বৃহস্পতিবার, ০৪-জুন ২০২০, ০৩:৩৮ পূর্বাহ্ন

প্রাথমিক শিক্ষা সচিবের দুর্নীতির নানা অভিযোগ

shershanews24.com

প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ১১:৩৮ পূর্বাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম আল হোসেনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরে তা তদন্তের জন্য সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবরে আবেদনও করা হয়েছে। আবেদনে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য, শিক্ষক বদলি বাণিজ্য, উপবৃত্তির টাকা পাঠিয়ে শিওর ক্যাশের মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্য, বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন কেনায় লুটপাটসহ নানা ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবরেও এসব অভিযোগ তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে। 
ওই আবেদনে, কোনো প্রকার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে বলা হয়, সচিব আকরাম আল হোসেনের মৌখিক নির্দেশে অধিদফতরের সদ্য বিদায়ী ডিজি ড. মঞ্জুর কাদের এসব অবৈধ নিয়োগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি করে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন। অথচ নিয়ম হলো পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া।
বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন কেনায় বাণিজ্য
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের উপস্থিতি শতভাগ নিশ্চিত করতে পাইলটিং আকারে বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। কিন্তু সচিব আকরাম আল হোসেনের বাণিজ্যের কারণে তা মুখ থুবড়ে পড়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। গত বছরের ২৭ মার্চ অনুষ্ঠিত এডিপি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাইলটিংভিত্তিতে পিইডিপি-৪ এর ঝখওচ ফান্ড এর অর্থ দিয়ে শুধুমাত্র রংপুর বিভাগের সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ডিজিটাল বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন বসানোর সিদ্ধান্ত হয় এবং বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু সচিব আকরাম-আল-হোসেন নিজস্ব কোম্পানি ও আত্মীয় স্বজনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে সারাদেশব্যাপী ঝখওচ ফান্ড এর অর্থ দিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন বসানোর একতরফা সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এমনকি গত বছর ২৮ এপ্রিল ৩৮.০০.০০০০.৭০০.৯৯.০০৩.১৮.১৫৮/৬৫ নং স্বারকের মাধ্যমে সকল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর  এই মর্মে নির্দেশনাও প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীতে ১ জুলাই ২০১৯ আরেকটি স্মারকের মাধ্যমে হাজিরা মেশিনের চূড়ান্ত  স্পেসিফিকেশন  প্রকাশ করা হয়।  কিন্তু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত সর্বশেষ চূড়ান্ত স্পেসিফিকেশন  ও নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে সচিব আকরাম-আল-হোসেনের একক স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তে এবং বিভিন্ন জেলা উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ঢাকার সাভার, গুলশান, মোহাম্মদপুর,  কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ,  খুলনা, মাগুরা,  নোয়াখালী, কুমিল্লা সদর,  লক্ষ্মীপুর, কিশোরগঞ্জ  এবং রাজশাহীর তানোরে বহুসংখ্যক নি¤œমানের হাজিরা মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। ওই সকল হাজিরা মেশিনের মাধ্যমে হাজিরা ডাটা কোনোভাবেই মূল সার্ভারে স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। কারণ মেশিনগুলোর ক্যাপাসিটি ও ক্যাপাবিলিটি পাওয়ার খুবই নিম্নমানের । যার মধ্যে অনেক হাজিরা মেশিন ইতিমধ্যেই নষ্ট ও অকেজো হয়ে গেছে। অভিযোগে বলা হয়, বিশেষ করে সাভারের প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সচিবের ঘনিষ্ঠ লোক হওয়ায় সাভারে এবং খুলনাতে খুবই নি¤œমানের অর্থাৎ ৩৮০০/৪০০০ টাকার হাজিরা মেশিন বসিয়ে ২০-২৫ হাজার টাকা আদায় করে কয়েক কোটি টাকা লুটপাট করে।
শিক্ষক বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে দেয়া ওই আবেদনে প্রাথমিক শিক্ষক বদলিতে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে বলা হয়, শিক্ষক বদলির নীতিমালা তোয়াক্কা না করে সচিব আকরাম-আল-হোসেনের নির্দেশে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের ডিজি, পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন) খান মোঃ নূরুল আমিন, পলিসি ও অপারেশন কর্মকর্তা  মির্জা হাসান খসরু,  সেলিনা আক্তার,  ঢাকা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, সাভার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারসহ আরো কয়েকজন দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তার যোগসাজশে  শিক্ষকদের কাছ থেকে  গড়ে ৭-৮ লাখ টাকার ঘুষ গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে সাভার উপজেলা শিক্ষা অফিসার সচিবের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে সাভারে ২০১৯ সালে বহুবার সফর করেছেন এবং তার মাধ্যমে ১০-১২ জন শিক্ষকের কাছ থেকে প্রায় ৮০-৯০ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে। 
উপবৃত্তির টাকা প্রেরণে কমিশন বাণিজ্য
রূপালী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং শিওর ক্যাশের মাধ্যমে দেশের প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা পৌঁছে দিয়ে বছরে ৪০ কোটি টাকার বেশি লোপাট হচ্ছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। শিওর ক্যাশ থেকে একজন শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির এক কিস্তি ৩০০ টাকা তুলতে অঞ্চলভেদে ১০ টাকা থেকে ৩০ টাকা কমিশন কেটে নিচ্ছে শিওর ক্যাশের এজেন্টরা। এতে প্রতিবছর কমিশন বাবদই কাটা হচ্ছে ৪০ কোটি টাকারও বেশি। এর ৫ শতাংশ কমিশন পাচ্ছে সচিব আকরাম-আল-হোসেন। কারণ সচিব আকরাম-আল-হোসেনের একক প্রচেষ্টায় রূপালী ব্যাংকের ‘শিওর ক্যাশ’ শিক্ষার্থীদের কাছে উপবৃত্তি পৌঁছে দেয়ার কাজটি পেয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, সচিব ছাড়াও ‘শিওর ক্যাশ’ অফিস থেকে ডিজিসহ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা কমিশন খান। সম্প্রতি আবারও প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের পোশাক ও স্কুল ব্যাগের টাকা পৌঁছে দিতে শিওর ক্যাশের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এই কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য সচিব আকরাম-আল-হোসেনের সঙ্গে শিওর ক্যাশের প্রায় দুই কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ প্রকাশিত)