রবিবার, ০৮-ডিসেম্বর ২০১৯, ০৩:৫৩ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • দুর্নীতি ধরতে গিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক নিজেই আউট

দুর্নীতি ধরতে গিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক নিজেই আউট

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০৫:৪৬ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: যোগদানের মাত্র চার মাসের মাথায় নিজ পদ থেকে সরে যেতে হলো স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) শহিদ মো: সাদিকুল ইসলামকে। অধিদফতরের অনিয়ম, দুর্নীতি আর সরকারি অর্থের যথেচ্ছ ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি, আর সেটাই কাল হয়েছে তার জন্য- এমনটাই বলছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) এর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সাদিকুল ইসলামকে পদায়ন করা হয়েছে একটি হাসপাতালের পরিচালক পদে। তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা একে ‘ডাম্পিং পোস্টি’ উল্লেখ করে হতাশা প্রকাশ করেছেন। দুর্নীতির শিকড় ধরে টান দেয়ায় একজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে মাত্র চার মাসের মাথায় বদলি করার ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের কেউ কেউ বলছেন, দেশে এখন শুদ্ধি অভিযান চলছে; অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার, চালানো হয়েছে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান; যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের মতো ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের নেতারা যখন নিজেদের রক্ষা করতে গা ঢাকা দিয়েছেন, তখন এমন একজন কর্মকর্তার জবরদস্তিমূলক বদলি করাটা প্রশাসনে ভুল বার্তা দেবে।
জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের আয়ের টাকা সরকারি কোষাগারে না দিয়ে একাউন্টে রেখে দেয়ার পাশাপাশি ওই টাকা নিয়ে নয়-ছয় করা হচ্ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আয়ের ৭ কোটি ৪৮ লাখ ৬০ হাজার ৫০ টাকার মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়া হয়েছিল মাত্র ২ কোটি ৪২ লাখ ৩৬ হাজার ৫শ’ ৫০ টাকা। অবশিষ্ট অর্থাৎ ৫ কোটি ৬ লাখ ২৩ হাজার ৬শ’ টাকা অধিদফতরের নিজস্ব একাউন্টে রেখে দেয়া হয়, যে একাউন্টটির লেনদেনে কোনো স্বচ্ছতা নেই। অথচ নিয়ম হচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব আয়ের টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া।
এ ব্যাপারে শীর্ষ কাগজের গত ১৬ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় ‘মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি গঠিত; স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্যাংক একাউন্টে কোটি কোটি টাকা হরিলুট’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. আমিরুজ্জামান অবসরে যাওয়ার পর উপ-পরিচালক (প্রশাসন) মুন্সী ছাদুল্লাহ পরিচালকের চলতি দায়িত্ব পালন করেন। এ দু’জনের দায়িত্ব পালনকালেই সরকারি টাকা নিয়ে নানা অনিয়ম হয় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা। পরে পরিচালকের (প্রশাসন) পদে নিয়োগ দেয়া হয় ডা. শহিদ মো. সাদিকুল ইসলামকে।
গত ৪ জুলাই নতুন দায়িত্বে যোগ দেন ডা. শহিদ মো. সাদিকুল ইসলাম। কাজে যোগ দিয়ে অধিদফতরের ব্যাংক হিসাবে লেনদেনে অনিয়ম আর অসংগতি বুঝতে পারেন তিনি। সরকারি সংস্থার লেনদেনে এ ধরনের কোনো নগদ জমা বা উত্তোলনের সুযোগ না থাকলেও স্বাস্থ্য অধিদফতরের রূপালী ব্যাংকের হিসাব থেকে বেশ কয়েকবার নগদ অর্থ উত্তোলন ও জমা দেয়া হয়েছে। এসব লেনদেনের যথাযথ জবাবও দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ডা. সাদিকুল এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলেও মুনশী ছাদুল্লাহ নিজের দায়ভার এড়াতে চেক বই, ব্যাংক একাউন্ট ব্যালেন্সসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র নতুন পরিচালক (প্রশাসন) সাদিকুল ইসলামের কাছে হস্তান্তরের চেষ্টা করেন। তবে ডা. সাদিকুল তা গ্রহণ করেননি। 
রূপালী ব্যাংক মহাখালী শাখার হিসাব নং (০৪৩০০২০০০২৩৯১) এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদফতরের লেনদেন হয়ে থাকে। ডা. শহিদ মো: সাদিকুল ইসলাম গত ২২ আগস্ট চিঠি দিয়ে ওই হিসাবের কার্যক্রম (লেনদেন) সাময়িক স্থগিত করার জন্য ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপককে একটি চিঠি দেন এবং ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত লেনদেনের হিসাব বিবরণী চান। 
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাবেক পরিচালক প্রশাসন আমিরুজ্জামানের সময় থেকেই এই অনিয়মের সূচনা হয়। তার আগে মুজহারুল ইসলাম পরিচালক (প্রশাসন) থাকাকালে টেলিটকের কাছ থেকে চেক পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তা চালানের মাধ্যমে কোষাগারে জমা দেন। মুজহারুল ইসলামের পর আমিরুজ্জামান কয়েক মাস এ পদে থাকাকালে দু’টি চেকের মাধ্যমে টেলিটক ৫ কোটিরও বেশি টাকা স্বাস্থ্য অধিদফতরকে দিলেও তারা সে টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেননি।
আবার দেখা গেছে, হিসাবরক্ষক মো: নাসিরউদ্দিনের নামের বিপরীতে দু’টি চেকে ৪২ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এরমধ্যে ১০ জুলাই, ২০১৯  ১ লাখ ৭৬ হাজার ৮শ’ ৫১ টাকা, পরের দিন অর্থাৎ ১১ জুলাই উত্তোলন করা ৪০ লাখ ৮৫ হাজার ৩শ’ ৩৮ টাকা।
এই চেকের মাধ্যমে যখন টাকা স্থানান্তর করা হয় তখন স্বাস্থ্য অধিদফতরের নতুন পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে ড. সাদিক দায়িত্ব নিলেও তাকে এ ব্যাপারে অবহিত করা হয়নি। পরে ছাদুল্লাহর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি পরিচালককে (প্রশাসন) জানান, ওই টাকা নগদ উত্তোলন করে প্রশিক্ষণ বাবদ ব্যয় করা হয়েছে। পরিচালক (প্রশাসন) প্রশিক্ষণের জন্য নগদ কোনো টাকা বরাদ্দের বিষয়টি অনুমোদন করেননি বলে জানা গেছে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, প্রশিক্ষণের নামে এই টাকা লুটপাট করা হয়েছে।
ফলে পরিচালক (প্রশাসন) সাদিকুল ইসলাম এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি লেখেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (অভ্যন্তরীন প্রশাসন ও শৃঙ্খলা) এর নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কমিটিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্যাংক হিসাব পরিচালনার বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তের জন্য ১০ কার্যদিবস সময় দেয়া হয়। কমিটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের লেনদেন স্থগিত রাখার জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়। এ সময় দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট বেপরোয়া হয়ে উঠে।
এ ঘটনা ধামাচাপা না দিতে পারে শহিদ মো. সাদিকুল ইসলামকে হয়রানি করে তাকে পদচ্যুত করার চেষ্টা চালায় অধিদফতরের স্বার্থান্বেষী ও দুর্নীতিবাজ চক্রটি। অধিদফতরের শীর্ষ কর্মকর্তাও এ ব্যাপারে তাদেরকে পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পরিচালক (প্রশাসন)কে সরিয়ে দিতে নানা মহলে তদ্বির শুরু করেন তারা। দাপ্তরিক কর্মকা-েও তাকে অসহযোগিতা করতে থাকেন। সেখানে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করা হয় যাতে ডা. সাদিকুল কোন কাজ করতে না পারেন। জানা গেছে, পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে ডা. সাদিককে মেনে নিতে পারেননি মহাপরিচালক। ফলে তাদের দু’জনের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্কও তৈরি হয়নি। 
শেষ পর্যন্ত শহিদ মো. সাদিকুল ইসলামকে বদলি করেই ক্ষান্ত হয় ওই সিন্ডিকেটটি। তাকে মুগদা ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক পদে বদলি করা হয়েছে। ২৮ অক্টোবর এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। সাদিকুল ইসলাম স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে যোগ দেন গত ৪ জুলাই, এর চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তাকে বদলি করা হলো। তার বদলির খবরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বার্থান্বেষী চক্রটি খুশি হলেও সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হতাশ। তাদের অনেকেই বলেছেন, এটাই কি দুর্নীতি-লুটপাটের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার পুরস্কার।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১১ নভেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)