বৃহস্পতিবার, ১৪-নভেম্বর ২০১৯, ০৮:২৪ পূর্বাহ্ন

দুর্নীতি ও পারিবারিকীকরণে ডুবতে বসেছে হামদর্দ

shershanews24.com

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর, ২০১৯ ০৬:৪৪ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ‘হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ’ কি একটি পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে চলেছে? এ প্রশ্ন এখন ঘুরে-ফিরে আসছে। শুধু পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই নয়, এতে দেদারছে চলছে লুটপাটও। আর এর সবকিছুর পেছনে আছেন একজন ব্যক্তি। তিনি হচ্ছেন হামদর্দের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাকিম মো. ইউছুফ হারুন ভূইয়া। শীর্ষ কাগজের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে হামদর্দের এমডির দুর্নীতি, লুটপাট, স্বজনপ্রীতি আর পারিবারিকীকরণের চেষ্টার ফলে ধীরে ধীরে রুগ্ন হতে বসা এ প্রতিষ্ঠানটির দুর্দশার চিত্র।
দুর্নীতি আর অনিয়ম
হাজার কোটি টাকা মূলধনের প্রতিষ্ঠান হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ দুর্নীতি, অনিয়ম, পরিবারতন্ত্রের বেড়াজালে। গোপন টেন্ডারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার কাঁচামাল আমদানি, মেশিন ও যন্ত্রপাতি কেনা, জমি কেনা, কনস্ট্রাকশন, কেমিক্যাল কেনা, ক্যালেন্ডার-ডায়েরি প্রিন্টিং ও প্রকাশনা খাতে লাগামহীন দুর্নীতি লুটপাট করছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হাকিম মো. ইউছুফ হারুন ভূইয়া। ব্যবস্থাপনার প্রায় সব ধাপে নিজের ছেলেরা। যে কারণে তার এসব দুর্নীতি-লুটপাটের তথ্য বাইরে প্রকাশ হবার সুযোগ থাকছে না। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ ‘টু’ শব্দটি করার মতো পরিবেশ নেই। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ মাথা তুলে কথা বলতে গেলে, এমনকি কাউকে নীরব প্রতিবাদী বলে সন্দেহ হলেও তাকে সঙ্গে সঙ্গে চাকরিচ্যুত করা হয়। ফলে কেউ কথা বলার সাহস পান না।
পরিণত হয়েছে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে
এই প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ তিন পদে রয়েছেন তাঁর তিন সন্তান। যদিও এটি একটি পুরোপুরি ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান, ওয়াকফ আইন অনুযায়ী যা এক ধরনের সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবেই পরিচিত; কিন্তু ওয়াকফ আইনের তোয়াক্কা না করে প্রতিষ্ঠানটিতে পুরোপুরি পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন ইউছুফ হারুন। লাগামহীন দুর্নীতি ও শীর্ষ তিন পদের নিজের সন্তানদের নিয়োগ দেয়ায় হামদর্দের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী তখন প্রতিবাদ করেন। কিন্তু তাদেরকে তোয়াক্কা না করে তার পারিবারিক দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতা চালিয়ে যান। এমনকি প্রতিবাদকারীদের তিনি চাকরি থেকে বরখাস্তও করেন। সম্প্রতিক সময়ে অনিয়মের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা এর কড়া প্রতিবাদ করেন। নিজের ও পরিবারের দুর্নীতিকে আড়াল করতে ইউসুফ হারুন নানা অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। উল্টো প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের অভিযোগ আনছেন। তাদের বিরুদ্ধে পত্রিকায় লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিজ্ঞপ্তি নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। যদিও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে এসব বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে বাস্তবে বিজ্ঞাপনের পেছনে যে কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে সেই টাকা হাকিম মো. ইউছুফ নিজেই দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, বর্তমানে হামদর্দ ল্যাবরেটরিজের চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদই হাকিম ইউছুফ হারুন ভূইয়া ও তার পরিবারের দখলে। বড় ছেলে মো. জামাল উদ্দিন ভুইয়া রাসেল হামদর্দের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, মেঝ ছেলে সাইফুদ্দিন ভূইয়া মুরাদ পরিচালক (বিপণন) আর মেয়ে হাকিম নারগিস মারজান হিউম্যান রিসোর্স ও ডেভেলপমেন্টের পরিচালক। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো পরিবারের দখলে থাকায় হাকিম ইউছুফ টেন্ডার ছাড়াই অথবা গোপন টেন্ডারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার কাঁচামাল আমদানি করেছেন। এছাড়া পরিবারের সদস্যদের বাইরে অন্য পরিচালকরাও হাকিম ইউছুফের অধীস্থ। হামদর্দের কেনাকাটা ও সরবরাহ পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমেই করান হাকিম ইউছুফ। হামদর্দের প্রচারণায় জটিল রোগের চিকিৎসা হয় বলে দাবি করা হয়। তবে ইউছুফ ও তার পরিবারের সদস্যরা এই চিকিৎসা নেন না; তাদের চিকিৎসা হয় বিদেশে। 
জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হাকিম মো. ইউছুফ হারুন ভূইয়ার পরিবারিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে কয়েকজন কর্মকর্তা প্রতিবাদ করেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক কাজী মনসুর-উল হক। তিনি হামদর্দের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিমূলক সিন্ধান্তের প্রতিবাদ করেন। ফলে তার সাথে এমডির ছেলেদের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। সম্প্রতি এই দ্বন্দ্ব ব্যাপক আকার ধারণ করে যা অভ্যন্তরীণভাবে মেটাতে না পেরে নিজের ও পরিবারের দুর্নীতি আড়াল করতে প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের নামে বিভিন্ন দৈনিকে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে হামদর্দ ল্যাবরেটরিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউছুফ হারুনের অপকর্মের বিরুদ্ধে রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মারামারিরও ঘটনা ঘটে। 
সেলসম্যান থেকে এমডি!
১৯৭২ সালে হামদর্দের গুলিস্তান শাখায় কাউন্টার সেলসম্যান হিসেবে যোগদান করেন  ইউছুফ হারুন ভূইয়া। কিন্তু তিনি এখন এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। শুধু পরিচালক বললে ভুল হবে, কর্মকা-ে মালিকই বলা চলে তাকে। কোন জাদুবলে তিনি সামান্য সেলসম্যান থেকে কীভাবে একটি ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হলেন তা বিস্মিত করে এর প্রবীণ ও নবীন সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। তাদের মধ্যে দু’একজন এ প্রতিবেদককে বলেছেন, নিজের পুরোটা জীবনই ইউছুফ হারুন ভূইয়া নিজের আখের গোছাতে মনোযোগী ছিলেন, আর প্রতিষ্ঠানে ইতিপূর্বে যেসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ছিলেন তাদের সাথে একটা অঘোষিত সিন্ডিকেট করেই তিনি কাজ করেছেন। প্রতিষ্ঠানটিতে ইউসুফ হারুন এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। যে কারণে এই বিয়য়ে শীর্ষ কাগজের এ প্রতিবেদক তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও কোনো কর্মকর্তা কথা বলেন নি। এমকি পরিচালক কাজী মনসুর-উল হক সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হলেও দেয়া হয়নি হামদর্দ ল্যাবরেটরিজের প্রধান কার্যালয় থেকে। 
জানা গেছে, হাকিম ইউছুফের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) হাকিম ইউছুফের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের তদন্ত করছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ১. স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিজের সন্তানদের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া, ২. অনিয়মের মাধ্যমে নির্ধারিত বেতনের চেয়ে বেশি বেতন গ্রহণ, ৩. কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির নামে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ ও  ৪. জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন। গত ২৯ আগস্ট দুদক থেকে এসব অভিযোগের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। দুদকের অনুসন্ধান টিম অনিয়মের বেশ কিছু তথ্যও পেয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেরও নজরে এসেছে হাকিম ইউছুফের কর্মকা-। একই অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যদের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। গত ১৯ জুন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি প্রায় দুই ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে তাকে। হাকিম ইউছুফ ও হামদর্দে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তদন্ত ও শুনানি চলছে বলে জানায় ওয়াকফ প্রশাসক কার্যালয়। 
হামদর্দ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ইউছুফ হারুন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রলোভন দেখিয়ে এক গৃহবধূকে ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগে রয়েছে। ঐ গৃহবধূর নাম কামরুন নাহার। হামদর্দ ফাউন্ডেশন পরিচালিত লক্ষ্মীপুর সদরের দত্তপাড়া রৌশন জাহান ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের (ইউনানি) সহকারী অধ্যাপক ছিলেন তিনি। মহিলার স্বামী নাজিম উদ্দিন রিপন সাংবাদিকদের বলেন, আমার স্ত্রীর সঙ্গে হামদর্দ ফাউন্ডেশনের এমডি ইউছুফ হারুনের পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক ছিল। গত ১৫ এপ্রিল প্রলোভন দেখিয়ে তিনি আমার স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়ে যান। তাকে ফিরিয়ে আনতে মোবাইল ফোনে কল করলে হারুন আমাকে হত্যাসহ মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। 
হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ (ওয়াকফ) এক সময় ইউনানি ও আয়ুর্বেদ ওষুধের জন্য উপমহাদেশ খ্যাত ছিল। হাকিম হাফিজ আব্দুল মজিদ ১৯০৬ সালের ১ আগস্ট দিল্লিতে হামদর্দ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৪৮ সালে এটি ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান হয়। বাংলাদেশ সরকারের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিশেষ ব্যবস্থায় একটি ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাকিম ইউছুফ কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় একটি ‘পুতুল ট্রাস্টি বোর্ড’ গঠন করে ইচ্ছামতো দুর্নীতি করছেন। তিনি ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান হামদর্দকে পরিণত করেছেন ‘ব্যক্তিগত’ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও লক্ষ্মীপুরে জমি, ভবন ও ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন ইউছুফ। তার নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন লোকসানি ও ঋণখেলাপি হওয়ায় সেটিকে হামদর্দের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। হামদর্দকে বিনাপ্রয়োজনে পাঁচ বছর ধরে ভাড়া দিতে হচ্ছে। বাজারদর অনুযায়ী জনকল্যাণ ফাউন্ডেশনের ভাড়া আড়াই লাখ টাকা। হামদর্দ মাসিক ভাড়া দিচ্ছে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা করে। আর ভাউচারের মাধ্যমে আরও ১৫ লাখ টাকা জনকল্যাণ ফাউন্ডেশনকে দিয়েছে হামদর্দ। হামদর্দের টাকায় নিজের মালিকানায় জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন হাকিম ইউছুফ। নারায়ণগঞ্জে (১১৬ মনোহর খার বাগ, মদনপুর, বন্দর থানা) ৭ বিঘা জমিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এই ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক কারখানা। ঢাকা থেকে মেঘনা ঘাট যেতে মুগড়াপাড়ার কিছু দূরে নয়াগাঁওয়ে নদীর ধারে আছে ১৭ বিঘা উঁচু জমি। লক্ষ্মীপুর জেলার দত্তপাড়ায় ৩০ বিঘা জমিতে আছে বিশাল অট্টালিকা, মসজিদ, মাদ্রাসা ও কলেজ। হামদর্দের টাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন মায়ের নামে রওশন জাহান মেডিক্যাল কলেজ ও মাদ্রাসা। লক্ষ্মীপুর জেলার চর মুটিয়ায় ৬০ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন মাদ্রাসা। ঢাকায় প্রত্যেক ছেলেমেয়ের নামে একাধিক ফ্ল্যাট আছে। বনানী ন্যাম ভবনে (হোল্ডিং ২বি, ফ্ল্যাট-বি৩, ব্লক-আই, রোড-১) হাকিম ইউছুফের নিজের নামেও রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট। সেগুনবাগিচায় (৬৭৫, পাইওনিয়ার রোডে) ৮ কাঠা জমির ওপর আছে আরও একটি বাড়ি। তদন্ত কমিটির তথ্য বলছে, ২০১৩ সালে তৎকালীন ওয়াকফ প্রশাসক নূরুল হুদাকে আড়াই কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে ট্রাস্টি বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে হাকিম ইউছুফ মোতওয়াল্লি কমিটি গঠন করেন। এর আগে ধর্ম মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রিত ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে হামদর্দ পরিচালিত হয়ে আসছিল। হামদর্দের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাকিম ইউছুফ বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়টি অতিদ্রুত আমলে নিয়ে ভালোভাবে পদক্ষেপ নিলে ওয়াকফ সম্পত্তি লুটেরাদের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)