বৃহস্পতিবার, ০৪-জুন ২০২০, ০৫:১২ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  •  পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ: পরিবেশ বিপর্যয়ে বাংলাদেশ

 পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ: পরিবেশ বিপর্যয়ে বাংলাদেশ

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০৫:২৬ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: বিশ্বের প্লাস্টিক দূষণকারী দেশগুলোর মধ্যে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৮৭ হাজার টন সিঙ্গেল ইউজ বা একবার ব্যবহার করা হয় এমন প্লাস্টিক পণ্য বর্জ্য হিসেবে জমা হচ্ছে। সংস্থাটি বাংলাদেশের শহর ও গ্রাম মিলিয়ে মোট ৮০০ জনেরও বেশি মানুষের ওপর সমীক্ষাটি চালিয়েছে। শহরে ৭৮ শতাংশ এবং গ্রামে ২২ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়। এই সমীক্ষায় প্রশ্নসমূহের মধ্যে ছিল, তারা কী ধরনের প্লাস্টিক ব্যবহার করে, এইসব প্লাস্টিক কোথা থেকে আসে এবং কীভাবে এগুলো নিষ্পত্তি হয়। এই সমীক্ষা থেকে উঠে এসেছে, এসব প্লাস্টিক বর্জ্যরে প্রায় ৯৬ শতাংশ খাদ্য ও প্রসাধনী সামগ্রীর মোড়ক থেকে আসে। এই মোট বর্জ্যরে ৩৫ শতাংশ হচ্ছে স্যাশে যা রিসাইকেল করা যায় না। বাংলাদেশে বেশির ভাগ একবার ব্যবহার উপযোগী প্লাস্টিকের সঠিকভাবে নিষ্কাশন হয় না, এর ফলে এইসব প্লাস্টিক বর্জ্য নদী, হ্রদ অথবা সমুদ্রে পতিত হয়। জাতিসংঘের পরিবেশ অধিদফতর অনুমান করেছে বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলো যেমন ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা এবং গঙ্গা, এইসব নদীর মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক সমুদ্রে পতিত হয়। একবার ব্যবহার উপযোগী প্লাস্টিকের মধ্যে রয়েছে পলিথিন বা প্লাস্টিকের ব্যাগ, পানীয়ের স্ট্র, বোতল, কটন-বাড, স্যাশে, খাদ্য পণ্যের মোড়ক, কফি স্ট্রেসার এবং আরও অনেক কিছু। প্লাস্টিক ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তা পরিবেশে সহজে বিনষ্ট হয় না এবং খাদ্যজালসহ পরিবেশের অন্যান্য উপাদানের সাথে রাসায়নিক ক্রিয়ার মাধ্যমে বিষ-ক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, এটি মানবদেহের রক্তের সাথে মিশে ক্যান্সার, বিকলাঙ্গতা, বন্ধ্যাত্ব, অকালে গর্ভপাতসহ নানা মরণব্যাধির কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্লাস্টিক দূষণের কারণে পর্যটন, বিনোদন, ব্যবসা, মানুষ, মাছ, পাখি, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধারাবাহিক এসব আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি বর্ণনাতীত। একবার ব্যবহার উপযোগী প্লাস্টিকের থেকে নির্গত বিষাক্ত পদার্থগুলো বায়ু, পানি এবং মাটি দূষিত করে পরিবেশে জমা হয় এবং এই সব বিষাক্ত পদার্থ মানবদেহে শ^াস গ্রহণের মাধ্যমে প্রবেশ করে যা পরবর্তীতে মানুষকে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত করে। অতি দ্রুত এর কার্যকর সমাধান গ্রহণ করা না হলে পলিথিন ও প্লাস্টিকের এই দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এসডোর গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রতি বছর বাংলাদেশের রেস্তোরাঁতে প্রায় ২০০০ টনেরও বেশি এ ধরনের প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়। বিমানসংস্থায় প্রায় ৭০০ টন এবং আবাসিক হোটেলে প্রায় ৬০০ টন একবার ব্যবহার উপযোগী প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও কাঁচাবাজারসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হয় আরো শ’ শ’ টন পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যাগ।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) বলছে, শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই প্রতিদিন দুই কোটি পলিথিন ময়লার ভাগাড়ে জমা হচ্ছে। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এই পলিথিনকে ঢাকার জলাবদ্ধতার জন্যও দায়ী করেছে পবা। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ৭৯ শতাংশ প্লাস্টিক বা পলিথিন বর্জ্য পানিতে মিশে জলজ প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত প্লাস্টিকের বোতল, বিভিন্ন সামগ্রী এবং পলিথিন ব্যাগের অধিকাংশই পুনর্ব্যবহার, পুনঃচক্রায়ন না করে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে, যা পরবর্তীতে খাল, নদী হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে। জলজ প্রাণী তা গ্রহণ করছে। জলজ প্রাণীর মাধ্যমে এই প্লাস্টিক আবার মানুষের খাদ্যচক্রেও প্রবেশ করছে। পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, ব্যবহার, বিপণন ও বাজারজাতকরণের উপর ২০০২ সালে নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও সেই আইন আজও কার্যকর হয়নি। চীন, ভারতসহ বিশে^র শতাধিক দেশ সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার ও উৎপাদন বন্ধে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তবে প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত পণ্যের দূষণে ভয়াবহ এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত ৬ জানুয়ারি দেশের হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ ও উপকূলীয় অঞ্চলে একবার ব্যবহারযোগ্য (ওয়ানটাইম) প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার এক বছরের মধ্যে নিষিদ্ধের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে পলিথিন ও পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার বন্ধে বিদ্যমান আইনি নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকরের জন্য সরকারকে বাজার তদারকি, পলিথিন উৎপাদনকারী যন্ত্রপাতি জব্দ ও কারখানা বন্ধেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত এক রিট আবেদনের শুনানি করে হাইকোর্ট রুলসহ এ আদেশ দেয়। সারাদেশে একবার ব্যবহারযোগ্য (ওয়ানটাইম) প্লাস্টিক পণ্যের নিরাপদ বিকল্প কী হতে পারে সে বিষয়ে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ণের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।
এছাড়া পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার বন্ধে বিদ্যমান আইনগত নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে সরকারকে কেন ব্যর্থ বলা হবে না- রুলে তাও জানতে চেয়েছেন আদালত। পরিবেশ সচিব, শিল্প সচিব, বাণিজ্য সচিব, পানি সম্পদ সচিব, বেসামরিক ও পর্যটন সচিব, বস্ত্র ও পাট সচিব, পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদক ও রাপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যানকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আদেশের পর আইনজীবী রিজওয়ানা হাসান সাংবাদিকদের বলেন, “বাংলাদেশে পলিথিন ব্যাগ ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রীর দৌরাত্ম মারাত্মকভাবে বেড়ে চলেছে। এগুলো আমাদের ভূমির উর্বরতা কমাচ্ছে, বায়ূ দূষণ ঘটাচ্ছে এবং সমুদ্রের জলজ উদ্ভিদ ও প্রতিবেশকে মারাত্মক হুমকির মধ্যে ফেলছে। ফলে প্লাস্টিকের উৎপাদন এবং ব্যবহার কমাতে হবে।”
প্রতিবেশী দেশ ভারতের কেরালার সমুদ্র সৈকতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে জানিয়ে এ আইনজীবী বলেন, “বিশ্বের মোট ১২৭টি দেশে নানাভাবে পলিথিন ব্যাগ এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রীর উৎপাদন, বিপণন, বিতরণে নিয়ন্ত্রণ আনা হয়েছে। এ আইনজীবী জানান, আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে আগামী বছরের ৫ জানুয়ারির মধ্যে বিবাদীদের প্রতিবেদন দিতে বলেছে আদালত। ওই বছরের ১০ জানুয়ারি ফের বিষয়টি কার্যতালিকায় আসবে। প্লাস্টিক সামগ্রীর উৎপাদন, বিক্রি, বিপণন, বিতরণ বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর বেলাসহ ১১টি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও সংগঠন এই রিট আবেদন করে। 
এর আগে ১৯৯৫ সালের বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৬(ক) ধারা অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন জারি করে ২০০২ সালের জানুয়ারি থেকে দেশে পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন, পরিবহন, মজুদ ও ব্যবহারকে নিষিদ্ধ করা হয়। তখন এ আইন কার্যকরের উদ্যোগও নেয়া হয়। বেশ ঘটা করে অভিযানও শুরু হয়। এতে মোটামুটি সফলতাও আসছিল। কিন্তু পরের পর্যায়ে অভিযান স্থিমিত হয়ে আসে। ক্রমান্বয়ে সবকিছু আগের মতোই চলতে থাকে। সেই সময় থেকে এখন পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে বলা যায়। পরিবেশ অধিদফতরের পাশাপাশি পুলিশ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিষ্ক্রিয়তা সর্বোপরি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাবকে এই আইন কার্যকর না হওয়ার জন্য দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, পরিবেশ রক্ষায় দেশে যথেষ্ট আইন রয়েছে। পরিবেশ অধিদফতরের প্রধান কাজ আইনগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা। কিন্তু পরিবেশ অধিদফতর অনেক বেশি প্রকল্পনির্ভর। ফলে পরিবেশ রক্ষা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে তাদের যে তদারকির ভূমিকা নেওয়ার কথা, সেখানে ঘাটতি রয়েছে। রাজধানীর বায়ুদূষণ, নদী রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিবেশ অধিদফতর প্রকল্পভিত্তিক অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের কোনো সুফল দেখা যায়নি বলে বিশ্লেষকরা অভিযোগ করেছেন। আর প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সুরক্ষার ওই কাজগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এসব কাজ টেকসই হয়নি। 
একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করছে চীন
একবারের বেশি ব্যবহারযোগ্য নয় এমন প্লাস্টিক ব্যাগ ও অন্যান্য পণ্যের ব্যবহার দেশজুড়ে কমানোর বড় ধরনের পরিকল্পনা করেছে চীন। এর আওতায় চলতি বছরের মধ্যেই অ-পচনশীল একবার ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ দেশের প্রধান প্রধান শহরে নিষিদ্ধ করা হবে। আর ২০২২ সাল নাগাদ এসব ব্যাগ নিষিদ্ধ হবে বাদবাকি সব শহর ও নগরে। চীনের রেস্টুরেন্টগুলোতেও ২০২০ সালের শেষ নাগাদ একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক স্ট্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হবে বলে জানিয়েছে বিবিসি। রেস্টুরেন্ট শিল্প সংশ্লিষ্টদেরকে ব্যবসায় সবধরনের সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক সরঞ্জাম ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমাতে হবে বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও হোটেল ব্যবসায়ীদেরকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিনামূল্যের একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য দেওয়া বন্ধ করতে বলা হয়েছে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক ব্যবহারকারী দেশগুলোর মধ্যে চীন একটি। দেশের ১৪০ কোটি মানুষের ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য সামলাতে বছরের পর বছর ধরে হিমশিম খাচ্ছে চীন সরকার।
চীনের সবচেয়ে বড় ময়লার ভাগাড়টি প্রায় ১০০ ফুটবল মাঠের সমান। সেটিও এরই মধ্যে ভরে গেছে। যদিও এটি ভরার কথা ছিল আরো ২৫ বছর পর। শুধু ২০১৭ সালেই চীন শহুরে এলাকাগুলো থেকে ফেলে দেওয়া সাড়ে ২১ কোটি টন আবর্জনা সংগ্রহ করেছে। সেগুলোর কতটুকু পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা সম্ভব হয়েছে তা জানা যায়নি।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন প্রকাশনা ‘আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডেটা’র গবেষণা অনুসারে, ২০১০ সালে চীনের বর্জ্যের পরিমাণ ছিল ৬ কোটি টন। যেখানে একই বছর যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৮০ লাখ টন। ২০১৮ সালে এ গবেষণা ফল প্রকাশ হয় এবং এতে ২০২৫ সাল নাগাদও প্লাস্টিক ব্যবহারের তুলনামূলক বৈশ্বিক চিত্র একইরকম থাকার ধারণা প্রকাশ করা হয়। এর প্রেক্ষাপটে চীন প্লাস্টিকের ব্যবহার সীমিত রাখতে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে প্লাস্টিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে এটিই চীনের প্রথম প্রচেষ্টা নয়। এর আগে ২০০৮ সালে চীন খুচরা বিক্রেতাদের পণ্য বিক্রির সময় ক্রেতাদেরকে বিনামূল্যে প্লাস্টিক ব্যাগ দেওয়া নিষিদ্ধ করাসহ অতিরিক্ত পাতলা প্লাস্টিক ব্যাগ উৎপাদন নিষিদ্ধ করেছিল। এছাড়া, ২০১৭ সালে চীন বিদেশি প্লাস্টিক বর্জ্য না কেনারও ঘোষণা দিয়েছিল।
ভারতে নিষিদ্ধ ৬ প্লাস্টিক পণ্য 
ছয়টি প্লাস্টিকজাত পণ্যের উৎপাদন, ব্যবহার ও আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে ভারতে। 
বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত এলাকার তালিকায় থাকা ভারতের শহর ও গ্রামগুলো থেকে ‘ওয়ান-টাইম’ প্লাস্টিকপণ্য তুলে দিতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের মধ্যে প্লাস্টিকমুক্ত দেশ গড়ার ঘোষণা দেওয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গত বছরের ২ অক্টোবর এ পণ্যগুলো নিষিদ্ধে শুরু হওয়া অভিযানের উদ্বোধন করেন।  নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা পণ্যগুলো হচ্ছে- প্লাস্টিকের ব্যাগ, স্ট্র, প্লেট, ছোট বোতল, কাপ ও শ্যাম্পুর মতো পণ্যের ছোট প্যাকেট। প্লাস্টিক পণ্যের দূষণ, বিশেষ করে সমুদ্রে এর প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়েই উদ্বেগ বাড়ছে। গবেষণা বলছে, ‘ওয়ান-টাইম’ প্লাস্টিকজাত পণ্যের প্রায় ৫০ শতাংশই সমুদ্রে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে। ধ্বংস করছে সামুদ্রিক জীবনব্যবস্থা, ঢুকে পড়ছে মানুষের খাদ্য-শৃঙ্খলেও। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২১ সালের মধ্যে প্লাস্টিকজাত স্ট্র, ফর্ক, ছুরি ও কটন বাডের মতো পণ্য নিষিদ্ধের পরিকল্পনা করছে।
বাংলাদেশে দূষণের শীর্ষে তরুণরা 
এসডোর গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্লাস্টিক দূষণের জন্য সবচেয়ে বেশী দায়ী তরুণ এবং যুব জনগোষ্ঠী। ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, এই তরুণ ও যুব জনগোষ্ঠী একবার ব্যবহার করা হয় এমন সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক পণ্য বেশী ব্যবহার করে। গবেষণার এই ফলাফল এমন এক সময়ে পাওয়া গেল যখন সারা বিশ্বে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে সার্বিকভাবে প্লাস্টিকের ব্যবহার একেবারে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব খাবারের সঙ্গে প্লাস্টিকের প্যাকেট রয়েছে, সেগুলোই সবচেয়ে বেশি ভোগ করছে তরুণ এবং যুবকেরা - যাদের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। মোট সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের ৬৮ শতাংশ ব্যবহার করছে এই জনগোষ্ঠী।
প্লাস্টিকের ক্ষতি কী? 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত পণ্যগুলো ক্যানসার তৈরি করার প্রথম ১০ উপাদানের একটি। প্লাস্টিকের বক্সে খাবার অনেকক্ষণ রাখা হলে তা খাদ্যকে দূষিত করে ফেলে। ক্যানসারের বিস্তৃতির অন্যতম প্রভাবক এই প্লাস্টিক। এছাড়া মাটির স্বাস্থ্যকে, পানির মধ্য গিয়ে পানিকে যেভাবে প্রভাবিত করছে, তাতে মনে করা হচ্ছে প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত পণ্য পরিবেশের একটি ধরনকে এত বদলে দিচ্ছে যে, সভ্যতা ধ্বংসের মুখোমুখি হতে পারে। 
সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাবার আগ পর্যন্ত মানবজীবনে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার ব্যাপক হয়ে উঠেছে।
সকালে দাঁত পরিষ্কারের ব্রাশ, টুথপেস্টের টিউব থেকে শুরু করে দিনের প্রতিটি খাবার এবং জীবনযাত্রায় প্লাস্টিক পণ্য এখন অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্লাস্টিক যেহেতু পচনশীল নয়, তাই ব্যবহারের পর যেসব প্লাস্টিক পণ্য ফেলে দেয়া হয়, তার অধিকাংশই যুগের পর যুগ একইভাবে পরিবেশে টিকে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এক গবেষণায় বলেছে, মুদি দোকান থেকে কেনা পণ্য বহন করার জন্য যেসব ব্যাগ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো প্রকৃতিতে মিশে যেতে ২০ বছর সময় লাগে। চা, কফি, জুস কিংবা কোমল পানীয়ের জন্য যেসব প্লাস্টিকের কাপ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো ৫০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে। আর ডায়াপার এবং প্লাস্টিক বোতল ৪৫০ বছর পর্যন্ত পচে না। রেস্টুরেন্ট, আবাসিক হোটেল, এয়ারলাইন্স এবং সুপারশপ থেকে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক সবচেয়ে বেশি আসছে। এরমধ্যে বেশি আসে রেস্টুরেন্ট থেকে। এরপর রয়েছে এয়ারলাইন্স এবং আবাসিক হোটেল। আবাসিক হোটেল থেকে যেসব প্লাস্টিক বর্জ্য আসে, সেগুলো হচ্ছে - শ্যাম্পুর বোতল ও মিনি-প্যাক, কন্ডিশনার প্যাকেট, টুথপেস্ট টিউব, প্লাস্টিক টুথব্রাশ, টি ব্যাগ এবং বিভিন্ন খাবারের প্যাকেট। এয়ারলাইন্স থেকে আসে প্লাস্টিকের চামচ, স্ট্র, প্লেট, কাপ, গ্লাস এবং আরো নানা ধরনের প্লাস্টিকের মোড়ক।
২০১৭ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একটি গবেষণার প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় বলেছেন, প্রতি বছর ৮ মিলিয়ন প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে পড়ছে। এতে ৮ বিলিয়ন ডলারের সামুদ্রিক ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্লাস্টিক ব্যাগ ও প্লাস্টিকজাত পণ্যকে সমুদ্র ও সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য কেবল হুমকিই নয়, প্রতিবছর হাজারো সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর কারণ বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।  অনেক উন্নয়নশীল দেশেই প্লাস্টিকের ব্যাগ নর্দমা আটকে দিয়ে বন্যার কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়। গবেষকদের মতে, মারাত্মক ক্ষতিকর এসব প্লাস্টিক পণ্য একদিকে যেমন ফসলি জমির উর্বরতা নষ্ট করছে, তেমনি নদী ও সামুদ্রিক প্রাণিকেও হুমকিতে ফেলছে। গবেষকদের মতামত, পাট, কলাগাছ, বাঁশ ও ব্যবহৃত কাগজ হতে পারে প্লাস্টিক পণ্যের বিকল্প। সহজে পচনশীল হওয়ায় এসব পণ্য পরিবেশ বান্ধবও।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ প্রকাশিত)