সোমবার, ০৬-এপ্রিল ২০২০, ০৭:৩১ পূর্বাহ্ন

বিশ্বজুড়ে নতুন আতঙ্ক ‘করোনা ভাইরাস’

shershanews24.com

প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০৫:০৭ অপরাহ্ন

 

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: বিশ্বজুড়ে এখন নতুন আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে করোনা ভাইরাস। চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে এ ভাইরাসের উৎপত্তি হলেও তা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে খুব দ্রুত। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো এ ভাইরাস প্রতিকার করার মতো এখন পর্যন্ত কোন ওষুধ বা ভ্যাকসিন/ অ্যান্টিভাইরাল উদ্ভাবন করা যায়নি। ফলে কিছুদিনের মধ্যে এ ভাইরাস আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে এমন আশঙ্কা করছে বিশ্লেষকরা। এদিকে প্রাণঘাতী এ ভাইরাস দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ইতোমধ্যে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চীনে  প্রায় ৩ শত মানুষ মারা গেছে। মানুষ মরে রাস্তায় পড়ে আছে এমন চিত্রও দেখা গেছে। আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার জানা গেলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলেই ধারণা করা হচ্ছে। যদিও দেশটির এক চিকিৎসাকর্মী দাবি করেছেন, চীনা সরকার মিথ্যা বলছে। সেখানে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। উহান শহরের হাসপাতালে কর্মরত এক নার্সের দাবি, সেখানে ইতোমধ্যেই ৯০ হাজার মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মাস্ক পরে হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত রয়েছেন ওই নার্স। তবে আক্রান্তের সংখ্যা যাই হোক,  সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো করোনা ভাইরাসের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে। তবে সেটা কতটা মারাত্মক হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। করোনা ভাইরাস হলো একটি আরএনএ ভাইরাস। সাধারণত পশু-পাখির মধ্যে এই ভাইরাস দেখা যায়। তবে মানুষ যদি ভাইরাস আক্রান্ত পশুপাখির সংস্পর্শে যায় বা অপরিচ্ছন্ন মাংস খায় তাহলে এই ভাইরাস মানবদেহে সংক্রমিত হতে পারে। মাঝে মাঝে এই ভাইরাস ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। হয়তো অনেকের মনে আছে, ২০০২-২০০৩ সালে বিশ্বের ৩৭টি দেশে ‘সার্স’ ছড়িয়ে পড়েছিল। বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৫-১৭ সালে মিডল ইস্ট বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশে ছড়িয়ে পড়ে ‘মার্স’। এগুলো করোনা ভাইরাসের প্রভাবে হয়েছিল। এবার চীনের উহানে ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাস, আরও বেশি অপ্রতিরোধ্য ও শক্তিশালী হয়ে। এর নাম দেয়া হয়েছে নোভেল করোনা ভাইরাস। চীনের হুনানে মাংস, মাছের পাইকারি বাজার থেকে ভাইরাস ছড়িয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এখন আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল সাত রাজ্যে বিশেষ নজরদারি চালাচ্ছে। গবেষকদের মতে, বিশ্বে সাড়ে ৬ কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে এই মারাত্মক ভাইরাস। আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যার হার বিশ্ববাসীকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বাংলাদেশও ঝুঁকিমুক্ত নয় বলে ইতিমধ্যে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা। 
করোনা ভাইরাস কী?
করোনা ভাইরাস হচ্ছে ভাইরাসের একটি বড় গ্রুপ। অনেক ধরনের করোনা ভাইরাস রয়েছে। প্রাণীদের মধ্যে এ ধরনের ভাইরাস কমন। বিরল ক্ষেত্রে এই ভাইরাস বিজ্ঞানীদের ভাষায় জুনোটিক হতে পারে। অর্থাৎ প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে এমন ৭টি করোনা ভাইরাস এতদিন পরিচিত ছিল। এখন যেগুলোতে মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে সেগুলো নতুন ধরনের করোনা ভাইরাস। আগে থেকে অপরিচিত এই ভাইরাস ভাইরাল নিউমোনিয়াকে মহামারির দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কীভাবে ছড়ায় এই ভাইরাস
মার্স ভাইরাস ছড়িয়েছিল উট থেকে। সার্স ভাইরাসের জন্য বিজ্ঞানীরা খাটাশ জাতীয় বিড়ালকে দায়ী করেছেন। কোনো সুস্থ মানুষ করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে গেলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভাইরাসটি কতটা সংক্রামক, তার ওপর নির্ভর করে কাশি, হাঁচি বা হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি ছুঁয়েছে এমন কিছু স্পর্শ করার পর সেই হাত দিয়ে মুখ, নাক বা চোখ স্পর্শ করলে সংক্রমণ হতে পারে। এমনকি রোগীর বর্জ্য থেকে চিকিৎসকরাও আক্রান্ত হতে পারেন।
কতটা ভয়ংকর এই ভাইরাস
এই ভাইরাস মানুষের ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায় এবং শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমেই এটি একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়ায়। সাধারণ ফ্লু বা ঠান্ডা লাগার মতো করেই এ ভাইরাস ছড়ায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে। তবে এর পরিণামে অরগ্যান ফেইলিওর বা দেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া, নিউমোনিয়া এবং মৃত্যু ঘটারও আশঙ্কা রয়েছে। এখন পর্যন্ত আক্রান্তদের ৫৬ জন মারা গেছেন, হয়তো আরও মৃত্যু হতে পারে। তাছাড়া এমন মৃত্যুও হয়ে থাকতে পারে যা চিহ্নিত হয়নি। তাই এ ভাইরাস ঠিক কতটা ভয়ংকর, তা এখনও স্পষ্ট নয়। 
করোনা ভাইরাসের লক্ষণ 
করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রধান লক্ষণ হলো, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, জ্বর এবং কাশি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় পাঁচ দিন লাগে। প্রথম লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। তারপর দেখা দেয় শুকনো কাশি। এক সপ্তাহের মধ্যে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং তখনই কোনও কোনও রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।
করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি কোথায়? 
মধ্য চীনের উহান শহর থেকে এই রোগের সূচনা। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর এই শহরে নিউমোনিয়ার মতো একটি রোগ ছড়াতে দেখে প্রথম চীনের কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সতর্ক করে। এরপর গত ১১ জানুয়ারি প্রথম একজনের মৃত্যু হয়। তবে ঠিক কীভাবে এর সংক্রমণ শুরু হয়েছিল, তা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেরনি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সম্ভবত কোনও প্রাণী এর উৎস ছিল। প্রাণী থেকেই প্রথমে ভাইরাসটি কোনও মানুষের দেহে ঢুকেছে এবং তারপর মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়েছে। করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে উহান শহরে সামুদ্রিক একটি খাবারের কথা বলা হচ্ছে। শহরটির একটি বাজারে গিয়েছিল এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ ঘটেছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওই বাজারটিতে অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী বেঁচাকেনা হতো কিছু সামুদ্রিক প্রাণী যেমন বেলুগা জাতীয় তিমি করোনা ভাইরাস বহন করতে পারে। তবে উহানের ওই বাজারে মুরগি, বাদুড়, খরগোশ এবং সাপ বিক্রি হতো।
করোনা ভাইরাসের  চিকিৎসা কী?
করোনা ভাইরাসটি নতুন হওয়াতে এখনই এর কোনও টিকা বা প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। এমনকি এমন কোনও চিকিৎসাও নেই, যা এ রোগ ঠেকাতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে মানুষকে নিয়মিত হাত ভালোভাবে ধোয়া নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে। হাঁচি-কাশির সময় নাক-মুখ ঢেকে রাখা এবং ঠান্ডা ও ফ্লু আক্রান্ত মানুষ থেকে দূরে থাকারও পরামর্শ দিয়েছে তারা। এশিয়ার বহু অংশের মানুষ সার্জিক্যাল মুখোশ পরা শুরু করেছে। আপাতত প্রতিকার হিসেবে এ ভাইরাস বহনকারীদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে বলছেন বিজ্ঞানীরা। ডাক্তারদের পরামর্শ, বারবার হাত ধোয়া, হাত দিয়ে নাক-মুখ স্পর্শ না করা ও ঘরের বাইরে গেলে মুখোশ পরা।  হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গ্যাব্রিয়েল লিউং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত এ নির্দেশনায় বলছেন, হাত সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, বারবার হাত ধুতে হবে। হাত দিয়ে নাক বা মুখ ঘষবেন না, ঘরের বাইরে গেলে মুখোশ পরতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি অসুস্থ হয়ে থাকেন তাহলে মুখোশ পরুন, আর নিজে অসুস্থ না হলেও, অন্যের সংস্পর্শ এড়াতে মুখোশ পরুন।’
নির্মম পরিস্থিতি উহানে রাস্তায় পড়ে আছে লাশ
বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক ছড়ানো করোনা ভাইরাসের উৎসস্থল চীনের উহানে পরিস্থিতি নির্মম হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবিতে শহরটিতে বিভীষিকার চিত্র ফুটে উঠেছে। ছবিগুলোয় দেখা যায়, ধূসর রঙের চুল, মুখে মাস্ক পরিহিত এক ব্যক্তির লাশ রাস্তায় পড়ে আছে। তার বয়স আনুমানিক ৬০। তার এক হাতে রয়েছে বাজারের ব্যাগ। পুলিশ ও স্বাস্থ্যকর্মীরা তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে তার মৃত্যু করোনা ভাইরাস থেকেই হয়েছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ছবিগুলোয় আরো দেখা যায় যে, দূর দিয়ে দুই-একজন মানুষ হেঁটে গেলেও কেউ লাশের কাছে যাওয়ার সাহস করছেন না।
ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি চীন 
প্রাণঘাতী এ ভাইরাস দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দেশটিতে নতুন এই ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় গত ২৫ জানুয়ারি দেশটির সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিশেষ এক বৈঠকে তিনি ওই সতর্ক বার্তা দেন। এছাড়া তিনি বলেছেন, চীনের একার পক্ষে এ ভাইরাস প্রতিকার করা সম্ভব না।  চীনের সরকারি টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের বৈঠকে শি জিনপিং বলেছেন, ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে চীন।
খাদ্য সংকটে উহান শহর
প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস আতঙ্কে বর্তমানে চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ থাকায় অবরুদ্ধ শহরটি। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে কোথাও কোথাও। উহান ছাড়াও বেশ কয়েকটি শহরে জারি রয়েছে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা।
বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় আনবে করোনা 
করোনা ভাইরাস আতঙ্কের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে চীনের অর্থনীতিতে। ভাইরাস বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করায় চীন ভ্রমণে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর একারণে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশটি। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চীনের সাথে বাণিজ্যিকভাবে সম্পৃক্ত দেশগুলো। ভাইরাসের সংক্রমণের ভয়ে কমে গেছে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও পণ্যের আমদানি রফতানি। ফ্লাইট, হোটেল বুকিং বাতিল হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশটির পর্যটন খাত। দেশটির ক্রমবর্ধমান পর্যটন খাতে বিনিয়োগ নিয়ে শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা। চীনা লুনার ইয়ার উপলক্ষে প্রতিবছরই এ সময়ে পর্যটনমুখর থাকে চীনের হোটেল আর পর্যটন কেন্দ্রগুলো। পরিবারের টানে দেশে আসেন চীনারা। বিভিন্ন দেশ থেকে নতুন বছর উদযাপন করতে আসেন পর্যটকরা। যাত্রীসেবায় তাই ব্যস্ত থাকে এয়ারলাইন্সগুলো। কিন্তু এ বছরের চিত্র পুরোটাই ভিন্ন। করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে ফিকে হয়ে গেছে উৎসবের আনন্দ। ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের উহান প্রদেশতো একরকম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এ বছর কয়েক লাখ মানুষ দেশটিতে ভ্রমণে যাওয়ার কথা থাকলেও ভাইরাস আতঙ্কে ফ্লাইট বাতিল করছেন অনেকে, বাতিল করছেন হোটেল বুকিংও। যাত্রীদের আগের বুকিং দেওয়া ফ্লাইটের ভাড়া ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীনা সাউদার্ন এয়ারলাইন্স, চীনা ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স ও চীনা এয়ার। হোটেলগুলোতেও নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা। চীনের বৃহত্তম অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি ট্রিপ ডট কম হোটেল, গাড়ি আর টিকিটের বুকিং বাতিলের জরিমানা মওকুফ করছে। এ ঘটনায় কমেছে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের শেয়ারের দর। চীনের অর্থনীতির ১১ শতাংশ নির্ভর করে পর্যটন খাতের ওপর। এ খাতকে ঘিরে কাজ করে ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স আর স্পেনের পর বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম পর্যটনবান্ধব দেশ চীন। ২০১৮ সালে দেশটিতে পর্যটক এসেছে ৬ কোটি। ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসলে তা দেশটির অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে এশিয়া প্যাসেফিক অঞ্চলের অর্থনীতি রীতিমতো ঝুঁকির মুখে পড়বে যদি আগামী কয়েক সপ্তাহে করোনা ভাইরাস আরও ছড়িয়ে পড়ে। এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে কতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সেটা নির্ভর করছে চীনের উহান শহরে এই মহামারী কত তাড়াতাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তার ওপর।
করোনা ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
চীনে শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমিত মারাত্মক ভাইরাস করোনার ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশও। কারণ চীনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। প্রতিদিন অনেক মানুষ বাংলাদেশ থেকে চীনে যাওয়া-আসা করছে। এছাড়া অন্যান্য যেসব দেশে রোগটি সংক্রমিত হয়েছে, সে দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। তাই এখন পর্যন্ত কোনো রোগী পাওয়া না গেলেও বাংলাদেশকে ঝুঁকিমুক্ত বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস ঝুঁকি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও মহাখালী সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতাল। পর্যায়ক্রমে সারাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত করা হবে। যাতে যেখানে রোগী শনাক্ত হবে, সেখানেই চিকিৎসা দেওয়া যায়। এছাড়া সকল বিমানবন্দর ও স্থল বন্দরগুলোতে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চীনসহ বিদেশ থেকে যারা আসছেন তাদের মধ্যে সর্দি-কাশি, জ্বর, গলা ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট উপসর্গ থাকলে অবশ্যই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে। এ সকল উপসর্গই হচ্ছে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের। এমন উপসর্গ দেখা দিলে তাদেরকে করোনা ভাইরাস আছে কিনা পরীক্ষা করে নিশ্চিত করতে হবে। পরবর্তীতে তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হবে বলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়।
সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা ভাইরাস
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা ভাইরাস। চীন ছাড়াও ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নেপাল, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম কানাডা, ভারত ও তাইওয়ানেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে।  ইতিমধ্যে ভারত ও মালয়েশিয়ায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২ জন মারা গেছে বলে জানা গেছে। আর একারণে সারা বিশ্ব আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।  
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন আতঙ্ক ইনফ্লুয়েঞ্জা, আক্রান্ত ১৫ কোটি 
বিশ্বব্যাপী এখন এক আতঙ্কের নাম নভেল করোনা ভাইরাস। যুক্তরাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে ৫ জনের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এদিকে, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে নতুন আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ইনফ্লুয়েঞ্জা। যদিও এই মহামারী নতুন নয়। গত কয়েক বছর ধরেই সেখানে ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত  হয়ে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আমেরিকাজুড়ে ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি। এক মৌসুমেই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৮ হাজারের বেশি মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় এলার্জিক ও সংক্রামক রোগ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকের মধ্যে ২০১৯-২০২০ সালের ফ্লু মৌসুম সবচেয়ে ভয়াবহ। এই মৌসুমে ফ্লু সংক্রান্ত জটিলতায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে কমপক্ষে ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ। আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ প্রকাশিত)