shershanews24.com
ব্যাংক কেলেঙ্কারির ধারাবাহিকতায় এবার এনআরবি-জনতা, আত্মসাত ৯৪০০ কোটি টাকা
বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২০ ০৭:৪৪ অপরাহ্ন
shershanews24.com

shershanews24.com

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারির পর এবার সামনে এসেছে এনআরবি ও জনতা ব্যাংকের দুই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) প্রায় ৯ হাজার ৪০০ শ’ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের কাহিনী। এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের এমডির দায়িত্বে থাকাকালে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নানা কৌশলে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন প্রশান্ত কুমার হালদার। এনন টেক্সের নামে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ৫ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা লুটপাটের সঙ্গে জনতা ব্যাংকের বর্তমান এমডি মো. আবদুছ ছালাম আজাদের সম্পৃক্ততা পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এনআরবি গ্লোবালের এমডি প্রশান্ত কুমার হালদারের লুটপাটে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার ইন্ধন ও সহযোগিতার তথ্য মিলেছে। হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাত করতে নামে-বেনামে অসংখ্য কাগুজে কোম্পানি বানিয়েছেন প্রশান্ত হালদার। নানা কৌশলে দখল করেছেন ব্যাংকবহির্ভূত ৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠান দখল করতে যেমন নামে-বেনামে অসংখ্য কোম্পানি খুলেছেন, তেমনি শেয়ারবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কিনেছেন, দখল করা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের নামে টাকাও সরিয়েছেন। এমনকি দেশের বাইরেও কোম্পানি খুলেছেন।
প্রতিষ্ঠানগুলো দখলের সময় প্রশান্ত হালদার প্রথমে রিলায়েন্স ফাইন্যান্স এবং পরে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। আর এসব কাজে তাকে সব ধরনের সমর্থন ও সহায়তা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন-এই দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখের সামনেই সবকিছু ঘটেছে। এই সুযোগে রিলায়েন্স ফাইন্যান্সসহ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে চম্পট দিয়েছেন প্রশান্ত হালদার। আর আমানতকারীরা দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন টাকা ফেরত পাওয়ার আশায়। 
দুদকের ক্যাসিনো ও মেগা দুর্নীতিবিরোধী টিম প্রশান্ত কুমারের লাগামহীন দুর্নীতির তথ্যপ্রমাণ নিয়ে কাজ করছে। পৌনে তিনশ (২৭৫) কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ৮ জানুয়ারি পি কে হালদারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাত ও পাচারের ঘটনায় প্রশান্তসহ ২০ জনের সব সম্পদ ক্রোক, ব্যাংক হিসাব ও পাসপোর্ট জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থেকে ঢালাওভাবে অর্থ লুটের অভিযোগের পাশাপাশি প্রশান্ত হালদারের বিরুদ্ধে পরোক্ষভাবে ক্যাসিনো বা বিভিন্ন জুয়াড়ি গ্রুপের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ এসেছে। এমডির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ব্যাংক-বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের মাফিয়া ডন হয়ে উঠেছিলেন প্রশান্ত। তিনি পরোক্ষভাবে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে নানা কাজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সেখানে লুটপাটের স্বর্গরাজ্য কায়েম করেছিলেন। দুর্নীতির টাকায় প্রশান্ত বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট ছাড়াও বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার কিনেছেন, ব্যাংকে এফডিআরসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেছেন। বিদেশে পাচার করেছেন হাজার হাজার কোটি টাকা। এক প্রশান্তের নামেই সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার সম্পদ- বিষয়টি রীতিমতো বিস্ময়কর অনুসন্ধানকারীদের কাছে। পিপলস লিজিংয়ের আমানতকারীদের কাছ থেকে অর্থ উত্তোলন, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিক্রি, কোম্পানির পোর্টফোলিও থেকে গ্রাহকদের মার্জিন লোনের বিপরীতে শেয়ার বিক্রি ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহের নামে এ অর্থ আত্মসাত করা হয়। রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সাবেক এমডি প্রশান্ত কুমার হালদার এই প্রতিষ্ঠানের এমডি থাকার সময় তার আত্মীয়স্বজনকে আরও বেশ কয়েকটি লিজিং কোম্পানিতে ইনডিপেন্ডেন্ট পরিচালক নিযুক্ত করেছিলেন। পিপলস লিজিংয়ে আমানতকারীদের তিন হাজার কোটি টাকা নানা কৌশলে আত্মসাত করে কোম্পানিটিকে অচল করে দেওয়া হয়েছে। পি কে হালদারের দখল করা চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)। এর মধ্যে গত বছরের জুলাইয়ে পিপলস লিজিং অবসায়নের জন্য অবসায়ক নিয়োগ করা হয়েছে। চারটি প্রতিষ্ঠান দখলে নিলেও কোনো প্রতিষ্ঠানেই পি কে হালদারের নিজের নামে শেয়ার নেই। সব শেয়ার অন্যদের নামে, কিন্তু ঘুরেফিরে আসল মালিক পি কে হালদারই। নিজেকে আড়ালে রাখতে এমন কৌশল নেন তিনি। নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে পি কে হালদার গড়ে তুলেছেন একাধিক প্রতিষ্ঠান, যার বেশির ভাগই কাগুজে। এর মধ্যে পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল, পিঅ্যান্ডএল অ্যাগ্রো, পিঅ্যান্ডএল ভেঞ্চার, পিঅ্যান্ডএল বিজনেস এন্টারপ্রাইজ, হাল ইন্টারন্যাশনাল, হাল ট্রাভেল, হাল ট্রিপ, হাল ক্যাপিটাল, হাল টেকনোলজি অন্যতম। এর বাইরে আনন কেমিক্যাল, নর্দান জুট, সুখাদা লিমিটেড, রেপটাইল ফার্মসহ আরও একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কাগজে-কলমে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় আছেন পি কে হালদারের মা লীলাবতী হালদার, ভাই প্রিতিশ কুমার হালদার ও তার স্ত্রী সুস্মিতা সাহা, খালাতো ভাই অমিতাভ অধিকারী, অভিজিৎ অধিকারীসহ বিভিন্ন আত্মীয়স্বজন। আবার ব্যাংক এশিয়ার সাবেক এমডি ইরফানউদ্দিন আহমেদ ও সাবেক সহকর্মী উজ্জ্বল কুমার নন্দীও আছেন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায়। এত দিন ধরে বহাল তবিয়তে থাকলেও পি কে হালদারের নাম সামনে আসে ক্যাসিনোবিরোধী সাম্প্রতিক শুদ্ধি অভিযানের সময়। এ সময় দুদক যে ৪৩ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে, তাদের মধ্যে পি কে হালদার একজন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গত ১৪ নভেম্বর হাজির হতে নির্দেশ দিয়েছিল দুদক। তার আগে ৩ অক্টোবর তার বিদেশযাত্রায়ও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। কিন্তু এরইমধ্যে সকলের চোখ এড়িয়ে বিস্ময়করভাবে দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন প্রশান্ত হালদার। বেশির ভাগ অর্থও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। দুদকের অনুরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) পি কে হালদারের অর্থ লেনদেন নিয়ে এক বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তাতেও তার ব্যাপক অনিয়ম ও জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পি কে হালদার ও তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হয় প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসেবে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা, পি কে হালদারের হিসাবে ২৪০ কোটি টাকা এবং তার মা লীলাবতী হালদারের হিসাবে জমা হয় ১৬০ কোটি টাকা। তবে এসব হিসাবে এখন জমা আছে মাত্র ১০ কোটি টাকার কম। অন্যদিকে পি কে হালদার এক ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকেই ২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ বের করে নিয়েছেন। এসব টাকা দিয়েই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা কেনা হয়। তবে ঋণ নেওয়া পুরো টাকার হদিস মিলছে না। নিয়ন্ত্রণ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্ষদে বসেছেন পি কে হালদারের একসময়ের সহকর্মী ও আত্মীয়রা। আর মালিকানা পরিবর্তনে সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
পি কে হালদারের নামে ব্যাংক এশিয়া, এনআরবি গ্লোবাল, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ কয়েকটি ব্যাংকের হিসাবে বিভিন্ন সময়ে জমা হয় ২৪০ কোটি টাকা। হাল ট্রাভেল (হাল ট্রিপ) এজেন্সির চেয়ারম্যান প্রশান্ত হালদার নিজে। বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা হাল ট্রিপের হিসাবে জমা হয় ৪০৭ কোটি টাকা। ফার্স্ট কমিউনিকেশনের পরিচালকও তিনি। এর ব্যাংক হিসাবে জমা হয় ৮২৩ কোটি টাকা। সুখাদা লিমিটেডে পি কে হালদারের শেয়ার ৯০ শতাংশ ও মা লীলাবতী হালদারের ৫ শতাংশ। এ হিসেবে ২০ কোটি ৪১ লাখ টাকা জমা হয়। লীলাবতী হালদারের ৩টি ব্যাংক হিসাবে জমা হয় ১৬০ কোটি টাকা। রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে নেওয়া ৩ গ্রাহকের ঋণের ৬৩ কোটি টাকাও লীলাবতী হালদারের হিসাবে জমা হয়। ওই সময়ে রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি ছিলেন প্রশান্ত হালদার। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের হিসাবে এত টাকা জমা হওয়া নিয়ে কোনো ব্যাংক কখনোই প্রশ্ন তোলেনি।
ভাই প্রিতিশ কুমার হালদারের ব্যাংক হিসাবে ৫০ লাখ টাকা জমা থাকলেও তার নামে রয়েছে হাল টেকনোলজি, হাল ট্রিপ টেকনোলজি, পিঅ্যান্ডএল হোল্ডিং, মাইক্রো টেকনোলজিস, নর্দান জুটসহ আরও নানা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ৫০০ কোটি টাকার বেশি জমা হয়, ঋণও রয়েছে। ব্যাংক এশিয়ার ধানমন্ডি শাখায় পি কে হালদারের দুটি হিসাবে বিভিন্ন সময়ে ২৪৪ কোটি টাকা জমা হয়। এই হিসাব থেকে রিলায়েন্স ব্রোকারেজে যায় ২০৫ কোটি টাকা, লীলাবতী হালদারের হিসাবে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা, পিঅ্যান্ডএল অ্যাগ্রোতে ১১ কোটি টাকা, আনন কেমিক্যালে ৩ কোটি ও এফএএস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টে যায় ৪০ লাখ টাকা।
২০১৫ সালে পিপলস লিজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয় আনান কেমিক্যাল। এফএএস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট ও রিলায়েন্স ব্রোকারেজের মাধ্যমে এই শেয়ার কেনা হয়। লীলাবতী হালদারের ব্যাংক হিসাবে বিভিন্ন সময়ে ১৬০ কোটি টাকা জমা হয়। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে তার হিসাবটি ২০১৩ সালের ৭ মার্চ খুলে ওই বছরের ২৬ আগস্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই ৫ মাসে ওই হিসাবে ১৯ কোটি টাকা জমা করে ইমেক্সকো, বর্ণা ও ওরিয়াল নামের তিনটি প্রতিষ্ঠান। আরেকটি হিসাবে জমা করে ৯ কোটি টাকা, যা ৩০ দিনের মধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ তিন প্রতিষ্ঠানই রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে ৬৩ কোটি টাকা ঋণ পায়। ওই সময়ে পি কে হালদার ছিলেন রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি। পুরানা পল্টনের ইস্টার্ন ট্রেড সেন্টারের ১০ তলায় এ তিন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়, যা গত চার মাস ধরে বন্ধ।
হাল ট্রাভেল সার্ভিস মূলত ট্রাভেল এজেন্সি প্রতিষ্ঠান, যা হাল ট্রিপ নামে পরিচিত। এর চেয়ারম্যান পি কে হালদার ও এমডি তাজবীর হাসান। পি কে হালদারের শেয়ারই ৯০ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি ব্যাংক হিসাবে বিভিন্ন সময় জমা হয় ৪০৭ কোটি টাকা।
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে হাল ট্রাভেলের মালিকানায় যুক্ত হোন পি কে হালদার। প্রতি মাসে সর্বোচ্চ তিন কোটি টাকার টিকিট বিক্রি হয়। অথচ ৩ বছরে কীভাবে ৪০০ কোটি টাকা জমা হলো সে প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইন্টারনেট গেটওয়ে প্রতিষ্ঠান (আইজিডব্লিউ) ফার্স্ট কমিউনিকেশনের পরিচালক পি কে হালদার। প্রতিষ্ঠানটির ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের হিসাবে বিভিন্ন সময় জমা হয় ৮২৩ কোটি টাকা। পি কে হালদার এমডি থাকাকালে রিলায়েন্স ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ দিয়েছিল, যার বর্তমান স্থিতি ৪৩ কোটি টাকা।
কাগুজে সব প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় একই ভবনে 
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণও নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রশান্ত হালদার কাগজে-কলমে যত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, তার বেশির ভাগের ঠিকানা পুরানা পল্টনের ইস্টার্ন ট্রেড সেন্টারের ১০ম তলা এবং কারওয়ান বাজারের ডিএইচ টাওয়ারের ৮ম ও ১৪ তলায়। ইস্টার্ন ট্রেড সেন্টারের ১০ম তলার ঠিকানা ব্যবহার করেই হাল ইন্টারন্যাশনাল, হাল এন্টারপ্রাইজ, সুখাদা লিমিটেড, সন্দীপ ইন্টারন্যাশনাল, উইন্টেল ইন্টারন্যাশনাল, বর্ণা, ইমেক্সো, আরবি এন্টারপ্রাইজ, এসএ এন্টারপ্রাইজসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন করা হয়। 
কারওয়ান বাজারের ডিএইচ টাওয়ারে আছে রেপটাইল ফার্ম, আনন কেমিক্যাল, নর্দান জুট, রহমান কেমিক্যাল, আজিজ ফাইবারসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। সবই পি কে হালদারের।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল যেভাবে
মূলত শেয়ারবাজার থেকে শেয়ার কিনে চারটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেন পি কে হালদার। এভাবে নিয়ন্ত্রণ নেওয়া চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পিপলস লিজিং ও বিএফআইসির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের একধরনের সহায়তা ছিল। এই দুই প্রতিষ্ঠানের আগের পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্য আইন ভেঙে নামে-বেনামে ঋণ নেওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আর এই সুযোগে এসব কোম্পানির শেয়ার কিনে প্রতিষ্ঠান দুটির নিয়ন্ত্রণ নেন পি কে হালদার।
যেমন বিআইএফসির নিয়ন্ত্রণ সুকুজা ভেঞ্চার ও কাঞ্চি ভেঞ্চার নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের হাতে। আরজেএসসি সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের একই দিনে এ দুটি প্রতিষ্ঠান কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। সুকুজা ভেঞ্চারের শেয়ার সুখাদা লিমিটেড ও প্রশান্ত কুমারের পারিবারিক বন্ধু আইনজীবী সুকুমার মৃধার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধার হাতে। এর মধ্যে অনিন্দিতা মৃধার শেয়ারই ৯০ শতাংশ। আর সুখাদা লিমিটেডের মনোনীত পরিচালক ব্যাংক এশিয়ার সাবেক এমডি ইরফানউদ্দিন আহমেদ। ইরফানউদ্দিন আহমেদ কিছুদিনের জন্য বিআইএফসির চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন। আর কাঞ্চি ভেঞ্চারের ৯৫ শতাংশ শেয়ার হাল ইন্টারন্যাশনালের হাতে, যার প্রতিনিধিও ইরফানউদ্দিন আহমেদ। পিপলস লিজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল আনন কেমিক্যাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের। আবার আনন কেমিক্যালের ৯৪ শতাংশ শেয়ার প্রিতিশ কুমার হালদারে হাতে ও ৫ শতাংশ শেয়ার তার খালাতো ভাই অভিজিৎ অধিকারীর হাতে।
এফএএস ফাইন্যান্সের নিয়ন্ত্রণ পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল ও রেপটাইল ফার্মের হাতে। আবার রেপটাইলস ফার্মের মালিকানায় আছে পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল, কেএইচবি সিকিউরিটিজের এমডি রাজীব সোম ও তাঁর স্ত্রী শিমু রায়। মালিক মূলত পি কে হালদারই।
ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ হাল ইন্টারন্যাশনাল, বি আর ইন্টারন্যাশনাল, নেচার এন্টারপ্রাইজ ও নিউ টেক এন্টারপ্রাইজের হাতে। এসব প্রতিষ্ঠান ২০১৫ সালে কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। হাল ইন্টারন্যাশনালের ৭০ শতাংশ শেয়ারের মালিক পি কে হালদার নিজে।
ইন্টারন্যাশনাল লিজিং একসময় ভালো চলছিল। ২০১৫ সালে এরা প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরই প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে পড়ে। প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠানের নামে বের করে নেওয়া হয় ২ হাজার ২৯ কোটি টাকা। এর সব কটির সুবিধাভোগীও পি কে হালদার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ সামগ্রিক বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, একজন ব্যক্তি কীভাবে চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিলেন, এটা বোধগম্য হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি বলে কি কিছুই ছিল না? জানার পরও কেন সেখানে প্রশাসক বসায়নি। আর্থিক অপরাধের বিচার না হওয়ায় সবাই অনিয়মে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
শুধু এই চার আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল নয়, প্রশান্ত কুমার হালদারের হাত প্রসারিত হয়েছিল পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত অন্য প্রতিষ্ঠানেও। শেয়ার কিনে রাতারাতি তিনটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নেন তিনি। পরিচালক পদে বসান স্বজনদের। প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যালয়ও এক ভবনে, কারওয়ান বাজারের ডিএইচ টাওয়ারে নিয়ে আসেন তিনি।
পি কে হালদারের নিয়ন্ত্রণে যাওয়া তিন প্রতিষ্ঠান হলো সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, রহমান কেমিক্যালস ও নর্দান জুট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড। এর বাইরে আজিজ ফাইবার্স জুট মিলের নিয়ন্ত্রণও ছিলো তাঁর হাতে, যেটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আজিজ পাইপসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কিনতে পি কে হালদার যে বিনিয়োগ করেছেন তার উৎস নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পি কে হালদারের নিয়ন্ত্রণে যাওয়া সিমটেক্স, রহমান কেমিক্যালস ও নর্দান জুটের নামের ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস থেকে ১৭০ কোটি ঋণ নেওয়া হয়। এই ইন্টারন্যাশনাল লিজিং সেই চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একটি, যা পি কে হালদার দখল করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ওই ১৭০ কোটি টাকা ঋণের সুবিধাভোগী পি কে হালদারই। পি কে হালদার শেয়ারবাজারে লেনদেন করতেন নিজের ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমেই। কেএইচবি সিকিউরিটিজ ও হাল ক্যাপিটাল লিমিটেডের মালিকানা তাঁর। এর বাইরে আরও অন্তত ১০টি ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে শেয়ার কেনাবেচা করতেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ওই ১০ প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং সিকিউরিটিজ ও আইএল ক্যাপিটাল রয়েছে। এ দুটি আবার পি কে হালদারের দখল করা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সহযোগী। 
নামে-বেনামে পি কে হালদার আরও অনেক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছেন। 
যেখান থেকে আর্থিকখাতের মাফিয়া ডন 
পি কে হালদারের জন্ম পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার দিঘিরজান গ্রামে। বাবা প্রয়াত প্রণনেন্দু হালদার ও মা লীলাবতী হালদার। তার মা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পি কে হালদার ও প্রিতিশ কুমার হালদার-দুই ভাইই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে ব্যবসায় প্রশাসন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। ২০০৮ সাল পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইআইডিএফসিতে উপব্যবস্থাপনা (ডিএমডি) পরিচালক ছিলেন পি কে হালদার। ১০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নিয়েই ২০০৯ সালে তিনি রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি হয়ে যান। এরপর ২০১৫ সালের জুলাইয়ে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের এমডি পদে যোগ দেন। জানা গেছে, দুই ভাই মিলে ভারতে হাল ট্রিপ টেকনোলজি নামে কোম্পানি খোলেন ২০১৮ সালে, যার অন্যতম পরিচালক প্রিতিশ কুমার হালদার। কলকাতার মহাজাতি সদনে তাদের কার্যালয়। আর কানাডায় পিঅ্যান্ডএল হাল হোল্ডিং ইনক নামে কোম্পানি খোলা হয় ২০১৪ সালে, যার পরিচালক পি কে হালদার, প্রিতিশ কুমার হালদার ও তার স্ত্রী সুস্মিতা সাহা। কানাডা সরকারের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কানাডার টরন্টোর ডিনক্রেস্ট সড়কের ১৬ নম্বর বাসাটি তাদের।
জনতা ব্যাংকের ৫৭৬৮ কোটি টাকা লোপাট, ফেঁসে যাচ্ছেন এমডি
জনতা ব্যাংকের বহুল সমালোচিত এনন টেক্স গ্রুপের ৫ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় বর্তমান এমডি মো. আবদুছ ছালাম আজাদের সম্পৃক্ততা পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আইন-কানুন ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গ্রুপটির ঋণের অনুমোদন, বিতরণ এবং পরিবীক্ষণে সহায়তা করেছেন তিনি। তার প্রত্যক্ষ সহায়তায়ই এলসি (ঋণপত্র) জালিয়াতির মাধ্যমে আমদানির নামে প্রায় ১ হাজার ৪শ’ কোটি পাচার করে নেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ইতিমধ্যে তাকে অপসারণের সুপারিশ করেছে পরিদর্শক দল। বিষয়টির চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার জন্য ব্যাংকিং রেগুলেশন ও পলিসি ডিপার্টমেন্টে (বিআরপিডি) রয়েছে। অন্যদিকে এ ঘটনায় মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি আলাদাভাবে তদন্ত করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। ওই রিপোর্টেও এমডির সংশ্লিষ্টতার বিষয় উঠে এসেছে। তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তদন্ত রিপোর্ট দুদকে পাঠানো হয়েছে। পরিদর্শন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জনতা ব্যাংকে এনন টেক্সের ২২টি প্রতিষ্ঠানের চলতি হিসাব খোলা হয়। এর মধ্যে কর্পোরেট শাখায় ২০টি এবং লোকাল অফিসে ২টি। ওইসব অ্যাকাউন্টে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রুপটির ঋণের স্থিতি ছিল ৫ হাজার ৭৬৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে হিসাব খোলা থেকে শুরু করে ঋণ অনুমোদন, বিতরণ, পরিবীক্ষণ এবং বারবার পুনঃতফসিলে অনেক গুরুতর অনিয়ম এবং জালিয়াতি হয়েছে। তড়িঘড়ি করে হিসাব খুলে আলোচ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে ব্যাংক কর্তৃক প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ অনুমোদনের পর মঞ্জুরির শর্ত পরিপালন না করে টাকা বিতরণ করা হয়েছে। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এসব কাজ করেছেন ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপক শাখা ম্যানেজার এবং বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুছ সালাম আজাদ। ১৫টি প্রকল্প দেখিয়ে ঋণ নেয়া হলেও ৯টি প্রকল্প স্থাপনই হয়নি। ফলে ব্যাংক থেকে প্রকল্প সম্পাদন প্রতিবেদন ইস্যু করেনি। এক্ষেত্রে সাজানো দরপত্র আহ্বান দেখিয়ে এনন টেক্স গ্রুপের প্রস্তাবিত বিভিন্ন প্রকল্প স্থাপনের জন্য বিদেশি মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির অর্থ নিজেদের ইনভেনটর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে বের করে নেয়া হয়েছে। এর বড় অংশই পাচার করা হয়েছে। এসব ঋণ নেয়া ও টাকা পাচারে সরাসরি সহায়তা করেছে ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক মো. আবদুছ ছালাম আজাদ। অনেক ক্ষেত্রে এক প্রতিষ্ঠানের নতুন ঋণের অর্থ অপর প্রতিষ্ঠানের নামে আংশিক পরিশোধ করে খেলাপি না দেখিয়ে ঋণ নিয়মিত দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় পুরোটাই কুঋণে রূপ নিয়েছে। পরিদর্শন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ব্যাংকের লোকাল অফিসের ২টি ও কর্পোরেট অফিসের ২০টিসহ মোট ২২টি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণের জামানত ৫৬ একর জমি। ব্যাংকের নির্ধারিত মূল্য ৬৭৭ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে স্থাপিত যন্ত্রপাতিসহ মোট সহায়ক জামানতের মূল্য দেখানো হয়েছে ৪ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। কিন্তু জমির স্পষ্ট সীমানা না থাকায় এর দাম জানা সম্ভব হয়নি। ভৌত অবকাঠামোতে ওভারল্যাপিং থাকায় জামানত বিক্রি করে টাকা আদায় সম্ভব নয়। এছাড়া এই ২২টি প্রতিষ্ঠানের বাইরেও ইউনূছ বাদল ও তার সহযোগীর অনেক প্রতিষ্ঠান পাওয়া গেছে। এতে অনিয়মের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবে দেখা গেছে, ৪টি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় ইউনূছ বাদল, ৩টি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় তার বড় ভাই মোহাম্মদ ইউসূফ এবং ১১টি প্রতিষ্ঠান তার ব্যবসায়িক সহযোগীদের মালিকানায়। এই অ্যাকাউন্টগুলোতে প্রায় একই ঠিকানা, ওয়েবসাইট এবং একই ধরনের ইমেইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। পরিদর্শক দল মনে করছে, এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যবসাবহির্ভূত লেনদেন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পুনঃতফসিলের অর্থ ইউনূছ বাদলের প্রতিষ্ঠান থেকে স্থানান্তর করা হয়েছে। পরিদর্শনের সময় গ্রুপের কাগজপত্র ও অন্যান্য দলিল চাওয়া হলে ব্যাংক থেকে চাহিদা অনুসারে কাগজপত্র দেয়া হয়নি। ঋণ সংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি, কিছু প্রতিষ্ঠানের হিসাবের নমুনা স্বাক্ষর কার্ড পাওয়া যায়নি। এছাড়া শাখা ব্যবস্থাপক থাকা অবস্থায় দেয়া ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তথ্য গোপন করে এমডির পদে থেকে পুনঃতফসিল করেছেন আবদুছ ছালাম আজাদ। এসব কারণে পরিদর্শনের রিপোর্ট ইতিমধ্যে দুদকে পাঠানো হয়েছে। তবে পুনঃতফসিলে তার হাত নেই বলে জানান আবদুছ ছালাম আজাদ।
অ্যাকাউন্টে জালিয়াতি 
বিএফআইইউর প্রতিবেদন অনুসারে এনন টেক্স গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান সিমি নিট টেক্স লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানের নামে পে-অর্ডারের মাধ্যমে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ২৫৩ কোটি টাকা দিয়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকের ১৭১তম বোর্ড সভায় প্রকল্প স্থাপনের জন্য এই প্রতিষ্ঠানের নামে ৬০:৪০ অনুপাতে ৯৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্যে বৈদেশিক যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ১ কোটি ৪৮ লাখ মার্কিন ডলারের ঋণপত্র খোলার অনুমোদন দেন তৎকালীন শাখা ম্যানেজার মো. আবদুছ ছালাম আজাদ। এক্ষেত্রে মেশিনারিজ সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির তিনটি প্রতিষ্ঠান। এগুলো হল- ওয়াইসুক ওভারসিস, ইউনিভার্সেল টেকনোলজিক্যাল লিমিটেড এবং ইউনি এশিয়া অ্যাসোসিয়েশটস। কিন্তু প্রাইম ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ইউনূছ বাদল নিজেই ইউনিভার্সেল টেকনোলজিক্যাল লিমিটেডের মালিক। প্রাইম ব্যাংকে এই প্রতিষ্ঠানের একটি হিসাবে রয়েছে। যার নম্বর ১৫৯১১০৮০০০৬৩৭২। অর্থাৎ নিজেই পণ্যের আমদানিকারক আবার রফতানিকারকও। অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ায় বিদেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রাইম ব্যাংকের তথ্য অনুসারে ওয়াইসুক ওভারসিসের মালিক ইউনূছ বাদল। আবার ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের তথ্য অনুসারে একই কোম্পানির মালিক এনন টেক্সের বিভিন্ন কোম্পানির পরিচালক মো. কবির হোসেন। এই কোম্পানির নামে ১ হাজার ৭২ কোটি ৭২ লাখ টাকা পাচার করা হয়েছে। এছাড়া প্রাইম ব্যাংকের তথ্য অনুসারে ইউনি এশিয়া অ্যাসোসিয়েটসের মালিক ইউনূছ বাদলের স্ত্রী জামিলা আক্তার সীমা এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়ালের তথ্য অনুসারে ওই কোম্পানির মালিক কবির হোসেন। পে-অর্ডারের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানকে ১৫১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির সঙ্গে এই কোম্পানির কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ নিজেরাই আমদানিকারক তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিক। অন্যদিকে পণ্য বাংলাদেশে আসার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। রিপোর্ট উল্লেখ করা হয়, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে এসব কাজ বড় ধরনের অপরাধ।
কোম্পানি ভিন্ন তথ্য একই 
মো. আবদুছ ছালাম আজাদের সহযোগিতায় এনন টেক্সের মোট ২২টি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দিয়েছে জনতা ব্যাংক। বিভিন্ন নামে এবং আলাদা মালিকানায় এসব কোম্পানি নিবন্ধিত। কিন্তু কোম্পানির ঠিকানা, ওয়েবসাইট এবং ই-মেইল আইডি একই। কিন্তু এসব কিছু যাছাই না করেই আলাদা আলাদাভাবে ঋণ দিয়েছে ব্যাংক।
জালিয়াতিতে এমডি জড়িত 
একটি ব্যাংকের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে গ্রাহকের তথ্য যাছাই, জামানতের সম্পদের মূল্যায়ন এবং ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া মূলত ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকেই করা হয়। বড় ঋণের অনুমোদন দেয়া হয় পরিচালনা পর্ষদ থেকে। অনুমোদনের পর বিতরণ ও পরিবীক্ষণও করে শাখা অফিস। এনন টেক্সের ঋণ বিতরণের সময় ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক ছিলেন মো. আবদুছ ছালাম আজাদ। এসব অনুমোদনের ব্যাপারে তিনি প্রত্যক্ষ সহায়তা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তথ্য গোপন করেছেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া তিনটি ভুয়া রফতানি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে এলসির অর্থছাড়ের অনুমোদন করেন তিনি। এক্ষেত্রে মূলধনী যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে অর্থছাড় করেছেন। রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়, এলসির বিপরীতে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সিএন্ডএফ এজেন্ট সি ইন্টারন্যাশনালের কাছে হস্তান্তর করার এখতিয়ার প্রধান কার্যালয়ের আওতাভুক্ত। কিন্তু এনন টেক্সের ক্ষেত্রে শাখার ম্যানেজার মো. আবদুছ ছালাম আজাদ আমদানির ঋণপত্রের মূল্য পরিশোধের অনুমতি দেন। এক্ষেত্রে নিয়মের তোয়াক্কা করেননি তিনি। রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়, এই অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের অর্থ গ্রাহককে বের করে নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন আবদুছ ছালাম আজাদ। ভুয়া আমদানির নামে বের করে নেয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪শ’ কোটি টাকা। এরপর অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে একের পর এক পদোন্নতি পেয়ে ব্যাংকটির শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসেন আবদুছ ছালাম আজাদ। বর্তমানে তিনি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। চলতি বছরের ডিসেম্বরে তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ প্রকাশিত)