শনিবার, ০৮-আগস্ট ২০২০, ০৫:২৪ অপরাহ্ন

গালওয়ান ভ্যালির চীন ভারত সীমান্ত সংঘাত প্রসঙ্গে

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৮ জুন, ২০২০ ০৮:৫১ অপরাহ্ন

চীন ভারত সীমান্তে লাদাখের গালওয়ান ভ্যালিতে গত সপ্তাহে ঘটে যাওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ছাড়া এক দফায় মারাত্মক যুদ্ধে ভারতের ভাষ্যমতে ২৩ জন ভারতীয় সৈন্য নিহত, বহু আহত।  চীনের সরকারি মাধ্যম তাদের পক্ষে ৫ জন নিহত ও ১১ জন আহতের কথা উল্লেখ করেছে। এখন আবার উভয় পক্ষ মুখোমুখি। বলা যায়, পরিস্থিতি চরম উত্তেজনাকর। আমরা যদি নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করি তবে চীন-ভারত সীমান্তে যুদ্ধের মে দামামা বাজছে তা হয়তো বাস্তবে রূপ লাভ করবে না। চীন-ভারত সীমান্তের আড়াই মাইলের মধ্যে কোন পক্ষ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করবে না এই মর্মে একটি লিখিত  চুক্তি আছে। দেখা যায়, চুক্তিটি দু'পক্ষই জীবন-মরণ দিয়ে মেনে চলছে। চীন এবং ভারত দুই পক্ষ থেকেই রণ হুংকার শোনা গেলেও যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে একটু পর্যালোচনা করতে চাই। 
চীন যতই বাগাড়ম্বর করুক, ভারতকে চাপে রাখার প্রচেষ্টায় সে গালওয়ান ভ্যালিতে সৈন্য এবং সমর সম্ভার বাড়াচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে চীনের ভীষণ রকমের অনীহা আছে। এর সর্বপ্রথম কারণ হল: সমগ্র পৃথিবীতে চীন একটি পরাশক্তি হিসেবে পরিচিত। যেকোনো পরিস্থিতিতে যদি চিন গালওয়ান ভ্যলির যুদ্ধে যদি কোনরকম চাপে পড়ে বা যুদ্ধে দুর্দান্ত কিছু না দেখাতে পারে তাহলে পরাশক্তি হিসেবে সারা পৃথিবীতে তাঁর সুনাম ও প্রতিপত্তি ক্ষুন্ন হবে। দ্বিতীয়তঃ গালওয়ান ভ্যালি এলাকাটি ছোট ছোট টিলা আর পাহাড়বেষ্টিত। সামরিক শক্তি বিবেচনায় চীনের মেকানাইজড ডিভিশন এবং পদাতিক বাহিনী ভারতের তুলনায় অনেক শক্তিশালী। সেটা সংখ্যাধিক্য, অস্ত্রশস্ত্রের মান-পরিমান সবকিছু বিবেচনায়। তবে অসুবিধা হলো গালওয়ান ভ্যালিতে চীনের সবচেয়ে শক্তিশালী আক্রমনাত্মক মেকানাইজড ট্যাংক টেলিভিশন সেখানকার ভূ - প্রকৃতির কারণে কাজে লাগাতে অসুবিধা হবে। তাদের মোটামুটি নির্ভর করতে হবে পদাতিক বাহিনী এবং দূরপাল্লার কামান ও ক্ষেপণাস্ত্রের উপর।

 যদিও ইতিমধ্যে ভারত সেখানে প্রচুর সৈন্য ও যুদ্ধসরঞ্জাম সমাবেশ করেছে, এমনকি বেফোর্সের মতো কার্যকর দূরপাল্লার কামানের সমাবেশও ঘটিয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যায়। যদিও সুইডেনের তৈরি বেফোর্সের মত কার্যকর দূরপাল্লার কামান চীনের হাতে আছে কিনা তা নিয়ে বিশ্বের সমরবিদদের সংশয় আছে। তদুপরি বিমানবাহিনীর অত্যাধুনিক বিমান এবং মিসাইল ধারী আক্রমণাত্মক আমেরিকান CH 47 চিনুক ও এপ্যাচি হেলিকপ্টারে ভারত ইতিমধ্যে সমৃদ্ধ। তাদের সুখই ৩০, মিগ ২৯, জাগুয়ার, এবং ফ্রান্সের মিরাজ ২০০০ এক্ষেত্রে চীনকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। পদাতিক বাহিনী কে গ্রাউন্ড সাপোর্ট দিতে মিগ ২৯ এবং মিরাজ ২০০০ এর কোন তুলনা নেই। প্রতিপক্ষে চীনের নিজস্ব বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী এবং যুদ্ধবিমানের সংখ্যা তাদের অনেক বেশী হলেও তাদের আক্রমণাত্মক এবং বোমারু বিমান গুলি ভারতীয় বিমানের সমপর্যায়ের নয় বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। চীনের নিজস্ব  Chengdu J-20- Mighty Dragon, Shenyang J 11, Changdu J-10,  রাশিয়ার তৈরি Sukhoi 27, Sukhoi 30, Sukhoi 35 সহ নিজস্ব আরো কিছু অত্যাধুনিক বিমানে তারা তাদের বিমানবাহিনীকে সাজিয়েছে। 

তবে প্রকৃত যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এগুলির পারফরম্যান্স সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞদের যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ভারত পাকিস্তানের পুলওয়ামা ঘটনার পর পাকিস্তানের হাতে পাকিস্তান এবং চীনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি JF 17 Thunder যে যুদ্ধবিমান আমেরিকার এফ-১৬ এর ডিএনএ সমৃদ্ধ বলে ধরা হয়, তার ব্যবহার না করে পাকিস্তানিরা আমেরিকার তৈরি এফ-১৬ এর উপর বেশি ভরসা করেছিল। সুতরাং, গালওয়ান ভ্যালিতে প্রকৃত যুদ্ধে চীনকে সর্বতোভাবে তাদের কার্যকর পদাতিক বাহিনীর উপর অত্যাধিক নির্ভরশীল হতে হবে। চীনের আরো একটি বড় অসুবিধে হল তাদের যুদ্ধ বিমান ঘাঁটি গুলি বেশিরভাগই পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। যেখান থেকে আক্রমণ পরিচালনা করা স্ট্র্যাটেজিক কারনে কিছুটা অসুবিধা পূর্ণ। তবে বিমান শক্তিতে চিনারা অসুবিধায় থাকলেও দূরপাল্লার কামানের সংখ্যা, ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য অত্যাধুনিক মিসাইল শক্তিতে তারা ভারতের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রগামী। তদুপরি প্রকৃত যুদ্ধ বেধে গেলে ভারতকে একসাথে তিনটি ফ্রন্টে মোকাবেলা করার ঝুঁকি মাথায় রাখতে হবে। যদিও ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন সাম্প্রতিক এবং অতীত যুদ্ধে চীন পাকিস্তানের সমর্থনে বাস্তব কোনো সাড়া দেয়নি - তবে বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। পাকিস্তান যেহেতু বর্তমানে আমেরিকার সঙ্গে সু সম্পর্কে নেই, সেহেতু তারা সম্পূর্ণভাবে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল। চিন চাইলে পাকিস্তান ভারতের সাথে নতুন একটি ফ্রন্ট খুলতে এমনকি অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাধ্য হবে। সে ক্ষেত্রে চীন সীমান্তে ভারতের পূর্ণাঙ্গ শক্তি নিয়োগ অসম্ভব হয়ে পড়বে। 

এদিকে নেপালের সঙ্গে বর্তমানে ভারতের সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে। নেপাল ভারত সীমান্তে ইতিমধ্যে সৈন্য সমাবেশ করেছে। তাদের সেনাপ্রধান সীমান্ত এলাকা সফর করে গেলেন মাত্র, এবং এর পেছনে চীনের যে হাত আছে এটা সর্বজনবিদিত। তাছাড়া ভুটানের সঙ্গেও চীনের সাম্প্রতিক সখ্যতা উল্লেখ করার মতো। এ সমস্ত কিছু মাথায় রাখলে ভারতের পক্ষে যুদ্ধ করার মনোবল ধরে রাখা কঠিন হবে। তাছাড়া ভারতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে চীনের প্রতি একটি মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ১৯৬২ সাল থেকে বিদ্যমান। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের মনোবল, মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা ইত্যাদি একটি নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে থাকে।

ভারতের সাথে বিবাদের সুবাধে চীন কূটনৈতিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট পারদর্শিতার পরিচয় দিচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া ভারতের প্রভাব বলয়ে আর কেউ বর্তমান নেই। নেপাল একটি হিন্দু রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও ভারতকে তার অন্যতম বৈরি রাস্ট্র মনে করে। একই রকম অবস্থা শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপের। পাকিস্তানের কথা না হয় বাদই দিলাম। ভারতের ঘনিষ্ঠতম একমাত্র মিত্র হিসেবে বাকি রইল শুধু বাংলাদেশ। চীনের সাথে সীমান্ত সমস্যা শুরু হওয়ার পর চীন বাংলাদেশকে তার বলয়ে আনার চেষ্টা প্রবল করেছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রায় সকল পণ্যের ক্ষেত্রে সম্প্রসারণ একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তবে চীনের শত চেষ্টাতেও বাংলাদেশকে ভারতের বলয়ের বাইরে নেওয়া চীনের পক্ষে বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্ভব হবে না। এর পেছনকার কারণ ব্যাখ্যা করতে গেলে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রসঙ্গ এসে যায়, যা এড়ানো প্রাসঙ্গিক। তবে চীন ভারতকে ব্যালান্স করে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে যতটুকু সুবিধা আদায় করতে পারে এটাই হবে বাংলাদেশের মোক্ষম সময় এবং উপরি পাওয়া।
 



..........