বৃহস্পতিবার, ০২-এপ্রিল ২০২০, ১১:১০ অপরাহ্ন

সাবেক সচিবদের থিংক ট্যাংক বৈঠক, নানা আলোচনা

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০৭:৫১ অপরাহ্ন


সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের আমন্ত্রণে অবসরপ্রাপ্ত ৪২ জন সচিবের সাম্প্রতিক এক বৈঠক নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগমুহূর্তে গত ২৭ জানুয়ারি সাবেক আমলাদের আকস্মিক ওই বৈঠক নিয়ে বিভিন্নমহলে নানা আলোচনা সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সাবেক ও বর্তমান আমলাদের অনেকে ওই বৈঠকের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। যদিও প্রথম দফায় এদিন ৪২ জন উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাবেক সচিবদের একটি বড় অংশের সমর্থন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বলা হচ্ছে, দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের আলোকে সাবেক সচিবদের ‘থিংক ট্যাংক’ হিসেবে কাজে লাগাতে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠনই এই বৈঠকের উদ্দেশ্য বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু সেই প্ল্যাটফর্ম ‘জনতার মঞ্চের আদলে হবে, না উত্তরের ষড়যন্ত্রের চরিত্র পাবে’ এমন প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান বদিউর রহমান। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, আমলাদের অনেকে সবসময় কোনো না কোনো ‘ফরমেটে’ ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চায়। এখানেও সে রকম গোপন কোনো এজেন্ডা রয়েছে কি না তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অবসরপ্রাপ্ত এই আমলা।
২৭ জানুয়ারির ওই বৈঠক থেকে সাবেক সচিব নজরুল ইসলামকে আহ্বায়ক ও হেদায়েতুল্লাহ আল মামুনকে সদস্য সচিব করে ১৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ও সংগঠনের গঠনতন্ত্রের খসড়া প্রণয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের আরেকটি উপকমিটিও করা হয়েছে। গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত হলে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে একটি সাধারণ সভার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে। ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ফরমার সেক্রেটারি’ বা ‘ফরমার সেক্রেটারি ফোরাম’ নামে প্রস্তাবিত এই সংগঠনে অন্তত পাঁচশ’ জন অবসরপ্রাপ্ত সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করতে চান উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, এই সংগঠন হবে অরাজনৈতিক, সেবা ও গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান। যাতে দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান অবসরপ্রাপ্ত সচিবরা দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারেন।
তবে উদ্যোক্তারা যতই এই সংগঠনকে অরাজনৈতিক বা নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম বলে দাবি করুন না কেন, এটি যে কোনো নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম নয় এবং বিশেষ উদ্দেশ্যেই এটি করা হচ্ছে প্রাথমিক কর্মকাণ্ডেই তা স্পষ্ট বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তারা বলছেন, সাবেক আমলাদের এ ধরনের সংগঠনের উদ্দেশ্য হতে পারে সরকার বা প্রশাসনের বিভিন্ন কাজে ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করা। এই সংগঠন নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা করতে সাবেক সচিবদের আমন্ত্রণ জানিয়ে দুদক চেয়ারম্যানের দেয়া চিঠি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, প্রথমত, দুদক চেয়ারম্যানের এ ধরনের চিঠি দেওয়া অনৈতিক। দ্বিতীয়ত, তারা সব সাবেক সচিবকে আমন্ত্রণ জানাননি। ফলে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যে এই সভা করা হয়েছে, তা পরিষ্কার। এছাড়া প্রথমসারির অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের অনেককেই এ বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। সরকার সমর্থক হিসেবে যাদের পরিচিতি রয়েছে, তাদেরও অনেককে দেখা যায়নি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটিতে। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ডামাঢোলোর মধ্যে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে আমন্ত্রণ পাননি এমন কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সচিব বলেছেন, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রাক্কালে এ ধরনের বৈঠক, সাদা কাগজে দুদক চেয়ারম্যানের আমন্ত্রণ এবং একই আদর্শে বিশ্বাসী সব সচিবকে এক হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তারা বলেছেন, যারা সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন, তারাই ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। আরো খোলাসা করে বললে, ৪২ সাবেক সচিবের উদ্যোগে সম্ভাব্য থিংক ট্যাংকটি কার্যত একই রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসীদের মধ্যেও যারা সরকারের বিশেষ আনুকূল্য পেয়েছেন, তাদের থিংক ট্যাংক। অথচ এমন পক্ষপাতমূলক একটি উদ্যোগের সঙ্গে দুদকের মতো একটি সংবিধিবদ্ধ, সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের প্রধান আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়েছেন। একটি আধা সাংবিধানিক সংস্থার প্রধান হিসেবে এ ধরনের সংগঠন গড়ার উদ্যোগ নেয়া নৈতিকভাবে আদৌ যৌক্তিক হয়েছে কি না সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। দুদক চেয়ারম্যান এই সংগঠন গড়তে বৈঠক ডেকেছেন এটি এ কারণেই উদ্বেগের যে, তিনি একটি নিরপেক্ষ জায়গায় রয়েছেন। সেই নিরপেক্ষতা তাকে বজায় রাখতে হবে। তিনি কোনো দলীয় পদে নেই। সংবিধিবদ্ধ পদাধিকারী। বিশেষ করে দুদকে যারা থাকবেন, তারা নিজেদের দলনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি সুরক্ষায় বিশেষভাবে সংবেদনশীল থাকবেন। সেই বিবেচনায় এই বৈঠক ডাকতে দুদক চেয়ারম্যানের চিঠি একটি বিচ্যুতি বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। দেশ ও দশের স্বার্থে সরকারের ‘থিংক ট্যাংক’ হিসেবে কাজ করার আকাক্সক্ষা দুদকের সনদ সমর্থন করে না। যেসব পদধারীদের বিচারপতিদের মতো প্রক্রিয়ায় অপসারণযোগ্য বলে সংসদ আইনের দ্বারা ঘোষণা দিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বিচারকদের জন্য প্রযোজ্য বিধিকেই দুদকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রযোজ্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এতে বলা আছে, ব্যক্তি তার নিজের স্বার্থে তার প্রতিষ্ঠানের সুমহান মর্যাদাকে অবনমিত করবেন না। কমিশন আইনে কমিশনারদের মেয়াদকালের নিশ্চয়তা বিধান করে বলা হয়েছে, “সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারক যেরূপ কারণ ও পদ্ধতিতে অপসারিত হইতে পারেন, সেইরূপ কারণ ও পদ্ধতি ব্যতীত কোন কমিশনারকে অপসারণ করা যাইবে না”। দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার যথাক্রমে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকের সমান মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। আপিল বিভাগের একজন বিচারক যেমন তার পদে থেকে স্বস্বার্থে সংগঠন গড়তে পারেন না, তেমনি দুদক চেয়ারম্যানও পারেন না। শোনা যাচ্ছে দুদক চেয়ারম্যান প্রস্তাবিত সংগঠনটির কোনো পদে থাকছেন না। কিন্তু তিনি সাবেক সচিব হলেও দুদকের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি সংস্থার পদে থেকে এই ধরনের বৈঠক আয়োজন করেছেন যেটি স্বাভাবিক বিষয় নয় বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। 
এছাড়া প্রস্তাবিত ‘থিংক ট্যাংক’ প্রতিষ্ঠানের গঠনতন্ত্রের খসড়া প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদকে। কেবলমাত্র মাসখানেক আগেই তিনি ওই পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। অথচ এরই মধ্যে তিনি নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে হাত দিয়েছেন। আবুল কালাম আজাদকে আওয়ামী লীগ তথা সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন হিসেবে মনে করা হয়। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার একচ্ছত্র প্রভাব ছিলো। বিষয়টি কম- বেশি সকলেই জানেন। যে কারণে চাকরির মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও একাধিকবার তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগেই ছিলেন। কিন্তু এই মেয়াদের পর তাকে আর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে দেখা যায়নি। এটি একটি বড় আলোচনার বিষয়ও ছিলো এবং এতে অনেকে অবাকও হয়েছেন। সরকারের নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতায় সাবেক সচিবদের একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম বা বৈঠক সাদামাটাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তবে এর আগে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০১৮ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রশাসনের তিন শতাধিক সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। সাবেক ওই আমলাদের নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের পদমর্যাদায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। অথচ কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর মতো সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির এই বৈঠকে কোনো ভূমিকা ছিলো না। 
সাবেক সচিবদের এই উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান বদিউর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘বেশির ভাগ আমলা যেহেতু সব সময় নিজেদের স্বার্থকে বড় করে দেখেন, সেহেতু এখানে জনগণের কোনো উপকার হবে বলে আমার মনে হয় না। এছাড়া প্রশাসনে বর্তমানে নিরপেক্ষ আমলা নেই বললেই চলে। যদিও ৫-১০% থাকে, তারা এদের কাছে টিকতেই পারবেন না।’ তিনি বলেছেন, ‘এখন যারা নানা স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গুণগান গাইছেন, তারাও কিন্তু ভোল পাল্টাতে সময় নেবে না। কোনো কারণে প্রধানমন্ত্রী গভীর কোনো সংকটে পড়লে এদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু জীবন দিয়ে সেটি প্রমাণ করে গেছেন।’
বদিউর রহমান বলেছেন, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রত্যেকের আছে। সেক্ষেত্রে সাবেক সচিবরাও একটি প্ল্যাটফর্ম করে তাদের মতপ্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হল- সংগঠনটি কোন ঘরানার হবে। জনতার মঞ্চের আদলে হবে, না উত্তরের ষড়যন্ত্রের চরিত্র পাবে?’ তিনি মনে করেন, ‘সাবেক সচিবরা কোনো মনায় যুক্ত না হয়ে যদি নিরপেক্ষভাবে দেশের স্বার্থে সেবা দিতে চান, তাহলে কোনো প্রশ্ন উঠবে না। সেক্ষেত্রে প্রধান শর্ত হিসেবে সত্যিকারার্থে তাদের সবার আগে নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমলাদের অনেকে সব সময় ক্ষমতায় থাকতে চান। তারা নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখেন। বিশেষ করে নব্বই দশকের পর প্রশাসনে যে দলমনা চরিত্রের আবির্ভাব ঘটেছে, তা থেকে জাতি এখনও মুক্ত হতে পারেনি। মূলত এসব দলমনা সচিব সব সময় কোনো না কোনো ফরমেটে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চান। এখানে সে রকম গোপন এজেন্ডা থাকলে নির্ঘাত তা একসময় কোনো গ্রুপের পকেট কমিটিতে পরিণত হবে। অতঃপর যা হওয়ার তা-ই হবে।’
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, দেশের যে কোনো নাগরিকের এরকম প্ল্যাটফর্ম করার অধিকার আছে। তারা সাবেক সচিব হোন বা অন্য কেউও এটা করতে পারেন। তবে দেশের সাধারণ মানুষের যে প্রত্যাশা থাকবে তাহলো এই প্ল্যাটফর্মকে যেভাবে অরাজনৈতিক বলা হচ্ছে সেরকম সত্যিই যেন এটি দলনিরপেক্ষ হয়। অরাজনৈতিক হয়। তিনি বলেন, যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তারা সহযোগিতা করবেন। এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। দলীয় রাজনীতি বিবেচনায় আনলে এটা ব্যাহত হবে। আমাদের দেশে সাধারণত এরকম উদ্যোগ নেওয়া হয় কিন্তু শেষ পর্যন্ত অরাজনৈতিক থাকে না।
৪২ সচিবের বৈঠক যেভাবে
২৭ জানুয়ারি বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে বৈঠকটি ডাকা হয়। এর আগে এতে উপস্থিত হওয়ার জন্য সাবেক সচিবদের চিঠি দেন ১৯৮১ ব্যাচের সাবেক সিনিয়র সচিব ও দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। খ্রিস্টীয় নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে দেয়া এ চিঠিতে তিনি বলেন, ‘জীবনের এক বড় সময় আপনি দেশ ও জাতির সেবায় নিয়োজিত থেকেছেন। এ সেবা দেওয়ার সময় অর্জন করেছেন বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা, গ্রহণ করেছেন দেশে-বিদেশে নানা প্রশিক্ষণ, প্রত্যক্ষ করেছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাঁকবদল। এ ছাড়া আপনার রয়েছে চমৎকার শিক্ষাগত যোগ্যতার পটভূমি। এসবের মিথস্ক্রিয়ায় আপনি ধীরে ধীরে হয়েছেন ঋদ্ধ, পরিণত ও প্রাজ্ঞ। আপনার অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা দেশের নীতি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও তার ফলাফলকে ত্বরান্বিত করতেও পারে। দেশ ও জাতি এগিয়ে যেতে পারে সবার ইতিবাচক সম্মিলিত প্রয়াসের মধ্য দিয়ে।’ এই সম্মিলিত প্রয়াসের উপায় ও ধরন কী হওয়া উচিত বা সাবেক সচিবদের সমন্বয়ে কোনো একটি প্ল্যাটফর্ম করা যায় কি না, তা আলোচনার জন্য তিনি এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করেন। বৈঠকে ৭৩,৭৭, ৭৯,৮১, ৮২ ও ৮২ (বিশেষ), ৮৪ ব্যাচের অবসরপ্রাপ্ত সচিবদের মধ্যে ইসমাইল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব ১৯৭৯ ব্যাচের মো. আবদুল করিম, ১৯৮১ ব্যাচের এএসএম রশিদুল হাই, কাজী আমিনুল ইসলাম, কাজী আতাহারুল ইসলাম, সদ্যবিদায়ী এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, ১৯৮২ ব্যাচের মিজানুর রহমান, মাহবুব হাসান, ড. খোন্দকার শওকত হোসেন, সেলিনা আফরোজা, মিকাইল শিপার, গোলাম রব্বানী, মঈনুদ্দীন আবদুল্লাহ, নজরুল ইসলাম খান, খন্দকার ইফতেখার আহমেদ, এমএ কাদের সরকার, ১৯৮৪ ব্যাচের ইব্রাহীম হোসেন খান, সোহরাব হোসেন, নাজিমউদ্দিন চৌধুরী, ইশতিয়াক আহমেদ, আবদুল হান্নান, শ্যামসুন্দর সিকদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন সাবেক সচিব শৈলেন্দ্রনাথ মজুমদার।
থিংক ট্যাংক নিয়ে সমালোচনার ঝড়
সাবেক সচিবদের থিংক ট্যাংক গঠনের উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্নমহলে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, নিজেদের অভিজ্ঞতা ও গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করবেন অবসরপ্রাপ্ত উদ্যোক্তারা। কিন্তু অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারের থিংক ট্যাংক লাগবে কেন? সাবেক সচিবরা পুনর্মিলনী করবেন, পিকনিক করবেন, জ্ঞানচর্চা করবেন, সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে থিংক ট্যাংক কেন? নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ঘাটতি পড়লে মন্ত্রণালয় বা সংস্থাগুলোর হাত খোলা। তারা যে কাউকে আউটসোর্সিংয়ের দায়িত্বও দিতে পারে।
সরকারঘনিষ্ঠ সংবাদপত্র দৈনিক সংবাদের এক সম্পাদকীয়তেও সাবেক সচিবদের এই উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। ‘সাবেক আমলাদের দেশসেবার খায়েশের পেছনে রহস্য কী’ শিরোনামে ৩০ জানুয়ারি প্রকাশিত ওই সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, “সাবেক সচিবরা তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা সরকারের কাজে লাগানোর যে উদ্যোগ নিয়েছেন সেটি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রথম কথা হচ্ছে, কর্মরত আমলাদের জ্ঞান বা প্রশিক্ষণে কোন ঘাটতি আছে কি না যে কারণে সাবেক আমলাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সরকারের প্রয়োজন পড়বে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, সাবেক হয়ে যাওয়ার আগে উল্লিখিত আমলারা তাদের শিক্ষা আর প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান কি দেশসেবায় কাজে লাগাননি। নাকি সিন্দুকে পুরে রেখেছিলেন এটা ভেবে যে অবসরের পর অর্জিত জ্ঞান সরকারের সেবায় নিয়োগ করবেন। এতকাল ‘দেশসেবা’ করেও সাবেক আমলাদের মন ভরেনি। বিষয়টি ভেবে আমরা পুলক বোধ করছি। অবশ্য দুর্মুখের বলছেন, নতুন সংগঠনের নামে দলবাজ আমলারা সরকারের কাঁধে বন্দুক রেখে আরেক দফা ফায়দা লুটতে চাচ্ছেন। সাবেক আমলারা জনগণের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার নতুন ফন্দি আঁটছেন কি না সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে আমলাদের এ বৈঠকের পেছনে সরকারের কোন সংশ্লিষ্টতা আছে কি না সেটি আমরা জানতে চাইব। কারণ আমরা জেনেছি যে, উক্ত বৈঠক আহ্বান করেছেন দুদকের বর্তমান চেয়ারম্যান। তিনি এ ধরনের বৈঠক আহ্বান করতে পারেন কি না সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে আমরা দুদক চেয়ারম্যানের বক্তব্য আশা করছি। আবার বৈঠক সম্পর্কে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তথ্য অধিদফতরকে অবহিত করা হয়েছে। এটা দেখে প্রশ্ন উঠেছে যে, সাবেক আমলারা তাদের কর্মকাণ্ডে সরকারকে সম্পৃক্ত করতে চাচ্ছে নাকি সরকার তাদের কাজে সম্পৃক্ত হতে চাচ্ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, দলবাজ সাবেক আমলারা প্রশাসন তথা সরকারের কাজে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ খুঁজছেন। আমরা এ বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই। আমরা মনে করি, সাবেক আমলাদের তথাকথিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা কাজে লাগানোর আরও অনেক পথ রয়েছে। তাদের সরকারি কাজকর্মে যুক্ত করার প্রয়োজন নেই। বর্তমান আমলারা নিরাপদ পানির সন্ধানে উগান্ডা যাচ্ছেন, শিক্ষা আইন ঝুলিয়ে রেখেছেন- এটাই যথেষ্ট। দেশ ও জাতির এহেন সেবায় সাবেকদের আর দরকার নেই।”
জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়েচেভেলের বাংলা বিভাগের এক সংবাদ পর্যালোচনায় সচিবদের থিংক ট্যাংক নিয়ে কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। ২৯ জানুয়ারি প্রকাশিত ওই সংবাদভাষ্যে বলা হয়েছে,‘চাকরির সময়ের আনুগত্য নিশ্চিত করতে অবসরের পরে থিংক ট্যাংকের প্রস্তাব নিয়ে নাড়াচাড়া চলছে। হাতের মুঠোয় রেখে দিতে মাঠ থেকে উঠিয়ে নিয়েও তাই সচিবদের খেলায় রাখতে চায় সরকার।’ ‘যদি আমরা একথা মেনে নেই যে, গত চার দশকের বেশি সময় ধরে এদেশে বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতি হয়েছে। তবে একথাও নিশ্চয়ই মানতে হবে যে, এসব দুর্নীতিতে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন রাজনৈতিক নেতারা আর তা পরিচালনা করেছেন শীর্ষ আমলারা। যারা, মানে যে সচিবরা এই দুর্নীতিযজ্ঞে অংশ নেন নাই তারা তা প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আমরা দুর্নীতির দায়ে রাজনীতিবিদদের, এমনকি সাবেক রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীকে জেল খাটতে দেখেছি, কিন্তু শীর্ষ পর্যায়ের আমলারা থেকে যান ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই। গণমাধ্যমও মাঝে মাঝে মিটার রিডার, সার্ভেয়ার, থানার ওসি বা কোনো উচ্চ মানের সহকারী নিয়ে হাফ ডজন চার তলা বাড়ি বা দুই হালি গাড়ি জাতীয় গা-ছমছমে রিপোর্ট করে এ পর্যন্তই। কারণ কী? একজন সচিবের আয় কি তার ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? দেশের অভিজাত এলাকায় বড়, মাঝারি বা ছোট সচিবদের এত বাড়ি বা এত ফ্ল্যাট কোত্থেকে আসে- কেন সচিবদের স্ত্রী বা পুত্র কন্যারা খুব ব্যবসা সফল হন? কী এমন আলাউদ্দিনের চেরাগ রয়েছে তাদের কাছে?’ ‘এখন দেখা যাক, সরকারি চাকুরেদের, মানে সচিবদের কথিত অভিজ্ঞতা বা জ্ঞানের দরকার কেন পড়লো? আর কোন জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার কথা বলা হচ্ছে আসলে। আমরা চিরকালই দেখে আসছি রাজনীতিবিদেরা, বিশেষ করে সরকার প্রধানের ইশারা আর বচনেই চলেছে দেশ। সেটি বাকশাল, খাল কাটা, পল্লী বন্ধুত্ব, একটি বাড়ি একটি খামার বা ডিজিটাল বাংলাদেশ যা-ই হোক না কেন। কী সাজেশন দিয়েছেন আমলারা দেশ পরিচালনায়, কী অবদান রেখেছেন ন্যায় প্রতিষ্ঠায়?’ ‘দুদক, নির্বাচন কমিশন বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য আর কয়টা পদ? তাই সবাইকে যদি কোনো পদ পদবী দিয়ে রাখা যায়, তবে স্বর্গের সঙ্গে ঠিক বিচ্ছেদটা ঘটে না। চেয়ারটা না থাকলেও ছায়াটা থাকে। সবাই বলতে গিয়ে অবশ্য ঠিক বলা হলো না, আমলারা জানেন কাকে ডাকতে হবে আর কাকে না ডাকলেও চলবে।’ ‘সরকারের জন্যও বিষয়টা উইন উইন। কারণ, নিবিড় আনুগত্য নিশ্চিত করতে পুরস্কার একটি আবশ্যকীয় শর্ত। নির্বাহী ইচ্ছায় ক্ষণিকের জন্যও যাতে কেউ বাধা না দিতে পারে তার জন্য চোখের সামনে কিছু ঝুলানো তো চাই।’ 
উদ্যোক্তারা যা বলছেন
অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের থিংক ট্যাংক নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনার জবাবে আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘যৌক্তিকভাবে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে প্রাক-প্রস্তুতির এ সভায় আমরা অনেককে আমন্ত্রণ জানাতে পারিনি। তবে এটি শুরু মাত্র। ফেব্রুয়ারিতে আমরা বড় পরিসরে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করব। এর আগে আমাদের গঠনতন্ত্র প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করা ও অবসরে থাকা সব সচিবের সঙ্গে পত্রালাপ ছাড়াও ব্যক্তিগত যোগাযোগের চেষ্টা করা হবে।’
তিনি বলেছেন, ‘জাতির কাছে সাবেক সচিবরা অনেকাংশে ঋণী। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে এখনও যারা দেশকে সেবা দিতে সক্ষম, তারা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে নিঃস্বার্থে কাজ করবেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই। এছাড়া অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দেশের মানুষের জীবনমান কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, সে বিষয়ে আমরা সভা-সেমিনার করা ছাড়াও বিভিন্ন উপকমিটি করে গবেষণাপত্র প্রকাশ করার আশা রাখি। এককথায় সব ভালো কাজের সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত সচিবরা নিজেদের সম্পৃক্ত করতে চান। যারা অতীতে কোটি টাকা খরচ করে দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, সেই সময় সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বও পালন করেছেন, এখন যেহেতু তারা অবসরে, তাই অরাজনৈতিক, সেবা ও গবেষণাধর্মী কাজ করার চিন্তা থেকে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেমন আমি অর্থ সচিব, বাণিজ্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছি। সেইভাবে যে যে দায়িত্ব পালন করেছেন সেই জায়গা থেকে একটা কিছু করার জন্য এই প্রচেষ্টা।’
হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন জানান, তারা একটি মহৎ উদ্দেশ্যে সাবেক সচিবদের নিয়ে এই সংগঠন বা ফোরাম করার উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রস্তাবিত ফোরামে এ পর্যন্ত অবসরে যাওয়া প্রায় ৫০০ সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করবেন। ইতিমধ্যে তারা সাবেক এই সচিবদের ঠিকানা ও ফোন নম্বর সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। আল মামুন জানান, ফোরাম হবে অরাজনৈতিক। এপর্যন্ত যেসব সচিবরা অবসরে গেছেন তাদের সবাইকে এই ফোরামে আহ্বান করা হবে। ইতিমধ্যে আমরা তাদের নাম, ঠিকানা সংগ্রহের চেষ্টা করছি। তবে যেসব সাবেক সচিব সরাসরি ও সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়িয়েছেন তাদের বাদ দিয়ে বাকিদেরকে এই ফোরামের সদস্য করার চেষ্টা থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হবে। তিনি জানান, এই ফোরামের মূল কাজ হবে গবেষণা করা। প্রকাশনা করা। বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কাজ করবে। দীর্ঘ চাকরিজীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতেই মূলত এই ফোরাম গঠনের লক্ষ্য। এই ফোরাম থিংক ট্যাংক হিসেবে কাজ করবে। অভিজ্ঞতা ও গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করবে। গঠনতন্ত্রের বিষয়ে আবুল কালাম আজাদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমরা আমাদের অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রের কাজে লাগাব। তাই সব সাবেক সচিবের অংশগ্রহণেই হবে এ সংগঠন। প্রথমে একটি খসড়া তৈরি করে সবার ই-মেইলে দেওয়া হবে। তারপর সবার মতামত নিয়ে এর গঠনতন্ত্র তৈরি করা হবে।’ চিঠির বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, তিনিও অবসরপ্রাপ্ত একজন সচিব। আর এটা ছিল পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। এর বাইরে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ প্রকাশিত)