বৃহস্পতিবার, ০৪-জুন ২০২০, ০৩:৫৮ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • অপ্রতিরোধ্য করোনা ভাইরাস: বিশ্ব অর্থনীতিতে অশনি সংকেত

অপ্রতিরোধ্য করোনা ভাইরাস: বিশ্ব অর্থনীতিতে অশনি সংকেত

shershanews24.com

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০৪:২৪ অপরাহ্ন

 

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ক্রমেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস। শত চেষ্টা সত্ত্বেও চীনের বাইরে ভাইরাসটির বিস্তার থামানো যাচ্ছে না। প্রতিদিন নতুন কোনো না কোনো দেশে এর অস্তিত্ব ধরা পড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, চীনে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে মৃতের সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ। তবে বিশেজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে। এদিকে চীনের বাইরেও ৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পার্শ্ববর্তী দেশে আক্রান্তের সংখ্যাও দিনকে দিন বেড়েই চলছে। এদিকে হংকংয়ের শীর্ষ চিকিৎসা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি কার্যকর না হলে এই প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হয়ে সাড়ে চার কোটি মানুষ মারা যেতে পারেন। আক্রান্ত হতে পারে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অন্তত ৬০ শতাংশ। এরপরেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ডালি ফিশার বলেছেন, বিশ্বজুড়ে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়বে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো এই মরণাঘাতী ভাইরাস প্রতিকার করার মতো এখন পর্যন্ত কোন ওষুধ বা ভ্যাকসিন/অ্যান্টিভাইরাল উদ্ভাবন করা যায়নি। এদিকে গবেষকরা বলছেন, এই ভাইরাসের সংক্রমণ চীনের পক্ষে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ইতোমধ্যে সার্সকে ছাড়িয়ে গেছে করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অবশ্য এখনো মহামারিটিকে বৈশ্বিক জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেনি। কিন্তু বিশ্বজুড়ে এর আতঙ্ক সুস্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। ফলে মরণাঘাতী ভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব চীনের পাশাপাশি পড়তে শুরু করেছে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে। তাই এই অপ্রতিরোধ্য ভাইরাস ঘিরে আতঙ্কে কাঁপছে গোটাবিশ্ব। করোনা ভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব চীনের পাশাপাশি পড়তে শুরু করেছে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে। সংকুচিত হচ্ছে বিশ্ব বাণিজ্যের পরিধি আর সরবরাহ ব্যবস্থা। বহুজাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো চীন থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করতে বাধ্য হচ্ছে।
উহান শহর নিষিদ্ধ থাকায় দেশের অভ্যন্তরেই ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি তেল সরবরাহ। পুরো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে সূচকের দরপতন হচ্ছে।
প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে আসেন লাখ লাখ চীনা পর্যটক। চীনা পর্যটকদের অন্য দেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় চলতি বছর নিউইয়র্ক আর ক্যালিফোর্নিয়া লোকসান গুণতে পারে ৫৮০ কোটি ডলার। চীনা পর্যটকরা অন্য যেসব দেশের পর্যটন খাতে অনন্য অবদান রাখেন, প্রায় সব দেশকেই এবার গুণতে হবে কঠিন লোকসান। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে চীনেও আসতে পারছেন না পর্যটকরা। এরই মধ্যে ধস নামতে শুরু করেছে দেশটির পর্যটন খাতে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ আর এশিয়া চীনাদের দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আমেরিকান এয়ারলাইন্স, ডেল্টা এয়ারলাইন্স, ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স চীনে ফ্লাইট বাতিল করেছে। সিঙ্গাপুর তো চীনের পর্যটক নিষিদ্ধ করার চিন্তাভাবনা করছে। এদিকে, হংকং চীন সংলগ্ন সীমান্তই বন্ধ করে দেয়ার পরিকল্পনা করছে।
দেশটির অন্যতম জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ক্ষেত্র উহান শহর লকডাউন থাকায় জ্বালানি কেনা কমিয়ে দিয়েছে বিদেশি প্রতিষ্ঠান। ক্রমাগত দর হারাচ্ছে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার। সেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিশ্ব শেয়ারবাজারে। ফার্মাসিউটিক্যালস, আর্থিক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে দেশের বাইরে আমদানি রফতানি বাণিজ্য। অথচ বিশ্বের সপ্তম ব্যস্ততম ১০টি কন্টেইনার বন্দর চীনে অবস্থিত। করোনা ভাইরাস আতঙ্কে নিজ বাসস্থান ছাড়ছেন অনেক চীনা। কমছে শিল্পখাতের কার্যক্রম ও খুচরা বিক্রি। বেড়ে যেতে পারে বেকারত্ব আর মূল্যস্ফীতি।
এর আগে ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসে পুরো বিশ্বে ৪ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছিলো। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের ইবোলায় ক্ষতি হয়েছিলো ৫ হাজার ৩শ’ কোটি ডলার। এ বছরের প্রথম প্রান্তিকেই করোনার কারণে চীনের ক্ষতি ৬ হাজার কোটি ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 
সার্সকে হার মানালো করোনা 
মৃতের সংখ্যার দিক দিয়ে প্রাণঘাতী সার্স ভাইরাসকে ছাড়িয়ে গেল করোনা ভাইরাস। ২০০২-২০০৩ সালে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সিভিয়ার অ্যাকুইটি রেসপিরেটরি সিনড্রোম (সার্স) ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৭৭৪ জন প্রাণ হারিয়ে ছিলেন। সার্স সে সময় ছড়িয়ে যায় বিশে^র ২৪ দেশে, আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ১০০ জন। কিন্তু নতুন করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। 
বিশ্ব অর্থনীতিতে চোখ রাঙাচ্ছে করোনা ভাইরাস
চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের প্রভাব ব্যাপকভাবে পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। একে মন্দার অর্থনীতি তার ওপর করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক সব মিলিয়ে টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি। বিশ্ববাজারে আকস্মিকভাবে কমে গেছে জ্বালানি তেলের দাম, বেড়ে গেছে প্রযুক্তি পণ্যের দামও। বিনোদনকেন্দ্র,  শেয়ারবাজারও নিম্নমুখী, ধাক্কা খাচ্ছে চীনসহ আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্প।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম গত কয়েক দিনে ২ দশমিক ৩ শতাংশ কমে তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে ঠেকেছে। যা গত অক্টোবর থেকে সব থেকে কম। এদিকে পেট্রল এবং ডিজেলের দামও কমেছে। এমএসসিআই ওয়াল্ড ইন্ডেক্স যা ২৩টি বাজারের সূচক তা গত কয়েক দিনে নেমেছে ১.৩ শতাংশ। এর প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়েছে। আমেরিকার শেয়ারবাজারে গত কয়েক দিন প্রধান তিনটি সূচকেই দরপতন হয়েছে ১ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে লন্ডনের এফটিএসই সূচকের পতন গিয়ে ঠেকেছে প্রায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ। ইউরোপের শেয়ারবাজারেও গত কয়েক দিন বড় ধরনের অবনমন ঘটেছে। পাশাপাশি জার্মানির ডিএএক্স ও ফ্রান্সের সিএসি দুটি সূচকই পড়ে যায় ২ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি। করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে প্রযুক্তি পণ্যেও। মোবাইল হ্যান্ডসেট ছাড়া সবকিছুতেই চরম সংকট শুরু হয়েছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে মোবাইল নেটওয়ার্কে ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর সাংহাই ও হংকংয়ের পার্ক বন্ধ করে দিয়েছে ডিজনি। তাদের দরপতন হয়েছে তিন শতাংশেরও বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পর্যটন কোম্পানিগুলোও। চলতি বছর কয়েক লাখ মানুষ দেশটিতে ভ্রমণে যাওয়ার কথা থাকলেও ভাইরাস আতঙ্কে ফ্লাইট বাতিল করছেন অনেকে, বাতিল করছেন হোটেল বুকিংও। যাত্রীদের আগের বুকিং দেওয়া ফ্লাইটের ভাড়া ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীনা সাউদার্ন এয়ারলাইন্স, চীনা ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স ও চীনা এয়ার। এদিকে কলকাতার চায়না টাউনে নিউ ইয়ার কার্নিভাল শুরু হয়ে যায় ২৫ জানুয়ারি থেকেই। ১৫ দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে কলকাতার চীনা বাসিন্দারা তাদের আত্মীয় স্বজনদের নিমন্ত্রণ করে ধুমধাম করে পালন করেন নববর্ষ। কিন্তু এই সব আয়োজন এবার কার্যত জলে গেছে করোনা আতঙ্কে। 
মূল বিষয় হচ্ছে চীন বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ। একই সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ চীনের পণ্যের উপর নির্ভরশীল। আবার অনেক শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের বড় বাজারও চীন। এখন সেখানে যদি করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তাহলে মানবিক ও অর্থনৈতিক দুই ধরনের বিপর্যয়ই ঘটবে। চীনের অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব সারাবিশ্বেই পড়বে। বাংলাদেশের সাথে চীনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক বেশ গভীর। ফলে বাংলাদেশকেও এর সম্মুখীন হতে হবে।
বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যে অশনিসংকেত
করোনা ভাইরাসের ঝাঁকুনিতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যেকার ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে বন্ধ রয়েছে আমদানি-রফতানি। নতুন করে এলসি তো খোলা হচ্ছেই না, পূর্বে এলসি করা পণ্যের জাহাজীকরণও বন্ধ। বন্ধ রয়েছে ব্যবসায়ী এবং কর্মরতদের আসা-যাওয়াও। অথচ বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই যুক্ত রয়েছে চীন। রফতানিমুখী এবং স্থানীয় বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প-কারখানাগুলো কাঁচামালের জন্য অনেকাংশেই চীনের ওপর নির্ভরশীল। বতর্মানে বাংলাদেশের ১২টি প্রকল্পে ৯০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে চীন। এসব প্রকল্পে কাজ করছে ২ হাজারের বেশি চীনা বিশেষজ্ঞ। তাদের অনেকেই ছুটিতে গেছেন, বাকিরা পরিবার-পরিজনের কাছে যেতে উদগ্রীব হয়ে আছেন। করোনা ভাইরাসের কারণে একরকম নিথর হয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতি। এর বিস্তৃতি ও ব্যাপকতা আরও বাড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা বলছেন, বর্তমানে যে অবস্থা চলছে, বাংলাদেশকে তার অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে। বিশেষ করে কাঁচামালের অভাবে শিগগির অনেক ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। মূলধনী যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক নতুন ফ্যাক্টরি চালু করা সম্ভব হবে না। ইতোমধ্যে চীনা নাগরিকদের বাংলাদেশে আসা বন্ধ রয়েছে। অনেক প্রতিনিধি তাদের সফর বাতিল করেছেন। এতে কারিগরি কর্মকর্তারাও আসতে পারছেন না।
এতে প্রস্তুতি শেষ হলেও কারিগরি কর্মকর্তার অভাবে অনেক শিল্পকারখানা চালু হতে পারবে না। ফলে পূরণ হবে না রফতানির লক্ষ্যমাত্রা। আটকে গেছে শত শত এলসি। এতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণও বাড়বে। পণ্য শিপমেন্টের অপেক্ষায় আছে বহু ব্যবসায়ী। উদ্যোক্তারা জানান, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের প্রায় পুরোটাই আমদানি করা হয় চীন থেকে। এর বাইরেও কাপড়, আদা, রসুন, বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যসামগ্রী, মেশিনারি, খুচরা যন্ত্রাংশ, খেলনা, মোবাইল, বৈদ্যুতিক সামগ্রী মিলিয়ে শত শত আইটেমের পণ্য আমদানি করা হয় চীন থেকে। সবচেয়ে বড় বাণিজ্য হচ্ছে তৈরি পোশাক ও এর কাঁচামাল আমদানি। যা চীনের বাইরে প্রত্যাশা করাটাও অসম্ভব। দেশটির ভেতরে এ সংক্রমণের প্রভাব এত তীব্র যে চীনের বেশির ভাগ অফিস ও ব্যাংক নববর্ষের ছুটির পর এখন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। সেকারণে চেষ্টা করেও সেখানে এলসি খুলতে পারছেন না বাংলাদেশি আমদানিকারকরা।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে মোট বাণিজ্য হয় ১২ দশমিক চার বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে চীন থেকে দেশে আমদানি হয়েছে এক হাজার ১৬৯ কোটি ২৫ লাখ ডলারের পণ্য। প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। একই সময়ে চীনে ৬৯ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ পাঁচ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। এ হিসাবে দেশটির সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ১১ বিলিয়ন ডলার বা ৯৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বর্তমানে চীনে ৪ হাজার ৭০০ পয়েন্ট শুল্কমুক্তভাবে রফতানি করতে পারে বাংলাদেশ।
এদিকে চীনের করোনা ভাইরাস দীর্ঘায়িত হলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হতে পারে মন্তব্য করে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, আমাদের বড় দুশ্চিন্তা তৈরি পোশাক শিল্প নিয়ে। আদা-রসুন হয়তো আমরা ভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে পারব, কিন্তু তৈরি পোশাকের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে চীনের বিকল্প কিছুই ভাবছি না। তবে এ মুহূর্তেই কিছু বলা ঠিক হবে না। কারণ, তথ্যের অনেক ঘাটতি রয়েছে। আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। কী করব তা সময় বলে দেবে। 
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুসারে বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন। অন্য দিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে ২০১৮ সালে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৪২তম। আর বিশ্বের চীনের অবস্থান দ্বিতীয়। এ সময়ে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল ৩০২ দশমিক চার বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে চীনের জিডিপি ছিল ১২ দশমিক ২৩ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়ে চীনের জিডিপির আকার ৫৫ গুণ বেশি। তৈরি পোশাকের বিশ্ববাজারে ৪০ শতাংশই চীনের দখলে। বাংলাদেশ চীন থেকে যেসব পণ্য আমদানি করে এরমধ্যে রয়েছে- টেক্সটাইল, যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, সার, টায়ার, লৌহ ও ইস্পাত, সয়াবিন তেল, পাম অয়েল, গম প্রভৃতি। অন্য দিকে বাংলাদেশ চীনে যেসব পণ্য রফতানি করে এগুলো হলো- চামড়া, পাট ও পাটজাত পণ্য, চা, তৈরি পোশাক ও মৎস্যজাতীয় পণ্য।
সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়বে করোনা
সবেমাত্র চীনের বাইরে ছড়িয়ে পড়া শুরু হয়েছে করোনা ভাইরাস বা কভিড-১৯। এর ফলে পৃথিবীর প্রতিটি দেশে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটবে। চীনের স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মকর্তারা আগামী এপ্রিলের মধ্যে এই ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার প্রত্যাশা করলেও, এমন ভয়াবহ সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ডালি ফিশার। এর আগে হংকংয়ের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক মেডিসিনের চেয়ারম্যান প্রফেসর গাব্রিয়েল লিউং সতর্কবার্তায় বলেছেন, করোনা ভাইরাসে বিশ্বে মারা যেতে পারেন সাড়ে ৪ কোটি মানুষ। আক্রান্ত হতে পারেন বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬০ ভাগ। তিনি বলেছেন, বিভিন্ন দেশের সরকারকে অবশ্যই এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তার সতর্কবার্তায় আরো বলা হয়েছে, যদি শতকরা এক ভাগ মানুষও মারা যায় তাহলেও মারা পড়বেন কয়েক কোটি মানুষ। বর্তমানে বিশ্বে মোট জনসংখ্যা ৭০০ কোটিরও বেশি। এর অর্থ হলো বর্তমান হারে যদি এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে তাহলে এতে আক্রান্ত হবেন কমপক্ষে ৪০০ কোটি মানুষ। প্রফেসর লিউংয়ের মতে, যদি শতকরা এক ভাগ মানুষও মারা যায়, তাহলে এতে মারা যাবেন কমপক্ষে সাড়ে ৪ কোটি মানুষ। এরপরেই ডা. ডালি ফিশার বিশ্বজুড়ে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার হুঁশিয়ারি দিলেন। তিনি বলেছেন, এই মহামারি চীনে সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌঁছে যেতে পারে। আর বাকি বিশ্বের পরিস্থিতি অব্যাহতভাবে আরো খারাপ হতে পারে। কারণ এই ভাইরাস সংক্রমণের আরো অনেক পদ্ধতি এখনও অজানা। 
৮০ শতাংশ রোগের উৎস প্রাণী!
বিশ্বজুড়ে এখন নতুন আতঙ্কের নাম নভেল করোনা ভাইরাস। নতুন এই প্রাণঘাতী ভাইরাসটি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান শহরের একটি বন্যপ্রাণীর বাজার থেকে ছড়িয়ে পড়ে। তবে কোন প্রাণী থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে তা এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে নতুন যে রোগগুলো ছড়াচ্ছে তার ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশের উৎস হচ্ছে বিভিন্ন পতঙ্গ ও জীবজন্তু।   
বিশ্ব যেভাবে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিচ্ছে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ভাইরাসের জন্য চীনে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখনো সেরকম পর্যায়ে যায়নি বলছে। তবে খুব দ্রুতই যে ছড়িয়ে যাবে, তার আশঙ্কাও আছে। তাই বিভিন্ন দেশ এখনই সতর্কতা অবলম্বন করছে। সিঙ্গাপুর, হংকং, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ বিমানবন্দরে চীন থেকে আগত যাত্রীদের স্ক্রিনিং করছে। যদিও এটি কতটুক কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ আছে। কারণ, করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত ব্যক্তির লক্ষণ প্রকাশ পেতে পেতে পাঁচ দিন সময় লাগে। এ সময়ে যেকোনো সংক্রমিত ব্যক্তি অর্ধেক পৃথিবী ঘুরে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারবেন। তাই অনেক দেশ চীন ফেরত নাগরিকদের ১০-১৪ দিন হাসপাতালে রেখে সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারপর ছাড়ছে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ প্রকাশিত)