রবিবার, ০৮-ডিসেম্বর ২০১৯, ০৪:০৭ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি প্রক্রিয়া শুরুর প্রাক্কালে আবারো শঙ্কা

মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি প্রক্রিয়া শুরুর প্রাক্কালে আবারো শঙ্কা

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০৬:২৪ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা, বায়রাসহ দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের অপকর্মের কারণে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি বন্ধ রেখেছিল মাহাতি সরকার। নতুন করে জনশক্তি বাজার চালু নিয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর বুধবার কুয়ালালামপুরের পার্লামেন্ট ভবনে দেশটির মানবসম্পদমন্ত্রী এম কুলাসেগারানের সঙ্গে সফররত বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদের বৈঠক হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ফের শুরুর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়াসহ বেশ কিছু বিষয় অমীমাংসিত রেখেই বৈঠকটি শেষ হয়েছে! এ বিষয়ে আগামী ২৪ ও ২৫ শে নভেম্বর ঢাকায় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকের ক্ষণ নির্ধারিত হয়েছে। এর মধ্যে দুদেশের সরকারের সিদ্ধান্তকে পাস কাটিয়ে একটি চক্র মরিয়া হয়ে উঠেছে বাজারটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে। 
জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে ঠিক হবে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া কী হবে এবং কবে নাগাদ এটি শুরু হবে তাও বলা যাবে। সূত্র এও বলছে, ১০ এজেন্সির যে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগের প্রেক্ষিতে মাহাথির সরকার ক্ষমতা নেয়ার পরপরই বাংলাদেশের সঙ্গে সই করা সমস্ত চুক্তি বাতিল করে জনশক্তি রফতানি বন্ধ করেছিল এখনও সেই সিন্ডিকেটকে ঘিরেই শঙ্কা। নতুন করে পুরনো সেই সিন্ডিকেটই বাজার নিয়ন্ত্রণে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আশা জাগানো শ্রমবাজার শুরুর আগেই শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাজার খুলতে আলোচনায় গিয়ে খোদ প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীকেই সিন্ডিকেটের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। মন্ত্রীর উত্তেজক বক্তব্যে সন্দেহের ডালপালা আরও বেড়েছে। বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী সাংবাদিকদের পাল্টা প্রশ্ন করেন- সিন্ডিকেট থাকলে সমস্যা কোথায়? তিনি সাফ জানান- শ্রমবাজার উন্মুক্ত করাই তার টার্গেট। অন্য কিছু নিয়ে আপাতত ভাবছেন না।
সিন্ডিকেট প্রশ্নে মালয়েশিয়া সরকারকে বায়রা যে চিঠি পাঠিয়েছে মন্ত্রী তাতেও চটেছেন। এ নিয়ে তার বক্তব্য ছিল এমন- তারা কি সরকার? মালয়েশিয়া সরকারের কাছে তারা চিঠি পাঠানোর কে? মন্ত্রী অবশ্য বলেছেন- স্বল্পখরচ ও স্বচ্ছভাবে যাতে বাংলাদেশের কর্মীদের মালয়েশিয়ায় পাঠানো যায় সেই ব্যবস্থাই তিনি এবং তার সরকার করতে যাচ্ছে। এ নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি দেশটি সফর করেছেন। ২০১৬ সালেই দুই দেশের মধ্যকার বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় প্রায় ৯ শতাধিক এজেন্সির একটি তালিকা নিয়ে কথা হয়েছিল। কিন্তু তখনকার মালয়েশিয়া সরকার মাত্র ১০টি এজেন্সিকে বেছে নেয়। তখন বলা হয়েছিল সংখ্যাটা পরে বাড়ানো হবে। কিন্তু তা হয়নি। বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানীকারকদের দাবি ছিল প্রসেসটা ওপেন করে দেয়ার। কোন সিন্ডিকেটের হাতে বিশাল এ বাজার না ছেড়ে সব এজেন্সিকে একটি সিস্টেমের মধ্যে কাজ করার সুযোগ দেয়ার। কিন্তু না, তা হয়নি। 
মধ্যপ্রাচ্যের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানির প্রশ্নে মন্ত্রী, মন্ত্রণালয় এবং সরকার বরাবরই কঠোর অবস্থানে। কিন্তু অসাধু সিন্ডিকেটের কবল থেকে সাধারণের মুক্তি ঘটে কি! এ নিয়ে অস্বস্তি আছে বাংলাদেশি আগ্রহী কর্মী ও মালয়েশিয়ানদেরও। খোদ সে দেশের প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ খোদোক্তি করেছেন। বিরক্তি প্রকাশ করেছেন, হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কিন্তু দুই দেশের সম্মিলিত ওই চক্রকে শেষ করা যায়নি।
ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসি, মালয়েশিয়ান সংবাদপত্র স্টারসহ আন্তর্জাতিক বহু সংবাদ মাধ্যমে ওই সিন্ডিকেট নিয়ে একাধিক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। সব রিপোর্টেই প্রায় অভিন্ন তথ্য এসেছে। রিপোর্ট মতে, গেল বছরে আগস্টেই মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল দাতো ইন্দেরা খাইরুল দাজমি বিন দাউদ স্বাক্ষরিত এক পত্রে বাংলাদেশকে জানিয়ে দেয়া হয়- নাজিব রাজাক সরকারের আমলে বাংলাদেশের কর্মী নিয়োগে যে ১০ রিক্রুটিং এজেন্সি কাজ করতো তাদের এসপিএ সিস্টেম বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু ওই চিঠিতে কোন কারণ উল্লেখ ছিল না। বিবিসি তার নিজস্ব অনুসন্ধানে জানতে পারে, ১০টি এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার পরই এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। মালয়েশিয়ান স্টারেও তাই বলা হয়। উভয় সংবাদ মাধ্যম জানায়, মালয়েশিয়ায় যেতে একজন বাংলাদেশি কর্মীর ৪০,০০০ টাকা লাগার কথা থাকলেও এজেন্সিগুলো চার লাখ টাকা পর্যন্ত চার্জ করতো। বাড়তি টাকা সিন্ডিকেট, সরকারি কর্মকর্তা এবং নেপথ্যের প্রভাবশালীদের মধ্যে বণ্টন হতো। 
দুই দেশের এজেন্টরা পাঁচ হাজার কোটি টাকার মত হাতিয়ে নিয়েছে বলে দেশটির সরকারের কাছে অভিযোগ রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক মালয়েশিয়ান সেই লেনদেনে যুক্ত ছিলেন। 
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া ফের শুরু করার জন্য দেশটির তরফে ৩ শর্ত দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রথমত : সেখানে কর্মীর কাজের অনুমতি দূতাবাসের মাধ্যমে দেয়া, পাসপোর্ট নিয়োগকর্তার কাছে জমা রাখা তথা নিয়োগকর্তাকে গ্যারান্টার হিসাবে থাকার শর্তই মূখ্য। 
দ্বিতীয়ত : কর্মীরা রিক্রুটিং এজেন্টকে কোনো টাকা দিতে পারবে না। কর্মী বাছাই, চাহিদাপত্র যাচাই, নিয়োগসহ সব কাজ মালয়েশিয়ার নির্ধারিত পদ্ধতিতে হবে। যার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে দেশটির নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের হাতে। কর্মীপ্রতি ৬০০ রিঙ্গিত অর্থাৎ ১২,৩১২ টাকা পাবে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্টরা। 
তৃতীয় শর্ত হচ্ছে- বিনা অনুমতিতে কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন বন্ধ। পালালে কিংবা দেশে ফিরলে মালয়েশিয়ার দরজা বন্ধ। 
কুয়ালালামপুরে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, তারা কোনো শর্ত নিয়ে আলোচনা করেননি। সব বিষয়ে কথা হয়েছে। অত্যন্ত ভাল আলোচনা হয়েছে। চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে ঢাকায় জয়েন্ট ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে বন্ধ দরজা খোলার বিষয়ে টাইম ফ্রেমসহ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা দীর্ঘ সময় ধরে মালয়েশিয়ায় দায়িত্বপালনকারী জ্যেষ্ঠ ওই কূটনীতিকের।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১১ নভেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)