শনিবার, ০৮-আগস্ট ২০২০, ০৫:০৭ অপরাহ্ন
ইভিএম বিভ্রাট, ব্যাপক কারচুপি, অনিয়ম, অরাজকতা

ঢাকা সিটিতে জনঅনাস্থার ভোট 

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০৫:৪৫ অপরাহ্ন


সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ঢাকা সিটি করপোরেশনের ভোটের মধ্য দিয়ে আবারও একটি চরম প্রহসনের নির্বাচন প্রত্যক্ষ করলো দেশবাসী। এবারের ভোটেও বিজয় নিশ্চিত করতে ব্যাপক কারচুপি, অনিয়ম, অরাজকতার আশ্রয় নিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। ইভিএমের নামে প্রহসন হয়েছে। পেশীশক্তির ব্যবহার হয়েছে ব্যাপকভাবে। আগের নির্বাচনগুলোর মতো এবারও ভোটার উপস্থিতি ছিলো চরম হতাশাজনক। এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে ২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দেয় বিএনপি। খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর এই প্রথম হরতালের মতো কঠোর কোনো কর্মসূচি দিলো বিএনপি। বিশ্লেষকরা বলছেন, জবরদস্তির মাধ্যমে একাধিকবার ভোটাধিকার কেড়ে নেয়ার ফলে ভোট ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে যে অনাস্থার সৃষ্টি হয়েছে এই নির্বাচনেও তার প্রতিফলন ঘটেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারও আশানুরূপ ভোটার উপস্থিতি ঘটেনি বলে স্বীকার করেছেন। নির্বাচনে ভোটের হার ৩০ শতাংশের নিচে, ভোট শেষে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন তিনি। মাহবুব তালুকদারের মতে, ভোটের হার ২৫ শতাংশেরও কম। বাস্তবে ভোটের সংখ্যা ১০ শতাংশের বেশি নয় বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। এরমধ্যেও যে স্বল্পসংখ্যক ভোটার ভোট দিতে কেন্দ্রে হাজির হয়েছিলেন তাদের বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের হস্তক্ষেপের কারণে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেননি। ভোটারদের আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে কেন্দ্র থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অনেকে ভোট দিতে এসে নাজেহাল ও লাঞ্ছিত হয়েছেন। অনেক নারী এজেন্টকে ধর্ষণের হুমকি দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বিরোধীপ্রার্থীদের বেশিরভাগ এজেন্টকে ভোটকেন্দ্রে ঢুকতেই দেয়া হয়নি। খোদ নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার নিজেই রাজধানীর ইস্পাহানি বালিকা বিদ্যালয়ে ভোট দিতে এসে বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের কোনো এজেন্ট পাননি। ভোট পর্যবেক্ষণে থাকা গণমাধ্যম কর্মীদের অনেকের ওপর ন্যাক্কারজনক হামলা হয়েছে। শারীরিকভাবে নাজেহাল থেকে শুরু করে কুপিয়ে জখমের মতো দৃষ্টতা দেখানো হয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় মোহাম্মদপুরের রায়ের বাজারে সুমন সিকদার নামে এক পোলিং এজেন্টের মৃত্যু হয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা
মাদারটেক আব্দুল আজিজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র থেকে লাঞ্ছিত করে তিন সাংবাদিককে বের করে দেয় নৌকা প্রতীকের কর্মীরা। ভোটের দিন বেলা সোয়া এগারটার দিকে ওই কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে দেখা যায় বাইরে গেট লাগিয়ে কেন্দ্রের ভেতরে শত শত নৌকার সমর্থক অবস্থান করছেন। এসময় সেখানে অবস্থান করা সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থীরা অভিযোগ করেন, ‘পোলিং অফিসাররা আঙ্গুলের ছাপে ভোটারদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের বুথ থেকে বের করে দিয়ে গোপন বুথে প্রবেশ করে নৌকার বাটনে চাপ দিয়ে ভোট দিচ্ছে নৌকার কর্মীরা।’ ওই বুথের পোলিং এজেন্ট শিউলি জানান, স্থানীয় পুলিশের লোকজন এসে নৌকায় ভোট দিতে বলে গেছে। কোনো সমস্যা করলে পরে দেখে নেওয়া হবে বলে হুমকিও দিয়ে গেছে। এই সুযোগে নৌকার সমর্থকরা ভোটারদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের ভোটকক্ষ থেকে বের করে দিয়ে গোপন কক্ষে গিয়ে ভোট দিচ্ছে। পোলিং এজেন্টের এমন অভিযোগের বিষয়ে নীরবতা পালন করেন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার তাহমিনা বেগম। এ ঘটনা প্রিজাইডিং অফিসার মফিজুল হকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি মাত্র অভিযোগ পেলাম। আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি।’ এর পরপরই ভোটকেন্দ্রে হট্টগোলের সৃষ্টি হলে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করতে থাকেন তিন সাংবাদিক। এ সময় নৌকার সমর্থকরা তাদের গালিগালাজ করে মোবাইল কেড়ে নিয়ে সব তথ্য মুছে ফেলে। এমনকি দৈনিক নয়াদিগন্তের শামছুল ইসলাম, ইনকিলাবের ফারুক হোসেন ও জাহিদুল ইসলামের কাছে থাকা নির্বাচন কমিশনের পরিচয়পত্র কেড়ে নিয়ে তাদের লাঞ্ছিত করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেন নৌকার কর্মীরা। দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা (পরিদর্শক) মাহবুব হোসেনের সামনেই লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটলেও দুর্বৃত্তদের নিবৃত না করে উল্টো তাদের পক্ষে অবস্থান নেন তিনি। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যে ব্যাপক অনিয়ম, অরাজকতা হয়েছে এই ঘটনা তার একটি নমুনা মাত্র। নগরীর আড়াই হাজার ভোট কেন্দ্রের বেশিরভাগজুড়েই এমন নৈরাজ্য ও দখলদারিত্ব ছিলো। কেন্দ্রের আশেপাশে বিএনপির নেতাকর্মীদের উপস্থিতিও সম্ভব ছিল না। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী জড়ো করে রাখা হয়েছিল সর্বত্র। কেন্দ্রের ভেতরে-বাইরে সব জায়গা ছিল তাদেরই নিয়ন্ত্রণে। ভোটকে কেন্দ্র করে কয়েকটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে মারপিটের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া আঙুলের ছাপ দেওয়ার পর ভোটারকে নির্দিষ্ট একটি প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাটনে চাপ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা। ভোট কেন্দ্রের বাইরের চিত্র এক রকম হলেও কেন্দ্রের ভেতরের পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ অন্য রকম। পুলিশের উপস্থিতি থাকলেও ভোট দিতে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছিল না তারা। অনেক ভোটারকে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে তর্ক করতে দেখে গেছে। নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতিতে ভোট না দিয়ে কেউ কেউ কেন্দ্র ছেড়ে চলে গেছেন এমন ঘটনাও ঘটেছে।
নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা হয় ভোটারদের
ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে গণহারে সিল মারার সুযোগ না থাকলেও অনেক ভোটারকে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়। এমন ঘটনা ঘটেছে অন্যান্য অনেক কেন্দ্রের মত সংসদ ভবনের উল্টো দিকে রাজধানী স্কুল কেন্দ্রেও। এখানে প্রকাশ্যে ভোট দিতে বাধ্য করা হয় বলে জানান দুজন ভোটার। তাদের অভিযোগ, সব প্রক্রিয়া শেষ করার পর বাটন চাপার সময় অন্য ব্যক্তি এসে ভোটারদের একটি প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করেন। ওই দুজন ভোটার জানান, এটা দেখে তারা ভোট না দিয়েই চলে এসেছেন। 
বুথ থেকে বেরিয়ে চিৎকার শুরু করলেন ভোটার!
রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভোটকেন্দ্র থেকে বের হয়েই চিৎকার শুরু করলেন এক ব্যক্তি। আর এই দৃশ্য দেখে মুহূর্তেই আশপাশের মানুষে জড়ো হয়ে গেল। জানা গেল, দুপুরের দিকে ভোট দিতে এসেছিলেন ওই ব্যক্তি। ভোট দেয়ার সব কাজ করেছেন, জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে আঙুলের ছাপও দিয়েছিলেন। তবে ভোট দেওয়ার বাটনে চাপ দিতে পারেননি। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তি বাটন চাপ দিয়ে তার ভোট দিয়ে দিয়েছেন। এমন কাজে হতবাক হয়ে তিনি কেন্দ্র থেকে বের হয়ে চিৎকার শুরু করেন। এসময় আশপাশের লোকজন জড়ো হয়ে যায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় হইচই।
ইভিএম বোঝানোর নামে ভোটকক্ষে আ.লীগ কর্মী
প্রবীণ ও স্বল্পশিক্ষিত অনেক ভোটার ইভিএমে বুঝতে পারছেন না এমন অজুহাতে সহযোগিতার নামে ভোটারদের সঙ্গে ভোটের গোপন কক্ষে ঢুকে পড়েন সরকার দলীয় মেয়র প্রার্থী বা সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর কর্মীরা। ভোটার কিসে ভোট দিচ্ছেন, সেটাও তাঁরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেন। উত্তরা গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুইটি কেন্দ্রে এমন চিত্র দেখা গেছে। কেন্দ্রের নারী ভোটারদের একটি বুথে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আফসার উদ্দিন খানের কর্মী খাদিজা নাজনীন এক ভোটারকে বুথের পর্দা ঘেরা ভোট দেওয়ার স্থান পর্যন্ত নিয়ে যান। এই কর্মী ভোটার ভোট দেওয়ার সময়ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ভোট শেষে খুর্শিদা জাহান নামের ওই ভোটার সাংবাদিকদের বলেন, ‘ওই নারী (খাদিজা নাজনীন) আমার পেছন পেছন হেঁটে আমার ভোটকক্ষ পর্যন্ত চলে আসেন। তিনি আমাকে বারবার বলছিলেন “নৌকায় ভোট দেবেন”। ভোট দেওয়ার সময়ে নৌকা প্রতীকের বোতামে চাপ দিতে বলেন। আমি তাঁকে বারবার বলছিলাম আপনি চলে যান। কিন্তু তিনি পুরোপুরি গোপন কক্ষ থেকে বের হননি, দাঁড়িয়েছিলেন।’ দুপুর সোয়া ১২ টার দিকে আরেকজন নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি ভোট দেওয়ার সময় আওয়ামী লীগের দলীয় একজন কর্মী উপস্থিত ছিলেন। তিনি বারবার চলে যেতে বললেও যাননি এবং তিনি কোথায় ভোট দিয়েছেন, তা দেখেছেন। দ্বিতীয় তলার পুরুষ ভোটার কেন্দ্রেও এমন চিত্র দেখা যায়। 
ভোটকেন্দ্রে ভোটার, পোলিং এজেন্ট, গণমাধ্যমকর্মী এবং অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া কেউ ভেতরে থাকার নিয়ম নেই। এরপরও ভোটকেন্দ্রের ভেতরে এবং বুথের ভেতরে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলরের কর্মীদের দেখা যায়। এ ব্যাপারে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, ‘তাঁদের আমরা নিষেধ করছি। অনেকে গায়ের জোরে আসছেন। কেন্দ্রে বাড়তি লোক থাকার কথা না।’ ওই কেন্দ্রে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত একটি বুথে ৩৭০ জন ভোটারের মধ্যে মাত্র পাঁচজন ভোটারকে ভোট দিতে দেখা যায়। 
ঢাবির সব কেন্দ্র ছিলো ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে! 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রগুলোর কোথাও বিরোধী প্রার্থীদের এজেন্ট ছিলো না। সেখানকার সবগুলো কেন্দ্রই ছিলো ক্ষমতাসীনদলের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের দখলে। কেন্দ্রে ভোটার না থাকলেও কেন্দ্রের বাইরে ছিলো বিপুলসংখ্যক ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর উপস্থিতি। প্রথমে ক্যাম্পাসের তিনটি কেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্টদের বের করে দিয়ে সর্বশেষ এনেক্স ভবন কেন্দ্র থেকে বিএনপি সমর্থিত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের পিটিয়ে বের করে দেয় ছাত্রলীগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি-সমর্থক শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, বেলা একটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ এলাকায় অবস্থিত এনেক্স ভবনের ভোটকেন্দ্র থেকে বিএনপি প্রার্থীদের এজেন্টদের পিটিয়ে বের করে দেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এর আগে সকালেই ক্যাম্পাসের অন্য তিনটি কেন্দ্র থেকে ধানের শীষের মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন ও বিএনপি-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী খাজা হাবিবের পোলিং এজেন্টদের বিতাড়িত করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা একটার দিকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ডাকসুর স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল সংসদের জিএস কাজল দাসের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের ২০-৩০ জন নেতা-কর্মী এনেক্স ভবন কেন্দ্রে প্রবেশ করেন। কেন্দ্রে থাকা বিএনপি প্রার্থীদের দুজন এজেন্টকে ভয় দেখিয়ে কেন্দ্র থেকে বাইরে এনে পেটান তাঁরা।  পরে ওই এলাকা থেকে তাঁদের বিতাড়িত করা হয়। 
ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন শুনেই বেধড়ক পিটুনি 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কার্জন হল কেন্দ্রে ধানের শীষে ভোট দেয়ায় এক ব্যক্তিকে মারধর করেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। সকাল সোয়া ১০টার দিকে কার্জন হলের সামনে এ ঘটনা ঘটে। সকাল ১০টার দিকে কার্জন হল কেন্দ্রে ভোট দেন ওই ব্যক্তি। ভোট দিয়ে বের হওয়ার পর বাইরে থাকা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাঁর কাছে জানতে চান, তিনি কোন প্রতীকে ভোট দিয়েছেন। ওই ব্যক্তি ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন বলতেই তাঁকে মারধর শুরু করেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা তাঁকে মারতে মারতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের দিকে নিয়ে যান। মারধরের সময় ঘটনাস্থলে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী একজন সাংবাদিকের কাছে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা জানতে চান, তিনি মারধরের ঘটনার কোনো ছবি তুলেছেন কি না। এ সময় তাঁরা মারমুখী হয়ে ওঠেন। কার্জন হলে সকাল ১০টার দিকে দেখা গেছে, ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল শাখার নেতা-কর্মীরা কৃত্রিম লাইন করে দাঁড়িয়ে আছেন। একপর্যায়ে সেখানে দায়িত্বরত একজন ম্যাজিস্ট্রেট ভোটার ছাড়া অন্যদের লাইন থেকে সরে যেতে বললে প্রায় সবাই সরে যান।
কেন্দ্রে ভোটারদের খরার একটি চিত্র
সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়ে গেছে, কিন্তু ভোটারের কোনো লাইন নেই। ভোট গ্রহণ কাজে দায়িত্বরত ব্যক্তিরা বসে আছেন। মাঝে মধ্যে দু-একজন ভোটার উপস্থিত হন। ভোট দিয়ে চলে গেলে আবার অপেক্ষা করেন পরবর্তী ভোটারের জন্য। এই চিত্র ছিলো রাজধানীর বেইলি রোড এলাকায় অবস্থিত সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ কেন্দ্রে। সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ কেন্দ্রে মোট তিনটি কেন্দ্র। নিচতলায় অবস্থিত কেন্দ্রের তথ্য সংগ্রহ করে জানা যায়, দুপুর ১২টা ১০ মিনিট পর্যন্ত ভোট পড়েছে মাত্র ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ। একটি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা জানান, তার কেন্দ্রে মোট ভোটার ২ হাজার ৩৫৮ জন। যাদের সবাই নারী ভোটার। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই কেন্দ্রের প্রতিটি বুথে মোট ভোটার সংখ্যা ৩৩৭ জন করে। এর মধ্যে ১ নম্বর কক্ষে ১২টা ৪ মিনিট পর্যন্ত ভোট পড়ে ২৩টি। ২ নম্বর কক্ষে ভোট পড়ে ২০টি। ৩ নম্বর কক্ষে ভোট পড়ে ১৯টি। ৪ নম্বর কক্ষে ১৭ টি। ৫ নম্বর কক্ষে ১৬, ৬ নম্বর কক্ষে ৮ এবং ৭ নম্বর কক্ষে ১৯টি । 
বকশীবাজারে ককটেল বিস্ফোরণ, সংঘর্ষ
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বকশীবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থী ও বিএনপির প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ৮টি ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। প্রায় ২০ মিনিট ভোট গ্রহণ বন্ধ ছিল। এই কেন্দ্রে সকাল থেকেই আওয়ামী মনোনীত প্রার্থী ওমর বিন আবদাল আজিজ তামিম ও তাঁর সমর্থকেরা উপস্থিত ছিলেন। তার প্রতীক মিষ্টিকুমড়া। সকাল থেকেই তাঁর সমর্থকেরা তাতখানা লেনে দাঁড়িয়েছিলেন। বেলা ১১টা ৪৭ মিনিটের দিকে এই ওয়ার্ডে বিএনপির প্রার্থী শাহেদা মোরশেদের সমর্থকেরা কেন্দ্রের পেছনে নাজিমুদ্দিন রোডের দিকে উপস্থিত হন। তাঁরা কেন্দ্রের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এ সময় আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থীদের দিকে বিএনপির সমর্থকেরা ঢিল ছুড়লে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দুই পক্ষের মধ্যে ঢিল ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। দুজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় নিয়ে যেতে দেখা যায়। এ সময় আটটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। কেন্দ্রে তখন ভোটারদের বড় একটি লাইন ছিল। ভোটাররা দিগি¦দিক ছুটে যান। ভোট গ্রহণ কিছুক্ষণ বন্ধ ছিল। 
শেষ ঘণ্টায়ও ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা 
বিভিন্ন স্থানে ভোটাররা কেন্দ্রে ঢুকতে পারছেন না বলে ভোটের শেষ ঘণ্টায়ও ইসির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমন্বয় মনিটরিং সেলে অভিযোগ করেন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা। জানানো হয়, ভোটাররা কেন্দ্রের সামনে আসার পর তাদের আর ভেতরে যেতে দেয়া হচ্ছে না। অনেককেই ফিরিয়ে দেয়া হয়। 
ধর্ষণের হুমকি দিয়ে নারী এজেন্টদের বের করে দিলো আ.লীগ কর্মীরা!
দারুসসালাম থানার ৯নং ওয়ার্ডে ধর্ষণের হুমকি দিয়ে জাতীয় পার্টির ১২ নারী পোলিং এজেন্টকে বের করে দেয়া হয়। ভোটের দিন সকাল সাড়ে ৮টায় বাঘবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আসমা বিদ্যানিকেতন ও সিদ্ধার্থ হাইস্কুল কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। 
জাতীয় পার্টির সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আলমাস উদ্দীন (ঝুড়ি মার্কা) বলেন, সকাল ৮টায় আমার পোলিং এজেন্টরা বাঘবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আসমা বিদ্যানিকেতন ও সিদ্ধান্ত হাইস্কুল কেন্দ্রে প্রবেশ করেন। সাড়ে ৮টায় এই তিন কেন্দ্র থেকে আমার ১২ জন নারী পোলিং এজেন্টকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর লোকজন ধর্ষণের হুমকি দিয়ে কেন্দ্র ছাড়ার নির্দেশ দেয়।
ধর্ষণের হুমকি পেয়ে নারী এজেন্টরা কেন্দ্র থেকে বের হয়ে আসে বলে জানান তিনি। আলমাস উদ্দীন অভিযোগ করেন, ঘটনাটি সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত প্রিজাইডিং অফিসার, পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেননি।
সিদ্ধার্থ হাইস্কুল কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্ট মোঃ ইব্রাহিম মোল্লাকে মারধর করে মাঠের মাঝখানে কাপড়-চোপড় ছিঁড়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এছাড়া তার স্ত্রীকে একটি খালি কক্ষে আটকে রেখে ধর্ষণের হুমকি দিয়ে একঘণ্টা পর কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয় বলে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। 
ইভিএমে বিভ্রাট বিড়ম্বনা
শুরু থেকেই ইভিএমের বিরোধিতা করে এসেছে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো। কিন্তু ইসি এতে অটল থাকলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই ভোট দিতে গিয়ে ইভিএম বিড়ম্বনায় পড়েন। তার আঙ্গুলের ছাপ না মেলায় তাকে বিকল্প উপায়ে ভোট দিতে হয়েছে। একইভাবে বিড়ম্বনায় পড়েন ড. কামাল হোসেন, জাতীয় পার্টির প্রার্থী হাজী সাইফুদ্দিন মিলন। বিড়ম্বনায় পড়েন সাধারণ ভোটাররাও।
আঙ্গুলের ছাপ না মেলায় বেশ বিড়ম্বনায় পড়েন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন। পরে সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তার সহায়তায় ভোট দেন তিনি। সকালে উত্তরার আইইএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে যান সিইসি কে এম নূরুল হুদা। দুবার যাচাই করেও আঙ্গুলের ছাপ না মেলায় ভোটার নম্বর ব্যবহার করা হয়। 
ইভিএম নিয়ে অসন্তুষ্টির কথা জানিয়ে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল বলেছেন, “জনগণ ইভিএমের ওপর কোনো আস্থা রাখতে পারছে না। তারা ভাবছে এটা দিয়ে কোনো লাভ হবে না। এজন্য ভোটাদের উপস্থিতি দেখে আমি হতাশ। এতে আমি মোটেও সন্তুষ্ট নই।”
ভোট শেষে ইসিতে ইভিএম বিতর্ক তুলে বিএনপি নেতা আমীর খসরু বলেন, ‘ইভিএম নিয়ে বিতর্ক এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে, কেউ আর ভোট দিতে আসছেন না। পুরো নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর অনাস্থা সৃষ্টি করতে ইভিএম একটি বড় ভূমিকা রাখছে। সেটা আজ প্রমাণ হয়েছে যে এক শতাংশ ভোট দেওয়ার ক্ষমতা প্রিজাইডিং অফিসারের রয়েছে। যাদের আঙুলের ছাপ মিলবে না তাদের ভোট দেওয়ানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে প্রিজাইডিং অফিসারকে। কিন্তু, সেটি আজ খুলে দেওয়া হয়েছে। ইভিএম ব্যবহারের পেছনে একটি অসৎ উদ্দেশ্য ছিল, সেটি আজ প্রমাণ হয়েছে।’ খসরু আরও বলেন, ‘পাড়া-মহল্লায় সন্ত্রাসীরা ভয় দেখিয়েছে। অনেক কেন্দ্রে দেখা গেছে, ইভিএম মেশিনে ধানের শীষের প্রতীকই পাওয়া যায়নি। অনেক ইভিএম নষ্ট। যেখানে ইভিএম কাজ করেছে সেখানে ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ ভোট পড়েছে। আর যেখানে ইভিএম কাজ করেনি সেখানে বেশি। আমাদের দুই প্রার্থী শুক্রবার থেকে শত শত অভিযোগ করেছেন, কোনও অভিযোগের প্রতিকার পাননি তারা।’
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ প্রকাশিত)



..........