সোমবার, ২৭-জানুয়ারী ২০২০, ০১:২৬ অপরাহ্ন

শঙ্কার মধ্যে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন

shershanews24.com

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারী, ২০২০ ০৪:৪৯ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: গত কয়েক বছর ধরে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত নির্বাচন দেখছে দেশের জনগণ। ভোটকেন্দ্র দখল, জালভোট প্রদান, আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা, কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টকে কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়া ও কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার মত ঘটনা ঘটছে। নির্বাচনী ব্যবস্থা এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে যে ভোটাররা নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর কোনো আস্থাই রাখতে পারছেন না। ভোট মানেই উৎসাহ ও উদ্দীপনার ব্যাপার ছিল। তা বর্তমানে শঙ্কাতে পরিণত হয়েছে। আগামী ৩০ জানুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভোট গ্রহণের দিন ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন(ইসি)। নির্বাচনী প্রচারণার শুরু ৯ জানুয়ারি। সেই দিক থেকে এখনো কয়েক দিন বাকি, এর আগেই ভোটের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর বিভিন্ন অলিতে গলিতে। এখন আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও কী ৩০ ডিসেম্বরের মতো ভোট ডাকাতির পুনরাবৃত্তি হবে? নাকি হুদা কমিশন ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে? অপরদিকে আসন্ন ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করলেও তারা নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছে। সিটি নির্বাচনের বিষয়ে দলটির ভাষ্য, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমরা অংশগ্রহণ করেছি। সেটাও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছিল। কিন্তু ৩০ ডিসেম্বরের ভোট ২৯ তারিখ রাতে ডাকাতির মাধ্যমে নিয়ে নেয়া হয়েছে- এটা সবাই জানে। সুতরাং এই সরকার এবং নির্বাচন কমিশন যা বলে তা তাদের মনের কথা নয়। আর এটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হচ্ছে, আমাদের অংশগ্রহণ করার কারণেই। তবে আমরা বিশ্বাস করি না, তারা (সরকার ও ইসি) সুষ্ঠু নির্বাচন করবে এবং আমরা আশাও করি না তারা নিরপেক্ষ করবে। তবুও আমরা জনগণের কাছে থাকার জন্য, জনগণের কাছে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের(ইসি) অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না, তা প্রমাণ করতেই বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন বলেছেন, প্রতিপক্ষ কে তা নিয়ে উদ্বেগ নেই। উদ্বেগ নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে। বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের গ্রেফতার করে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে যেতে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে চাপ সৃষ্টি করে লাভ নেই। আমরা কোনোভাবেই ভোটের মাঠ ছেড়ে যাব না। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়ে যাব। 
অন্যদিকে ইভিএম নিয়ে বারবার কারচুপির আশঙ্কা করে আসছে দলটি। তাতে জনগণের ভোটাধিকার সত্যিকারের প্রতিফলন ঘটবে নাকি ডিজিটাল ডাকাতি হবে তা নিয়েও রয়েছে ঢের উদ্বেগ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দলটির অনেক নেতা-কর্মীর মধ্যে ‘গা ছাড়া’ ভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে দলের মধ্যেই। ঢাকা সিটির নির্বাচনে ভালোভাবেই নামার পরিকল্পনা করেছে বিএনপি। সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে বিএনপি ভালোভাবে নিয়ে এগোতে চায়। ২০১৫ সালের নির্বাচনে ঢাকার দুই মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও মির্জা আব্বাস দুপুরেই ভোট বর্জন করেন। তবে এবার দলটি শেষ পর্যন্ত দেখবে। হাল ছেড়ে দিতে চায় না। কেন্দ্র থেকে স্থানীয় পর্যায়ে মাঠে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের প্রতি বারবার নিজেদের অনাস্থার কথা জানালেও এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে তারা। তবে ইসি এই নির্বাচন ‘সুষ্ঠু’ করতে না পারলে এটাই হতে পারে দলীয়ভাবে বিএনপির অংশ নেওয়া শেষ নির্বাচন। দলের উচ্চপর্যায়ে তেমন চিন্তাভাবনা রয়েছে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হারলেও তেমন কোনও ক্ষতি হবে না। এটা তো জাতীয় নির্বাচন নয় যে নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন না পেলে সরকার গঠন করা যাবে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কথার কথা, রাজনৈতিক বক্তব্য। সরকার কোনোভাবে চাইবে না রাজধানী ঢাকাকে হাতছাড়া করতে। ইতিপূর্বে বিরোধী দলগুলো বেশ কয়েকটি সরকার পতনের শক্তিশালী আন্দোলন করেছে। বলা চলে পুরো দেশ আন্দোলনকারীদের দখলে ছিল একমাত্র রাজধানী ছাড়া। ঢাকা দখল করতে পারলে হয়তোবা আন্দোলনকরীরা সফল হতো। এছাড়া সামনে বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী ও স্বাধীনতা লাভের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। তাই কোনো রকমের ঝুঁকি নিবে না বলে মনে হচ্ছে। তাছাড়া মেয়র প্রার্থী হিসাবে এবার শেখ পরিবারের সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস রয়েছেন। তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। এখানে পদ ও শেখ পরিবারের ইমেজও জড়িত। তাই আওয়ামী লীগ কোনোভাবে চাইবে না ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন তাদের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে যাক। দুই সিটি ধরে রাখতে যে কোনো কৌশল গ্রহণ করবে দলটি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে প্রশাসনই এখন সবচেয়ে বড় বাধা। পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে- ইসি সুষ্ঠু নির্বাচন চাইলেও প্রশাসন নিরপেক্ষ না হওয়ায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না। কারণ ভোটকেন্দ্রের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা ও অবাধ ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনের। প্রশাসন নিরপেক্ষ নয় বলেই সুষ্ঠু ভোট না হওয়ার শঙ্কা থেকে ভোটাররা কেন্দ্রবিমুখ হয়ে পড়ছেন। যার কারণে পুরো নির্বাচনব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন ইতিপূর্বে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে নিজেদের গায়ে কালি লাগিয়েছে। ঢাকা সিটি নির্বাচনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে সেই বিতর্ক কিছুটা হলেও কমিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে বেশ কয়েকটি নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু কোনো নির্বাচনে ইসি জনগণ বা বিরোধী প্রার্থীদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। যে কারণে জনগণ ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার ইচ্ছে হারিয়ে ফেলেছে। সেই জায়গা থেকে সরে আসতে চাইলে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিরপেক্ষ কাজ করতে হবে। আমি মনে করি, নির্বাচন কমিশন যদি তারা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে তাহলে এধরনের কোনো পরিস্থিতি তৈরি হবে না। জনগণের আস্থা ফেরানোর জন্য এটাই তাদের শেষ সুযোগ।
জয়ের ছক কষছে দুই দল
ভোটারদের আস্থা বাড়াতে ও প্রচারে এগিয়ে থাকতে আসন্ন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। দুই সিটির বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকা-ের ফিরিস্তি ভোটারদের সামনে তুলে ধরা হবে। এর জন্য গঠন করা হচ্ছে একটি শক্তিশালী সমন্বয় কমিটি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে (ডিএসসিসি) আমির হোসেন আমুকে টিম লিডারের দায়িত্ব দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি অনুমোদন করেছে আওয়ামী লীগ।
অপরদিকে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সরকারের ব্যর্থতাগুলো সামনে এনে সিটি নির্বাচনের প্রচারে নামবে বিএনপি। আর কয়েকদিন পর আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হবে। তবে এখন থেকেই নতুন সব কৌশল নিয়ে পরিকল্পনা করছে বিএনপির হাইকমান্ড। ধানের শীষের পক্ষে মাঠে নামতে ‘অলআউট’ প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। দুই সিটিতে সিনিয়র নেতাদের নিয়ে গঠন করা হবে দুটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে দুই মেয়র প্রার্থী তাদের ইশতেহার তৈরির কাজ শুরু করেছেন। বাসযোগ্য নগরী গড়তে ১০০ বছরের ভিন্ন ভিন্ন মাস্টারপ্ল্যান থাকবে দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেনের ইশতেহারে। বাসযোগ্য ঢাকা- ‘ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকীকরণের’ পথে এ সেøাগানে মাঠে নামবেন তিনি। উত্তরের মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ‘নতুন প্রজন্ম-নতুন ঢাকা’ এ স্নোগান সামনে রেখে প্রচার চালাবেন।
ইভিএম নিয়ে বিতর্ক
গত ২২ ডিসেম্বর ডিসিসি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিনই দুই সিটির সব কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহারের কথা জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা। বিরোধী দলের আপত্তি সত্ত্বেও এই ইভিএম ব্যবহারে এখনো অনড় রয়েছে নির্বাচন কমিশন। এরই মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার ভোট কক্ষে ব্যবহারের জন্য ৩৫ হাজার ইভিএম প্রস্তত রাখা হয়েছে। তবে ইভিএমে বিশ্বাসযোগ্য ফল পাওয়া অসম্ভব বলে দাবি করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, “ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনে সরকারের কারসাজি করার ইচ্ছা পূরণেই ইসি ইভিএম ব্যবহারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।” ইসি এক ভয়াবহ পথে অগ্রসর হচ্ছে- এমন মন্তব্য করে স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, “মানুষের মধ্যে অনাস্থা, অবিশ্বাস ও অসন্তোষ আছে। নির্বাচন কমিশনারেরা কানে তুলো আর বিবেকে তালা দেওয়ায় সাধারণ ভোটারেরা হতাশ।” “বিগত জাতীয় নির্বাচনে এই ইসি কলঙ্কজনক প্রতারণায় জাতির ভোটাধিকার হরণ করেছে। যার ফলে আজ আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা অনেকাংশেই ভেঙে পড়েছে।” ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এই ইভিএমের পক্ষে। বিএনপির আশঙ্কা, ইভিএমে ডিজিটাল কারচুপি হবে। ইসি বলছে, ত্রুটিমুক্ত নির্বাচন করতেই ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে অনিয়ম ও কারচুপি কমবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইভিএমে কারচুপির সুযোগ একেবারেই নেই, তা নয়। ইভিএম নিয়ে বিভিন্ন মহলে যে সংশয়, তা ইসিকেই দূর করা উচিত। সবার সঙ্গে আলোচনা করে ইভিএমে ভোট করলে ভালো হতো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের আস্থায় আনার চেষ্টা করেনি ইসি। তাই ইভিএম ভোট নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়াবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুটি জায়গায় ইভিএমে ভোট কারচুপি সম্ভব। প্রথমত, ভোটারের আঙুলের ছাপ না মিললে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নিজের আঙুলের ছাপে ভোটারকে ভোট দেওয়ার সুযোগ দিতে পারেন। এভাবে ২৫ শতাংশ ভোটারকে কর্মকর্তা সুযোগ দিতে পারেন। দ্বিতীয় শঙ্কার বিষয় হলো, ইভিএমে বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে ফল পরিবর্তন সম্ভব। কারণ, ইভিএমে ভোটার ভ্যারিয়েবল পেপার অডিট ট্রেইল বা ভিভিপিএটি নেই। অর্থাৎ যন্ত্রে ভোট দেওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে তার প্রিন্ট কপি ব্যালট জমা হওয়ার সুযোগ নেই। তাই কারচুপি হলে তা প্রমাণ করা যাবে না। তবে ইসি বলছে, এ ধরনের সন্দেহ থাকলে যে কেউ বিশেষজ্ঞ এনে ইভিএম পরীক্ষা করতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেমন ইভিএম নিয়ে মতৈক্য হয়নি, তেমনি ভোটারদের বেশির ভাগ এখন পর্যন্ত ইভিএমের সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত নন। বিএনপির মতো সিপিবিও ইভিএম নিয়ে শঙ্কায় আছে। ইভিএমে ডিজিটাল কারচুপির বা প্রোগ্রামিং করে জালিয়াতি করার আশঙ্কা আছে। এ ছাড়া ভোটারদের প্রশিক্ষণের বিষয় আছে। এত অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক ভোটার এবং নির্বাচনের কর্মকর্তাদের কীভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে? ইসি বলছে, ইভিএমে ইন্টারনেটের কোনো সংযোগ নেই। ফলে হ্যাকিংয়ের সুযোগ নেই। আঙুলের ছাপ বা স্মার্ট কার্ড বা ভোটার নম্বর বা জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়ে ভোটার শনাক্ত করা হবে। ভোটারের ছবি পোলিং এজেন্টরা দেখতে পাবেন। তাই জাল ভোট, ভোটকেন্দ্র দখল করে ভোট দেওয়া, একজনের ভোট অন্যজনে দেওয়া বা একাধিকবার ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। অনুমোদিত কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কারও পক্ষে ইভিএম চালু করা সম্ভব নয়। এক ভোট কক্ষের জন্য নির্দিষ্ট করা ইভিএম অন্য কোথাও ব্যবহার করার সুযোগ নেই বলে তারা দাবি করছেন। 
যে কারণে বাদ পড়লেন সাঈদ খোকন
একাদশ জাতীয় নির্বাচনের ঠিক এক বছর এক মাস পর অনুষ্ঠিতব্য এই দুই সিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহুদিন পর সরগরম হয়েছে নির্বাচনী রাজনীতি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে দুই দলই আগের প্রার্থী বহাল রাখলেও দক্ষিণে পরিবর্তন এসেছে। সেখানে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাতিজা (ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে) ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস। মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন ডিএসসিসির বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকন। যদিও অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফের ছেলে খোকন আগেরবার ৫ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৬ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। তারপরেও সাঈদ খোকন কেন দলীয় মনোনয়ন পেলেন না সেই বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সাঈদ খোকন মেয়র হিসেবে পুরো একটি টার্ম দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু এসময় ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি ও বেফাঁস কিছু মন্তব্যের কারণে অনেকবার নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হয়েছেন খোকন। গত ২৫ জুলাই রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এক অনুষ্ঠানে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যাকে ‘গুজব’ বলে অভিহিত করেন মেয়র খোকন। তিনি বলেন, মশা নিয়ে রাজনীতি কাম্য নয়। সাড়ে তিন লাখ আক্রান্তের যে তথ্য এসেছে সেটি কাল্পনিক তথ্য। ছেলেধরা আর সাড়ে তিন লাখ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত একই সূত্রে গাঁথা। মেয়রের এমন মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দলের ভেতরে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এর আগে ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর আজিমপুরের পার্ল হারবাল কমিউনিটি সেন্টারের পাশে কর্মী সমাবেশ ডাকে আওয়ামী লীগ। তার পাশেই ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন পাল্টা কর্মসূচি দেন। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেওয়ায় কে বা কারা সমাবেশস্থলের সামনে সিটি করপোরেশনের ট্রাক ভর্তি করে ময়লা রেখে যায়। ওই ঘটনার জন্য মেয়র সাঈদ খোকনকেই দোষারোপ করা হয়। এ সময় মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন মেয়র খোকন। এ নিয়েও দলীয়ভাবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। দলীয় রাজনীতিতেও কোন্দলে জড়িয়ে পড়েন তিনি, যেটা ক্ষমতাসীন দলের ইমেজকে নষ্ট করেছে। এছাড়া, মেয়র হিসেবে খোকন নগরবাসীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারেননি। মূলত এসব কারণেই তাকে বাদ দিয়ে ডিএসসিসির মেয়র পদে এবার নতুন প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ ছাড়া দলের হাইকমান্ডেও তার কর্মকা-ে অসন্তোষ ছিল। নীতিনির্ধারক পর্যায়ও তাই প্রার্থী পরিবর্তনের পক্ষে ছিল সরব। দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকা দক্ষিণের মেয়রপ্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পাচ্ছেন না বিষয়টি আঁচ করতে পেরে অঝোরে কেঁদেছেন মেয়র সাঈদ খোকন।
ডিসিসি নির্বাচন নিয়ে আসলে কী ভাবছে আওয়ামী লীগ? 
ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচনের কৌশল নিয়ে এখনো দ্বিধায় রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। যেকোনো উপায়ে প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করা নাকি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল সেটি দূর করা হবে সে ব্যাপারে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি দলটির নীতিনির্ধারকরা। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সূত্রগুলো জানায়, সম্প্রতি দলের সভাপতিমন্ডলীর বৈঠকে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের কৌশল কী হবে সেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি এই বৈঠকে। সে জন্য নির্বাচন নিয়ে করণীয় ঠিক করতে আরেকটু সময় নেয়া হতে পারে। 
যদিও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, “আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, এই নির্বাচন ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার’ (অবাধ ও নিরপেক্ষ) থাকবে, সুষ্ঠু হবে। ‘একসেপ্টেবল অ্যান্ড ক্রেডিবল’ (গ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বাসযোগ্য) একটি নির্বাচন হবে।” কিন্তু সিটি নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে- নীতিনির্ধারকরা এমন বক্তব্য দিলেও শেষ পর্যন্ত এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রার্থীর বিজয় নাকি সরকারের বিজয় নিশ্চিত করা হবে তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে ক্ষমতাসীনরা। নীতিনির্ধারকদের বড় একটি অংশ এবারের নির্বাচনকে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের ‘কলঙ্ক’ মোচনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। সে জন্য এ নির্বাচনে প্রার্থীর চেয়ে দল ও সরকারের বিজয়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা। তাদের মতে, এ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হেরে গেলেও তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। এতে সরকার পড়ে যাবে না। বরং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দলীয় প্রার্থীর ভরাডুবি হলে সরকারের ইমেজ বাড়বে। এ ছাড়া এ বছর মুজিববর্ষ উপলক্ষে বছরব্যাপী নানা অনুষ্ঠানমালা রয়েছে। এসব অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত বিদেশী অতিথিরাও আসবেন। তাই নির্বাচনকে কলঙ্কিত করে বিরোধীদের হাতে কোনো ইস্যু তুলে দেয়ার পক্ষে নন তারা। অন্য দিকে দলের আরেকটি অংশ মনে করছে, এ নির্বাচন সরকারের জনপ্রিয়তার মাপকাঠি। সে জন্য সাম্প্রতিক সময়ের অন্য নির্বাচনগুলোর মতো এ নির্বাচনেও যেকোনো মূল্যে নৌকার প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হারলে সরকারের জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে বিরোধীরা। শুধু তাই নয়, ক্ষমতাসীনদের পরাজয় হলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি আরো জোরালো হবে। ফলে সেই সুযোগ যাতে বিরোধীরা না পায় সে জন্য যেকোনো মূল্যে নৌকার প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী বিতর্ক আরো জিইয়ে রাখা ঠিক হবে কি না তা ভাবছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। নতুন করে আবারো নির্বাচনী বিতর্কে জড়ালে তা দল ও সরকারের কতটুকু ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করতে পারে অথবা দলীয় প্রার্থী পরাজিত হলে কী প্রভাব পড়তে পারে তা নিয়ে গোলকধাঁধায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। বিষয়টি নিয়ে এখনই চূড়ান্তভাবে কিছু বলা যাবে না। নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত সরকারি দলের কৌশল কী হতে পারে সেটি স্পষ্ট হতে আরেকটু সময় লাগতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের একাংশ মনে করছেন, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে ভোট বিতর্ক দূর করার সুযোগ এসেছে আওয়ামী লীগের হাতে। সেই সুযোগ কাজে লাগানো উচিত। যেনতেন নির্বাচন না দিয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ফল যা আসে সেটিতেই আওয়ামী লীগের বিজয় হতে পারে। কেননা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারি দলের প্রার্থী পরাজিত হলেও এক দিকে যেমন ভোট বিতর্ক দূর হবে, তেমনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ভাবমর্যাদাও উজ্জ্বল হবে।
আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানিয়েছে, এই মুহূর্তে দলের অধিকাংশ নেতাই চান সিটি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হোক। এতে সরকারের ভাবমর্যাদা বাড়বে। কারণ, সিটি নির্বাচনে মেয়র হারলেও যেমন সরকারের ভিত নড়বে না তেমনি জিতলেও সরকার অনেক বেশি শক্তিশালী হবে বিষয়টা এমন নয়। তাই নির্বাচন নিয়ে বিশ্বস্ততা বাড়ানোর যে সুযোগ আওয়ামী লীগের সামনে এসেছে সেই সুযোগ লুফে নেয়া উচিত।

(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৬ জানুয়ারি ২০২০ প্রকাশিত)