বুধবার, ০৮-এপ্রিল ২০২০, ০৩:৩৬ অপরাহ্ন

ইউটিউব-ফেসবুক দেখে নিজেকে ডাক্তার ভাবার মানসিকতা পাল্টাতে হবে

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৬ মার্চ, ২০২০ ১০:৩৬ পূর্বাহ্ন

এফ এইচ ফারহান: মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনে অতি সম্প্রতি প্রকাশিত একটা দুঃসংবাদ দিয়ে শুরু করতে চাই । সংবাদটির বঙ্গানুবাদ অনেকটা এমনই ছিলো যে, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার এক ব্যক্তি করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় নিজের থেকেই ক্লোরোকুইন ফসফেট খেয়ে মারা গেছেন। তার স্ত্রী ক্লোরোকুইন ফসফেট খেয়ে এখন মৃত্যুশয্যায় ।
 
আমি সেদিকে যাচ্ছি না; খুব বড় বা বিস্তারিত বিবরণ দিয়েও কিছু লিখবো না। কারণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এখন বাংলাদেশের মোটামুটি অধিকাংশ মানুষই এক-একজন করোনা বিশ্লেষক। যদিও অতিরিক্ত সচেতনতা বিপদেরই লক্ষণ ।
 
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমাদের মানসিক প্রস্তুতিকে এন্টিম্যালেরিয়ালস হাইড্রোক্সি-ক্লোরোকুইন ( বাণিজ্যিক নাম- প্ল্যাকুইনিল ), যা মূলত একটি স্কাইজোন্টঘাতক ড্রাগ ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এজিথ্রোমাইসিনের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশ সেটাকে খুব গুরুত্বসহকারে নিচ্ছে এবং সম্প্রতি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ বার্তায় বলা হয়েছে, তাদের কাছে বিশ হাজার লোকের চিকিৎসা দেয়ার মতো এই মেডিসিন মজুদ রয়েছে । ডেল্টা ফার্মাসিউটিক্যাল বলছে, তাদের কাছে নতুন ঔষধ তৈরি করার মতো প্রয়োজনীয় কাঁচামাল নেই। এই খবরে মানুষ ছুটছে ঔষধের ফার্মেসীতে; এটা ভাবছে না যে, মেডিসিনগুলা কিভাবে কাজ করে বা অনিয়মতান্ত্রিক ব্যবহারে এর সাইড ইফেক্ট কতটা ভয়াবহ হতে পারে ! অনেক ফার্মেসীও দেখা যাচ্ছে চড়া দামে ঔষধগুলো বিক্রি করছে ।
 
করোনা ভাইরাস একটি বৈশ্বিক দুর্যোগ। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই এখন এই ভাইরাসে আক্রান্ত । করোনা ভাইরাস থেকে সংক্রমিত রোগের নামই হচ্ছে কভিড-১৯ । ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এই নতুন ভাইরাস ও রোগটি সবার কাছে ছিল অজানা । ফার্মাসিউটিক্যাল সাইন্সে যে রাষ্ট্রগুলো বিশ্বজুড়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তারাও অনেকটা দিশেহারা বলা যায় । তবে ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে, দেশে দেশে বিজ্ঞানীরা জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এর প্রতিষেধক উদ্ভাবনে । করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় বিজ্ঞানীরা প্রায় ৭০টি ওষুধ পরীক্ষার ওপর নজর দিচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ওষুধগুলোর বৈশ্বিক প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। তবে সংস্থাটি এগুলোর মধ্য থেকে কয়েকটি ওষুধ নিয়ে চারটি সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলে গত রোববার সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এক নিবন্ধ হতে জানা যায় ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গুরুত্ব দেওয়া ওষুধগুলোর প্রথমটি হচ্ছে ইবোলা চিকিৎসায় ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রের বায়োটেক কোম্পানি জিলিড সায়েন্স উৎপাদিত রেমডিসিভির।  দ্বিতীয়টি সংক্রামক রোগের বীজনাশক ওষুধের একটি মিশ্রণ। এই যৌগে রয়েছে ম্যালেরিয়ার ওষুধ ক্লোরোকুইন ও হাইড্রোক্লোরোকুইন। তৃতীয়টি হচ্ছে এইচআইভির দুটি ওষুধের সমন্বয় লোপিনাভির ও রিটোনাভির । চতুর্থ চিকিৎসা পদ্ধতি হচ্ছে তিনটি ওষুধের সমন্বয়। এতে এইচআইভি চিকিৎসায় ব্যবহৃত লোপিনাভির ও রিটোনাভিরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ইন্টাফেরোন-বেটা। এই  ইন্টাফেরোন বেটা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর আক্রমণকারী ভাইরাসকে দুর্বল করে ।
কিছু পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চীনে সীমিত পরিসরে করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় এইচআইভি চিকিৎসায় ব্যবহৃত দুটি ওষুধের সমন্বিত প্রয়োগ কাজ করেনি। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্বাস বিভিন্ন ধরনের রোগীর ওপর ব্যাপক আকারে এর পরীক্ষা প্রয়োজন ।
নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের শোহোমিশ কাউন্টিতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এক তরুণের ওপর রেমডিসিভির প্রয়োগ করা হয়। প্রথম দিন তার অবস্থা আরো অবনতির দিকে যায়। দ্বিতীয় দিন থেকে তার অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে। ক্যালিফোর্নিয়াতেও করোনা আক্রান্তেএক রোগীর ওপর রেমডিসিভির প্রয়োগ করা হয় এবং সে সুস্থ হয় ।
চীনে ২০ জনেরও বেশি করোনা আক্রান্ত রোগীর ওপর ম্যালেরিয়ার ওষুধ ক্লোরোকুইন ও হাইড্রোক্লোরোকুইন প্রয়োগ করা হয়েছিল। ওষুধ প্রয়োগের পর তাদের কী অবস্থা হয়েছিল সে বিষয়ে চীন কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। সার্স ও মার্স ভাইরাসের চিকিৎসায় গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছিল লোপিনাভির ও রিটোনাভির । তবে এর ফলাফল খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না।
লোপিনাভির ও রিটোনাভিরের সঙ্গে ইন্টাফেরোন-বেটা যুক্ত করে সৌদি আরবে মার্স ভাইরাসের চিকিৎসায় প্রথম পরীক্ষা করা হয়েছিল । তবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত গুরুতর রোগীর বেলায় ইন্টাফেরোন-বেটা ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী ।
 
এরই মধ্যে করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় ম্যালেরিয়াবিরোধী ওষুধ হাইড্রোক্সি-ক্লোরোকুইন ব্যবহারের অনুমোদন দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন বক্তব্য রীতিমতো আলোচনা সৃষ্টি করেছে । বিয়য়টি সাময়িকভাবে আশার আলো জাগালেও গবেষকরা বলছেন এটা নিয়ে আরো ভাবতে হবে । একইসাথে মেডিসিনটির অনুমোদন কিংবা বিশ্ববাজারে ছাড়ার পূর্বে অন্তত আরো মাস কয়েক দীর্ঘ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে । হার্ট, কিডনী , লিভার সহ নানা দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এর ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে ।
 
রসায়ন বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমি নিজে যতটুকু জানি ক্লোরোকুইন জাতীয় ঔষধ ডিএনএ ট্রান্সলেশনে অংশগ্রহণ করে পরজীবীর কোষ বৃদ্ধি আটকে দেয় । ফলে জীবাণু দেহে বিস্তার লাভ করতে পারে না । এটি মূলত ম্যালেরিয়া জীবাণুর ইরাইথ্রোসাইটিক অবস্থাকে ধ্বংস করে এবং প্লাজমডিয়াম ফ্যালসিপেরাম দ্বারা সৃষ্ট ম্যালেরিয়াতে উত্তম প্রতিষেধকরূপে কাজ করে। রাসায়নিকটি ম্যালেরিয়া চিকিৎসায় স্বল্পমাত্রায় ব্যবহার করা হয়। বাণিজ্যিকভাবে এটি মাছের ট্যাঙ্ক পরিষ্কারের জন্যও ব্যবহৃত হয় ।
 কিছু গবেষণায় প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, ক্লোরোকুইন কার্যকর হতে পারে সার্স করোনাভাইরাস-২ এর ক্ষেত্রে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইলন মাস্ক এর আগেও বলেছেন, করোনাভাইরাস ঠেকাতে ক্লোরোকুইন সহায়তা করবে ।
মেডিসিনাল সায়েন্স যেটা বলে, ক্লোরোইন প্রয়োগে কার্যকারিতার বিপরীতে যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে । এমতাবস্থায় আমাদের ডাক্তার এবং গবেষকদেরও এ জাতীয় ওষুধ অনুমোদন বা প্রেসক্রাইভ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভাবতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য মানুষজন নিজের মতো করে উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে ।