শনিবার, ২৯-ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০১:৩৫ পূর্বাহ্ন

সীমান্তে বাড়ছে হত্যা, চুক্তি মানছে না ভারত

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০৯:৩২ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ছবিটি ছিলো আজ থেকে ৯ বছর আগে ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারির। সীমান্তের কাঁটাতারে উল্টো হয়ে ঝুলছে কিশোরী ফেলানী! অদূরে দাঁড়িয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দুই সদস্য। নয়াদিল্লীতে গৃহকর্মীর কাজ করা ফেলানী সেদিন তার বাবার সঙ্গে বাংলাদেশে ফিরছিল। অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করার সময়, ফেলানীর পোশাক কাঁটাতারের বেড়ায় জড়িয়ে যায়। আতঙ্কিত হয়ে সে চিৎকার শুরু করে। ভারতের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী (বিএসএফ) সেই চিৎকারের জবাব দেয় তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে। সেখানেই ফেলানী মারা যায়। মধ্যযুগীয় কায়দায় তার প্রাণহীন দেহটি প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে উল্টোভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হয় ফেলানীর ঝুলন্ত দেহের ছবি। ফেলানী হত্যাকাণ্ডে গোটা দেশজুড়ে তীব্র জনরোষের সৃষ্টি হয়েছিলো। ভারতীয় মানবাধিকার কর্মীরাও এই হত্যাকাণ্ডে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিলেন। ফেলানী হত্যায় দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও ন্যায় বিচারের দাবি থাকলেও প্রধান আসামি বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ এবং তার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিএসএফের নিজস্ব আদালত জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে নির্দোষ প্রমাণিত হন। রায় পুনর্বিবেচনা করেও একই আদালত সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। ফেলানীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নির্দেশও আমলে নেওয়া হয়নি।  তোলপাড় সৃষ্টি করলেও ফেলানীর ছবি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বর্বরতার চিত্রে বদল ঘটাতে পারেনি। গত এক দশকে বিএসএফের বন্দুকের নিশানায় পরিণত হয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, রাজশাহী, লালমনিরহাট সীমান্তের কয়েকশো মানুষ। বরং ক্রমবর্ধমানহারে সীমান্তে বেসামরিক নাগরিক হত্যার ঘটনা বাংলাদেশের জন্য একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সা¤প্রতিক সময়ে এই হত্যার প্রবণতা অতীতের সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। ফেলানী খাতুনের বীভৎস হত্যার নবম বর্ষপূর্তির ঠিক একদিন পরই চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে দুই বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে বিএসএফ। চলতি বছরের প্রথম ২৫ দিনেই এ সংখ্যা ১০ জনে পৌঁছে গেছে। এরমধ্যে শুধুমাত্র এক সপ্তাহেই বাংলাদেশ সীমান্তে সাত জনকে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
এক দশকে সাড়ে তিন’শ জনকে হত্যা
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে ২০১৯ সালে সীমান্তে ৪৩ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৭ জনকেই গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। বিএসএফের নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছেন ছয় জন। আহত হয়েছেন আরো ৪৮ জন। অপহৃত হয়েছেন ৩৪ জন। ২০১৮ সালে নিহত হয়েছেন ১৪ জন। ২০১৭ সালে ২৪ জন। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ১০ বছরে সীমান্তে বিএসএফের হাতে ২৯৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এরমধ্যে ২০০৯ সালে ৬৬ জন, ২০১০ সালে ৫৫, ২০১১ সালে ২৪, ২০১২ সালে ২৪, ২০১৩ সালে ১৮, ২০১৪ সালে ২৪, ২০১৫ সালে ৩৮, ২০১৬ সালে ২৫, ২০১৭ সালে ১৭ এবং ২০১৮ সালে তিন জন হত্যার শিকার হয়েছেন। বিজিবি বলছে, ২০১৯ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৩৫ জন বাংলাদেশি। তবে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে বলা হয়- ২০১৯ সালে সীমান্তে ৩৭ জনকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাদের হিসাবে ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ১৪ জনের। যদিও সরকারি পরিসংখ্যানে ২০১৮ সালে সীমান্ত হত্যার সংখ্যা বলা হয়েছে তিন জন। তবে সরকারি-বেসরকারি সব পরিসংখ্যানেই গত চার বছরের মধ্যে ২০১৯ সালেই সীমান্তে হত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি।
বছরের প্রথম ২৩ দিনে নিহত ১০ 
চলতি বছরের প্রথম ২৩ দিনেই সীমান্তে বিএসএফের হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন ১০ বাংলাদেশি নাগরিক। এর মধ্যে গত ২২ ও ২৩ জানুয়ারি পরপর দুই দিনে ছয়জনকে হত্যা করেছে বিএসএফ। নওগাঁ ও যশোর সীমান্তে চারজন, লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দইখাওয়া এলাকায় বনচৌকি সীমান্তে দু’জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে দু’জন এবং ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে একজনকে হত্যা করেছে বিএসএফ। সর্বশেষ গত ২৩ জানুয়ারি নওগাঁ ও যশোর সীমান্তে চার বাংলাদেশি নিহত হন। তাদের মধ্যে তিনজন নিহত হয়েছেন বিএসএফের গুলিতে এবং একজন নির্যাতনে। নির্যাতনে নিহত হানেফ আলী জোয়ার্দার (৩২) যশোরের বন্যাবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় বিএসএফের হাতে ধরা পড়েন। এসময় বিএসএফ সদস্যরা বাংলাদেশি ওই যুবককে নির্যাতন করলে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে তাকে বনগাঁ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। হানেফ আলীর চাচা শহিদুল ইসলাম জানান, হানেফ তার স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে ২০ জানুয়ারি বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এরপর অবৈধভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মধ্যমগ্রামে মামার বাড়িতে যান। ২২ জানুয়ারি সকালে তিনি সেখান থেকে বাড়ি ফেরার পথে বিএসএফের হাতে ধরা পড়েন। বিএসএফের নির্যাতনে তার মৃত্যু ঘটে। 
অথচ বিজিবি কর্মকর্তারা বলছেন, কেউ ভুলবশত বা অবৈধভাবে ভারতের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়লে, বাংলাদেশ-ভারত চুক্তি অনুযায়ী তাকে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করার কথা। কিন্তু বিএসএফ সে অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণ না করে বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর গুলিবর্ষণ করছে। সীমান্তে এই হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।  বিভিন্ন সময়ে বিজিবি ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের শীর্ষ পর্যায়ের সম্মেলনে সীমান্তে নন-লিথ্যাল উইপন বা প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার ব্যাপারে সদিচ্ছার কথাও বলেন নীতিনির্ধারকরা। এমনকি উভয় দেশের মধ্যে রাজনৈতিক পর্যায়ের আলোচনায়ও সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে প্রতিশ্রæতি দিয়েছিল ভারত। কিন্তু বাস্তবে এসবের কোনো প্রতিফলনই ঘটেনি। বরং দিনকে দিন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করা হয়েছিল। যেখানে সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনায় প্রাণঘাতি অস্ত্রের ব্যবহার না করার ব্যাপারে উভয় দেশ একমত হয়। কিন্তু, ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা অহরহ এই চুক্তি লঙ্ঘন করে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা করে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে উভয় দেশের মধ্যে দ্রæত রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হওয়া দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্ত হত্যার ঘটনা মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বের যে সম্পর্ক, তা অব্যাহত রাখতে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে হবে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক যে সম্পর্ক, তার প্রতিফলন যাতে মাঠ পর্যায়ে বিএসএফের সদস্যদের আচরণে পড়ে, সেটা নিশ্চিত করা জরুরি। বিজিবি কর্তৃপক্ষ বলছে, সীমান্তে হত্যার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তারা উদ্বিগ্ন। এসব হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে বিএসএফের বক্তব্যও গ্রহণযোগ্য মনে করছে না তারা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সীমান্তে সাম্প্রতিক একের পর এক হত্যাকাণ্ড বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরই মধ্যে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারের কাছে এ নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। বিজিবি-বিএসএফের বৈঠকেও সীমান্ত হত্যার প্রসঙ্গটি গুরুত্ব দিয়ে উত্থাপন করা হয়েছে। ভারত বারবার বলেছে, তারা সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করছে না। কিন্তু পরিস্থিতি যা দেখা যাচ্ছে, তাতে তাদের এই বক্তব্য অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনে করছেন। তিনি জানিয়েছেন, সীমান্তে হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশ উদ্বিগ্ন এবং অবশ্যই এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আরও দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হবে। 
তবে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ও খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের সাম্প্রতিক মন্তব্যে বিভিন্নমহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, ভারতে অনুপ্রবেশ করে গরু আনতে গিয়ে গুলিতে কেউ নিহত হলে সরকার কোনো দায়িত্ব নেবে না। আমাদের চরিত্র ভালো না হলে পরের দোষ দিয়ে লাভ নেই। খাদ্যমন্ত্রীর এমন মন্তব্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নাগরিকরা। মন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে বিএসএফের পক্ষে সাফাই গাওয়ায় ক্ষোভ আর নিন্দায় ভাসছে ফেসবুক। মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন মনে করেন, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, কোনভাবেই সীমান্তে গুলি চালিয়ে হত্যার বিষয়টি আইন অনুযায়ী একেবারেই যুক্তিসংগত নয়। খাদ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, দায়িত্বশীল পদে থেকে যদি এ ধরনের বক্তব্য দেয়া হয়, তখন ধরেই নিতে হয় যে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতার দিক রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলছেন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড অনিয়মিত ঘটনা। এতে ভারতের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না। বর্ডারে যেটা (হত্যাকাণ্ড) সেটা অনিয়মিত মাঝে মাঝে হচ্ছে। কখনও দুই পক্ষের মিটিং হচ্ছে তারা সমাধান করার চেষ্টা করছে। এর সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের কোন সম্পর্ক নাই। খাদ্যমন্ত্রীর পর এই বেফাঁস মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিও। বাণিজ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য সীমান্তে হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তারা বলছেন, যখন সীমান্তে উদ্বেগজনকহারে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা করা হচ্ছে; ঠিক সেই মুহূর্তে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজন মন্ত্রীর এ ধরনের বক্তব্য প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। সীমান্তে একজন নাগরিককে অবৈধ প্রবেশের কারণে হত্যা করা হলে সেটিও অপরাধ। অবৈধ অনুপ্রবেশের শাস্তি কী, সে ব্যাপারে আইন এবং দুদেশের চুক্তিতে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে। অথচ একজন মন্ত্রী দায়িত্বশীল পদে থেকে এমন কথা বলছেন, যা তিনি কোনোভাবেই বলতে পারেন না। সীমান্তে মানুষ হত্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনায় এসেছে। বিরোধী দল বিএনপি পর পর কয়েকটি ঘটনার ব্যাপারে নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানিয়েছে। 
বিজিবির সাবেক মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব.) মইনুল ইসলাম বলেছেন, সীমান্তে কোনো নাগরিককে হত্যার অধিকার কারও নেই। এটা মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামাতে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে। দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় কথা ছিল সীমান্তে প্রাণঘাতী নয়- এমন অস্ত্র ব্যবহার করা হবে। এই প্রতিশ্রæতি যাতে রক্ষা করা হয় সেটি নিয়মিত ফলোআপ করা দরকার। দেশ পাহারা একটি চ্যালেঞ্জের বিষয়। দেশপ্রেম নিয়েই সেটা করে যেতে হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ মনে করেন, কেন সীমান্ত হত্যা বাড়ছে সেটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রেক্ষাপট থেকে দেখতে হবে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করা দরকার। যদি তারা বে আইনিভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে তাহলে কেন করছে, সেই কারণ খুঁজতে হবে। সীমান্ত হত্যা বন্ধে উভয় দেশের মধ্যে যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রæতি রয়েছে, তা কেন মাঠ পর্যায়ে মানা হচ্ছে না, তার পেছনে কী ধরনের অনুঘটক রয়েছে বাংলাদেশ-ভারতকে তার কারণ বের করতে হবে। এরপর দুই দেশের মধ্যে মতবিনিময় করে যৌথ ব্যবস্থাপত্র প্রণয়ন করা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, হঠাৎ করেই সীমান্ত হত্যার ঘটনা বেড়েছে। এটা উদ্বেগের বিষয়। দুই দেশের মধ্যে যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে সেই বার্তা আমলে নিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী যথাযথ আচরণ করছে না। তাদের বুঝতে হবে সীমান্তে কোনো যুদ্ধাবস্থা নেই। এমন অবস্থায় গুলি করা কোনো সমাধান হতে পারে না। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের এ বিষয়টি গভীরভাবে ভাবা উচিত।
বিজিবির অপারেশন বিভাগের পরিচালক লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, যখনই সীমান্তে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে তখনই আমরা জোরালো প্রতিবাদ জানাচ্ছি। সীমান্ত হত্যা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনেরও লঙ্ঘন। বিএসএফের দাবি- আত্মরক্ষার্থে তারা গুলি করছে। এ ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়।
মহিউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, আমরা বলছি, যদি অজ্ঞতাবশত, ভুল করে বা অবৈধভাবে কোনো নাগরিক সীমান্ত অতিক্রম করে তাহলে চুক্তি অনুযায়ী তাদের বিজিবি অথবা স্থানীয় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করার কথা। সেটা না করে তারা সীমান্তে হত্যা করছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সভা, সম্মেলন ও সরকারি পর্যায়ের বৈঠকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রæতি দিয়েছিল সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে। নন-লিথ্যাল উইপন ব্যবহারের কথাও বলেছে। তারপরও দেখা যাচ্ছে, সীমান্তে বিএসএফ গুলি ছুড়ছে। এতে আমাদের নাগরিকরা হতাহত হচ্ছেন। এ ধরনের ঘটনার প্রতিবাদ আমরা আগেও জানিয়েছি, এখনও জানাচ্ছি। পাশাপাশি সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছি। আমাদের জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে যাতে অবৈধভাবে তারা সীমান্ত না পেরোয়।
লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ আরও বলেছেন, হঠাৎ করে সীমান্ত হত্যা বেড়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ আমাদের জানা নেই। বিষয়টি বিশ্লেষণ হচ্ছে। আলোচনা হচ্ছে। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি, যাতে সীমান্ত হত্যা কমে আসে। এটি ভারতীয় কর্তৃপক্ষকেও জানানো হচ্ছে। সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদে বিজিবি সদর দপ্তর থেকে প্রতিবাদ পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া যারা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে তাদের শনাক্ত করেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়; যাতে ভবিষ্যতে তারা সীমান্ত অতিক্রম না করে। সংবাদ মাধ্যমকে সীমান্তে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি বক্তব্য দিয়েছেন বিএসএফের দক্ষিণবঙ্গ সীমান্ত অঞ্চলের ইন্সপেক্টর জেনারেল ওয়াই বি খুরানিয়া। সেখানে তিনি বলেছেন, বাহিনীর সদস্যদের পরিষ্কার নির্দেশ দেওয়া আছে- শুধু আত্মরক্ষার্থেই বল প্রয়োগ করা যাবে, আর সেটাও যতটা সম্ভব কম করেই করতে হবে। এর জন্য দক্ষিণবঙ্গ সীমান্তে অনেক পাম্প অ্যাকশন গান ব্যবহার করা হয়, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী নয়।
সীমান্তে কেন এই হত্যা
শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকার কর্মী সি আর আবরার এক নিবন্ধে লিখেছেন, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যার প্রধান কারণ বিএসএফের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ। দুই দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো ঘনবসতিপূর্ণ। উভয় দেশের বহু মানুষ নদী ভাঙনের কারণে খেত-খামার ও জীবিকা হারিয়েছে। তারা আন্তঃসীমান্ত গবাদি পশু ও পণ্য পাচারের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। অনেক ক্ষেত্রে, চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে অনেককে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয় বা হত্যা করা হয়। পণ্য পাচারের জন্য শিশুদেরও ব্যবহার করা হয়। কারণ, তাদের ধরা পড়ার আশঙ্কা কম থাকে। তবে তারাও সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মতে, বিএসএফ আত্মরক্ষার জন্য হত্যা করে। কিন্তু, বাস্তবতা তা বলে না। বেশ কয়েক বছর আগে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাবিøউ) ‘ট্রিগার হ্যাপি’ নামে একটি প্রতিবেদনে এ ধরনের বেশ কয়েকটি মামলার উল্লেখ করেছে। যাতে বেঁচে যাওয়া এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন যে, বিএসএফ তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা না করে বা সতর্ক না করেই নির্বিচারে গুলি চালায়। তবে বিএসএফ দাবি করেছে দুর্বৃত্তরা গ্রেফতার এড়ানোর চেষ্টা করলে তাদের সদস্যরা গুলি চালায়। তবে কোনো অপরাধের সন্দেহে প্রাণঘাতি অস্ত্রের ব্যবহার ন্যায়সঙ্গত হয় না। নির্যাতনের ঘটনাগুলোর মধ্যে শিশু নির্যাতনের ঘটনাও আছে। ২০১৯ সালের ১০ মে সাতক্ষীরার কুশখালী সীমান্তে বিএসএফের হাতে নির্যাতনের শিকার হন কবিরুল ইসলাম। তার মুখ এবং পায়ুপথে পেট্রল দেওয়া হয়েছিলে। এর ১৭ দিন পর ২৭ মে নওগাঁর শাপার সীমান্তে আজিমুদ্দিন নামের এক যুবককে আটকের পর তার দুই হাতের ১০টি আঙুলের নখ তুলে ফেলে রাইফেলের হাতল ও লাঠি দিয়ে বর্বর নির্যাতন করা হয়। পরে বিএসএফের সঙ্গে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ওইদিনই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনে বিজিবি। এইচআরডাবিøউ, অধিকার ও আসকের প্রতিবেদন এবং সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে অপরাধী হিসেবে সীমান্তে হত্যার শিকার ব্যক্তিরা হয় নিরস্ত্র থাকে অথবা তাদের কাছে বড়জোর কাস্তে, লাঠি বা ছুরি থাকে। এমন ব্যক্তিদের মোকাবিলায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক শক্তি ব্যবহার করে ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীদের পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে পিঠে গুলি করা হয়েছিল। এইচআরডাবিøউ আরও উল্লেখ করেছে, তদন্ত করা মামলার কোনোটিতেই বিএসএফ প্রমাণ করতে পারেনি যে হত্যার শিকার ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্র বা বিস্ফোরক পাওয়া গেছে; যার দ্বারা তাদের প্রাণ সংশয় বা গুরুতর আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। সুতরাং, বিএসএফের মেরে ফেলার জন্য গুলি চালানোর দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে মানুষের জীবনের অধিকার লঙ্ঘন করে। যা ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের বেআইনিভাবে হত্যায় বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়টি নয়াদিল্লিতে খুবই কম গুরুত্ব পেয়েছে। এখনও পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশিকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্যের বিবরণ বাংলাদেশকে দেয়নি ভারত। ভারত সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট অনুমোদন না থাকলে অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি বিএসএফকেও ফৌজদারি কার্যবিধির বাইরে রাখা হয়। বিএসএফ সদস্যদের এমন জবাবদিহিতার বাইরে থাকাই সীমান্ত হত্যার ঘটনাগুলোকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সাধারণত ভালো প্রতিবেশী দেশ হিসেবে সীমান্তে চলাচলকারীদের সঙ্গে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আচরণ করার কথা। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত সরকারের এটা নিশ্চিত করা উচিত যে তার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রতি সম্মান করছে এবং আইনের শাসন অনুসরণ করছে। বিএসএফ এবং অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে জাতিসংঘের সাধারণ নীতিমালা মেনে চলার জন্য প্রকাশ্যে আদেশ দেওয়া উচিত। বিএসএফের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থা এখনও পর্যন্ত তার সদস্যদের বিচার করতে পারেনি। ভারত সরকার বেসামরিক কর্তৃপক্ষকে নির্যাতনের মামলাগুলো তদন্তের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর উচিত একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের জন্য দাবি তোলা। সেখানে এ জাতীয় ঘটনার জন্য ভারত ও বাংলাদেশ উভয়েই অভিযোগ জমা দিতে পারবে। প্রয়োজনীয় প্রমাণও জমা দেবে উভয় পক্ষ। এই কমিশনটি হবে স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ। বছরের পর বছর ধরে সীমান্তে হত্যা বন্ধ করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কোনো অর্থবহ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়া বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে চাপ বাড়িয়ে বাংলাদেশ সরকারকে একটি কঠিন পরিস্থিতিতে নিয়ে এসেছে। এধরনের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্তে আসার জন্য এখনই নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকদের পদক্ষেপ নেয়ার সময়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলছেন, সীমান্তে হত্যার বিষয়টি এক বছরে প্রচুর বেড়েছে। সীমান্ত রক্ষী বাহিনীরা সীমান্ত পার করছেন এমন কাউকে দেখলেই গুলি করে ফেলছে। এটি বদলাতে হবে। দুই দেশের সীমান্তে অভিন্ন পাড়া রয়েছে। যেখানকার মানুষরা একে পাড়া হিসেবেই দেখে এবং ভারতের বাসিন্দারা বাংলাদেশে আসে আবার বাংলাদেশিরা ভারতে যায়। আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করা ছাড়াও জীবিকার সন্ধানেও মানুষ সীমান্ত পারাপার হয়ে থাকে। দু’ দেশেরই আইন অনুযায়ী, এসব মানুষদের গ্রেফতার ও বিচার করার কথা। দু’দেশের সরকারি বাহিনীই যদি এটি মেনে চলেন তাহলে দেখা মাত্রই গুলি করার কথা না। কিন্তু সেটা হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনাকে মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘন বলেও উল্লেখ করেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক। বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ এর চেয়ারম্যান এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলছেন, আমরা ভারতীয়দের গুলি করি না, কিন্তু তারা(বিএসএফ) বাংলাদেশিদের মারে। বিশ্বের প্রায় সব খানেই অভিন্ন সীমান্তের দেশগুলোতে মানুষ আসা-যাওয়া করে। কিন্তু তাই বলে তাদের মেরে ফেলাটা সমাধান নয় বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত বছরের অক্টোবরে রাজশাহী জেলায় পদ্মা নদীতে বিজিবি এবং বিএসএফের মধ্যে গোলাগুলিতে বিএসএফের একজন সদস্য নিহত হয়েছিল। সেই ঘটনার পর সীমান্তে বিএসএফের পক্ষ থেকে গুলি চালানোর ঘটনা বেড়েছে কিনা, এমন প্রশ্নও তুলছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তবে ভারত এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ঋণ চুক্তি হয়, ডজন ডজন সমঝোতা স্বাক্ষর হয়, এক দেশ আরেক দেশের কতটা কাছের তা নিয়ে দুই সরকারের প্রশংসার বিনিময় চলে।  সীমান্ত হত্যাই শুধু বন্ধ হয় না।  দুই দেশের সরকারই এই বিষয়ে অবাক করা নীরবতা আর নিষ্ঠুর উদাসীনতার পথ বেছে নিয়েছে যেন। নাগরিকের জীবনকে পাশ কাটিয়ে এই উষ্ণতা প্রদর্শনের প্রচেষ্টা কি দিনকে দিন মেকি হয়ে যাচ্ছে না? আপাত বন্ধু রাষ্ট্রের সঙ্গে সীমান্তে এমন যুদ্ধ পরিস্থিতির পরিসংখ্যান মানুষের মনে যে ক্ষতের জন্ম দিচ্ছে তা কোনো দেশের জন্যই মঙ্গল নয়।  দুই দেশের সরকারের এই বোধ জাগ্রত হোক ঠিক এখনই, আর একটিও প্রাণ ঝরবার আগেই। এক্ষেত্রে ভারতে যৌক্তিক আচরণ যেমন কাম্য, তেমনি এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশের সরকারেরও উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। কেন সীমান্তের মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চোরাকারবারের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তার আর্থ সামাজিক কারণটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। 
বাংলাদেশ ছাড়া ভারতের পাঁচ সীমান্তে হত্যাকাণ্ড শূন্য
ভারতের সাথে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, চীন, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমারসহ ছয়টি দেশের স্থল সীমান্ত রয়েছে। সমুদ্র সীমান্ত রয়েছে শ্রীলঙ্কার সাথে। এই সবগুলো দেশের সীমান্তেই ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ মোতায়েন রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দেশের সীমান্তে হত্যাকাণ্ড একেবারেই শূন্য। তবে ২০১৭ সালের ৯ মার্চ ভারত- নেপাল সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে গোবিন্দ গৌতম নামে এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় নেপালের জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পাওয়া ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুঃখ প্রকাশ এবং নিহতের পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন। পরে গোবিন্দ গৌতমকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া হয়। অথচ বাংলাদেশ সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বেড়েই চলছে। মানবাধিকারকর্মী ও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সীমান্তে নাগরিকদের মৃত্যুতে সরকারের পক্ষ থেকে যতটা জোরালো প্রতিবাদ জানানোর রেওয়াজ ছিল, এখন সেটি ততটা জোরালো নয়। অনেকে হয়রানির ভয়ে বিএসএফের নির্যাতনের কথা স্বীকারও করছেন না।
সীমান্তে হত্যার বিষয়ে ভারত কী বলছে?
ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ বলছে, রাজশাহী সীমান্তে বিজিবির গুলিতে তাদের যে সদস্য নিহত হয়েছিলেন তার প্রতিশোধ নেয়ার প্রশ্নই নেই। এরপর থেকে বিএসএফের গুলিতে কয়েকজন নিহত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেগুলির সঙ্গে ওই ঘটনার কোনও সম্পর্ক নেই। বিএসএফের দক্ষিণবঙ্গ সীমান্ত অঞ্চলের ইন্সপেক্টর জেনারেল ওয়াই বি খুরানিয়া সীমান্তে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে বলেছেন, ওই ঘটনাটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আমরা দুই বাহিনীই ঘটনার তদন্ত করেছি এবং কেন, কীভাবে ওই ঘটনা হয়েছিল আর ভবিষ্যতে যাতে এধরনের ঘটনা এড়ানো যায়, তার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। বাহিনীর সদস্যদের পরিষ্কার নির্দেশ দেওয়া আছে যে শুধুমাত্র আত্মরক্ষার্থেই বলপ্রয়োগ করা যাবে, আর সেটিও যতটা সম্ভব কম বলপ্রয়োগ করেই করতে হবে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ প্রকাশিত)