রবিবার, ০৮-ডিসেম্বর ২০১৯, ০৪:৩৯ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • মিঠু, শামীমসহ অর্ধশতাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কালো তালিকাভুক্ত হচ্ছে

মিঠু, শামীমসহ অর্ধশতাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কালো তালিকাভুক্ত হচ্ছে

shershanews24.com

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর, ২০১৯ ০৭:৫৬ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: স্বাস্থ্যখাতের গডফাদার মিঠু, গণপূর্ত বিভাগের জিকে শামীম ও শিক্ষাখাতের টেন্ডার শফিকসহ অর্ধশতাধিক হেভিওয়েট ঠিকাদারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করতে যাচ্ছে সরকার। আগামীতে এসব প্রতিষ্ঠান সরকারের কোনো কর্মকা-েই দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবে না। অতীতে এই গডফাদাররা হেন কোনো অপকর্ম নেই যা করেনি। সংশ্লিষ্ট সেক্টরগুলোতে এরা দুর্নীতি, লুটপাট ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। সরকারের বর্তমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে এদেরকে বিশেষভাবে টার্গেট করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রমতে, এই তালিকার শুধুমাত্র জিকে (গোলাম কিবরিয়া) শামীমকে আটক করা গেছে। বাকি সকলেই আত্মগোপনে আছে। এমনকি দেশেও এরা নেই। মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু, টেন্ডার শফিকসহ প্রায় সকলেই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন।
বিগত সময়ে এরা ছিলো ধরাছোঁয়ার বাইরে। সুনির্দিষ্ট অসংখ্য দুর্নীতির অভিযোগ ও তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন এদের টিকিটিও ছুঁতে পারেনি। বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাতের ঠিকাদার মিঠুর হাত অনেক লম্বা। স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন অনেকবার তদন্ত শুরু করেও শেষ করতে পারেনি। মিঠুর ঘনিষ্ঠজনদের মতে, দুর্নীতি দমন কমিশনের শীর্ষ পর্যায়ে তার হাত রয়েছে। আর এ কারণেই তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া দুদকের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু স্বাস্থ্যখাতের গডফাদার হিসেবে পরিচিত। বিগত সাড়ে ১০ বছরে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করেছে এই খাতে। জিকে শামীম গ্রেফতার হওয়ার পর তার দুর্নীতি-লুটপাটের কিছু চিত্র মানুষ জানতে পেরেছে। সাধারণ সচেতন মানুষ তার অপকর্মের এতো কাহিনী দেখে অবাকও হয়েছে। কিন্তু জিকে শামীম বা টেন্ডার শফিকের চেয়েও অনেকগুণ বেশি অপকর্ম করেছে মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু। শুধু ‘শত’ ‘শত’ নয়, স্বাস্থ্য খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি-লুটপাটের সঙ্গে মিঠু সরাসরি জড়িত। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হক ও তার ছেলে জিয়াউল হক, এমনকি পরের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের ছেলেরা ছিলেন গডফাদার মিঠুর বিজনেস পার্টনার। এমনকি বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক পূর্ণ দায়িত্বে মন্ত্রী হবার পর তার সঙ্গে এবং তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও মিঠুর ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছে। 
জিকে শামীমের বেশিরভাগ কাজই গণপূর্ত বিভাগ কেন্দ্রীক। তাকে গ্রেফতারের পর বিভিন্ন ব্যাংকে তার সবগুলো ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানের হাতে সরকারি যে কাজগুলো চলমান ছিল সেগুলোর কার্যাদেশও বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে। ভবিষ্যতে জিকে শামীমের কোনো প্রতিষ্ঠানকে আর কার্যাদেশ দেয়া হবে না বলেও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির বেশকিছু অভিযোগের তদন্ত চলছে। গণপূর্ত বিভাগে জিকে শামীমের এতোটা উত্থান ঘটেছিল সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের দুর্নীতির দুই সহযোগী মানিক বাবলু ও জিয়ার হাত ধরে। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামসহ অন্যদেরও সরাসরি সহযোগিতা পেয়েছেন শামীম।
বিগত বছরগুলোতে এমন পরিস্থিতি হয়েছিল যে, শিক্ষাভবন মানেই টেন্ডার শফিকের রাজত্ব। ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শিক্ষা ভবনে টেন্ডারবাজি করতে গিয়ে পিটুনি খেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি সাহিত্যের ছাত্র ও তৎকালীন মুহসীন হল ছাত্রলীগের সভাপতি শফিকুল। গ্রেফতার অবস্থায় পত্রিকায় তার ছবিও ছাপা হয়েছিল। এরপর একাধিকবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও শিক্ষা ভবন ছাড়েননি শফিক। ধীরে ধীরে নিজেকে পরিণত করেছেন শিক্ষা ভবনের টেন্ডারবাজির প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, ঠিকাদারি শফিকুলের মূল পেশা নয়। তার মূল পেশা টেন্ডারবাজি। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট যেকোনো কাজ যিনি পান না কেন, প্রতিটি টেন্ডারে ৫ শতাংশ কমিশন দিতে হতো শফিককে। এর মাধ্যমেই মূলত তিনি বিশাল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে ছিল সখ্যতা, বিশেষ করে মন্ত্রীর শ্যালক শামীম হাসান ছিল শফিকের দুর্নীতি-অপকর্মের প্রধান সহযোগী। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালাও টেন্ডার শফিকের বেপরোয়া অপকর্মে অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। টেন্ডার শফিকের অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে গত ২১ নভেম্বর দুদক একটি মামলাও দায়ের করেছে। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সেক্টরে এ ধরনের বেশ কয়েকজন মাফিয়া ঠিকাদারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের চলমান উন্নয়ন কাজ বিকল্প উপায়ে বাস্তবায়নের চিন্তাভাবনা চলছে। এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ অন্যভাবে বাস্তবায়নের জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। তাছাড়া বিগত বছরগুলোতে সরকারের বিভিন্ন কর্মকা-ে একচেটিয়াভাবে কাজ বাগিয়ে নিয়ে লুটপাট চালিয়ে যাওয়া এ ধরনের অর্ধশতাধিক হেভিওয়েট প্রতিষ্ঠানকে ভবিষ্যতের জন্যও কালো তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। টেন্ডার মোগল জিকে শামীম, স্বাস্থ্য সেক্টরের মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু ও টেন্ডার শফিকের নামে-বেনামে মালিকানাধীন সব কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া, বহুল আলোচিত একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে এ তালিকায়। চাল-গম রাখার গুদাম নির্মাণে নয়-ছয়ের অভিযোগ রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
স্বাস্থ্য সেক্টরের বহুল আলোচিত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। গত সেপ্টেম্বরে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন। মিঠু বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থে যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল বিত্ত-বৈভব গড়ে তুলেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অস্ট্রেলিয়াতে বিপুল অর্থসম্পদ পাচার করেছেন তিনি। তার অবর্তমানে ভাই-ভাগিনারা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনা করছে। তবে সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, দুদকের সঙ্গে মিঠুর বিশেষ সখ্যতা থাকলেও এবার তিনি আর পার পাচ্ছেন না। কারণ, সরকারের শীর্ষ মহল থেকে মিঠুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মিঠুর মালিকাধীন সব কোম্পানিকে এখনই কালো তালিকাভুক্ত করার জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকা আগামীতে আরো বাড়বে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কোন কোম্পানিকেই ছাড় দেয়া হবে না।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৫ নভেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)