শনিবার, ০৮-আগস্ট ২০২০, ০৬:১৮ অপরাহ্ন

নির্বাচন ও রাজনীতি কোন পথে?

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারী, ২০২০ ০৬:৪২ অপরাহ্ন


সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: নির্বাচন নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত নজির সৃষ্টি করেছিলেন লাইবেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট চার্লস ডি. বি. কিং। তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য ১৯২৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি এতোটাই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছিলেন যে, ইতিহাসের সবচাইতে বড় প্রতারণাপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে ওই ঘটনা ১৯৮২ সালে গিনেজ বুক অফ রেকর্ডে স্থান পেয়েছিলো। তার ওই ভোট জালিয়াতির ঘটনা গোটা বিশ^বাসীকে হতভম্ব করে দিয়েছিলো। ওই নির্বাচনে চার্লস ডি. বি. কিং ২ লক্ষ ৪৩ হাজার ভোট পেয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে দিয়েছিলেন। যিনি পেয়েছিলেন মাত্র ৯ হাজার ভোট। ভোট প্রাপ্তির এই সংখ্যায় অবাক হবার কিছু নেই। কিন্তু অবাক তখনই হতে হয় যখন জানা যায় সে নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যাই ছিল মাত্র ১৫ হাজার! বাংলাদেশের ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনসহ অন্যান্য নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। জনমনে বিশ^াসযোগ্য নির্বাচন নিয়ে অনাস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এরইমধ্যে ৩০ জানুয়ারি আবারও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে ভোটের আয়োজন করেছে নির্বাচন কমিশন। যদিও গত বছর ডিএনসিসির মেয়র পদে উপ নির্বাচনে ভোটার অনুপস্থিতির চিত্র ছিলো উদ্বেগজনক। এই নির্বাচনে এমন কেন্দ্রও পাওয়া গেছে যেখানে মাত্র ৩ ভোট, ৫ ভোট  পড়েছে। ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের অনুপস্থিতি ভোট ব্যবস্থার প্রতি জনগণের অনাস্থার জানান দিচ্ছে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে যেখানে ভোটার উপস্থিতি ছিল এমন হতাশাজনক সেই নির্বাচনেই ২৩৫টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার নজির সৃষ্টি করা হয়েছে।
তফসিল ঘোষণার আগে থেকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে জল্পনা চলছিল। তফসিল ঘোষণার পর সেই জল্পনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শঙ্কা। এবার সত্যি সত্যি ভোট হবে, না আগের মতো? নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, তারা বরিশাল, খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের পুনরাবৃত্তি চান না। যদিও তাদের এ বক্তব্যে কারো কোনো আস্থা নেই।
গত ২৫ ডিসেম্বর নির্বাচনী কর্মকর্তাদের এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিনি বলেছেন, কেন নির্বাচন নিরপেক্ষ, শুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হয় না? এ প্রশ্নের উত্তর আত্মজিজ্ঞাসার কারণেই আমাকে খুঁজতে হয়েছে। আমার নিজের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন আইনত স্বাধীন কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে এই স্বাধীনতা নির্বাচন প্রক্রিয়ার কাছে বন্দী। এজন্য নির্বাচন প্রক্রিয়ার সংস্কার প্রয়োজন। নির্বাচন যদি গণতন্ত্রের পূর্ব শর্ত হয় তাহলে গণতন্ত্রের পদযাত্রা অবারিত করতে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হতে হবে। বর্তমান নির্বাচন অবস্থা প্রসঙ্গে মাহবুব তালুকদার বলেন, পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে আমরা গণতন্ত্রের শোকযাত্রায় শরিক হতে পারি না।
তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনের ৩ বছর অতিবাহিত হতে যাচ্ছে। বাকি দু’বছর সময়ের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হচ্ছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এই নির্বাচনকে নিয়ে রাজধানীবাসীর উৎসাহ, উদ্বেগ অন্তহীন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও জাতীয় নির্বাচনের মতোই এতে সমগ্র দেশবাসীর দৃষ্টি নিবদ্ধ। তিনি বলেন, অতীতে যেসব সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়েছে এর তিনটির বিষয়ে আমি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলাম। বরিশাল সিটি নির্বাচনে আমি এককভাবে দায়িত্ব পালন করি এবং গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচন সম্পর্কে আমি প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে এই তিনটি নির্বাচনের স্বরূপ সন্ধান করি। কিন্তু এই তিন সিটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা আমার কাছে মোটেই সুখকর নয়। আসন্ন ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিগত ওই তিন সিটি নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না। 
এবারের নির্বাচনও কেমন হতে পারে মাহবুব তালুকদারের এই বক্তব্যের মাধ্যমে তা আঁচ করা যায়। তারপরও বিএনপি সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এমনকি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠে থাকার ঘোষণাও এসেছে তাদের পক্ষ থেকে। আশা করা যায়, শীতের ঠান্ডা সত্ত্বেও নির্বাচনী হাওয়া গরম হবে। তবে সেই গরম হাওয়া সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দেবে কি না, বলা কঠিন।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরে গেলে মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়বে না। এটি যদি তার মনের কথা এবং সরকারি দলের মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ হয়, দেশবাসী স্বাগত জানাবে। বাংলাদেশের মানুষ বহুদিন সুষ্ঠু নির্বাচন থেকে বঞ্চিত। আগে নির্বাচন ছিল উৎসব। এখন নির্বাচন মানে আতঙ্ক। ইতিমধ্যেই বিএনপি সমর্থিত একজন কাউন্সিলর প্রার্থীকে গ্রেফতার করে এর নমুনা দেখানো শুরু হয়েছে। বিএনপি অভিযোগ করেছে, একটি ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করার লক্ষ্যে সরকারের নির্দেশে পুলিশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পুরাতন মামলায় ওয়ারেন্ট তৈরি করে তাকে গ্রেফতার দেখিয়েছে। 
প্রচারণা শুরু হওয়ার আগেই নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। ভোট সুষ্ঠু হবে কি না তা নিয়ে দারুণ সংশয় রয়েছে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের। এরই মধ্যে ২ জানুয়ারি বিএনপি সমর্থিত একজন কাউন্সিলর প্রার্থীকে গ্রেফতার করায় আতঙ্ক আরো বেড়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা যেখানে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিসগুলো যখন তাদের উপস্থিতিতে সরগরম, তখন বিএনপির সমর্থিত প্রার্থীরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পথ চলছেন। পাশাপাশি হামলা হতে পারে এমন ভয়ও প্রকাশ করেছেন তারা।
তবে প্রতিকূল পরিবেশেও সিটি নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকতে চায় বিএনপি। সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, এটা নিয়ে দলটির খুব একটা আশাবাদ নেই। নির্বাচনের প্রতিযোগিতায় থাকলে কিভাবে সরকার ভোট জালিয়াতি করে, তা অন্তত ফুটে উঠবে বলে তারা বলছেন। আওয়ামী লীগকে সরকারে রেখে নির্বাচন যে সুষ্ঠু হবে না, তা প্রমাণের জন্যই তাদের এই অংশগ্রহণ। বিএনপির কোনো কোনো নেতার মতে, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে হলে মাঠের নেতাকর্মীদের রাজপথমুখী করাই মূল লক্ষ্য। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দুইভাবে চাঙ্গা হন। একটি হলো ভোটের মাধ্যমে। অন্যটি দল পুনর্গঠনের মাধ্যমে। দু’টি কাজই বিএনপি একসাথে করে যাচ্ছে।
বলা হচ্ছে, অর্থনীতিতে আমাদের অনেক অর্জন আছে। বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। স্বল্পোন্নত দেশের বৃত্ত ছাড়িয়ে উন্নয়নশীল দেশের পথে এগোচ্ছি। আমাদের গড় আয়ু ও গড় আয় দুটোই বেড়েছে। কিন্তু রাজনীতি ও গণতন্ত্রের সূচক ক্রমেই নিচে নামছে। গণতান্ত্রিক শাসনের দাবি করি, অথচ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারি না। নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়া ধ্বংসের কিনারে এসে ঠেকেছে। ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৮ যে জাতীয় নির্বাচন হলো, তা আইনত সিদ্ধ হলেও নৈতিকতার বিচারে পাস করতে পারেনি।
নির্বাচনের পর আর কেউ জিজ্ঞেস করেন না, ‘আপনার ভোট দিয়েছেন কি না।’ জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার ভোটটি রাতে হয়েছে, না দিনে।’ দিনের ভোটের জন্য নির্বাচন কমিশনের দরকার হয়। রাতের ভোটের জন্য নির্বাচন কমিশনের দরকার হয় না। সে ক্ষেত্রে এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজন আছে কি না, সেটাও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ১২ ডিসেম্বর এক বিবৃতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সব কমিশনারদের অপসারণ ও কমিশন ঢেলে সাজাতে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন জানিয়েছে টিআইবি। নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যেভাবে একের পর এক কেলেঙ্কারির জন্ম দিচ্ছে তা অভূতপূর্ব ও গোটা জাতির জন্য বিব্রতকর বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের হাতে এমন রাষ্ট্রীয় অমর্যাদা বন্ধ করতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সব কমিশনারদের আশু অপসারণ ও নির্বাচন কমিশনকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর বিকল্প নেই উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ কামনা করেছে সংস্থাটি। 
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেছেন, “অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে নির্বাচন কমিশন ও এর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় পচন ধরেছে। আর এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের মতো সুবিবেচনা ও সক্ষমতা আমরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনার বা কমিশন সচিবালয়ের কাছে আশা করার মতো সাহস পাচ্ছি না। কারণ একের পর এক কেলেঙ্কারির পর তাঁরা যেভাবে স্বপদ আঁকড়ে ধরে আছেন, তাতে এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে সংশ্লিষ্ট সবাই নিজেদের জবাবদিহিতা ও ন্যূনতম আত্মসমালোচনার ঊর্ধ্বে বলে ধরে নিয়েছেন।” নির্বাচন কমিশনের এই নির্বিকার আচরণ থেকে আমরা কি ধরে নিব? - এমন প্রশ্ন তুলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “এই নির্বাচন কমিশন দেশকে এক অভূতপূর্ব নির্বাচনের দায় চাপিয়ে দিয়েছেন, যার পরতে পরতে অনিয়মের অভিযোগ সত্ত্বেও কোনো তদন্ত হয়নি। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনাররা এবং সচিবালয়ের কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণের নামে জনগণের করের টাকা হরিলুট করেছেন এমন অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু তারপরও ছিল অস্বস্তিকর নীরবতা।” 
এই নির্বাচন কশিমন গোটা জাতির মাথা হেঁট করে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন ড. জামান। তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন যে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সেই সত্যটাও কমিশন সংশ্লিষ্টরা সম্ভবত ভুলে গেছেন। তাদের অধীনে ভবিষ্যত যে কোনো কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য। গণতন্ত্রের স্বার্থেই এহেন অবমাননাকর অধ্যায়ের শেষ হওয়া দরকার। ব্যর্থতা এবং নৈতিক স্খলনের দায় নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা অন্যান্য কমিশনাররা যে সরে যাবেন না সেটা এতোদিনে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। তারা তাদের শপথের অবমাননা করছেন, সংবিধান অবমাননা করছেন এবং নিয়োগকর্তা হিসেবে মহামান্য রাষ্ট্রপতির অসম্মানের ঝুঁকি সৃষ্টি করছেন। আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির প্রতি সশ্রদ্ধ আবেদন করছি, এই বিতর্কিত ব্যক্তিদের দ্রুত অপসারণের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য।” 
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনেরই দায়িত্ব নাগরিকদের ভোটাধিকার রক্ষা করা। ভোটাধিকার রক্ষা মানে তারা নির্বিঘেœ কেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যেতে পারবেন। কেউ বাধা দেবে না। হাঙ্গামা করবে না। কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন সেই কাজটি শুরু থেকে করতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি নির্বাচনে ‘পুকুর চুরি’ হওয়ার পরও তাঁরা নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে বলে গীত গেয়েছেন। তারা বলেছেন, বিরোধী দলের প্রার্থীর এজেন্ট কেন্দ্রে না এলে কিছু করণীয় নেই। কিন্তু কেন ওই এজেন্টরা কেন্দ্র যেতে পারেন না, কারা এজেন্টদের গাড়িতে তুলে নিয়ে নির্বাচনী এলাকার বাইরে রেখে আসেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন না। কাউকে জিজ্ঞাসা করার মুরোদ রাখেন না। নির্বাচন কমিশন চোখের সামনে যা ঘটে, তা দেখতে পায় না।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনিয়ম কারচুপি শুধু নূরুল হুদা কমিশনের আমলেই হয়নি; এর আগে কাজী রকিবউদ্দীনের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন ঢাকার দুই সিটি ও চট্টগ্রামে নির্বাচনের নামে মহা কেলেঙ্কারি করেছিল। ভোটাররা কেন্দ্রে যাওয়ার আগেই তাদের ভোট দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। আমাদের নির্বাচন কমিশনগুলো সুষ্ঠু নির্বাচন না দিতে পারলেও কারচুপির নির্বাচনের নতুন নতুন মডেল উপহার দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার হয়তো বিবেকতাড়িত হয়ে কিছু সত্য কথা বলেছেন। কিন্তু তাতে নির্বাচন কমিশনের চরিত্র বদলাবে বলে মনে হয় না। তিনি যেদিন সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সদুপদেশ দিলেন, তার এক দিন পর আরেকজন কমিশনার বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে আনা মামলা প্রসঙ্গে বলেছেন, কারও বিরুদ্ধে আগের ফৌজদারি মামলা থাকলে তাদের কিছু করার নেই। আইন নিজের গতিতে চলবে। কিন্তু আইন নিজের গতিতে চললে তো ভোটকেন্দ্রে বিশেষ প্রার্থীর সমর্থকেরা ‘ভোট সন্ত্রাস’ করতে পারতেন না। আইন নিজের গতিতে চললে নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী দলের শত শত নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা হতে পারত না। আইন নিজের গতিতে চললে দিনের ভোট রাতেই সম্পন্ন হতে পারত না। সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত ভয়মুক্ত পরিবেশ ও সব দল ও প্রার্থীর জন্য মাঠ সমতল করা। কে এম নূরুল হুদার কমিশন আগের নির্বাচনগুলোতে সেই কাজটি করতে পারেনি। এবারে পারবেন কি না বিশ্লেষকরা সেই প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রতিবাদ কী থেমে যাবে? 
৩০ ডিসেম্বরের বিতর্কিত নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে বাম গণতান্ত্রিক জোটের কালো পতাকা মিছিল ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রায় হামলা চালিয়েছে পুলিশ। ওই হামলায় জোটের অনেক নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতিই দেয়া হয়নি। বিএনপি নতুন বছরেও দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নতুন নির্বাচনের দাবি নিয়ে মাঠে থাকতে চায়। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নতুন বছরের প্রাক্কালে বলেছেন, গেল বছরটি ছিল গণতন্ত্র হত্যার বছর, মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়ার বছর এবং ফ্যাসিবাদের জয়ের বছর। নতুন বছরে আমরা সবসময়ই নতুন করে ভাবতে চাই, নতুন করে স্বপ্ন দেখতে চাই এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করতে চাই, গণতন্ত্র উদ্ধার করতে চাই।
গেল বছরের শেষ দিকে ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের বাইরে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে ‘গণতন্ত্র উদ্ধার আন্দোলন’ নামে নতুন একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। এই সংগঠন সরকারবিরোধী কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, ‘গণতন্ত্র উদ্ধার আন্দোলনÑ এটা নাগরিক ঐক্যের না, এটা বিএনপির না, এটা কোনো দলের না। এটা সবার। শেখ হাসিনার পতন না হওয়া পর্যন্ত আমরা আছি, যাব না।’ বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের এক বছর পূর্তিতে বাম গণতান্ত্রিক জোট ঘোষিত কর্মসূচিতে পুলিশি হামলার পর সরকারের পদত্যাগ দাবিতে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছেন নেতারা। নতুন বছরে তারা নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকতে চান। তবে প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর ক্রিয়াকলাপের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নানা ইস্যুতে নতুন বছরে বিকল্প আন্দোলন গড়ে তোলার আভাস রয়েছে। ডাকসুর ভিপি নুরের আন্দোলন ঘিরে নানা বাস্তবতা এখন লেগেই আছে। আন্দোলনের মাঠে নুরের অদম্য উদ্যোগ অনেকের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাকে গ্রেফতার করা হতে পারে এমন শঙ্কার কথা জানিয়েছেন নুর। নতুন বছরে ডাকসু নেতার ভাগ্যে কী আছে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এরইমধ্যে ডাকসু কার্যালয়ের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ও ছাত্রলীগ নূরুল হক নূরের ওপর যে বীভৎস-দানবীয় হামলা চালিয়েছে তা নজিরবিহীন। স্বাধীনতাত্তোর ডাকসু’র প্রথম ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, স্বাধীনতাত্তোরকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাত খুনের আসামি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদে আসীন হয়েছিল। তাদের সন্ত্রাস বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল অস্থিতিশীল করেনি জাতীয় পর্যায়ে দুর্যোগ বয়ে এনেছিল। আজও সেই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।  ইতিমধ্যেই নূরের ওপর কয়েক দফায় হামলা চালানো হয়েছে। সর্বশেষ ২২ ডিসেম্বর ডাকসু কার্যালয়ে যে নারকীয় হামলা চালানো হয়েছে এর মাধ্যমে নূরকে একেবারে মেরে ফেলার চেষ্টা হয়েছিলো বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। 
তবে ওই ঘটনার পর উল্টো নূরের বিরুদ্ধেই মামলা করা হয়েছে। যদিও হামলায় নূরসহ বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অন্তত ২৪ জন আহত হয়েছেন। হামলায় গুরুতর আহত তুহিন ফারাবীকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল, অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তাকে নিউরোলজি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। ভিপি নূরের কক্ষের কম্পিউটারসহ অন্যান্য আসবাবপত্র ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ ঘটনার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, এক ঘণ্টা ধরে এ হামলার ঘটনা ঘটলেও ডাকসু ভবন থেকে সামান্য দূরত্বের কলাভবনের নিচতলায় প্রক্টর তার কার্যালয়ে থাকলেও ঘটনাস্থলে আসেননি। হামলা সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি আসেন, যেমনটি বাংলা সিনেমায় দেখতে দেখা যায়, ঘটনা যখন শেষ তখন পুলিশ উপস্থিত। ডাকসুর ভিপি হওয়ার আগে-পরে নূরুল হক নূর ও তার সহযোগীদের ওপর অন্তত ৯ বার হামলা করেছে সরকারি ছাত্র সংগঠন। আর এর মধ্যে পাঁচবারই হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কখনও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ভারতের নাগরিকত্ব আইন নিয়ে যখন খোদ ভারতসহ সারা বিশ্বে প্রতিবাদ হচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশে পড়তে বাধ্য। অথচ ঢাবি ক্যাম্পাসে নূরের নেতৃত্বে যখন ছাত্ররা প্রতিবাদ শুরু করল, তাদের ওপর হামলা করা হলো। নূরের কার্যালয়ে আলো নিভিয়ে যেভাবে হামলা করা হয়েছে, সেটি সভ্য সমাজে অচিন্তনীয়। হামলাকারীরা ডাকসুর ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। চরম বর্বরতা পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোকে গ্রাস করে ফেলছে, অথচ কর্তৃপক্ষের কোনো হুঁশ যেন হচ্ছে না। সবাই মৌখিক বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছেন এবং ডিপ্লোম্যাটিক কথাবার্তাই বলছেন। বাংলাদেশের মানুষের শ্রেষ্ঠ অহংকার মুক্তিযুদ্ধ। ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’ নামীয় সংগঠনটির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ শব্দটি ব্যবহার করে সন্ত্রাস করার অধিকার কে কাকে দিল, এমন প্রশ্ন এসেছে। মুক্তিযুদ্ধ শব্দটি ব্যবহার করে কারও ওপর নিপীড়ন কিংবা হামলা করলে সেটি বৈধ হয়ে যায়? গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা প্রশাসনের দায়িত্ব হলেও তারা তা করেনি। মুক্তিযুদ্ধের নাম ব্যবহার করে এমন হামলা মুক্তিযুদ্ধের সুস্পষ্ট অপমান।’ ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, ‘এরকম বর্বরতা আমি আমার ছাত্ররাজনীতিতে দেখিনি। বাংলাদেশ আমলে কবে দেখলাম তাই ভাবছি, পাকিস্তান আমলেও দেখিনি। এরকমভাবে বেধড়ক পেটানো মৃত্যু সমতুল্য। এর নিন্দা জানানোর ভাষা আমার নেই। তিনি আরও বলেন, ডাকসু ভিপি মানে তো সরকারের প্রতিপক্ষ হয়ে গেছে, এমন তো নয়। 
ডাকসু ভিপি নূরুল হক নূর ও তার সহযোগীদের ওপর হামলায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ছাত্ররা। সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্র ঐক্যের ব্যানারে ২৩ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে জড়িতদের বহিষ্কারেরও দাবি জানানো হয়। হামলাকারীরা দাবি করেন, সিসিটিভিতে হামলাকারীদের ফুটেজ রয়েছে, অবিলম্বে তাদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হোক। এরই মধ্যে জানা যায়, ডাকসুতে ৯টি সিসি ক্যামেরা থাকলেও ফুটেজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নূরের কক্ষ আটকে মারধরের পর পরই সিসি ক্যামেরার ফুটেজসহ হার্ডডিস্ক, মনিটর ও সিপিইউ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কে বা কারা নিয়ে গেছে এগুলো তাও কর্তৃপক্ষ বলতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছয় সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এ হামলার ঘটনায়। এ ঘটনাটি কেন ও কীভাবে সংঘটিত হলো এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত তা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করার জন্য কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেনকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতীতেও দেখো গেছেÑ তদন্ত কমিটি করা মানে কোনো কিছুকে হিমঘরে পাঠিয়ে দেওয়া। আর কমিটির রিপোর্ট যদি তাড়াতাড়ি দিতে বলা হয়, সেটি করা হয় অত্যন্ত সুচতুরভাবে, ডিপ্লোম্যাটিক ল্যাংগুয়েজ ব্যবহার করে। এতে না থামে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি, না হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো লাভ। এতে লাভ একটিই হয়, সেটি হচ্ছেÑ অরাজকতা বাড়তেই থাকে, কারণ সন্ত্রাস যারা করে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা না নেওয়া মানে আরও সন্ত্রাস করার জন্য তাদের পুরো লাইলেন্স দিয়ে দেওয়া। 
ঢাবিতে পরপর ককটেল বিস্ফোরণ কীসের আলামত?
নূরের ওপর হামলার পর প্রতিবাদ আন্দোলনে উত্তাপ ছড়িয়েছে সারাদেশের শিক্ষাঙ্গণগুলোতে। এরইমধ্যে হামলায় জড়িতদের দ্রুত বিচার ও একাডেমিক বহিষ্কার, ঢাবির প্রক্টরের পদত্যাগ, নুর ও অন্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবিতে ১২টি ছাত্র সংগঠন একজোট হয়েছে। কিন্তু ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে এই প্রতিবাদ আন্দোলনের মধ্যে কয়েকদফা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সেখানে আতঙ্ক ছড়ানো হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নানা কারণে আন্দোলন সংগ্রাম চললেও বিগত কয়েক বছর বিস্ফোরণের ঘটনা নেই। অথচ চার দিনে ক্যাম্পাসে চার বার ককটেল বিস্ফোরণ কিসের আলামত? পরপর এসব বিস্ফোরণ ঘটলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি প্রশাসন। এসব ঘটনার সবগুলোই ছাত্র রাজনীতির কেন্দ্রস্থল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনকে ঘিরে হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে মধুর ক্যান্টিনের গুরুত্ব থাকায় এ জায়গাকে ঘিরে পরিস্থিতি অস্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে বলে দাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। তারা বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ককটেল ফুটিয়ে একটি চক্র রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের চেষ্টা করছে। আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে তাদের সে সুযোগ দিয়ে যাচ্ছে।
২ জানুয়ারি একটি সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে গত ১০ দিনে ৯ দফা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন, নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন এলাকায় এ বিস্ফোরণগুলো ঘটানো হয়েছে। তবে এই বিস্ফোরণের সঙ্গে কারা যুক্ত, এ নিয়ে মন্তব্য করতে নারাজ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীলরা। তারা বলছেন, হাতেনাতে ককটেল নিক্ষেপকারীদের না ধরা পর্যন্ত বা জড়িতদের গ্রেফতার করার আগে, কারা এই বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে, তা নিয়ে কোনও মন্তব্য করা যাবে না।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৬ জানুয়ারি ২০২০ প্রকাশিত)
 



..........