বুধবার, ০৮-এপ্রিল ২০২০, ০৩:১৯ অপরাহ্ন

করোনার ছোবলে গোটা বিশ্ব তছনছ বাংলাদেশেও আঘাত 

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৭ মার্চ, ২০২০ ১০:৪৫ পূর্বাহ্ন


সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: করোনাভাইরাসের সক্রমণকে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। শুধুমাত্র অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া অন্য সব মহাদেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ১২৩ টি দেশ ও অঞ্চলে এখন পর্যন্ত  দেড় লাখেরও বেশি মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে বলে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা তার সর্বশেষ বুলেটিনে জানিয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ইতিমধ্যে ৫ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। 
চীনের পর এবার গোটা ইউরোপকে এই মহামারির কেন্দ্রস্থল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোতে প্রতিদিন এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।  বিশেষ করে ইতালিতে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সেখানে শুধুমাত্র ২৪ ঘণ্টায় ২৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় প্রায় ছয় কোটি জনসংখ্যার দেশ ইতালির জনগণকে কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট রোগ কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে চীনের পর এখন ইতালিতে প্রতিদিন সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান ড. টেড্রস আধানম গেব্রেইয়েসাস বলেছেন, বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারির কেন্দ্র এখন ইউরোপ। তিনি দেশগুলোর সরকারকে মানুষের জীবন বাঁচাতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ, সংহতি রাখা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই আগুনকে আর জ্বলতে দেবেন না।’ তবে কবে নাগাদ এই মহামারি নিয়ন্ত্রণে আসবে তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলতে পারছে না বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। 
বাংলাদেশেও ইতিমধ্যে তিনজন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়ছে। দেশের ৩২ টি জেলায় করোনা ভাইরাসের শঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এসব জেলার বিদেশ ফেরত এবং তাদের সংস্পর্শে আসা প্রায় দেড় হাজার জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গ দেখা যাওয়ায় ৯ জনকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে বলে ১৪ মার্চ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জানিয়েছে।  
আর দেশে যে তিনজন কভিড-১৯ রোগী ধরা পড়েছিলেন, তাদের দুজনই এখন নভেল করোনাভাইরাস মুক্ত বলেও জানিয়েছে আইইডিসিআর।
দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে বিদেশ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের না ফেরার পরামর্শ দিয়েছে সরকার। যেসব দেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঘটেছে সেসব দেশ থেকে কেউ বাংলাদেশে ফিরলে তাকে নিজ আবাসস্থলে কমপক্ষে ১৪ দিন অন্তরীণ থাকতে বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কেউ দেশে ফিরলে তাকে নিজ উদ্যোগে কোয়ারেন্টাইন বা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে রয়েছে এমন দাবি করা হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের অব্যবস্থাপনা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহল প্রশ্ন তুলেছে। ১৪ মার্চ ইতালি ফেরত ১৪২ জনকে নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা ও তাদের কোয়ারেন্টাইন নিয়ে অব্যস্থাপনায় এর প্রমাণ মিলেছে। ইতালী ফেরত নাগরিকদের বিমানবন্দর থেকে নিয়ে আশকোনা হজ্জ ক্যাম্পে রাখা হলেও প্রথমে কয়েক ঘণ্টা সেখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদফতরের কোনো কর্মকর্তার দেখা  মেলেনি। এমনকি দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্ত বিদেশ ফেরত নাগরিকদের পানি খাওয়ার ব্যবস্থা পর্যন্ত করা হয়নি কয়েক ঘণ্টাতেও। এ নিয়ে প্রবাসী ও তাদের স্বজনদের ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এমনকি সেখানে হট্টগোলের মতো ঘটনাও ঘটেছে।   
দেশের সর্বোচ আদালতের পক্ষ থেকেও করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকারের প্রস্তুতিতে অনেক ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য এসেছে। আদালত বলেছে, ‘এটি একটি জনবহুল দেশ। আমরা কেউ নিরাপদ নই। এর কোনো প্রতিষেধক নেই। ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ার আগেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। এ নিয়ে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই।’ দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপিও করোনা মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। 
এদিকে বাংলাদেশ থেকে পর্যটকদের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে পেট্রোপোল-বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে পর্যটকদের ভারত প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে দেশটির সরকার। ১২ মার্চ এক চিঠিতে ভারতের পেট্রোপোল ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৩ মার্চ সন্ধ্যার পর নতুন কোনো যাত্রী তারা গ্রহণ করবে না। তবে যেসব বাংলাদেশি ভারতে আছেন এবং যেসব ভারতীয় বাংলাদেশে আছেন তারা নিজ দেশে ফেরত যেতে পারবেন। ১৪ মার্চ থেকে ঢাকা-কলকাতা-দিল্লির মধ্যে চলাচলকারী সকল ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে ঢাকা-কলকাতা চলাচলকারী ট্রেনও বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা আসতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। একইভাবে ঢাকা-শিলং এবং ঢাকা-শিলিগুড়ি রুটে চলাচলকারী বাস বন্ধ করে দিয়েছে মালিক সমিতি।
জানুয়ারি মাসে চীনে করোনাভাইরাস বিস্তার লাভ করলেও গত ৮ মার্চ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মোট তিনজন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন পুরুষ যারা ইতালির দুটি শহর থেকে দেশে ফিরেছেন। এদের মধ্যে একজনের সংস্পর্শে এসে পরিবারের আরেক নারী সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। এই ঘোষণার পর মুজিববর্ষ উপলক্ষে ১৭ মার্চের নির্ধারিত ঢাকা সফর বাতিল করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। জনসমাগম এড়াতে মুজিববর্ষের সব অনুষ্ঠানও পুনর্বিন্যাস করেছে সরকার। 
বিশ^জুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে এখন পর্যন্ত এর কোনো প্রতিষেধক বা চিকিৎসা আবিস্কৃত হয়নি। ফলে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে সরকার তা মোকাবিলায় কতটা সক্ষম হবে তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।  গত ২১ জানুয়ারি থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট ৫ লাখ ৫২ হাজার মানুষ বিদেশ থেকে এসেছে। এরমধ্যে ইতালি ফেরত দুজনের শরীরে করোনার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ইতালি থেকে আসা এসব যাত্রীদের বিমানবন্দরে পর্যবেক্ষণ না করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। এ ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন বিভাগ দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
বাংলাদেশের করোনাভাইরাস পরিস্থিতির অবনতি না হলেও এর বিস্তার বন্ধ করতে জনসমাগম নিরুৎসাহিত করছে সরকার। সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অ্যাসেম্বলি বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। একের পর এক বন্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। 
ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হচ্ছে বিশ্ব
অধিকাংশ দেশে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে গোটা বিশ্ব। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ বহির্বিশ্বের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। ভ্রমণেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে ঘোষণার পর বিভিন্ন দেশ নানা পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। দেশগুলো স্বেচ্ছায় অন্য দেশ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। করোনা আতঙ্কে ভারত সব ধরনের ভিসা বন্ধ করে দিয়েছে। ইউরোপে সব ধরনের ভ্রমণ স্থগিত ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও লেবানন। ভারতে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, বেসরকারি বিমান সংস্থা নভোএয়ার ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। ভারতে বাংলাদেশিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করায় বিমান সংস্থাগুলো এ ঘোষণা দিয়েছে।
বাংলাদেশ সীমান্তে হাট বন্ধ করে দিয়েছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। করোনা আতঙ্কে এটি বন্ধ করা হয়েছে বলে রাজ্য কর্মকর্তারা জানান। 
সব দেশের ভিসা স্থগিত করেছে ভারত
নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে কয়েকটি বিশেষ ক্যাটাগরির বাইরে বিশ্বের সব দেশের নাগরিকদের ভিসা স্থগিত করেছে ভারত সরকার। ১২ মার্চ ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়ে বলা হয়, ১৩ মার্চ রাত ১২টা থেকে শুরু হয়ে এই স্থগিতাদেশ থাকবে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত। তবে কূটনৈতিক, অফিসিয়াল, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা, চাকরি ও প্রকল্প ভিসা এই আদেশের বাইরে থাকবে বলে জানিয়েছে দেশটি।
একই সময়ের জন্য ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া (ওসিআই) কার্ডধারীদের ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধাও স্থগিত করেছে দেশটির সরকার।  এই সময়ে যদি কোনো বিদেশি নাগরিককে ‘বাধ্যতামূলকভাবে’ ভারতে যেতে হয়, তাহলে তাকে নিকটস্থ ভারতীয় মিশনে যোগাযোগ করতে বলেছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
মহামারির নতুন কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে ইউরোপ
ইউরোপ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের নতুন কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে। 
বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ এর মধ্যেই জানিয়েছে যে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিদিনের সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত বা মৃত্যুর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ইতালি। সেখানে ২৪ ঘণ্টায় ২৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৪ মার্চ পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইতালিতে সব মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৬৬ জন, আর আক্রান্ত হয়েছে ১৭৬৬০জন। স্পেনে মারা গেছেন ১২০জন আর আক্রান্ত হয়েছে ৪২৩১জন। দুই সপ্তাহের জন্য দেশ জুড়ে সতর্কাবস্থা জারি করতে যাচ্ছে দেশটি।
স্পেন ও ইতালির বাইরে ফ্রান্স জানিয়েছে, তাদের দেশে ২৮৭৬জন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং ৭৯জন মারা গেছে। জার্মানিতে ৩০৬২জন রোগী পাওয়া গেছে এবং পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। যুক্তরাজ্যে ৭৯৮জন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিদেশিদের জন্য সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে ডেনমার্ক, চেক রিপাবলিক, শ্লোভাকিয়া, অস্ট্রিয়া, ইউক্রেন, হাঙ্গেরি এবং পোল্যান্ড। বেলজিয়াম, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানির একাংশে স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
সরকারের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন
চীনের উহানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটার প্রায় চার মাস পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাকে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করেছে। এই সময়ে ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই ভাইরাস মোকাবেলায় নানা পরিকল্পনা হয়েছে। যদিও দেশে দেশে এ পরিকল্পনায় পার্থক্য দেখা গেছে বিভিন্ন পর্যায়ে। যেখানে ভালো পরিকল্পনা হয়েছে সেখানে সুফল মিলেছে। যেখানে ভালো পরিকল্পনা করা যায়নি সেখানে বিস্তার ঘটেছে বেশি।
বাংলাদেশে সরকার থেকে শুরু করে সামগ্রিকভাবে সংশ্লিষ্ট সব মহলই এই সময়ে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছে। সুযোগ পেয়েছে প্রস্তুতি গ্রহণের। এর ফলে এখন পর্যন্ত দেশে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে প্রস্তুতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় দুর্বলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। বিশেষ করে করোনাভাইরাসে উচ্চমাত্রায় সংক্রমিত দেশগুলো থেকে আসা যাত্রীরা যেভাবে হোম কোয়ারেন্টাইনের সুযোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে তা নিয়ে এখন উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে সবাই। সরকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, হোম কোয়ারেন্টাইন মানছে না বিদেশফেরত মানুষ। ফলে গণবিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে আইনগত অবস্থানের জানান দিতে হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে। এ ছাড়া প্রশ্ন আছে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও নমুনা পরীক্ষার পরিকল্পনা নিয়েও।
অনেকেই মনে করছে, কোয়ারেন্টাইনের পরিকল্পনাটি সঠিক হয়নি; এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে আরো সতর্ক হওয়া দরকার ছিল আগে থেকেই। বিশেষ করে দেশের সামাজিক ব্যবস্থা ও মানুষের আচরণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যারা দেশের বাইরের অধিকতর আক্রান্ত দেশগুলো থেকে এসেছে তাদের বাসাবাড়িতে যেতে দেওয়া ঠিক হয়নি। বরং উহান থেকে আগতদের মতোই উচ্চমাত্রায় আক্রান্ত দেশগুলো থেকে আগতদের বন্দর থেকেই সরকারি কঠোর ব্যবস্থাপনায় কোয়ারেন্টাইনের আওতায় নেওয়া উচিত ছিল। তাতে করে দেশে ভাইরাসটির বিস্তারের ঝুঁকি অনেক কমে যেত। বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে দুর্বল কোনো পরিকল্পনা থাকা যাবে না। সরকারি ব্যবস্থাপনায় কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করা সার্বিক দিক থেকে কিছুটা কঠিন হলেও এটা করা দরকার। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন না হলে আমাদের দেশের মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়। এ ছাড়া ফ্লাইটগুলোও নিয়ন্ত্রণ করা যায় আরো কঠোরভাবে। 
সরকার চাইলেই অন্যান্য দেশের মতো সামরিক বাহিনীর সহায়তা নিয়ে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়াম বা এমন  কোনো সংরক্ষিত এলাকায় অস্থায়ী ফিল্ড ডরমিটরি বা হাসপাতাল প্রস্তুত করতে পারত। সেখানে ১৪ দিন তাদের নজরদারিতে বা তদারকিতে রাখা সম্ভব ছিল। যেমনটা চীনফেরত ৩১২ জনকে রাখা হয়েছিল। ওই সিদ্ধান্তটা খুবই সঠিক ও কার্যকর ছিল। তিনি আরো বলেন, এমনকি ঢাকা ছাড়াও দেশের অন্যান্য বন্দর হয়ে প্রবেশকারীদেরও স্থানীয়ভাবে সরকারি কোয়ারেন্টাইনে রাখার সুযোগ ছিল বা এখনো রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রতি জেলায় যে স্টেডিয়াম বা সরকারি বড় বড় অডিটরিয়াম রয়েছে সেগুলোও কাজে লাগানো যায় সহজেই।
এ ছাড়া পরীক্ষার পরিকল্পনা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। কেউ কেউ বলছে, শুধু সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) হাতে এই পরীক্ষা না রেখে এখন থেকেই আরো একাধিক প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগালে ভালো হতো।
এদিকে প্রশ্ন উঠেছে স্কুল বন্ধ নিয়েও। কেউ বলছেন, এ ক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনা সঠিক কি না সেটা আরো বিবেচনা করা দরকার। বিশেষ করে পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে আগাম সতর্কতা হিসেবে এখনই স্কুল বন্ধ করলে বরং ঝুঁকি কমবে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।
ঝুঁকি এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের উৎপত্তি আমাদের দেশে নয়। ফলে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি দেশের বাইরে থেকেই আসছে, আসবে। এই অবস্থায় বিদেশ থেকে কেউ ভাইরাসটি নিয়ে আসছেন কি না, তা চিহ্নিত করার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। এখন পর্যন্ত যে তিনজন আক্রান্তের খবর এসেছে, তাঁদের দুজন বিদেশ থেকে আগত। একজন তাঁদের সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হয়েছেন। অর্থাৎ প্রথমবার স্ক্রিনিংয়ে তাঁদের চিহ্নিত করা যায়নি। তাই বিদেশ থেকে আগতদের মাধ্যমে যাতে ভাইরাসটি ছড়াতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। চীনসহ বিভিন্ন দেশ আক্রান্তদের বিচ্ছিন্ন করে, স্বল্প সময়ে বিপুল রোগীর জন্য হাসপাতাল প্রস্তুত করতে পেরেছে। আমাদের সেই সক্ষমতা নেই। তাই সতর্কতাই আমাদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হবে। এদিকে হোম কোয়ারেন্টিন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। 
তারা বলছেন, কেন্দ্রীয়ভাবে বা সরকারি ব্যবস্থাপনায় কোয়ারেন্টিন করতে পারলে ভালো হতো। বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশে এ ধরনের অবকাঠামো এখনো প্রস্তুত করা যায়নি। তাই বাসায় যে কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা চালু আছে, তা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা দরকার। এই বিষয়ে কোনো হেলাফেলা করা যাবে না। কেউ নির্দেশনা ভেঙে বাইরে বের হচ্ছে কি না, সেটা দেখতে হবে।
চাপের মুখে অর্থনীতি 
দেশে প্রবাসী আয় ছাড়া অর্থনীতির সব সূচক এখন নিম্নমুখী। করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক প্রভাবে গত মাসে বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান দ্বার চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য কমেছে। চীনে পণ্য রফতানি অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে। রাজস্ব আয়ে যে নেতিবাচক প্রভাব চলছে, সেটিতেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। কাঁচামালের সংকটে কারখানায় উৎপাদনও ব্যাহত হতে শুরু করেছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং জনশক্তি, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির ৯৫ শতাংশ ও পণ্য রফতানির ৯০ শতাংশ বাজারে করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে। চীনে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বিশ্বজুড়ে তা ছড়িয়ে পড়ায় জনশক্তি ও পণ্য রফতানি নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলছেন, করোনাভাইরাস যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। আক্রান্ত দেশের মধ্যে চীনে রফতানি কমার অর্থ হলো, নতুন করে যেসব দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানেও সামনে রফতানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ, এসব দেশে মানুষের কেনার চাহিদা কমে গেছে। আর করোনাভাইরাস যাতে দ্রুত ছড়াতে না পারে, সেটিই এখন সবচেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কারণ, প্রাদুর্ভাবের ওপর জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির অবস্থা নির্ভর করে।
চীন থেকে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমলেও এত দিন কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়নি। আগের মজুত ও স্থানীয় উৎস থেকে সংগ্রহ করে কারখানা সচল রেখেছেন উদ্যোক্তারা। তবে অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ উৎপাদন সময় কমিয়ে এনেছে। চীনের রফতানিকারকেরা নতুন চালানের কাঁচামাল সরবরাহ করতে শুরু করলেও তা এখনই পাচ্ছেন না কারখানার মালিকেরা। নতুন চালানের কাঁচামাল হাতে পেতে রফতানিকারকদের অপেক্ষা করতে হবে মার্চের শেষে বা এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত। তাতে এ মাসেই উৎপাদনমুখী খাতে প্রভাব পড়েছে।
আয় বাড়লেও প্রবাসে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা দুই বছর ধরে কমছে। এখন আবার করোনাভাইরাসের প্রভাব সাময়িকভাবে এই খাতেও পড়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশের ভ্রমণকারীদের দেশটিতে প্রবেশে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে কুয়েত ও কাতার। তাতে দেশ দুটিতে জনশক্তি রফতানি বন্ধ রয়েছে। 
 এদিকে দেশের রাজস্ব আয় এমনিতেই নিম্নমুখী। ফেব্রুয়ারিতে শুধু চীন থেকে আমদানি কমায় জানুয়ারির তুলনায় প্রায় ২২৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় কমেছে। আমদানি পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের বড় প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের আট মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১১ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা ঘাটতিতে আছে প্রতিষ্ঠানটি। গত বছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি খুব সামান্যই, দশমিক ৩ শতাংশ। 
পুঁজিবাজারেও করোনার ছোবল 
করোনার বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশের প্রধান দুই খাত পুঁজিবাজার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। করোনার প্রভাবে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ অবস্থায় নেমে এসেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক। ৯মার্চ এক দিনে ২৭৯ পয়েন্ট হারিয়েছে ডিএসইর প্রধান সূচক। 
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০১০ সালের মহাধসের পর দেশের ৯ মার্চের মতো পুঁজিবাজারে এমন নাজুক অবস্থা আর দেখা যায়নি। করোনাভাইরাস নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এ কারণে দেশি-বিদেশি সব ধরনের বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়িয়েছেন। যার ফলে শেয়ারবাজারে বড় দরপতন হয়েছে। এর প্রভাবে ৯ মার্চ এক দিনেই ২৭৯ পয়েন্ট সূচক হারিয়েছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসই। প্রথম ৬ মিনিটের লেনদেনে ডিএসইর সূচক হারায় ১০০ পয়েন্ট। ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট রাকিবুর জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের আতঙ্কের প্রভাব আমাদের দেশে পড়েছে। বিশেষ করে যেসব শিল্প কলকারখানায় চীনের বিনিয়োগ ছিল বা চীনের কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল ছিল ওই সব প্রতিষ্ঠানে চীনের করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওই সব প্রতিষ্ঠান। এরওপর নতুন করে দেশে তিনজন করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হওয়ার পর দেশের পুঁজিবাজারের ওপর প্রভাব পড়েছে। ডিএসইর সাবেক এ প্রেসিডেন্ট বলেন, গ্রাহক বারবার আস্থায় হোঁচট খাচ্ছেন। গত ১৪ ও ১৫ জানুয়ারি পুঁজিবাজারে দরপতন হয়েছিল। ১৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি প্রণোদনা দেয়া হয়েছিল। এ দিকে করোনাভাইরাসের প্রভাব পুঁজিবাজারের মতো আর্থিক বাজারেরও ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। রাজধানীতে বেশির ভাগ ব্যাংকের শাখায় লেনদেন অর্ধেকে নেমে এসেছে। একান্ত প্রয়োজন না হলে কেউ লেনদেন করতে আসছেন না। 
দুই সপ্তাহ স্কুল বন্ধ রাখার দাবি বিএনপির
বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়ানো নভেল করোনাভাইরাস এখন বাংলাদেশে চলে আসায় সব স্কুল দুই সপ্তাহ বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি করেছেন। 
তিনি বলেছেন, “আমরা মনে করি, স্কুল-কলেজ, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। অন্ততঃ প্রথম দিকে দুই সাপ্তাহ বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। তারপর অবস্থা দেখে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।” তবে সরকার তাদের ওই দাবি এখন পর্যন্ত আমলে নেয়নি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধা রাখার মত পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। তবে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হলে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতেই তা নেওয়া হবে।
সার্ক দেশগুলোকে এক হওয়ার প্রস্তাব মোদির
নভেল করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সার্কভুক্ত দেশগুলোকে এক হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
এক টুইটে তিনি বলেছেন, “করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে যৌথভাবে একটি শক্তিশালী কৌশল প্রণয়নের জন্য আমি সার্কভুক্ত দেশগুলোর নেতৃত্বের কাছে প্রস্তাব রাখছি।” বিমান পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ইরানের কওম নগরে আটকা পড়া ৪৪ জন ভারতীয়কে সরিয়ে আনার পর ১৩ মার্চ প্রধানমন্ত্রী মোদির এই প্রস্তাব আসে।
তিনি লিখেছেন, “আমাদের নাগরিকদের কীভাবে সুস্থ রাখা যায়, সে বিষয়ে আমরা ভিডিও কনফারেন্সে আলোচনা করতে পারি। একসঙ্গে আমরা বিশ্বের সামনে একটি উদাহরণ তৈরি করতে এবং একটি স্বাস্থ্যকর গ্রহ গড়ে তুলতে অবদান রাখতে পারি।” চীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতেই প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। 
করোনা যেভাবে নিয়ন্ত্রণে নিলো হংকং 
চীনের পর প্রথম যেই কয়েকটি দেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত করা গিয়েছিল, তার মধ্যে একটি হচ্ছে হংকং। চীনের সাথে লাগোয়া এই স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলটিতে প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয় জানুয়ারির ২৩ তারিখ। কিন্তু এখন পর্যন্ত হংকংয়ে মাত্র ১২২ জন করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন এবং এর প্রকোপে মারা গেছে মাত্র তিন জন। হংকং কীভাবে নাগরিকদের মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়ানো রোধ করলো, সেবিষয়ে বিবিসি বাংলার সাথে কথা বলেছিলেন হংকংনিবাসী বাংলাদেশি প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুনিরুজ্জামান, যিনি সাত বছর ধরে হংকংয়ে রয়েছেন। তিনি বলেন, ভাইরাস প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে হংকংকে সবচেয়ে বেশি যেটা সাহায্য করেছে তা হলো তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা। ২০০৩ সালের সার্স এর সময় চীনের পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল হংকং। হংকংয়ের সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত সচেতনতা মেনে চলার দিক থেকে যথেষ্ট সচেতন। এখানে প্রায় শতভাগ মানুষের মুখে মাস্ক পরা। সবার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চলছে কিন্তু তারা চেষ্টা করছে ভিড়, জনসমাগম এড়িয়ে চলতে। সাধারণ জ্বর সর্দি থাকলেও কর্মক্ষেত্রে আসছে না।
সরকারিভাবে যথেষ্ট সতর্কতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিটি ভবনের প্রবেশপথে, সেটি রেস্টুরেন্ট, আবাসিক ভবন বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যাই হোক না কেন, সেসব জায়গায় দেখা যায় নিরাপত্তা রক্ষীরা সবার শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করছে, মাস্ক না পড়ে কাউকে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। আবার আমার অফিসের বিল্ডিংয়ের প্রত্যেকটি গেইটের সামনে হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখা রয়েছে। যারাই বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করবেন, তাদের সবারই হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুয়ে ঢুকতে হবে। আর প্রত্যেক ভবনের গেইটেই করোনাভাইরাস ছড়ানো ঠেকাতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া রয়েছে। 
হংকংয়ে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে যেসব সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার আগেই নেয়া হয়েছিল। চীন থেকে হংকংয়ে প্রবেশ করা প্রত্যেককে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে রাখা সরকারিভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে হংকংয়ে, এখন আইনে পরিণত করা হয়েছে। কোয়ারেন্টিন যথাযথভাবে হচ্ছে কিনা তা মনিটর করছে হংকংয়ের পুলিশ প্রশাসন।
এখানে সরকারিভাবে কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং হোম কোয়ারেন্টিন বা ঘরে কোয়ারেন্টিনেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। যারা ঘরে কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন তাদের নিয়মিত ফোন করে খোঁজখবর রাখছে প্রশাসন।
জানুয়ারির শুরু থেকে সব পাবলিক লাইব্রেরি, পাবলিক জিমনেসিয়াম বন্ধ রয়েছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে। সরকারি অফিসগুলোতে কাজের পরিধি কমিয়ে দেয়া হয়েছে। আর যেসব অফিসে সম্ভব সেসব অফিসে কর্মীদের ঘরে থেকে কাজ করতে বলা হয়েছে।
তাইওয়ানে করোনা ভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা এখনো ৫০ এর নিচে।  অথচ উহানের খুব কাছে হওয়ায় সেখানে ভাইরাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল।  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাইওয়ান ভাইরাসকে আটকে দিতে সক্ষম হয়েছে। উহানে করোনা প্রাদুর্ভাবের পর বলা হয়েছিল, চীনের মূলভূখণ্ডের বাইরে তাইওয়ানে এই ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হবে।  অথচ চীনে ৮০ হাজারের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হলেও তাইওয়ানে এই সংখ্যা এখনো পঞ্চাশের নিচে। 
‘পাবলিক হেল্থ পলিসি’ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টানফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ ডা. জেসন ওয়াং বলেন, তাইওয়ান সম্ভাব্য সংকটের ভয়াবহতা আগেই বুঝতে পেরেছিল এবং ভাইরাসের চেয়ে এগিয়ে থাকতে সক্ষম হয়েছে। 
এদিকে উহানে করোনা প্রাদুর্ভাবের পরপরই তাইওয়ান সরকার চীনের মূলভূখণ্ড ছাড়াও হংকং, ও ম্যাকাওর উপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে।  এছাড়া ওই সময় সরকার সার্জিক্যাল মাস্ক রফতানি নিষিদ্ধ করে, যেন তাদের মজুদে সংকট দেখা না দেয়।  এছাড়া তাইওয়ান সরকার ন্যাশনাল হেল্থ ইনস্যুরেন্স এবং ইমিগ্রেশন ও কাস্টম বিভাগ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো সমন্বয় করে।  এর মাধ্যমে তারা জনগণের ভ্রমণের তথ্য নিয়ে শুরুতেই সম্ভাব্য রোগীদের শনাক্ত করে ফেলে। 
তাইওয়ানে যারা ভ্রমণ করেছেন তাদের জন্যও একটি প্রোগ্রাম চালু করা হয়।  সেখানে একটি ‘কিউআর কোড’ স্ক্যান করে ভ্রমণকারীরা তাদের ভ্রমণের ও অসুস্থতার লক্ষণ সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে। তারপর ভ্রমণকারীদের কাছে তাদের স্বাস্থ্যের বর্তমান অবস্থা নিয়ে একটি ম্যাসেজ যায়।  এভাবে কাস্টম কর্মকর্তারা নিম্ন ঝুঁকির ভ্রমণকারীদের ছেড়ে দিয়ে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকাদের পরীক্ষায় অধিক গুরুত্ব দিতে পেরেছেন। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৬ মার্চ ২০২০ প্রকাশিত)