বৃহস্পতিবার, ০৪-জুন ২০২০, ০৩:৫৭ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • ঢাকা সিটি নির্বাচন: যেসব প্রশ্নের উত্তর মিলছে না

ঢাকা সিটি নির্বাচন: যেসব প্রশ্নের উত্তর মিলছে না

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০৫:৩৬ অপরাহ্ন

 

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: সরকারি হিসাবে সদ্য সমাপ্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২৫ থেকে ২৯ শতাংশ ভোট পড়েছে। বিএনপির দাবি অনুযায়ী ৫ থেকে ৭ শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি। বাস্তবে এই ভোটের সংখ্যা ১০ শতাংশের বেশি নয় বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। তবে এতো কমসংখ্যক ভোট পড়লেও ভোটের ফলাফল প্রকাশে দেরি করা হয়েছে নজিরবিহীনভাবে। ইভিএমে ভোট নেয়ার পরেও ফলাফল প্রকাশে ১১ ঘণ্টা থেকে ২৪ ঘণ্টা দেরি হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অথচ নির্বাচন কমিশন আগ থেকেই দাবি করে আসছে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর স্বল্প সময়ের মধ্যেই ইভিএমের ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে। এমন অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেরিতে ফলাফল প্রকাশ রহস্যজনক বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। খোদ শাসক দলের প্রার্থীদের পক্ষ থেকে একাধিক ওয়ার্ডে ফল পাল্টানোর অভিযোগ ওঠায় ঘোষিত ফলাফলই স্থগিত করে দেয়া হয়েছে। মিডিয়া ক্যু করে ভোটের ফলাফল পাল্টে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। এমন কথাও বলা হচ্ছে, ইভিএম মেশিনের ফলাফলের সঙ্গে ঘোষিত ফলাফলের কোনো মিল নেই। নির্বাচন কমিশনের কমকর্তারা নিজেরা ইচ্ছেমত ফলাফল তৈরি করে সেটি প্রকাশ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যে কারণে বিএনপি ইভিএম-এর ডকুমেন্ট প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। ইভিএমে যেমন দ্রুত এবং সহজে ভোট গ্রহণ করা যায় তেমনি দ্রুত ফলাফল প্রকাশ করা যায় বলেও দাবি করেছিলো ইসি। কিন্তু ঢাকা সিটি নির্বাচনে ভোটগ্রহণের প্রায় ১১ ঘণ্টা পর ফল ঘোষণা করা হয়। কাউন্সিলরদের ফল পেতে অপেক্ষা করতে হয় পুরো একদিন অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা। আধুনিক যন্ত্রে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফল প্রকাশের আশার কথা শোনালেও বাস্তবে তা হয়নি। আর তাই জনমনে ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এবং নানা কথা উঠছে নির্বাচনের ফল নিয়েও। যদিও ফলাফল প্রকাশে দেরি নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তারা কয়েকটি অজুহাত দেখিয়েছেন। তবে এসব অজুহাত বিশ্লেষকদের কাছে একেবারেই বিশ^াসযোগ্য মনে হয়নি।  
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) এম সাখাওয়াত হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, ইভিএমে ফল প্রকাশে তো এত সময় লাগার কথা না। তারা (ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা) কী করার চেষ্টা করছিলেন, বুঝতে পারছি না! তারা কি যোগ করতে পারছিলেন না? তিনি বলেন, আইনে বলা আছে, কেন্দ্রে ফল ঘোষণার পর সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচনী মালামাল নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেবেন। ভোট হয়েছে ঢাকার মধ্যে। কেন্দ্র থেকে সরাসরি নিয়ে এলেও তো এত সময় লাগার কথা না। জনমনে প্রশ্ন তো তারাই তৈরি করেছেন। সাবেক এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, ভোটের আগে তারা (ইসি) বলেছে, আধা ঘণ্টা-এক ঘণ্টার মধ্যে ফল প্রকাশ করা হবে। এখন কেন পারলেন না, তা ইসিরই পরিষ্কার করা উচিত।
ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন করে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, আমার অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ঘোষিত ভোটের হার সংগতিপূর্ণ নয় বলেই আমার মনে হয়। ইভিএমে ভোট গ্রহণ করায় দ্রুত ফল ঘোষণা করার কথা থাকলেও গভীর রাত পর্যন্ত সব ফলাফল পাওয়া যায়নি, যা এই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে। ইভিএম ব্যবহারের কারণে পুনর্গণনা করে তা বের করারও সুযোগ নেই-কমিশন যে তথ্য দিয়েছে, তাই আমাদের গ্রহণ করতে হবে।
 তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আবুল কাসেম বলেছেন, সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে কেন্দ্রে ইভিএমের ফল হয়ে গিয়েছিল। আমাদের এলাকা অনেক বড়Ñ সেই সাঁতারকুল, বেরাইদ পর্যন্ত। ওখানে আমাদের নেট ছিল ধীর গতির। এ কারণে দেরি হয়েছে। ট্যাবের মাধ্যমে আমরা যে ফল নিয়েছি, ওখানকার নেটওয়ার্কে বা আমাদের কিছু টেকনিক্যাল ত্রুটির কারণে ফল দিতে বিলম্ব হয়েছে। দক্ষিণের রিটার্নিং অফিসার আবদুল বাতেন বলেছেন, প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের ভুলের কারণে ফল প্রকাশে দেরি হয়। প্রিসাইডিং অফিসাররা ট্যাবে রেজাল্ট পাঠাতে ভুল করেছেন, অনেকে ম্যানুয়ালি পাঠিয়েছেন। যারা ভুল করেছেন, তাদের আলাদা আলাদাভাবে কল করে আমরা ম্যানুয়ালি রেজাল্ট নিয়েছি। রিটার্নিং অফিসারদের এমন বক্তব্য কেউ বিশ্বাস করছেন না।
ভোটগ্রহণের আগে ইসির ইভিএম প্রকল্পের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. কামাল উদ্দিন বলেছিলেন, ভোট শেষে প্রিসাইডিং অফিসাররা ট্যাবের মাধ্যমে অনলাইনে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ফল পাঠিয়ে দেবেন। পরে কেন্দ্রীয়ভাবে তা ঘোষণা করা হবে। এ জন্য প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং, পোলিং অফিসারদের ‘যথেষ্ট প্রশিক্ষণ’ দেওয়া হয়েছে।
ফলাফল পাল্টে দেয়ার যত অভিযোগ 
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একাধিক ওয়ার্ডে ফলাফল পাল্টে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনেক কাউন্সিলর প্রার্থী বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হলেও পরে কারসাজি করে ফলাফল পাল্টে প্রতিপক্ষকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে বলে খোদ সরকার দলীয় প্রার্থীরাই অভিযোগ করেছেন। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনেক ওয়ার্ডে ঘোষিত ফল স্থগিতও করেছে ইসি।
যদিও প্রার্থীরা বলছেন, এই কারসাজির সঙ্গে ইসির দায়িত্বপ্রাপ্তরাও জড়িত রয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণের ৩১নং ওয়ার্ডের প্রার্থীর অভিযোগ আমলে নিয়ে ফল স্থগিত করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। গত ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর ওই রাতেই ফল ঘোষণা করা হয়। জানা যায়, ফল জালিয়াতি করে ভোটে হারিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ইসিতে জমা দিয়েছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ আলমগীর। একটি কেন্দ্রে ভোটের সংখ্যা উল্টে দিয়ে প্রতিপক্ষকে জিতিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। প্রথম দিকে তার অভিযোগ আমলে না নিলেও দ্বিতীয় দফায় ইভিএমের প্রিন্ট কপি নিয়ে এসে জমা দেয়ায় ভোটের ফল স্থগিত করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা আবদুল বাতেন। এই ওয়ার্ডে পোলিং এজেন্টদের কাছ থেকে পাওয়া হিসাবে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী জিতেছেন ২৭ ভোটে। কিন্তু রাতে প্রকাশিত বেসরকারি ফলে টিফিন ক্যারিয়ার মার্কার স্বতন্ত্র প্রার্থী জুবায়েদ আদেলকে ২১০ ভোটে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
আওয়ামী লীগ সমর্থিত (ঝুড়ি মার্কা) প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, সব ক’টি কেন্দ্রের ফল যোগ করে আমার জয়ী হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল। রাতে সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমিতে ফল নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে তার পরিবর্তে অন্যজনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। কেন্দ্র থেকে পাওয়া ইভিএমের প্রিন্টেড কপির হিসাবে আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-২ পুরুষ কেন্দ্রে তিনি পান ৪৪৯ ভোট। কিন্তু ঘোষণায় দেখানো হয়েছে ২০২ ভোট। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইরোজ আহমেদের ঘুড়িতে পড়েছে ৪৩৯ ভোট। আর বিজয়ী ঘোষণা করা স্বতন্ত্র প্রার্থী জুবায়েদ আদেলের টিফিন ক্যারিয়ার মার্কায় পড়ে ২২৬ ভোট। তিনি বলেন, সব সেন্টার মিলিয়ে টিফিন ক্যারিয়ারে দেখানো হয় ২৪৪৫ ভোট। আর তাকে দেখানো হয় ২২৩৫ ভোট। একটি কেন্দ্রের ফল যোগ না করায় ২০০-এর বেশি ভোটের ব্যবধানে তাকে পরাজিত দেখানো হয়। পরে তিনি লিখিতভাবে চ্যালেঞ্জ করলে ফল স্থগিত করা হয়।
একইভাবে দক্ষিণের ৩২নং ওয়ার্ডের সঠিক ফল ঘোষণা এবং ভোট পুনঃগণনার জন্য রিটার্নিং অফিসারের কাছে আবেদন করেন ঠেলাগাড়ী প্রতীকের সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী মো. বিল্লাল শাহ। তিনিও অভিযোগ করেন, সুষ্ঠুভাবে ভোট গণনা না করে মৌখিকভাবে ফল ঘোষণা করা হয়। এই ফল জালিয়াতি আর গরমিলে ভরপুর। কেন্দ্রে তিনি যে ভোট পেয়েছেন ঘোষণার সময়ে তা কমিয়ে দেখানো হয়েছে। অর্থের বিনিময়ে ফলাফল পাল্টানোর অভিযোগ করেছেন ঢাকা উত্তর সিটির ৬নং সাধারণ ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত মো. সালাউদ্দিন রবিন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগে রবিন (টিফিন ক্যারিয়ার মার্কা) উল্লেখ করেন, ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর ভোট গণনার সময় তার এজেন্টদের মৌখিকভাবে বিজয়ী বলে জানানো হয়। তবে কেন্দ্র থেকে জোরপূর্বক তার এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়। রিটার্নিং অফিসের বরাতে বিভিন্ন টেলিভিশন এবং অনলাইনে সালাউদ্দিন রবিনকে বিজয়ী করে সংবাদ পরিবেশন হয়। কিন্তু রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে নাম পরিবর্তন করে বিদ্রোহী প্রার্থী তাজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পিকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং জালিয়াতি।
সালাউদ্দিন রবিন বলেন, দ্বিগুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলুদ্বী পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং পল্লবী মাজেদুল ইসলাম মডেল হাইস্কুল কেন্দ্রে তার এজেন্টের কাছে ফল ঘোষণার লিখিত কপি সরবরাহ করা হয়নি। এই তিন কেন্দ্রের ফল পরিবর্তন করে তাকে হারানো হয়েছে। ইসির সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তারা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এ কাজ করেছেন বলে অভিযোগ প্রার্থীর।
এ বিষয়ে উত্তরের রিটার্নিং অফিসার মো. আবুল কাশেম গণমাধ্যমকে বলেছেন, মৌখিক ফলকে চূড়ান্ত বলে গণ্য করার সুযোগ নেই। কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসার যে ফল পাঠিয়েছেন তার ভিত্তিতেই ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে কোনো ত্রুটি থাকলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কমিশন অথবা ট্রাইব্যুনালে যেতে পারেন। তবে ফল ঘোষণার পর ইভিএম লক করা হয়েছে। এটি একমাত্র ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে পুনঃগণনা সম্ভব বলে মত দেন তিনি। 
যেসব প্রশ্ন বিএনপির
ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা এবং ইভিএমে কারচুপি করে ঢাকা সিটি নির্বাচনে বিএনপির জয় কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন দলটির দুই মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেন। ৫ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে তাবিথ বলেন, ”একটা উদাহরণ দিচ্ছি; লক্ষ্য করবেন, ১ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার সময়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মাত্র ৩১১টা কেন্দ্রের ফলাফল দিয়েছিল। ওই সময়ে দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ছিলো মাত্র ২৩ হাজার। “তাহলে প্রশ্ন জাগে, কী করে রাত ৯টার সময়ে আমার প্রতিপক্ষ প্রধানমন্ত্রীর ভবন থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে বিজয়ী নিশ্চিত ঘোষণা করেন গণমাধ্যমের সামনে এবং বিজয় মিছিলও শুরু করে দেয়। তখন ২০ শতাংশের কম ফলাফল দেখা হয়েছিল। ভোর ৪টার সময়ে আনফিশিয়ালি তাকে এগিয়ে থাকার ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।”
ইভিএমে ফল ঘোষণায় দেরি নিয়ে তাবিথ বলেন, “ইভিএমের বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, রেজাল্ট চার-পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে দেওয়া যাবে। রাত ৯টার মধ্যে জনগণের সামনে রেজাল্ট পেশ করা উচিৎ ছিল। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মানুষদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ভোর ৪টা পর্যন্ত। তারপরেও আমরা মৌখিক রেজাল্ট পেয়েছি, এখনও লিখিত বা তথ্য সম্বলিত কোনো রেজাল্ট আমরা পাই নাই। বোঝা যাচ্ছে যে, এখানে চুরি করা হয়েছে, এখানে অনেক ভোট বদলানো হয়েছে। সেই কারণে ভোর ৪টা পর্যন্ত তাদের সময়টা লেগেছিল।” ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিট থেকে রেজাল্টের তথ্য সরবরাহ না করা এবং ইভিএম ব্যবহারের আগে ফরম-৩ পূরণ না করারও অভিযোগ তোলেন তাবিথ।
ইভিএমে সংরক্ষিত সমস্ত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “অবিলম্বে সমস্ত লগ প্রকাশ করা হোক। এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারব কন্ট্রোল ইউনিটে কী লেখা ছিল, রেজাল্ট শিটে কী এসেছে, ফাইনালি মৌখিক প্রকাশে কী রেজাল্ট আমরা পেয়েছি। আশা করি, নির্বাচন কমিশন নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণ করার জন্য সমস্ত লগ পাবলিকলি রাইট ডেফিনেশন অ্যাক্টের আওতায় সবার জন্য ওপেন করে দেবে।”
ইশরাক বলেন, “ধীরে ধীরে ভোটার উপস্থিতি একেবারে কমে যাওয়াতে আমি মনে করি টোটাল কাস্ট ১০ শতাংশের অনেক কম হয়েছে। যার কারণে পরবর্তীতে বিশেষ কোড ব্যবহার করে প্রিসাইডিং অফিসারদেরকে ব্যালট ওপেন করে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়। তারপরেও ভোটগ্রহণ শেষে আমরা বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে রেজাল্ট সংগ্রহ করতে থাকি সেখানেও আমরা দেখতে পাই যে, ধানের শীষ এগিয়ে ছিলো। শিল্পকলা একাডেমির ফল নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে ভোটের ফলাফল ঘোষণা ৭টার পর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। রাত দেড়টার দিকে নৌকাকে বিজয়ী করে সম্পূর্ণ একটা মনগড়া ফলাফল ঘোষণা করা হয়।”
ইভিএম থেকে ইসি কেন সরে আসছে?
ভবিষ্যতে সব ভোট ইভিএমে হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন সিইসি। কিন্তু ঢাকা সিটি নির্বাচনের পর সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটছে নির্বাচন কমিশন। আগামী ২১ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য তিনটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে দুটিতেই ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। হঠাৎ করে ইভিএম থেকে এভাবে পিছু হটার ঘোষণার রহস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তীব্র বিরোধিতার মুখেও ইভিএম ব্যবহারে অটল ছিলো নির্বাচন কমিশন। কিন্তু হঠাৎ করে  ইসি কেন সেই ইভিএম থেকে সরে আসার কৌশল খুঁজছে- তা নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। কেন্দ্র দখল করে ব্যালটে সিল মারা ঠেকাতে ইভিএম সংযোজন করেছিল ইসি। তবে ঢাকা সিটি নির্বাচনে সেই ইভিএমেও নিজের ভোট নিজে দিতে পারেননি ভোটাররা। দুর্বৃত্তরা গোপনকক্ষ দখল করে ভোটারদের যেমন প্রকাশ্যে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করেছে, তেমনি ভোটারের আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে অন্যজন ভোট দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে দিনভর ব্যাপকহারে। আঙ্গুলের ছাপ না মেলার কারণে খোদ সিইসিসহ বেশিরভাগ ভোটারকে শনাক্তই করতে পারেনি ইভিএম। ছাপ না মেলায় অনেক ভোটার হতাশ হয়ে ভোট না দিয়েই ফিরে গেছেন। অনেক ভোটার কোন কেন্দ্রে ভোট দেবেন ইভিএমের কারণে তা শনাক্ত করাই সম্ভব হয়নি। এভাবে বিপুলসংখ্যক ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে এই যন্ত্রটি ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে। কেন্দ্রভিত্তিক অস্বাভাবিক ফলাফলও দেখা গেছে। কোথাও ১ শতাংশ আবার কোথাও ৭৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। তবে এতো কমসংখ্যক ভোট পড়লেও ফলাফল ঘোষণা হয়েছে নজিরবিহীন বিলম্বে। ইভিএমে কারচুপির অভিযোগও উঠেছে। ৩ জন কাউন্সিলর প্রার্থী ভোটের ফলাফল বদলে দেয়ার অভিযোগ করেছেন। তার মধ্যে একজন কাউন্সিলর প্রার্থী ইতিমধ্যে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে, মিডিয়া ক্যুর মাধ্যমে তাকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে। যদিও বরাবরই বলা হচ্ছিলো ইভিএমে কারচুপির কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কেন্দ্রে দেখা গেছে সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং কর্মকর্তার আঙ্গুলের ছাপে নির্দিষ্টসংখ্যক ভোট দেয়ার সুযোগ রয়েছে। অথচ কোনো ভোটারের অনুপস্থিতিতে তার ভোট অন্য কারো দেয়ার সুযোগ বা ক্ষমতা থাকতে পারে না। সুতরাং ইভিএমেও যে কারচুপির সুযোগ রয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমন পরিস্থিতিতে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে নির্বাচন কমিশন। ফলে ইভিএম থেকে পিছু হটার কৌশল খুঁজছে বলে অনেকে মনে করছেন। শুধু নির্বাচন কমিশনারই নয়, সরকারও এখন ইভিএম থেকে পিছু হটছে। তারা মনে করছেন ইভিএম-এর কারণেই ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়েছে। ব্যালটে ভোট হলে রাতের বেলাতেই সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে দেয়া যেতো। তাছাড়া, ইভিএম-এ ভোট হওয়ার কারণেই গোপন ভোট কক্ষে গিয়ে দিনভর দাঁড়িয়ে থেকে কর্মীদের কষ্ট করতে হয়েছে। ব্যালটে ভোট হলে এসবের প্রয়োজন হতো না। আরো সহজভাবে কারচুপি করা যেতো।
বহিরাগত প্রসঙ্গ
আগ থেকেই বহিরাগতদের নিয়ে অভিযোগ করা হচ্ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণাও দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু ভোটের দিন ভোটারের চেয়ে কেন্দ্রে কেন্দ্রে সেই বহিরাগতদের উপস্থিতিই ছিলো উদ্বেগজনক। প্রতিটি কেন্দ্রই ছিলো মূলত বহিরাগতদের দখলে। শুধু কেন্দ্রেই নয়, ভোট দেয়ার গোপন কক্ষেও ছিলো এই বহিরাগতদের সদর্প উপস্থিতি। যেসব ভোটার ভোটদানের গোপন কক্ষে এই বহিরাগতদের উপস্থিতি মেনে নিতে পারেননি তাদের অনেককে যেমন লাঞ্ছিত হতে হয়েছে, তেমনি ভোট না দিয়েও চলে যেতে হয়েছে। কেন্দ্রে কেন্দ্রে বহিরাগতদের কি পরিমাণ কর্তৃত্ব ছিলো বিভিন্ন  জায়গায় সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করা, কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া, জোর করে মোবাইলের ছবি বা ভিডিও মুছে ফেলাই তার সাক্ষ্য বহন করে। সাংবাদিকরা বলেছেন, এসবই ঘটেছে পুলিশের সামনে। অথচ পুলিশ এই বহিরাগতদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে কোথাও কোথাও উল্টো সাংবাদিকদেরকেই ধমকিয়েছেন। পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এহেন ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, সমালোচনা হচ্ছে। অথচ আজ পর্যন্ত পুলিশ এসব বিষয় নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা বা বক্তব্য দেয়নি।  সিটি নির্বাচনের আগে ঢাকায় ব্যাপকহারে বহিরাগত উপস্থিতির সবচে’ বেশি অভিযোগ করেছিল সরকারি দলের পক্ষ থেকেই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ নেতারা প্রায় প্রতিদিনই ঢাকায় বিএনপির বহিরাগত আনার অভিযোগ করেছিলেন। অথচ নির্বাচনের দিন ঢাকা সিটির কোনো কেন্দ্রেই বিএনপির কোনো বহিরাগত দেখা যায়নি। বলা যায়, প্রতিটি কেন্দ্রই আওয়ামী লীগের বহিরাগতদের দখলে ছিল। তাহলে প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ কেন বহিরাগতের এতো অভিযোগ করলো? এর কোনো জবাব কিন্তু ওবায়দুল বা আওয়ামী লীগের নেতারা এ পর্যন্ত দেননি। অন্যান্য অভিযোগের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় হতাশা সৃষ্টি হয়েছে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার কারণে। উভয় সিটিতে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৫৫ লক্ষ, অথচ দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বড় দলের প্রার্থীদের বাক্সে ভোট পড়েছে মাত্র সাড়ে ১২ লক্ষ। অর্থাৎ উভয় সিটিতে গড়ে মাত্র ২৭.১৫% ভোটার উপস্থিত হয়েছেন। বাস্তবে যদিও এই সংখ্যা আরো কম বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ২০১৫ সালের নির্বাচনে উত্তর সিটিতে ৩৭.৩০% এবং দক্ষিণে ৪৮.৪০% ভোটার উপস্থিত ছিলেন। এ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দিনে দিনে ভোটাররা ভোটের প্রতি আস্থা হারিয়ে এখন ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। ভোটারদের নিরাপত্তাহীনতা কিংবা সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থাহীনতাই কি এর মূল কারণ?
ভোটার উপস্থিতি হতাশাজনক হওয়ায় সিইসি মন্তব্য করেছেন, ‘ভোটারদের কেন্দ্রে উপস্থিত করার দায়িত্ব আমাদের নয়, এ দায়িত্ব প্রার্থীদের।’ তার এ মন্তব্য কি গ্রহণযোগ্য? না কি ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ? তাও জনগণের বিবেকের মাপকাঠিতে পর্যালোচিত হচ্ছে। 
ভোটাররা কেন ভোটদানে উৎসাহ হারিয়েছে, সেই বিশ্লেষণ জরুরি। সরকারি দলের প্রার্থী ও নেতাদের বক্তব্যে প্রকাশ পাচ্ছে- যেহেতু দেশ উন্নতির দিকে যাচ্ছে, এ জন্য ভোটারদের উপস্থিতি কম। এমন বক্তব্যকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’, ‘উদ্ভট’ ও ‘হাস্যকর’ বলে আখ্যায়িত করেছেন পর্যবেক্ষকরা। নির্বাচনের দিন প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান থাকা সত্ত্বেও ভোটার উপস্থিতি কেন আশানুরূপ হলো না, তার একটি সরকারি ব্যাখ্যা জাতি প্রত্যাশা করে। পরীক্ষায় ৩৩ শতাংশ নাম্বার না পেলে তৃতীয় শ্রেণির পাসও মেলে না। তাই ২৭ শতাংশ বা তার চেয়েও কম ভোটারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? সেই ভোট কতটা জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারে? ভোটারদের হতাশাজনক অনুপস্থিতি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সত্যিকারার্থে গ্রহণযোগ্য কোনো বক্তব্য আসেনি। সিইসি যে বক্তব্য দিয়েছেন সেই বক্তব্য চরম দায়হীন মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। এতো উচ্চ সাংবিধানিক মর্যাদার নিরপেক্ষ আসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তি কিছুতেই এমন দায়সারা বক্তব্য দিতে পারেন না। ভোটার টানার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর যেমন রয়েছে, তেমনি নির্বাচন কমিশনেরও দায়িত্ব রয়েছে ভোটারদের শঙ্কাহীনভাবে ভোট দেয়ার অর্থাৎ আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করে দেয়া। কি কি কারণে দিনকে দিন ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসতে নিরুৎসাহিত হলেন বা হচ্ছেন সেই কারণ বিশ্লেষণ করা, সমাধানমূলক গবেষণা করা। যাতে ভোটাররা অতীতের মতো ভোটকে উৎসব মনে করে। নিশঙ্ক চিত্তে ভোট দিতে আসে। এই কারণ খুঁজে বের করার দায়িত্ব শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের মতো সংস্থার উপরেই বর্তায়। এটি কোনো এনজিও, কোনো পর্যবেক্ষক সংস্থা, কোনো রাজনৈতিক দল করে দেবে না। মনে রাখতে হবে, চলমান ভোটব্যবস্থার প্রতি জনগণের যে অনাস্থা, যে অনীহার সৃষ্টি হয়েছে সেটি যদি অব্যাহত থাকে তাহলে একদিন নির্বাচন কমিশনেরই আর কোনো প্রয়োজন হবে না। আর সেটি হবে গোটা জাতির জন্যই অপ্রত্যাশিত এক পরিস্থিতি। সেই দায় কিছুতেই আজকের নির্বাচন কমিশন এড়াতে পারবে না। 
ভোটারদের ভোটদানের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। ভোটার আনার দায়িত্ব আমাদের নয়-এই কথা বলেই খালাস হওয়ার সুযোগ কমিশনের নেই। কমিশন তাদের  ‘বিশ^স্ততার সহিত’ দায়িত্ব পালনের শপথের কথা ভুলে গেলে চলবে না। ভুলে গেলে চলবে না ‘বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ^াস’ রাখার অঙ্গীকারের কথা। জনগণই বাংলাদেশ। আর তাই জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষা করা, পরিবেশ তৈরি করা নির্বাচন কমিশনের শপথের দায়িত্ব। 
নির্বাচন কমিশনকে এই কথাটিও মনে রাখতে হবে, তারা যে দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন, মাস শেষে রাজ কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা নিচ্ছেন, সকাল বিকাল নিরাপত্তাবাহিনীর স্যালুট পাচ্ছেন এ সবই এদেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকায়। সুতরাং সেই জনতার ভোটাধিকার ভুলুণ্ঠিত করে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন নির্বিকার, নির্লিপ্ত ভূমিকা তারা নেন কীভাবেÑ এমন প্রশ্ন সাধারণ জনগণের।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ প্রকাশিত)