বৃহস্পতিবার, ০২-এপ্রিল ২০২০, ০৯:২৫ অপরাহ্ন
প্রসঙ্গ : প্রশাসনে সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তার পদায়ন

সচিব হতে পারলেন না সোহরাব হোসাইন!

shershanews24.com

প্রকাশ : ১১ মার্চ, ২০২০ ০৮:০২ অপরাহ্ন

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
একরামুল হক: সোহরাব হোসাইন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে ছিলেন ২০১৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে এর আগে মাত্র একজন কর্মকর্তা সচিব হিসেবে তার থেকে ১৫দিন বেশি এ মন্ত্রণালয়ে ছিলেন। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর পিএস এবং অতিরিক্ত সচিব পদেও তিনি এ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর ডান হাত হিসেবে কাজ করেছেন। সেগুলো হিসাবে আনলে দেখা যায়, শিক্ষাখাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে তিনিই ক্ষমতাবান ছিলেন। শিক্ষাখাতের ওপর কাজের সুযোগ তারচেয়ে আর বেশি কোনো কর্মকর্তা পাননি। তাই সোহরাব হোসাইন অবসরের পর আমার ইচ্ছা হলো, শিক্ষাখাত সম্পর্কে তার সঙ্গে কিছু কথা বলার। যেহেতু শিক্ষা সচিব হিসেবে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে যেসব কথা, ঘটনা ইতিপূর্বে জেনেছি সেগুলো নিয়ে কথা বলার দরকার ছিল। তাছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল অনেক এবং তাঁর অনেক কর্মকাণ্ড নিয়ে আমার নিজেরই খটকা লেগেছিল। শিক্ষাখাতে বিগত সময়ে যেসব দুর্নীতি-লুটপাট, অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে সেগুলোতে তার হাত ছিলো বা তার হাত দিয়েই  হয়েছে। যদিও তিনি নিজেকে একজন সৎ কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করে থাকেন। আমি নিজেও তাকে এক সময় সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা বলে জানতাম।
বিগত সংখ্যার প্রতিবেদনেই বলেছি, শিক্ষা সচিব থাকাকালে সোহরাব হোসাইন এতো বেশি ব্যস্ত ছিলেন যে, কোনো বিষয়ে তার সঙ্গে ধীরস্থিরভাবে কথা বলা খুবই দুঃরহ ব্যাপার ছিল। তাই অবসরের পর তাকে মোবাইল ফোনে এই মর্মে এসএমএস পাঠালাম যে, “শিক্ষাখাতে বিগত সময়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে লিখতে চাই। কথা বলা প্রয়োজন।” তিনি ফোন করে জানালেন, এখন বেশিরভাগ সময় বাসায় এবং অফিসার্স ক্লাবেই কাটাচ্ছেন। অফিসার্স ক্লাবের নির্বাচন চলছিল তখন। নির্বাচনের পরে যে কোনো দিন ফোন করে অফিসার্স ক্লাবে যেতে বললেন। সেই অনুযায়ী আগে ফোন করেই সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু মাত্র কয়েকদিন আগের মহাব্যস্ত, মহাক্ষমতাবান সচিবকে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় একাকী বসে সিগারেট টানতে দেখে আমার নিজেরই খারাপ লাগলো। কুশলাদি বিনিময়ের পর চা পর্বে আসল আলোচনা শুরু করলাম চার বছর আগের খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল আলোচিত সেই দুর্নীতির ঘটনা নিয়ে। 
সম্ভবত ২০১৬ সালের জুন মাসের শেষের দিকের কথা। ওই সময় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইস্যুটি নিয়ে একবার কথা বলতে গিয়েছিলাম তাঁর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দফতরে। তারপর সোহরাব হোসাইনের সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাত বা ফোনেও কথাবার্তা আর হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন, বিশেষ করে শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগের দুর্নীতি-লুটপাট নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে। কিন্তু সেইসব প্রতিবেদনে কখনো ঘুর্ণক্ষরেও তাঁর নাম উল্লেখ করিনি। আগেই বলেছি, এক সময়ের বিশেষ দুর্বলতার কারণে তাঁর নামটি সচেতনভাবেই হয়তো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে, অনেক ঘটনায়ই সংশ্লিষ্টরা সরাসরি তার বিরুদ্ধেই অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছেন। এবং তাতে জাজ্বল্য তথ্য-প্রমাণও আছে। তারপরও কেন যেন আমার মনে হয়েছে, তিনি দোষী নন- নির্দোষ। মনে হয়েছে, অর্থের বিনিময়ে তিনি এগুলো করেননি। তার নিজের কোনো স্বার্থ এতে ছিল না। তবে কেন তিনি এসব করছেন, হিসাব মেলাতে পারছিলাম না। আলাপচারিতায় তার সমর্থকরা কেউ কেউ তখন আমাকে বলছিলেন, মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের চাপে পড়ে এসব করছেন সোহরাব হোসাইন। হয়তো তা-ই বিশ্বাস করেছি, আর এ কারণেই তার বিরুদ্ধে কোনো শব্দ আমার প্রতিবেদনে ছাপা হয়নি।
অবশ্য, অফিসার্স ক্লাবের এ দিনের আলোচনায় সোহরাব হোসাইনকে এ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি সব ধারণা পাল্টে দিয়ে আমাকে বললেন, এই চার বছর শিক্ষাসচিব পদে থাকাকালে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ তার শুধুমাত্র একটি বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছেন। অফিসার্স ক্লাবের বন্ধুদের সুপারিশে একজন অযোগ্য মহিলাকে ঢাকার একটি কলেজের প্রিন্সিপাল পদে নিয়োগ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। এ প্রস্তাবটি মন্ত্রীর কাছে গেলে মন্ত্রী ফাইলসহ সচিবের দফতরে এসে তাকে বুঝিয়ে বলেন এবং প্রস্তাবটি নাকচ করে দেন। এ ছাড়া আর কোনোদিন কোনো বিষয়ে নুরুল ইসলাম নাহিদ তাকে অনুরোধ বা চাপ সৃষ্টি করেননি। সোহরাব হোসাইনের এমন কথায় আমি অত্যন্ত অবাকই হলাম। কারণ, শুধু আমার নয়; সম্ভবত তাকে চেনেন-জানেন এরকমের সবারই একই ধারণা, নুরুল ইসলাম নাহিদের চাপে পড়ে সোহরাব হোসাইন এসব অপকর্ম করেছেন। তার ব্যাচমেট ও বন্ধুরা অনেকেই এ কারণে এমন কথা বলতেন, ‘সোহরাব আর সচিব হতে পারলো না। ‘পিএস’ হিসেবেই রিটায়ার করতে হবে তাকে।’ যদিও তিনি ওই সময় শুধু সচিব নন, সিনিয়র সচিব পদে। 
এসব প্রসঙ্গে সোহরাব হোসাইনকে এদিন জিজ্ঞেস করা হলে তিনি শুধু বলেন, আমার বন্ধুরা ‘জেলাসি’ থেকেই এসব বলছে। 
আসা যাক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই প্রসঙ্গে। ২০১৬ এর মার্চের মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা। পরিকল্পনা বিভাগের আমার ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তা ফোন করে আমাকে তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বললেন। সাক্ষতে তিনি জানালেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. মোহাম্মদ ফায়েকুজ্জামানের দুর্নীতি ধরতে গিয়ে উল্টো মহাবিপাকে পড়েছেন ১০ সদস্যবিশিষ্ট আন্তঃমন্ত্রণালয় মূল্যায়ন কমিটির কর্মকর্তারা। ভিসি নিজে বাঁচতে গিয়ে উল্টো তদন্ত কমিটির বিরুদ্ধেই ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ এনেছেন। কমিটির মধ্যে তিনজন ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা উইংয়ের (ইকোনোমিক ক্যাডারের) কর্মকর্তা। বাকিরা ছিলেন আইএমইডি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা উইংয়ের এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি। বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা উইংয়ের এই তিনজনের উপর সচিব সোহরাব হোসাইন মহাক্ষুব্ধ হয়েছেন। তিনি পরিকল্পনা সচিবকে ফোন করে সঙ্গে সঙ্গে এদের ওএসডি করিয়েছেন। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের ব্যবস্থাও করছেন, অবস্থা এমন! 
অথচ এই মূল্যায়ন কমিটির সদস্যরা ২৯ এপ্রিল, ২০১৬ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরেজমিন তদন্তে গিয়ে সেখানকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভিসির ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির হাতেনাতে প্রমাণ পান। সেইসব প্রমাণসহ কমিটি তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করে। ১০ সদস্য বিশিষ্ট আন্তঃমন্ত্রণালয় মূল্যায়ন কমিটি তাদের প্রতিবেদনে অবকাঠামো উন্নয়নে অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে সার্বিক পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি অনিয়ম ঠেকাতে আটটি সুপারিশ করে ১০ মে, ২০১৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়। মূল্যায়ন কমিটির সরেজমিন তদন্তে অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠায় ক্ষুব্ধ হন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ফায়েকুজ্জামান। এরপর তিনি কমিটির বিরুদ্ধে পাল্টা ১০ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ আনেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে। যদিও ভিসি এমন অভিযোগের কোনো ভিত্তি বা প্রমাণ বা আলামত দেখাতে পারেননি তারপরও শিক্ষা মন্ত্রণালয় দুর্নীতিবাজ ভিসির পক্ষ হয়ে একেবারেই একতরফা পদক্ষেপ নেয়। এ ব্যাপারে নজিরবিহীন অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় তৎকালীন শিক্ষাসচিব সোহরাব হোসাইনকেই। তিনি অনিয়ম-দুর্নীতির দালিলিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ভিসির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আন্তঃমন্ত্রণালয় মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। পরিকল্পনা কমিশনের সচিবকে দফায় দফায় ফোন করেন মূল্যায়ন কমিটির আহ্বায়ক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা উইংয়ের প্রধান স্বপন কুমার ঘোষ, একই উইংয়ের উপ-প্রধান মো. ইমরুল মহসিন এবং সহকারী প্রধান নিশাত জাহানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য। 
আন্তঃমন্ত্রণালয় মূল্যায়ন কমিটির পেশকৃত ওই তদন্ত প্রতিবেদনের উপর জুন, ২০১৬ এর মাঝামাঝি সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সচিব সোহরাব হোসাইনের সভাপতিত্বে একটি আলোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে ভিসি ফায়েকুজ্জামানও উপস্থিত ছিলেন। তদন্ত প্রতিবেদনে উপস্থাপিত অনিয়ম-দুর্নীতির দালিলিক প্রমাণগুলো নিয়ে আলোচনাকালে ভিসি ফায়েকুজ্জামান এসবের কোনো ব্যাখ্যা বা জবাব দিতে পারেননি। এ সময় ভিসিকে অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তে দেখা যায়। কিন্তু বৈঠকে সবার সামনেই সচিব সোহরাব হোসাইন ভিসিকে এই বলে সাহস দিতে দেখা যায়, ‘আপনার ভয় পাবার দরকার নেই। কিচ্ছু হবে না। আমি আছি আপনার সাথে।’ বৈঠকে উপস্থিত সকলেই সোহরাব হোসাইনের এমন ভূমিকায় অবাক হন। এর কয়েকদিন পরে, সম্ভবত জুন মাসের শেষের দিকে আমি সচিব সোহরাব হোসাইনের সঙ্গে তার দফতরে সাক্ষাত করি এবং এ ঘটনাটি নিয়ে কথা বলি। কিন্তু তিনি কোনো সদুত্তর আমাকে দিতে পারেননি। তারপর আর কোনো বিষয়ে সচিব সোহরাব হোসাইনের মুখোমুখি হইনি। কারণ আমার মনে হয়েছে, তার সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলাটাই অর্থহীন। তিনি কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হচ্ছেন।