বুধবার, ১৩-নভেম্বর ২০১৯, ১১:২৫ পূর্বাহ্ন

নানা অনিয়মে ভরা এমপিওভুক্তি!

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০৭:৩৯ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: সর্বশেষ ২০১০ সালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিও হয়েছিল। এরপর গত নয় বছরে একাধিকবার উদ্যোগ নেয়া হলেও নানা কারণে নতুন এমপিও করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে অনেক প্রতীক্ষার পর গত ২৩ অক্টোবর ২৭৩০টি প্রতিষ্ঠান এমপিও’র ঘোষণা দেয়া হয়। বলা হয়েছিল, সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে এমপিও করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে যাচাই-বাছাইও হয়েছে। কিন্তু তারপরও এই এমপিও-তে ব্যাপক অনিয়ম ও ভুল-ভ্রান্তির অভিযোগ উঠেছে। প্রায় অর্ধশত অযোগ্য অথবা প্রায় অস্তিত্বহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবার এমপিওভুক্ত হয়েছে। ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত, শিক্ষার্থী নেই, পাস নেই, স্কুল ঘর নেই এমন প্রতিষ্ঠানও এমপিও পেয়েছে। এমপিওভুক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্তির তালিকায় স্থান পেয়েছে। অস্তিত্বহীন টেকনিক্যাল কলেজ, এমনকি সরকারি হয়ে যাওয়া কলেজও এমপিও তালিকায় স্থান পেয়েছে। কোনো কোনো সরকারদলীয় মন্ত্রী-এমপিদের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান হয়নি। এমপিওভুক্তির কার্যক্রমে এমপিদের দেয়া ‘ডিও’ লেটারও আমলে নেয়া হয়নি। এতে সরকারদলীয় মন্ত্রী-এমপিরা অনেকে ক্ষুব্ধ। এমপিওভুক্তির দাবিতে যেসব শিক্ষক আন্দোলন করেছিলেন তাদের সংগঠনের সভাপতি ও সম্পাদকের প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্ত হয়নি।
অথচ দেখা যাচ্ছে, ভোলার সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের মা, বাবা, স্ত্রী ও নিজের নামে প্রতিষ্ঠিত চারটি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। জামালপুর সদর উপজেলায় প্রায় ১৮টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। পঞ্চগড়ের আটোয়ারি উপজেলার সন্দেশদীঘি নি¤œ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে নেই বসার মতো কোনো জায়গা, কাম্য শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার ফল কোনোটাই নেই তবুও এমপিওভুক্ত হয়েছে। এমপিও নীতিমালা ২০১৮ অনুযায়ী পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থী প্রয়োজন ৪০ জন এবং পাসের হার প্রয়োজন ৭০ শতাংশ। কিন্তু এই স্কুলে শিক্ষার্থী শেষ ৩ বছরের ২০১৬-তে ২ জন, ২০১৭-তে ৫ জন এবং ২০১৮-তে ১৩ জন। তবুও কীভাবে এমপিওভুক্তি সম্ভব হলো, এটাই এখন পঞ্চগড়ে সবার মুখে। পাসের হারও গড়ে ৩৬ শতাংশ।
আবার একই জেলার বোদা উপজেলার ঝলইশাল শিরি ইউনিয়নের নতুন হাট টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই। যদিও চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৬০ জন অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ৫৮ জন পাস করেছে বলে দেখানো হয়েছে। অস্তিত্বহীন কাগজে-কলমের এই প্রতিষ্ঠানটিও এবার এমপিও পেয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষণার পর রাতারাতি প্রতিষ্ঠানটি স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ইটের গাঁথুনির ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
নতুন এমপিওভুক্তির জন্য গত বছরের আগস্টে আবেদন করে ৯ হাজার ৬১৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে ২ হাজার ৭৩০টি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তির ঘোষণা দেয়া হয়। এরমধ্যে ২৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ বিবেচনায় এমপিওভুক্ত করা হয়। জানা গেছে, ২৭৩০টির মধ্যে নতুন এমপিও পেয়েছে ১৪২৮টি। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন স্তর এমপিও পেয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী চার শর্ত পূরণ করলে এমপিও পাওয়ার কথা। শর্তগুলো হল- প্রতিষ্ঠানের বয়স বা স্বীকৃতির মেয়াদ, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ও পাসের হার। প্রতিটি পয়েন্টে ২৫ করে নম্বর থাকে। কাম্য শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং স্বীকৃতির বয়স পূরণ করলে শতভাগ নম্বর দেয়া হয়। সর্বনিম্ন ৭০ নম্বর পাওয়া প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্তির জন্য বিবেচিত হয়েছে। 
আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই অনলাইনে তথ্য দিয়েছে। ওইসব তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু এমপিও তালিকা প্রকাশের পর প্রমাণিত হয়েছে, তথ্য যাচাই হয়নি। এ কারণে ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত, অস্তিত্বহীন এবং জাতীয়করণ হওয়া প্রতিষ্ঠানও এমপিও পেয়েছে। এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঢাকার বাড্ডার ন্যাশনাল আইডিয়াল কলেজ ভাড়া বাড়িতে আছে। এমন আরও কিছু প্রতিষ্ঠান আছে। সরকারি হওয়ার পরও এমপিও পাওয়া প্রতিষ্ঠানের নাম হবিগঞ্জের মাধবপুরের শাহজালাল কলেজ।
নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির নতুন তালিকায় আবারো স্থান পেয়েছে যশোরের অভয়নগর উপজেলার এমপিওভুক্ত রাজ টেক্সটাইল নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে নিম্ন মাধ্যমিক স্কুল হিসেবে এমপিওভুক্ত হলেও নতুন তালিকায় একই স্তরে স্থান পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মাধ্যমিক স্তরের এমপিওভুক্তির আবেদন করা হলেও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে পুনরায় এমপিওভুক্ত হওয়ায় শিক্ষকসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। 
স্কুল সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়টি ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে এমপিওভুক্ত হয়। বিদ্যালয়টিকে মাধ্যমিক স্তরের এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করা হলেও অজ্ঞাত কারণে নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে আবারও এমপিওভুক্তিতে স্থান পেয়েছে বলে দাবি করেছেন শিক্ষক কর্মচারীরা। তাই, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। 
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার শাহজালাল কলেজকে সরকারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ গত বছরের ১২ আগস্ট আদেশ জারি করে। ওইদিনের আদেশে বলা হয়েছিল, ‘সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্মীকরণ বিধিমালা-২০১৮’ এর আলোকে জেলা ও উপজেলাধীন ২৭১টি কলেজ ৮ আগস্ট থেকে সরকারি করা হলো।’ সেই ২৭১ কলেজের মধ্যে একটি হলো শাহজালাল কলেজ। প্রকাশিত এমপিওভুক্তির তালিকায় দেখা যায়, তালিকার ৫১ নম্বরে (ইআইএন ১২৯৪৯২) থাকা শাহজালাল কলেজটির ডিগ্রি স্তরের এমপিওভুক্তি হয়েছে। এ ব্যাপারে শাহজালাল কলেজের অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক বলেছেন, সরকারি হওয়ার পরও আমাদের কলেজের ডিগ্রি শাখা এমপিওভুক্তির তালিকায় যুক্ত হলো কীভাবে। তারা হয়তো ঠিকভাবে তথ্য যাচাই-বাছাই করেননি। 
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের মোট ৮৯টি উপজেলা ও থানা থেকে একটি প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্তির জন্য কাম্য যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। সেক্ষেত্রে আঞ্চলিক সামঞ্জস্যতা বিধানের জন্য এমপিও নীতিমালা ২০১৮-এ ২২ ধারা প্রয়োগ করে বিশেষ বিবেচনায় ২৩৫ প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এ ধারায় বলা হয়েছে, শিক্ষায় অনগ্রসর, ভৌগোলিকভাবে অসুবিধাজনক, পাহাড়ি, হাওড়-বাঁওড়, চরাঞ্চল, নারীশিক্ষা, সামাজিকভাবে অনগ্রসর গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় শর্ত শিথিল করা যেতে পারে। ৮৯টি উপজেলায় শিক্ষার্থী সংখ্যা ১০০ জন এবং স্বীকৃতির মেয়াদ দুই বছর বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলায় সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত ৫৮টি প্রতিষ্ঠান বাছাই করা হয়।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৮ অক্টোবর ২০১৯ প্রকাশিত)