বৃহস্পতিবার, ২৪-সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:৪৮ অপরাহ্ন
  • আন্তর্জাতিক
  • »
  • ‘আমি আগুন দেখেছি, মুহূর্তেই সবকিছু টুকরো টুকরো হয়ে মাটিতে পড়ল’

‘আমি আগুন দেখেছি, মুহূর্তেই সবকিছু টুকরো টুকরো হয়ে মাটিতে পড়ল’

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৫ আগস্ট, ২০২০ ১০:১২ অপরাহ্ন

শীর্ষনিউজ ডেস্ক : লেবাননের বৈরুতের বন্দর এলাকায় গুদামে মহাবিস্ফোরণে বেঁচে যাওয়াদের উদ্ধারে ব্যাপকভাবে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। মঙ্গলবার (০৪ আগস্ট) ওই বিস্ফোরণ ঘটে।

বিস্ফোরণে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত ৪ হাজারের বেশি। নিখোঁজ কতোজন তার সঠিক কোনো সংখ্যা জানা যায়নি। বিস্ফোরণে পুরো শহর কেঁপে ওঠে। ধোঁয়ায় ঢেকে যায় বন্দর এলাকা।

প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন বলেন, গুদামে ২ হাজার ৭শ’ ৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মজুদ ছিল। ওই গুদাম থেকে বিস্ফোরণ হয়েছে। সেখানে অনিরাপদে রাসায়নিক মজুদ রাখা হয় বলেও জানান তিনি। অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট কৃষিতে সার এবং বিস্ফোরক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট। বুধবার (০৫ আগস্ট) থেকে শোক পালন চলছে। বুধবার মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠকের আউন বলেন, বৈরুতে মঙ্গলবার রাতে ঘটে যাওয়া ভয়ানক পরিস্থিতি বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার জানা নেই। বিস্ফোরণ পুরো শহরকে ক্ষতিগ্রস্ত-ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।

‘দুর্ঘটনার পর থেকে যারা উদ্ধার, সহায়তায় অংশ নিয়েছেন তাদের বীরত্বকে সম্মান জানাই। বলেন আউন। বুধবার স্থানীয় সময় বিকেল ৬টায় বন্দরের একটি গুদামে অগ্নিকাণ্ডে এ বিস্ফোরণ ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী হাদি নাসরাল্লাহ বলেন, আমি আগুন দেখেছি। বিস্ফোরণ হতে পারে তা মাথায় আসেনি। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমি শ্রবণ শক্তি হারিয়ে ফেলি। আমার মনে হলো খারাপ কিছু একটা হচ্ছে। আমি তখন গাড়িতে। দোকান, বাড়িঘর, গাড়ির গ্লাসগুলো মুহূর্তে টুকরো টুকরো হয়ে মাটিতে পড়ে গেলো।’

বিস্ফোরণের সময় ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ৫ মিনিটের দুরত্বে ছিলেন মরোক্কান এজেন্সি ফর সাসটেইনাবল এনার্জির সদস্য লিনা সিনজাব। বলেন, বিল্ডিং কাঁপতে শুরু করলো। মনে হচ্ছে বিল্ডিং পড়ে যাবে। এমন পরিস্থিতি। ঝাঁকুনির মাত্রা এত বেশি ছিল, কাঁচের যতো দরজা-জানালা ছিল সব খুলে মাটিতে পড়ে যায়।

ভূমধ্যসাগরের উত্তরাঞ্চলীয় সাইপ্রাস উপদ্বীপ থেকেও ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। জায়গাটি বৈরুতের ঘটনাস্থল থেকে ১৫০ মাইল দূরে। সেখানকার বাসিন্দারা সাধারণ ভূমিকম্প মনে করেছিলেন।

‘বিস্ফোরণের পরপরই মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে। সাইরেন বাজিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে আসতে থাকে অ্যাম্বুলেন্স। আশপাশের রাস্তাজুড়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় ভাঙা গ্লাস। দুর্ঘটনার শিকার মানুষদের নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স বেরোতে পারছিল না। পুরো বিশৃঙ্খল একটা পরিস্থিতি। কোনো কিছুই তখন ঠিক মতো হচ্ছিল না।’ বলেন এক প্রত্যক্ষদর্শী। 

স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষ আটকে আছে। বিল্ডিং এবং গাড়ির ভাঙা অংশে চারপাশ সয়লাব। হাসপাতালগুলোতে উপড়ে পড়া ভিড়। হাসপাতালে লোক ধারণের আর জায়গা নেই। লেবানন রেড ক্রসের প্রধান জর্জ কেটানি বলেন, ব্যাপক ভয়াবহতা। সব জায়গায় আহত, নিহত মানুষ আর ধ্বংস স্তূপ।’

‘লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে মরদেহ রাখার ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করছে রেডক্রস। নিখোঁজদের খুঁজে অনুসন্ধান চলছে।’ শতাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

লেবাননের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হামাদ হাসান জানান, আহতদের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত শয্যা নেই। গুরুতর আহতদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব দেখা দিয়েছে।

‘বহু শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে।’ মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

লেবাননের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কীভাবে ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা ঘটলো তা অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে।’ 

অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট সাধারণত কৃষি ক্ষেত্রে সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। খনিতে বিস্ফোরণের জন্য প্রধান উপাদান এটি। নিজে থেকে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বিস্ফোরিত হতে পারে না। আগুনের সংস্পর্শে এলে রাসায়নিক পদার্থটি জ্বলে ওঠে। যখন জ্বলে তখন তার থেকে ক্ষতিকর নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং অ্যামোনিয়া গ্যাস বের হয়। অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট রাসায়নিক মজুদ করার জন্য ফায়ার প্রুফড জায়গা নির্ধারণ করতে হয়। ওই জায়গায় কোনো নালা, পাইপ বা অন্য কোনো ছিদ্র থাকতে পারবে না। যা দিয়ে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বেরিয়ে যেতে পারে।   

সাবেক ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ফিলিপ ইনগ্রাম বলেন, জ্বালানি তেলের সস্পর্শে এলে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বিস্ফোরণ হবে। লেবাননের সুপ্রিম ডিফেন্স কাউন্সিল জানিয়েছে, বিস্ফোরণে জড়িতদের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হবে।

এমন সময় বৈরুতে বিস্ফোরণ ঘটলো যখন লেবানন করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত। আক্রান্তদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির হাসপাতালগুলো। এখন হাজার হাজার আহতদের চিকিৎসা দিতে রীতিমত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তারা।

এছাড়া, মারাত্মক আর্থিক মন্দার মধ্যে রয়েছে লেবানন। দেশটির আমদানি করা অধিকাংশ শস্য রাখা হয়েছে বন্দর নগরীর বিভিন্ন গুদামে। ওই এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ায় খাদ্য সংকটে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় কবে নাগাদ বন্দর আবার চালু হবে তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বহু বাড়ি ঘর ধ্বংস হয়ে গেছ। ৩ লাখের মতো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বৈরুতের গভর্নর মারওয়ান আবুউদ।

লেবাননের যেসব এলাকার মানুষ নিরাপদে আছেন তারা ঘরবাড়ি হারানো মানুষের আশ্রয়ে এগিয়ে এসেছেন।

প্রেসিডেন্ট আউন জরুরি তহবিল থেকে ৬ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার অনুদানের ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৫শ’ কোটির বেশি হবে।

দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী হামাদ হাসান জানান, সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। কিন্তু আর্থিক সংকটের মধ্যে এ বিস্ফোরণ আমাদের নতুন পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে।

বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটেছে ২০০৫ সালে যেখানে লেবাননের সাবেক প্রেসিডেন্ট রাফিক হারিরিকে গাড়িবোমা হামলায় হত্যা করা হয় তার কাছেই। আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে হারিরি হত্যার বিচার চলছে। হামলার পরিকল্পনায় ৪ ব্যক্তি অভিযুক্ত। 

বিস্ফোরণের আগে দেশটিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ সরকার করোনা পরিস্থিতি যথাযথভাবে মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত দেশটিতে চলা গৃহযুদ্ধ থেকেও বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি ভয়াবহ বলে জানান আন্দোলনকারীরা। 

বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অনেকেই দেশটির এলিট রাজনৈতিকদের দায়ী করছেন। রাজনীতিবীদরা নিজের স্বার্থ রক্ষায় জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে দেশটির জনগণ বিদ্যুৎ সংকট, নিরাপদ পানির সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবা সংকটে ভুগছেন।

ইরাইলের সঙ্গেও দেশটির সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে। তেল আবিব জানিয়েছে গেলো সপ্তাহে তারা ইসরাইলি সীমায় হিজবুল্লাহর একটি হামলা পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছে। ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ লেবাননের জোট সরকারের অংশীদার।

ইসরাইলের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা চললেও বৈরুতে বিস্ফোরণের সঙ্গে তেল আবিবের কোনো সম্পৃক্ত নেই বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন ইসরাইলি এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
শীর্ষনিউজ/এসএসআই