বুধবার, ১৮-সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:৩১ পূর্বাহ্ন

কাশ্মীর সংকট, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ কি অনিবার্য?

shershanews24.com

প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৭:৫৪ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: নিজের ক্ষমতার দ্বিতীয় মেয়াদে এসে সবচে’ ঝূকিপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটি নিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কাশ্মীরকে বিশেষ অঞ্চলের স্বীকৃতি দিয়ে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫(ক) অনুচ্ছেদ বাতিল করার পর মোদির ব্যাপারে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও রাজনীতি পর্যবেক্ষকদের অভিমত এমনই। গত ৫ আগস্ট ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ লোকসভায় এ সংক্রান্ত বিল উত্থাপন করেন, বিরোধীদের প্রতিবাদের মধ্যেই পাস হয় তা। পরে ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ ওই বিলে স্বাক্ষর করলে ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে বিশেষ সুযোগ ও মর্যাদা পাওয়া জম্মু ও কাশ্মীরের পূর্ণ ভারতীয়করণের পথযাত্রা শুরু করে বিজেপি সরকার। মোদি সরকারের এমন সিদ্ধান্তে ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে চিরবৈরী সম্পর্ক আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের আশংকাও করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এ ঘটনায় দ্বিধাবিভক্ত। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় চলছে। ভারতের নেতাদের কারো কারো ধারণা, এর মাধ্যমে ভারত শুধু অগণতান্ত্রিক আচরণই করেনি, নিজেকে বিপদের দিকেও ঠেলে দিয়েছে, এমনকি ঝূঁকিতে পড়তে পারে ভারতের অখ-তাও। 
জম্মু ও কাশ্মীরের ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলী
জম্মু-কাশ্মীর ভারত শাসিত একটি রাজ্য। এর আয়তন ২ লক্ষ ২২ হাজার ২শ’ ৩৬ বর্গকিলোমিটার, আর জনসংখ্যা সোয়া কোটির মতো। বর্তমানে ভারত শাসিত হলেও দীর্ঘদিন এটি কার্যতঃ একটি স্বাধীন ভূখ- বা অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। ব্রিটিশ রাজের সময়ও এ অঞ্চলটির আলাদা মর্যাদা ছিল। সে সময় জম্মু ও কাশ্মীরের রাজা ছিলেন হরি সিং। অঞ্চলটি মুসলিম অধ্যুষিত কিন্তু শাসক ছিলেন অমুসলিম, তাই তার নীতিতে সন্তুষ্ট ছিলেন না সেখানকার মুসলমানরা। এজন্য ব্রিটিশ আমল থেকেই জম্মু ও কাশ্মীর স্বাধীন হওয়ার জন্য চেষ্টা শুরু করে। ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি) নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে মুসলমানরা। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মো: আবদুল্লাহ স্বাধীন কাশ্মীর কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। 
ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার সময় ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্ট অ্যাক্ট’ অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীর ভারত না পাকিস্তানের অংশ হবে সে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার তাদের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়। কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা পাকিস্তানের সাথে যেতে চাইলেও তৎকালীন রাজা হরি সিং ভারতের অন্তর্ভূক্ত হতে চেয়েছিলেন। পরে রাজা হরি সিং পাকিস্তানের সাথে স্থিতাবস্থায় পৌঁছেন। ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের সশস্ত্র একটি গোষ্ঠী জম্মু ও কাশ্মীরে প্রবেশ করে। রাজা হরি সিং তখন ভারতের কাছে সাহায্য চান এবং প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগের মতো বিষয়গুলোতে ভারতের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেন। এ নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ বাধে। ১৯৪৭ সালের ২১ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ওই যুদ্ধ শেষ হয় ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর। জাতিসংঘ এই যুদ্ধ শেষ করার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা করে। ১৯৪৯ সালের ১৭ অক্টোবর ভারতীয় সংবিধানে ৩৭০ অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়। পরে ১৯৫৪ সালে ৩৫(ক) ধারা সংযোজন করা হয়। এই ধারাগুলোর ফলে ভারতীয় ইউনিয়নের মধ্যে থাকলেও কাশ্মীরের আলাদা পতাকা ও সংবিধান রাখার সুযোগ তৈরি করা হয়। ভারতের অন্য অঞ্চলের মানুষ কাশ্মীরে জমি কিনতে পারতেন না, ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের আদেশ-নির্দেশও কাশ্মীরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। তবে এই চুক্তির বলেই ভারতীয় সৈন্যরা কাশ্মীরে অবস্থান করতে পারছে, বর্তমানে সেখানে ভারতের বিভিন্ন বাহিনীর আট লক্ষ সৈন্য অবস্থান করছে। 
১৯৫৬ সালে জম্মু কাশ্মীরের জন্য আলাদা সংবিধান হয়, তবে এই দুটি অঞ্চলকে ভারতের অংশ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। ১৯৭২ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোর মধ্যে সিমলা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তিতে ’লাইন অব কন্ট্রোল’কে যুদ্ধবিরতি রেখা হিসেবে ঘোষণা করে দুই দেশ। ১৯৭৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহর মধ্যে একটি চুক্তি হয়, এ চুক্তি অনুযায়ী ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়। 
কাশ্মীরের সাম্প্রতিক পর্বের সূচনা হয় ২০১৫ সালের মার্চে জম্মু ও কাশ্মীরের পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির সাথে বিজেপির জোট গঠনের মাধ্যমে। ২০১৮ সালে এই জোট ভেঙে যায়, কাশ্মীরে কেন্দ্রের শাসন চালু করে ভারত সরকার। সবশেষ গত ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫ (ক) ধারা বাতিল করা হয়। এর মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীর কার্যত তার স্বকীয়তা হারালো। ভারতের আইন আর সংবিধানে চলবে ভূস্বর্গ কাশ্মীর! তবে বিষয়টা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয় বলেই মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, কাশ্মীরের জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া এমন সিদ্ধান্ত তারা বিনাবাক্য ব্যয়ে মেনে নেবেন এতোটা আশা করা ঠিক নয়। কাশ্মীরে দীর্ঘদিন ধরেই আগুন জ¦লছে, মোদি সম্ভবতঃ সে আগুনে ঘি ঢাললেন! 
কাশ্মীর নিয়ে মোদির সবশেষ পদক্ষেপে ভারতের আধিপত্যবাদী মনোভাব বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদির আধিপত্য ও শক্তিশালী শাসক হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, মোদির শাসনামলে ’মেরা ভারত মহান’ এই শ্লোগানটি খুব জোরেসোরে উচ্চারিত হচ্ছে। ভারতকে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছেন মোদি। মোদির এই স্বপ্নের শক্তির কাছে কি চাপা পড়ে যাবে কাশ্মীরিদের স্বপ্ন? 
উত্তপ্ত কাশ্মীর, চলছে ধরপাকড়-নির্যাতন
ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ করায় ‘বিশেষ মর্যাদা’ হারিয়ে ভারতনিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। কাশ্মীর আলাদা রাজ্য হবে, আর জম্মু ও লাদাখ মিলে হবে আলাদা রাজ্য। থাকবে না আলাদা সংবিধান ও পতাকা। ফলে বদলে গেল ৭০ বছরের ইতিহাস। কাশ্মীরের পরিবর্তিত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার পরিপূর্ণ প্রস্তুতি ছিল ভারত সরকারের। গত ৭ আগস্ট কাশ্মিরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। শুরু হয় সেনা টহল। ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল করেন কাশ্মিরের সাধারণ মানুষ। ওই সময় বিক্ষোভ মিছিলের উপর গুলি চালায় পুলিশ। এতে অন্তত ৬ জন নিহত হন। এছাড়া কাশ্মিরজুড়ে চলছে গণগ্রেফতার। সাবেক দুই মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি ও ওমর আব্দুল্লাহসহ দুদিনেই গ্রেফতার করা হয় চারশ’র বেশি মানুষকে। শুধু তাই নয়, জম্মু-কাশ্মীর কার্যতঃ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় দেখা দেয় খাদ্য সংকট, বন্ধ করা হয় টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ। যোগাযোগ ও যাতায়াত ব্যবস্থা সংকুচিত করা হয়। সবমিলিয়ে কাশ্মীরিরা এখন পুরোপুরি অবরুদ্ধ জীবনযাপন করছেন। অনেক পর্যবেক্ষক এরমধ্যে দেখছেন ইসরাইলি নীতির প্রতিফলন। ফিলিস্তিনে যেমন ফিলিস্তিনী ভূখ- দখল করে ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, ভারতও সম্ভবতঃ কাশ্মীরের মাটিকে হিন্দু অধ্যুষিত করতে চায়। আর যদি এটা হয়েও থাকে তাতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই কেন না, ভারত আর ইসরাইলের মধ্যকার সম্পর্ক বরাবরই উষ্ণ। ইসরাইলের পরামর্শেই যে ভারত এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা অনেকে বলাবলি করছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু গত বছরের জানুয়ারিতে ভারত সফর করে গেছেন। সে সফরকালে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী করার প্রতি ভারতের সমর্থন না পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করলেও তাতে দু’দেশের সম্পর্কে কোন ঘাটতি হবে না বলে মন্তব্য করেন নেতানিয়াহু। তিনি মোদিকে ইসরাইলে স্বাগত জানানোর জন্য মুখিয়ে আছেন বলেও জানিয়েছিলেন। 
বিশ্লেষকরা বলেন, ধর্মসহ নানাদিক থেকে এই দুই দেশের মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকলেও একটি দিক থেকে তাদের মধ্যে যথেষ্ট মিলই আছে আর তা হচ্ছে এই দুই দেশেরই প্রতিপক্ষ হচ্ছে মুসলিম দেশ বা মুসলমানরা। ফিলিস্তিনীরা তাদের ভূখ- হারিয়েছেন, বিশেষ মর্যাদা হারিয়ে কার্যতঃ ভারতের আওতায় কাশ্মীর, দু’দেশের মধ্যে আদর্শিক মিল যাই থাকুক না কেন লক্ষ্যের মিল কিন্তু যথেষ্টই আছে এমনটাই অভিমত বিশ্লেষকদের। 
‘ভারত ভাঙণের সূচনা’! 
জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর রাজ্যসভা থেকে বেরিয়ে প্রবীণ কংগ্রেস নেতা ও সাবেক কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরম বলেন, এর মাধ্যমে ভারতের ভাঙনের সূচনা ঘটলো। চিদম্বরম আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, প্রত্যেকটা রাজ্যকে এভাবে ভেঙে দেয়া যাবে, দুটি অথবা তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা যাবে। তিনি বলেন, সরকার যদি এই পথেই এগোতে থাকে, তা হলে এখন থেকেই ভারতের ভাঙন শুরু হয়ে গেল। ভারতের কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান নেতা গুলাম নবী আজাদ বলেন, এর মাধ্যমে ভারতীয় সংবিধানকে হত্যা করা হলো। তিনি বলেন, ‘সাংবিধানিক ইতিহাসে এটি কালো দিন। সরকার যা করেছে, তা নজিরবিহীন। জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ বলেন, একটি মানুষের শরীর কেটে দুটো ভাগ করলে যেমন হয় কাশ্মীরের জনগণের অনুভূতি আজ তেমন। জম্মু ও কাশ্মিরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ সরকারের সিদ্ধান্তকে আগ্রাসন ও জনগণের আস্থার প্রতি পুরোপুরি বিশ্বাসঘাতকতা বলে অভিহিত করে বলেন, সরকার একতরফাভাবে এমন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। এমন সিদ্ধান্ত অবৈধ। এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি টুইটারে দেয়া এক টুইটে বলেন, এটি ভারতীয় গণতন্ত্রের কালো দিন। ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্ব প্রত্যাখ্যানের এবং ভারতের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত উল্টো ফল দিল। মেহবুবা মুফতি বলেন, ভারত এত বড় একটি দেশ, তারপরও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ছোট একটি রাজ্যের ভয়ে ভীত। ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে কেন এই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো? কাশ্মীরের জনগণের সঙ্গে ভারত প্রতারণা করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারত তাদের বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছে। জনগণ এখনো চিন্তা করছে যে, তারা পাকিস্তানে যোগ না দিয়ে ভুল করেছেন। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের সমালোচনা করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তিনি এ পদ্ধতির সঙ্গে একমত নন।
ভারতের কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, জম্মু-কাশ্মিরকে একতরফাভাবে দ্বিখ-িত করে, নির্বাচিত নেতাদের কারাবন্দি ও সংবিধান লঙ্ঘন করে জাতীয় সংহতির উন্নতি সম্ভব হবে না। কংগ্রেসের সাবেক এই সভাপতি আরও বলেন, এই দেশটি জনগণের দ্বারা তৈরি হয়েছে। ভারতের মাটি কোন ‘প্লট’ নয়। তিনি কাশ্মীরে সহিংসতা চলছে বলেও উল্লেখ করেন।
রাহুল গান্ধীর এমন বক্তব্যের জবাব দেন কাশ্মীরের গভর্ণর সত্য পাল মালিক। তিনি বলেন, তিনি রাহুলের জন্য উড়োজাহাজ পাঠাবেন, রাহুল এসে দেখে যান কাশ্মীরে কোন সহিংসতা হয়েছে কি না? বিশ্লেষকরা বলেন, কাশ্মীরের গভর্ণরের কথা চটকদার কথা ছাড়া কিছু নয়, সত্য পাল কাশ্মীরের ব্যাপারে মোটেও সত্য কথা বলেননি। রাহুল গান্ধীর সেখানে গেলে তাকে হয়তো তিনি নিরাপত্তা দিতে পারবেন কিন্তু কাশ্মীরিরা মোটেই নিরাপদ নয়, তারা নিজ ভূখণ্ডে পরবাসী।
ভারতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াংকা গান্ধী মোদি সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, অসাংবিধানিক পথে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করেছে কেন্দ্রিয় সরকার। তিনি বলেন, এই অনুচ্ছেদ করার সময় কিছু নিয়মও করা হয়েছিল সে নিয়মের তোয়াক্কা না করে মোদি সরকার একতরফাভাবে কাশ্মীরের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিয়েছে।
কাশ্মীর নিয়ে সবশেষ সিদ্ধান্তকে ভারত ভাঙনের সূচণা বলে যে কথাটি ভারতের রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, তাকে শুধু কথার কথা মনে করছেন না আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, কাশ্মীর যে বিশেষ মর্যাদা পাচ্ছে প্রায় কাছাকাছি কিছু সুবিধা আরো কয়েকটি রাজ্য পায়। বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত এমন রাজ্যের সংখ্যা নয়টি। ওই রাজ্যগুলো হলো; কাশ্মীর, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, আসাম, মিজোরাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল ও অন্ধ্রপ্রদেশ। কাশ্মীর নিয়ে মোদির সিদ্ধান্তের পর বাকি রাজ্যগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মিজোরামের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা লালথানহাওলা বলেন, এ ঘটনা মিজোরাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল প্রদেশের মতো রাজ্যের পক্ষে আতঙ্কের। কংগ্রেস মুখপাত্র লাল লিয়াংচুঙ্গা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, নিজেদের অধিকার রক্ষায় তারা আত্মবলিদানেও প্রস্তুত। একই ধরণের আশংকা প্রকাশ করেছেন নাগাল্যান্ডের নেতারাও।
পাকিস্তানের তীব্র প্রতিক্রিয়া 
কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় ভারতের চিরবৈরী দেশ পাকিস্তান। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই করার ঘোষণা দেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তিনি ভারতের সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘণ বলেও মন্তব্য করেন। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কাশ্মীরে জাতিগত নিধন শুরু করতে পারে ভারত এমন আশংকা প্রকাশ করে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতীয়রা কাশ্মীরে অন্য অঞ্চলের লোক এনে কাশ্মীরীদের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীতে পরিণত করতে পারে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ান বলেন, অধিকৃত কাশ্মীরের জনগণের সাহায্যে সবকিছু করতে প্রস্তুত তার সৈন্যরা। ৬ আগস্ট রাওয়ালপিন্ডিতে শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বাজওয়া আরো বলেন, কাশ্মীরিদের ন্যায়ের সংগ্রামে শেষ পর্যন্ত পাশে থাকবে পাক সেনাবাহিনী। তবে শুধু প্রতিক্রিয়া দেখিয়েই ক্ষান্ত হয়নি পাকিস্তান। ভারতের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিত করে পাকিস্তান। ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে বহিষ্কার করে এবং দিল্লীতে কর্মরত তাদের হাইকমিশনারকে প্রত্যাহারও করে ইসলামাবাদ। পাকিস্তান আরো কিছু পদক্ষেপ নেয়। এরমধ্যে ছিল দু’দেশের মধ্যে চলাচলকারী ট্রেন ’সমঝোতা এক্সপ্রেস’ ও ’থর’ এক্সপ্রেস বন্ধ করে দেয়। পরে বন্ধ করা হয় লাহোর ও দিল্লীর মধ্যে চলাচলকারী বাস সার্ভিস ‘দোস্তি’। ‘সমঝোতা’ আর ‘দোস্তি’ বন্ধ হয়ে গেছে, এর পরিণতি নিয়ে পর্যবেক্ষকরা শংকিত। তারা আপাতত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সমঝোতার কোন সম্ভাবনা দেখছেন না, দোস্তি তো আরো পরের কথা। 
যুদ্ধের আশংকা
ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে কী একটি যুদ্ধ আসন্ন? এ প্রশ্নটি এখন শুধু এই দেশ দু’টির মধ্যেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ জোরেসোরে উচ্চারিত হচ্ছে। ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে দু’দেশের সেনাসদস্যদের মধ্যে গোলাগুলি হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জানায়, কাশ্মীর সীমান্তে ভারতীয় বাহিনী তাদের সৈন্যদের ওপর গুলি ছুঁড়লে তিন সেনা নিহত হয়। পরে পাকিস্তানের হামলায় প্রাণ হারায় ৫ ভারতীয় সৈন্য। তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের কোন সেনার হতাহতের কথা স্বীকার করেনি। 
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ বাধবে কি না তা সময়ই বলে দেবে। তবে দেশ দু’টির মধ্যে চলছে বাকযুদ্ধ। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ১৪ আগস্ট তার দেশের স্বাধীনতা দিবসে ভারতকে হুঁশিয়ার করে বলেন, ভারতের ইটের জবাব পাথর দিয়ে দেয়া হবে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেছেন, পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরও ভারতের অংশ, তাকে পুণরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনে জীবন দেবেন। পাকিস্তান ও ভারতের নেতাদের এমন হুঁশিয়ারি সত্যিই আশংকার বিষয়, কেন না দু’দেশ কারণে-অকারণে কিংবা তুচ্ছ কারণে একে অপরের ওপর হামলা চালিয়ে থাকে, আর এবার তো শুধু মর্যাদারই নয়, অস্তিত্ব রক্ষার মতো বিষয় নিয়ে মুখোমুখি ভারত-পাকিস্তান।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া
ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদে দেওয়া জম্মু-কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর সেখানকার অধিবাসীদের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানায় যুক্তরাষ্ট্র। কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণরেখায় শান্তি বজায় রাখতে সব পক্ষকে আহ্বান জানায় যুক্তরাষ্ট্র। কাশ্মিরের নেতাসহ সাধারণ মানুষকে গ্রেফতারে উদ্বেগ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, জম্মু-কাশ্মিরের ঘটনাবলি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যুক্তরাষ্ট্র। অবশ্য গত এক মাস ধরেই কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এক ধরণের বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতি চলে আসছিল। জুলাই মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ২২ জুলাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, কাশ্মির ইস্যুতে সমঝোতার জন্য তাকে অনুরোধ করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে ভারত সে সময় সরাসরিই জানিয়ে দেয়, তারা এ ধরণের কোন অনুরোধ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে করেনি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ভারতীয় সংসদে বিবৃতি দিয়ে জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সেরকম কোন অনুরোধ করেননি। কাশ্মীর নিয়ে ভারতের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে চীন। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে দুই পক্ষের মধ্যে সীমান্ত সংক্রান্ত যে সমঝোতা হয়েছিল তা মেনে চলার জন্য এবং সীমান্ত ইস্যুগুলো আরও জটিল করে তুলবে এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ ইস্যু আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পরামর্শ দিয়ে কোন ধরণের উত্তেজনা না ছড়াতে ভারত ও পাকিস্তানের প্রতি আহ্বান জানায়। ইমরান খান টেলিফোনে কথা বলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোয়ান ও মালশেয়িার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহথির মোহাম্মদের সাথে। তারা পাকিস্তানকে সমর্থন দেয়ার কথা জানান। তবে এ ইস্যুতে রাশিয়া সরাসরিই ভারতের প্রতি সমর্থন দিয়েছে। অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এ ব্যাপারে অনেকটা নীরব। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুসলিম দেশগুলোর আচরণে নিজের হতাশা চেপে রাখতে পারেননি, তিনি সরাসরি বলেছেন, ভারতে মুসলিম দেশগুলোর অনেক বিনিয়োগ আছে, তারা বিনিয়োগের বিষয়টাকে খুবই গুরুত্বের সাথে দেখে থাকে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ মন্তব্যে ক্ষোভ আর শ্লেষ থাকলেও অযৌক্তিক মনে করেন না বিশ্লেষকরা। কাশ্মীর ইস্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করে সর্বোচ্চ সংযম দেখাতে ভারত ও পাকিস্তানের প্রতি আহ্বান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তার পক্ষে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, জম্মু ও কাশ্মীরের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে পারে এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। সবশেষ চীনের উদ্যোগে ১৬ আগস্ট রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। ওই বৈঠকে চীন বলেছে, ভারত একতরফাভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদ কাশ্মীরে চলমান পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ভারত ও পাকিস্তানকে সংযত আচরণের আহ্বান জানান। ইমরান খান ১৬ আগস্ট টেলিফোন করেন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে। প্রায় ২০ মিনিট তারা কথা বলেন। ইমরান-ট্রাম্প টেলিসংলাপ ইমরান খানকে কতটা আশ^স্ত করেছে আর ভারতকে কতটা নিবৃত্ত করবে তা দেখার জন্য অপেক্ষা পর্যবেক্ষকদের।
মোদি সরকার কি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সফল হবেন?
৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের বিষয়টি নিয়ে ভারতের সুপ্রিমকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন একজন সমাজকর্মী। তবে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত এ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে যে আদেশ দিয়েছে তা অনেককে হতাশ করেছে। আদালত বলেছে, সময় নিয়ে কাশ্মীর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হবে, এ ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করার পরামর্শ দেয়ার পাশাপাশি মামলাটির শুনানি ২ সপ্তার জন্য মুলতবি করা হয়। ভারতের বর্তমান সরকারের আদর্শ হচ্ছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল। তার জন্মস্থান গুজরাটে প্যাটেলের এক বিশাল মূর্তি স্থাপন করেছেন নরেন্দ্র মোদি। ‘ঐক্যের মূর্তি’ নামের ওই ভাস্কর্যটি ৫৯৭ ফুট উঁচু যা প্রায় ৬০ তলা ভবনের সমান উঁচু। নরেন্দ্র মোদি কাশ্মীরের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অর্থাৎ জম্মু ও কাশ্মীরের বিভক্তি তা কার্যকর করা হবে ৩১ অক্টোবর। সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেলের ১৪৪তম জন্মদিনে এটি কার্যকর করতে চাচ্ছে মোদি সরকার। মোদির এ আশা কতটা পূরণ হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি নির্বিকার আচরণ করে তাহলে কাশ্মীরের ক্ষেত্রে মোদির নীতি বাস্তবায়নে খুব একটা বেগ পেতে হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। অবশ্য তা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হবে নাকি ভারতকে আরো কোন দীর্ঘতর সংকটের দিকে ঠেলে দেয় সেটাই প্রশ্ন।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৯ আগস্ট ২০১৯ প্রকাশিত)