বৃহস্পতিবার, ২২-অক্টোবর ২০২০, ০৬:১৪ পূর্বাহ্ন
  • মন্তব্য প্রতিবেদন
  • »
  • ইতিহাসের শিক্ষার আলোকে কোভিড-১৯ এর মোকাবেলা করেই সভ্যতার ও মানবতার মশাল জ্বালাতে হবে

ইতিহাসের শিক্ষার আলোকে কোভিড-১৯ এর মোকাবেলা করেই সভ্যতার ও মানবতার মশাল জ্বালাতে হবে

shershanews24.com

প্রকাশ : ১১ জুলাই, ২০২০ ০৪:৫৪ অপরাহ্ন

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ: কোভিড-১৯ এক অন্য রকমের যুদ্ধ-এ যুদ্ধ চলমান। এ যুদ্ধের ভবিষ্যৎ অজানা ও অনিশ্চিত। এই যুদ্ধের আতঙ্কে গোটা বিশ্বে আতঙ্কিত। বিশ্বের বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের প্রচেষ্টায় আমরা যদিও কিছু কিছু জেনেছি—তবু অনেকটা অন্ধকারেই রয়ে গেছি। এটি আমাদের নিজেদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে বলেই আমাদের  প্রত্যাশা। এখন আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে গভীরভাবে ভাবা দরকার। মানুষ হিসেবে আমরা কারা? মানবতা বলতে আমরা কী বুঝি? আমাদের জীবনযাত্রার লক্ষ্য কী? পরস্পরের সঙ্গে আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত? আমরা কীভাবে এই ধরনের গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পেতে পারি? সব প্রশ্নের উত্তর আমাদের  কাছে নেই। তবে একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী, সীমিত জ্ঞান মানুষের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়া আমাদের  কর্তব্য। ইতিহাসের শিক্ষার ভিত্তিতে সামাজিক প্রেক্ষাপটে মহামারীর প্রভাব ও ভবিষ্যৎ করণীয় কি হবে সে বিষয়ে আলোকপাত করা হলো। 
প্রত্যেক মহামারীর পর ইতিহাসের মোড় ঘুরে গিয়েছে। বহু প্রাণের বিনিময়ে মানুষের সভ্যতা জয়ী হয়েছে অস্তিত্বের সংগ্রামে, আলোকিত পথে উত্তরণের দিশা দিয়েছে পরবর্তী প্রজন্মকে, পরিবেশের প্রতি ঋণ মিটিয়েছে, সম্পদের সুষম বণ্টন ঘটেছে, জীব হিসাবে উত্তরণ ঘটেছে প্রত্যেকবার। বুবোনিক প্লেগের পর জীবনযুদ্ধে জয়ীদের জীবনযাত্রার উন্নতি ঘটে, দাস প্রথার অবসানের সূচনায় বেঁচে যায় ‘মানব মন’। ‘নতুন বিশ্বের’ আবিষ্কার প্রাকৃতিক সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার উন্মোচিত করে, স্পেন সহ তৎকালীন ইউরোপে অর্থব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে যা পরবর্তীকালে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার ভিত্তি প্রস্তুত করে। মানুষ বুদ্ধিমান প্রাণী। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বলে বলীয়ান। তাই বলে আমাদের অহংকারী হয়ে ওঠার কোনও জায়গাই নেই। মহাপ্রকৃতির কাছে আমরা অতি তুচ্ছ। তাই পৃথিবীর পরিবেশ আমাদের নির্মল রাখতে হবে। অন্যান্য জীবজন্তুর সঙ্গে আমাদের মিলেমিশে থাকতে হবে। নিজেদের মধ্যে আমাদের সদ্ভাব বজায় রেখে চলতে হবে। বারে বারে আমরা ভুলে যাই জীব হিসাবে মানুষের একত্রিত হয়ে বাঁচতে হবে, লড়তে হবে বিরুদ্ধ অণুজীবদের সঙ্গে। ভুলে গেলে চলবে না আমরা– মানুষরা এক জীব, কেউ বিচ্ছিন্ন নই, কেউ আলাদা নই। 
আমরা যে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছি, তা সত্ত্বেও আমাদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল, যদি আমরা তা তৈরি করে নিতে পারি। যুক্তরাষ্ট্র যখন মহামন্দার শীর্ষে ছিল এবং যখন লাখ লাখ মানুষ অনেক কষ্ট সহ্য করে দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছিলেন, তখন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এই বলে জনগণের কাছে আশা নিয়ে এসেছিলেন, ‘আমাদের কেবল ভয় পাওয়ার বিষয়টাই ভয়’। এই সুন্দর কথা যথাযথভাবে আজও প্রযোজ্য। আমরা মানবজাতি হিসেবে এর আগে অনেক দুর্গতি পেরিয়ে এসেছি। তাই আমরা এই সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসার পথও খুঁজে পাব—এতে আমার কোনো সন্দেহ নাই। প্রতিবন্ধকতাগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য যা করনীয়, তা বাস্তবে রূপ দিতে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। যাঁরা আজকের তরুণ, তাঁরাই এই নতুন যাত্রায় সামনের সারিতে থাকবেন।
কোনো পরিস্থিতিতেই অজ্ঞতা মঙ্গল বয়ে আনে না। দুর্ভাগ্যক্রমে, আমরা নিজেদের সামনে দেখতে পাচ্ছি, কীভাবে অজ্ঞতার কারণে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে। আমরা কীভাবে এর পরিবর্তন করব? আমাদের সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত হতে হবে। শুধু ডিগ্রিধারী হলেই শিক্ষিত হয় না। ভালো–মন্দের যাচাই করার, বিবেচনা করার যোগ্যতা; তথ্য, পরিস্থিতি খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করার এবং সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারার সক্ষমতা—সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত ব্যাক্তিদের অলংকার। এসব গুণাবলী শুধু অর্জন করলে হবে না, এদের বাস্তবে কার্যকরী করতে হবে। যাঁরা উচ্চশিক্ষা অর্জন করে সমাজের উচ্চ আসনে আসীন, তাঁরা যদি দুর্নীতি করে আয় করতে দ্বিধাবোধই না করেন, তাহলে বুঝতে হবে যে তাঁরা সঠিক শিক্ষা পাননি। রোগীর সেবা করার শপথ নিয়ে যিনি ডাক্তারি প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, তিনি যখন করোনা রোগীকে চিকিৎসা করতে অপারগতা প্রকাশ করেন, তখন বুঝতে হবে তাঁর শিক্ষা যথার্থ হয়নি। নিজেকে সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত করুন, অন্যদের শিক্ষার আলোতে আলোকিত করুন, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন করুন। বিজ্ঞানের বিষয় সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করুন। অজ্ঞতা বিপজ্জনক। সংকট থেকে মুক্তি পেতে এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যত গঠনের জন্য আমাদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ওপর নির্ভর করতে হবে। অজ্ঞতার আঁধার মুছে দিতে হবে জ্ঞানের মশাল জ্বালিয়ে। কে বহন করবে এই জ্ঞানের মশাল? সেই কর্তব্য তরুণ শিক্ষানবিশদের ওপরই বর্তেছে।তরুণরা আমাদের ভবিষ্যত। মানবতার ভবিষ্যত তরুণদের হাতে। নতুন বিশ্বের কাছে তাই তরুণদের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।
কভিড-১৯ মহামারি বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এই মহামারিকে জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগের অজুহাত হিসেবে কাজে লাগাতে পারে। সরকারগুলোর সংকট প্রতিরোধে গণতন্ত্রের নামে নানা ধরনের ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ নীতি প্রয়োগে আগ্রহী হতে পারে। এই মহামারি ট্রলের বিস্তার এবং ভুয়া সংবাদের উত্থানকে ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে পেশাদার দক্ষতা ও জ্ঞানের প্রতিনিধিত্বকে অস্বীকার করার প্রবণতার প্রকাশ ঘটাতে পারে। এই সংকট জনস্বাস্থ্যসহ প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্ভরযোগ্যতা ও বৈধতা সম্পর্কেও ব্যাপক সন্দেহকে শক্তিশালী করতে এবং ষড়যন্ত্রমূলক রাজনৈতিক পক্ষগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে এই বিতর্ককে প্রশ্রয় দিতে পারে। করোনা মহামারি মানুষের প্রাকৃতিক মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ব্যর্থতাগুলো প্রকাশ করতে শুরু করেছে। প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্যকে বিকল করে কার্যকর জনস্বাস্থ্য পরিচালনার রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকে ক্ষুণ্ন করছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাসমূহের নির্দেশনায় এবং নয়া উদারনৈতিক পুঁজিবাদী নীতির আলোকে স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রীয় সহায়তা হ্রাসের পদক্ষেপের ফলে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য খাত এই মহামারিজনিত কারণে এখন চরম চাপের মধ্যে রয়েছে।
বর্তমান করোনাক্রান্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মন্দা শুরু হবে আশংকা করছে সবাই আর সে ব্যবস্থাপনায় যারা যতটা সফল হবে তারা ততটা আয়ু ধরে রাখতে পারবে। আর যারা পারবেনা তারা আফ্রিকার মত প্রস্তুতি নিতে হবে করোনা নিয়েই তাদের বাস করতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষের এই গড় আয়ু কমে যাবে আশংকাজনক ভাবে। কারো কারো জন্য পরিনতি কল্পনার চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। আসুন, কোভিড-১৯ পরবর্তী নতুন বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে প্রয়াসী হই। পারস্পারিক সহযোগিতা, সাম্য, সহানুভূতি, বন্ধুত্ব আর ভালোবাসাৱ নতুন বন্ধন গড়ে তুলি। দৃঢ়তা, সাহস আর উদ্যম দিয়ে প্রতিষ্ঠা করি স্বপ্নের বাংলাদেশ। নতুন সভ্যতার জাল বুনে একটি মানবিক বাংলাদেশ উপহার দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়াই হবে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। আগামীর এই আহবানে লক্ষ্য পূরণে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

(সাবেক উপ-মহাপরিচালক
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী
লেখক, কলামিস্ট ও গবেষক)