রবিবার, ০৮-ডিসেম্বর ২০১৯, ০৬:০১ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • সর্বগ্রাসী সংকটে উচ্চশিক্ষা: দুর্নীতি-রাজনীতিতে বিশ্বমানে বাংলাদেশের চরম অবনতি

সর্বগ্রাসী সংকটে উচ্চশিক্ষা: দুর্নীতি-রাজনীতিতে বিশ্বমানে বাংলাদেশের চরম অবনতি

shershanews24.com

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০৭:৪৫ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: দেশের উচ্চ শিক্ষার সংকট প্রকারান্তরে জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে, এমন মতামত শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের। তারা মনে করেন, সমকালীন পৃথিবী বা পরিবর্তিত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না বাংলাদেশের বিশ^বিদ্যালয়গুলো। একসময়ে দেশে বিভিন্ন ধরণ ও ঘরানার বিশ্ববিদ্যালয় সরকারই প্রতিষ্ঠা করতো। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হওয়ায় সে সব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পেরে দেশের অনেক শিক্ষার্থীই বিদেশ চলে যেত। এ অবস্থা উত্তোরণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয় ১৯৯১ সালে। এরপর ধীরে ধীরে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এতে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বিদেশমুখীতা কিছুটা কমেছে বটে কিন্তু শিক্ষার মানের কোনো উন্নয়ন ঘটেনি, বরং নানাভাবে অবনতি হয়েছে বলেই মনে করা হয়। এর কারণ, বেসরকারি উদ্যোক্তারা অধিকাংশই শিক্ষার মানের পরিবর্তে শুধু নিজেদের ব্যবসাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কেউ কেউ বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের নামে শুধু সার্টিফিকেট ব্যবসা করেছেন। এমন কথা বলছেন শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যা ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে পরিচিত, সেগুলোতেও ব্যাপকহারে চলেছে দলীয়করণ ও শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতি। শিক্ষা প্রশাসনে জবাবদিহীতার অনুপস্থিতি মারাত্মক। যে কারণে সার্বিকভাবে দেশের উচ্চ শিক্ষার মানেরও চরম অবনতি ঘটেছে। 
সবকিছু ছাপিয়ে এখন সামনে এসেছে উচ্চশিক্ষার মান বা মানে অবনতির বিষয়টি। নতুন করে এই আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে, লন্ডনভিত্তিক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন টাইমস হায়ার এডুকেশন এর দু’টি তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর। এ তালিকার মধ্যে একটি বৈশি^ক তালিকা। মূলতঃ সেরা ১ হাজার বিশ^বিদ্যালয়ের নাম বের করতে ওই তালিকা করা হলেও তাতে স্থান হয়েছে ১৩শ’র বেশি বিশ^বিদ্যালয়। এর আগে এশিয়ার বিশ^বিদ্যালয় নিয়ে একটি তালিকা করেছিল ম্যাগাজিনটি। যাতে স্থান পেয়েছিল ৪শ’ ১৭টি বিশ^বিদ্যালয়। বিশে^র সেরা ১ হাজার বা এশিয়ার সেরা ৪শ’ বিশ^বিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোন বিশ^বিদ্যালয়ের নাম নেই। দেশে পাবলিক ও বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় নিয়ে সবমিলিয়ে দেড়শ’র মতো বিশ^বিদ্যালয় আছে, এতগুলো বিশ^বিদ্যালয়ের মধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়েরও ওই তালিকায় না থাকাটা শুধু হতাশাজনকই নয় দুঃখজনকও, এমনটাই মনে করেন দেশের শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাগবেষকরা।
 বৈশ্বিক তালিকা
সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বের সেরা ১ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করে লন্ডনভিত্তিক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’। এ তালিকায় সবার উপরে আছে ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। অবশ্য সেরা ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ই যুক্তরাষ্ট্রের, অন্য তিনটি যুক্তরাজ্যের। আগের তালিকায় জার্মানির মাত্র তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও নতুন তালিকায় আছে ২৩টি বিশ^বিদ্যালয়। এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয় সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর, তালিকায় এর স্থান ২২তম। এ তালিকায় তিনশ’ থেকে এক হাজারের মধ্যে আছে ভারতের ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয়, এক হাজারের মধ্যে পাকিস্তানের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, আছে শ্রীলংকার একটি বিশ^বিদ্যালয়ের নামও।
এবার র‌্যাংকিং-এ এক হাজারের মধ্যে বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভাগ্যিস এ তালিকাটি বাড়িয়ে ১ হাজার ৩শ’টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম অন্তর্ভূক্ত করেছে টাইমস হায়ার এডুকেশন, আর তাতে ১৩শ’র মধ্যে শেষের দিকে হলেও কোনরকমে ঠাঁই করে নিয়েছে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়। ২০১৬ সালে আরেকটি তালিকা প্রকাশ করেছিল টাইমস হায়ার এডুকেশন। সে তালিকায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের নাম ছিল প্রথম আটশ’র মধ্যে কিন্তু তিন বছরের মাথায় সে স্থানটি তো ধরে রাখতে পারেইনি এমনকি জায়গা হয়নি ১ হাজারটির তালিকায়ও। 
এশিয়ান বিশ^বিদ্যালয়ের তালিকা
গত মে মাসে এশিয়ার ৪শ’ ১৭টি সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এই তালিকায় চীনের ৭২টি, ভারতের ৪৯টি, তাইওয়ানের ৩২টি, হংকংয়ের ৬টি এমনকি পাকিস্তানের ৯টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেলেও বাংলাদেশের একটি বিশ^বিদ্যালয়েরও স্থান হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠদান, গবেষণা, জ্ঞান আদান-প্রদান এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি- এই চারটি মৌলিক বিষয়ের উপর ভিত্তি করে ওই তালিকা করা হয়েছে। নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার বিশ্ববিদ্যালয় সেরার তালিকায় স্থান পেলেও, বাংলাদেশের কোন বিশ^বিদ্যালয়ের নাম ছিল না। দেশের বিশ^বিদ্যালয়গুলোর মান কতটা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে এই তালিকাই তার প্রমাণ দিচ্ছে এমনই অভিমত শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাগবেষকদের। 
উচ্চশিক্ষায় মানের অবনতি
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা কি নিম্নগামী? এর মান কি নিম্নমুখী? এমন প্রশ্ন বেশ ক’বছর ধরে চলে আসছে। শিক্ষার মান, অবদান, শিক্ষার ফলাফল সব বিচারেই উচ্চ শিক্ষার যাত্রা নি¤œমুখী। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী, অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ড. জাফর ইকবালের মতো প্রথিতযশা শিক্ষাবিদরা উচ্চশিক্ষার সংকট এবং তা দূর করার উপায় নিয়ে বিভিন্ন সময় মতামত দিয়েছেন। 
অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের মতে, আজ থেকে চার দশক আগে বাংলাদেশে যখন বিশ^বিদ্যালয় ছিল মাত্র হাতে গোনা ছয়/সাতটি তখন দেশের উচ্চ শিক্ষা অনেক মানসম্পন্ন ছিল। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও বুয়েটের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ছিল লক্ষণীয়। এই দুই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণায় বিশ্বের অনেক নামকরা বিশ^বিদ্যালয়ে গিয়েও চমক দেখিয়েছেন। পরবর্তীতে সে সব শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে অনেকেই জাতীয় পর্যায়ে তো বটেই আন্তর্জাতিক অঙ্গণেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। 
তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশের শিক্ষার মানের বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষার মানে অবনতি হওয়ার কারণ কী? বিশ^বিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষক এবং শিক্ষাবিদরা বিভিন্ন সময়ে এর কারণগুলো তুলে ধরেছেন। সেগুলো মিলিয়ে দেখলে যে কারণগুলো আমরা পাই তা হচ্ছে: উচ্চ শিক্ষায় বাজেট স্বল্পতা, অবকাঠামোগত ঘাটতি, শিক্ষক স্বল্পতা বা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত পার্থক্য বেশি হওয়া, যুগোপযোগী পাঠক্রম বা সিলেবাস না থাকার মতো জঘন্য অপকর্ম এবং এর পাশাপাশি কাঙ্খিত মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাবও এর জন্য দায়ী। এমন আরো অনেক কারণের কথা বলা যায়। অবশ্য, সবমিলিয়ে সরকারি হস্তক্ষেপ ও দলীয় রাজনীতির ছত্রছায়ায় নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলাই মূলতঃ শিক্ষার মানের এ চরম অবনতির জন্য দায়ী।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক গণমাধ্যমকে বলেন, শিক্ষা জাতির মেরুদ- কিন্তু শিক্ষার মেরুদ- হচ্ছে শিক্ষকরা। সেই শিক্ষকতা পেশায় মেধাবী ছেলেমেয়েদের আকর্ষণ করানোর জন্যে যেসব সুযোগ-সুবিধা দেয়া দরকার তা দেয়া হচ্ছে না।
উল্লেখ্য, বর্তমান ভিসি ড. আখতারুজ্জামানের আগ পর্যন্ত এই আরেফিন সিদ্দিকই ভিসি পদে ছিলেন এবং তিনিই সম্ভবতঃ ঢাবির দীর্ঘকাল দায়িত্বে থাকা ভিসি। তার সময়েই প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাত ঢাবিতে শিক্ষার মানের সবচেয়ে বেশি অধঃপতন ঘটেছে বলে মনে করা হয়। এর কারণ, এই সময়েই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপকহারে অনিয়ম-দুর্নীতি এবং দলীয়করণ হয়েছে। ছাত্র ভর্তিতেও অসদুপায়সহ নানা রকমের জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মতে, পাঠদানের মানের পাশাপাশি শিক্ষকদের যোগ্যতাও দেখতে হয়। শিক্ষকদের মানসম্পন্ন প্রকাশনাও থাকতে হয়। পিএইচডি কোথা থেকে করা হলো, থিসিসের বিষয়টা কী- সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষকদের যে নিয়োগ দেওয়া হয় যদি সেখানে রাজনীতি থাকে তাহলে র‌্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সেটিও একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। 
সমস্যা আর সমস্যা
দেশের পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে প্রতি বছরই বাড়ানো হচ্ছে আসন, খোলা হচ্ছে নতুন নতুন বিভাগ কিন্তু সে অনুপাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয় না। আবার পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়গুলো যত সহজে অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলো তা পারে না। কেন না একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যে পরিমাণ জায়গা দরকার তা কেনার মতো আর্থিক সক্ষমতা বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়েরই নেই।
তাছাড়া দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধুমাত্র ব্যবসায়িক মানসিকতা নিয়েই গড়ে উঠেছে। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে মানসম্মত শিক্ষাদানের পরিবর্তে শুধুমাত্র সার্টিফিকেট ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর জন্য দায়ী সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ই। দেখা যাচ্ছে, নীতিমালার শর্ত পূরণ করেনি তার পরও ‘বিশেষ বিবেচনায়’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেয়া হচ্ছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় নীতিমালার শর্তপূরণ ছাড়াই বছরের পর বছর শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। পাঠদান বা মানসম্মত শিক্ষাদানের পরিবর্তে প্রকাশ্যে নিছক সার্টিফিকেট ব্যবসা চালিয়ে গেলেও এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না মন্ত্রণালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। 
অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের আবাসন, শিক্ষার্থীদের জন্য হল নির্মাণসহ নানা কারণে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, এতে বিশ^বিদ্যালয়গুলো দিন দিন কার্যতঃ কংক্রিটের জঙ্গল হয়ে উঠছে। 
মানের অবনতির জন্য দায়ী কারা?
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার জন্য আরো যেসব ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন ছিলো সেগুলোরও যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক কর্মকান্ডে খুবই কম অংশগ্রহণ করে। এসব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষ থেকে যে ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই তা নেয় না। বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে এক দেশের শিক্ষার্থীর আরেক দেশে যাওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থী খুব একটা নেই, বাংলাদেশের বিশ^বিদ্যালয়ে আগে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা আসতেন, শিক্ষার্থী বিনিময় চুক্তির আওতায় তো আসতেনই পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অনেকে আসতেন। কিন্তু এখন দেশের ‘জেনারেল’ বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম, বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিছু বিদেশি শিক্ষার্থী থাকলেও তারা মূলতঃ বৃত্তি পেয়েই এ দেশে এসেছেন।
ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিষয়টি তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পরপরই শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষায় নিজের পছন্দ ঠিক করে আর সেভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। দেশে পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে একটি আসনের বিপরীতে কখনো কখনো ৪০ জনও ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে মেধাবীরা ভর্তিযুদ্ধে নামেন। কিন্তু এরই মাঝে বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে জালিয়াতি আর প্রশ্ন ফাঁসের মতো ঘটনাও ঘটছে।
গত ৬ আগস্ট ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ৬৯জন শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত এসব শিক্ষার্থী অসদুপায় ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। ভর্তিতে জালিয়াতি নিয়ে একটি মামলার কার্যক্রম চলমান থাকায় আর এসব শিক্ষার্থী ওই মামলার আসামি হওয়ায় তাদেরকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রশ্ন ফাঁস ও জালিয়াতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ২৩ জুন বিশ^বিদ্যালয়ের ৮৭ শিক্ষার্থীসহ ১২৫জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দায়ের করেছিল। 
এমনকি সর্বশেষ আরো বড় অপকর্মের খবর ফাঁস হয়েছে। বিশ^বিদ্যালয়ের নৈশকালীন নানা কোর্সে বিনা ভর্তি পরীক্ষায় ভর্তির অভিযোগ উঠেছে, যাদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে তাদের প্রায় সবার রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, পরীক্ষা ছাড়াই বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানের চিরকুট দেখেই তাদের ভর্তি করা হয়েছে। 
শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি ও শিক্ষক রাজনীতি
বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি আর অনিয়ম বহুল আলোচিত একটি বিষয়। বলা হয়, শিক্ষক নিয়োগে এখন মেধাকে যতোটা না মূল্যায়ন করা হয় তারচে’ অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় রাজনৈতিক অবস্থানকে। এমনকি সরাসরি আর্থিক লেনদেনও হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে, যা ইতিপূর্বে কল্পনাও করা যেতো না। 
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশাল ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক নিয়োগে ৩ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ করেছিল টিআইবি। ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আটটিতেই শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির চিত্র পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করা বৈশি^ক এ সংস্থাটি।
সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়া ওই বিশ^বিদ্যালয়ের আইন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ পেতে একজন চাকরিপ্রার্থী কত টাকা দিতে রাজি আছেন সে ব্যাপারে টেলিফোন করে ওই প্রার্থীর স্ত্রীর কাছে জানতে চান। ওই ফোনালাপটি ফাঁস হয়ে গেলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।
শুধু টিআইবিই নয়, দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকও তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির বিষয়টি উল্লেখ করেছে। তাছাড়া শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতির কথাও বলেছে দুদক।
সমাধানে করণীয় কী?
বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ বেশ গুরুতর। এ সমস্যা সমাধানে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৃত মেধাবী ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সময় নানা সুপারিশ উঠে এসেছে। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি রোধের ব্যাপারে সুপারিশ করে দুদক বলেছিল, বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তনের কথাও বলছেন কেউ কেউ। 
অবশ্য এর বিরোধিতাও আছে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসান এক নিবন্ধে বলেছেন, মৌখিক পরীক্ষায় অনিয়মের কারণে চারটি প্রথম শ্রেণি পাওয়া একজন প্রার্থী বাদ পড়লে আগে অন্ততঃ তা নিয়ে লেখালেখি বা সমালোচনা করা যেত। চার বছরের স্নাতক (সম্মান) ও এক বছরের (স্নাতকোত্তর) কোর্সের ৪০ থেকে ৪৫টি কোর্সের লিখিত পরীক্ষায় প্রায় সব সময় প্রথম হওয়া একজন ব্যক্তি একটি ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় ভাল না করলেই বাদ পড়ে যাবেন! এটা একটি আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত হবে বলে মনে করেন তিনি। 
ধারাবাহিক জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে কর্মপন্থা নির্ধারণ
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, উচ্চ শিক্ষার সংকট সমাধানে ধারাবাহিক জাতীয় সংলাপের আয়োজন করতে হবে। ওইসব সংলাপ থেকে পাওয়া সুপারিশের আলোকে নানা পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নিতে হবে। তারা বলেন, উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো কি, সমস্যাগুলো কিভাবে তৈরি হলো, সমস্যাগুলো এখন কোন মাত্রায় বা পর্যায়ে আছে তা চিহ্নিত করতে হবে। এরপর সমাধানের বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করতে হবে। এ সমাধানের জন্যও কাজ করতে হবে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি তিন ধরণের পদক্ষেপ ও প্রকল্পের মাধ্যমে। তবে তারা মনে করেন শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি আর দলীয়করণের মতো বিষয়গুলোতে আর দেরি করার সুযোগ নেই, কেন না পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে একজন ‘ভুল’ ব্যক্তিও যদি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক হন তাও গ্রহণযোগ্য নয়। একজন শিক্ষক ৪০ বছরের মতো পেশায় থাকেন, তাই জেনে-শুনে ৪০ বছর ধরে একজন ভুল ব্যক্তিকে কোন প্রতিষ্ঠান বহন করতে পারে না। শিক্ষাবিদরা মনে করেন, বাংলাদেশে যে বিশ^বিদ্যালয়গুলো আছে সেগুলোর উচিত আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের আরো বেশি করে উপস্থাপন করা। তাদের মনে রাখা উচিত বৈশি^ক মানসম্পন্ন বিশ^বিদ্যালয় গড়তে হলে বৈশি^ক মঞ্চে গিয়েই নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে হবে। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১১ নভেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)