইলেই পেশা শিক্ষকতা থেকে Unemployed করে দিতে পারতেন এনরোলমেন্ট অফিসার। এতে ১০ সেকেন্ডও লাগার কথা না।অনলাইন আবেদন ফরমের ডাটা বারকোড রিডার দিয়ে পাসপোর্ট অফিসের মূল সার্ভারের প্রবেশ করার পর আবেদনের যেকোন তথ্য এডিট করতে পারেন এনরোলমেন্ট অফিসার। কোন বানান ভুল থাকলে সেটাও কারেকশন করে দিতে পারেন।

কিন্তু, আবেদন জমা নিলেন না অফিসার।আবার নুতুন করে ফরম পূরন করে সত্যায়িত করে যেতে হবে? না, আরেকটা পথ আছে। সেটা হচ্ছে, দালাল ধরা।পাসপোর্ট অফিসের পাশেই এক দালালের সাথে ৩৩০০ টাকায় চুক্তি করলেন আব্বু। দালাল নতুন করে ফরম পূরন করে অন্যের সিল মেরে নিজেই আবেদন ফরম সত্যায়িত করে দিলেন। আবেদনের ফরমের উপরে 'বিশেষ চিহ্ন'  দিয়ে জানিয়ে দিলেন, এলাকায় পুলিশ ভেরিফিকেশনও যাবেনা ! জমির দলিল ছাড়া প্রথমবার পাসপোর্ট জমা নেয়নি!কিন্তু, উইদআউট ভেরিফিকেশন ছাড়াই পাসপোর্ট! আহা! একেই বুঝি বলে দালালের কেরামতি!!!

পেশার অপশন নিয়ে নানারকম নাটক করা পাসপোর্ট অফিসের কর্তারা আবেদনের ফরমের বিশেষ চিহ্ন দেখেই নামকাওয়াস্থে ফরম দেখেই আবেদন জমা নিলেন। ছবি উঠালেন, ফিঙ্গার প্রিন্ট নিলেন। আবেদনের ফরমে জাদুকরী 'বিশেষ চিহ্নের' বদৌলতে সবই হয়ে গেলো কিছুক্ষনের মধ্যে! কারণ, দালালকে দেওয়া ৩৩০০ টাকার ভাগ পাসপোর্ট অফিসের কর্তারাও পাবেন! আমাদের মত মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির মানুষদের জন্য ৩৩০০ টাকা অনেক কিছু। মাস শেষে পাওয়া বেতনের টাকার নোটগুলোর পেছনে থাকে টুকরো টুকরো দীর্ঘশ্বাঃসের গল্প। যে গল্প শুধুই নিজের।

প্রিয় পাঠক, এতক্ষন যা পড়লেন তা গেল বছরের নভেম্বরের পাসপোর্ট রঙ্গের গল্প। এরপর? শুধুই অপেক্ষা! আম্মুর পাসপোর্ট জমা দেবার এক সপ্তাহ আগে আব্বুর পাসপোর্টও জমা দিয়েছি। ২১ দিনে  পাসপোর্ট হাতে পাবার কথা। ৪ মাস হতে চললো, এখনো আব্বু-আম্মুর পাসপোর্ট হয়নি। গত দুই মাস ধরে Application Status দেখছি Pending for Passport Personalisation. অর্থাৎ এখনো পাসপোর্ট প্রিন্ট হয়নি। অফিসে গিয়ে প্রতিদিনই অনলাইনে আব্বু-আম্মুর পাসপোর্ট আবেদনের Status দেখি। প্রতিবারই ভাবি আজ বুঝি পাসপোর্ট প্রিন্ট হয়েই গেল! ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত আমি গত কয়েকদিনে বন্ধু-বান্ধবদের কাছে যা শুনছি তাতে রীতিমত আতংকিত। আবার কোন দালাল না ধরলে আগামী ৩ মাসেও আব্বু-আম্মুর পাসপোর্ট প্রিন্ট হবে কিনা সন্দেহ আছে।

এতদিন জানতাম পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে গেলে দালাল ধরা লাগে। তবে এবার নুতুন আরেকটি ব্যাপার জানলাম। Pending for Passport Personalisation হচ্ছে পাসপোর্ট প্রিন্ট হবার আগের ধাপ। এই ধাপে গিয়ে আটকে পড়া পরিচিত একজন পাসপোর্ট অফিসের এক কর্তাকে ১১ হাজার টাকা দেওয়ার ৯ দিন পরই পাসপোর্ট হাতে পেয়েছে! টাকা দেওয়া ছাড়াও আরেকটি পথ আছে। দুঃখিত পাঠক, পথটি জানাতে নিরাপদ বোধ করছিনা। কারণ, তাতে কেউ আবার নাখোশ হতে পারেন।

ahmedarif2011@gmail.com