shershanews24.com
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর: গাড়িতে বসেই অফিস করছেন ডিজি, অন্যরা গাড়িও পাননি
রবিবার, ০১ মার্চ ২০২০ ০৬:১৫ অপরাহ্ন
shershanews24.com

shershanews24.com

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: গত ৩০ ডিসেম্বর নবগঠিত স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ডা. এএইচএম এনায়েত হোসেন। নতুন এই প্রতিষ্ঠানটির তিনিই প্রথম ডিজি হলেন। আগের স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) পদে ছিলেন অধ্যাপক এনায়েত হোসেন। কিন্তু ডিজি পদে নিয়োগ এবং যোগদানের পর ইতিমধ্যে দেড় মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও এখনো তিনি বসার জন্য কোনো চেয়ার টেবিল পাননি। টিবি গেটস্থ নতুন ভবনের এডিজি পদের আগের সেই রুমটিও ইতিমধ্যে বেহাত হয়ে গেছে। ফলে তাকে এই পুরো দেড় মাস গাড়িতে বসেই অফিস করতে হয়েছে এবং এখনো তাই করতে হচ্ছে। এমনকি এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দেড় মাস অতিক্রান্ত হতে চললেও নতুন এই অধিদফতরটির এডিজি এবং পরিচালকদের বসার কোনো স্থান এখনো হয়নি, নেই তাদের জন্য কোনো গাড়িও। অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তো আরো বেহাল অবস্থা! এরজন্য সংশ্লিষ্টরা দায়ী করছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডিজি আবুল কালাম আজাদকে। 
এদিকে পাশাপাশি পুরাতন স্বাস্থ্য অধিদফতর ভাগ হয়ে যে দু’টি অধিদফতরে পরিণত হয়েছে তারমধ্যে নতুন স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা আছেন রাজার হালে। তাদের প্রত্যেক পরিচালক এবং লাইন ডাইরেক্টরদের অধীনে ডিডি-এডি, পিএম-ডিপিএম নামধারী যে জুনিয়র ডাক্তাররা কাজ করছেন এসব কর্মকর্তারা আলীশান অফিস কক্ষ, বিলাসবহুল জীপ গাড়িসহ সবই ভোগ করছেন। পরিচালক, লাইন ডাইরেক্টররা তো আরো কয়েক গুণ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন! ডিজি আবুল কালাম আজাদ নামে-বেনামে একাই চারটি গাড়ি ব্যবহার করছেন। যদিও নিয়ম অনুযায়ী বিভাজনের পর উভয় অধিদফতরেরই মর্যাদা সমান। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদফতর বিভাজনের সময় এই মর্মে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, অধিদফতরের মহাখালীস্থ পুরাতন ৫ তলা ভবনটি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের জন্য পুরোটা ছেড়ে দেয়া হবে। আর টিবি গেটস্থ নতুন ভবনটি নির্ধারিত হয়েছে নতুন স্বাস্থ্য অধিদফতরের জন্য। পুরাতন ভবনের ওপি এবং প্রকল্প অফিসগুলো অন্যত্র ভাড়া বাড়িতে স্থানান্তর করা হবে। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদফতরের অন্য যে অফিসগুলো এখানে আছে সেগুলো স্থানান্তর করা হবে টিবি গেটস্থ নতুন ভবনে। কিন্তু অধিদফতর বিভাজন অর্থাৎ ভাগ করার প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে গত বছরের ২৪ নভেম্বর। এরপর গত বছরের শেষ সপ্তায় স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের ডিজি-এডিজি এবং চলতি বছরের প্রথম সপ্তায় বিভিন্ন পরিচালক পদেও পদায়ন হয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত একটি ফ্লোর, এমনকি একটি কক্ষও বুঝিয়ে দেয়া হয়নি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরকে। 
নতুন ভবন নির্মিত হবার পর ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কার্যালয় মহাখালীস্থ পুরাতন ভবন থেকে টিবি গেটস্থ নতুন ভবনে স্থানান্তর করা হয়। তখন থেকে পুরাতন ভবনের ৩য় তলার ডিজির (মহাপরিচালকের) দফতরটি খালি পড়ে ছিল। পরবর্তীতে এক সময়ে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্প অর্থাৎ কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার এর লাইন ডাইরেক্টর ডা. আবুল হাসেম খান তার বিএমআরসি ভবনের দফতরের অতিরিক্ত হিসেবে এখানকার ডিজির রুমটি ব্যবহার করে আসছিলেন। কিন্তু গত ৩০ ডিসেম্বর নবগঠিত স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের ডিজি নিয়োগের পরও তিনি রুমটি ছাড়েননি। এমনকি তাকে বার বার বলা হলেও তিনি এ রুমটি ছাড়তে রাজি হননি। আবুল হাসেম খান নতুন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরে এডিজি (অতিরিক্ত মহাপরিচালক), প্রশাসন পদে নিয়োগ পেয়েছেন। সেই হিসেবে তিনি কক্ষটি দখলে রাখতে বদ্ধপরিকর। তাকে বলা হচ্ছিল ৩য় তলার ডিজির কক্ষের সামনে সাবেক এডিজির যে কক্ষটি আছে সেটিতে বসার জন্য। এটিতে ইতিপূর্বে স্বাস্থ্য অধিদফতরের এডিজি (প্রশাসন)-ই বসতেন। কিন্তু ডা. হাসেম খান তাতে বসতে রাজি নন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান খানের নেতৃত্বে দুই অতিরিক্ত সচিব ও দুই যুগ্মসচিব গত মাসে এ ভবন পরিদর্শনে এসে আবুল হাসেম খানকে ডিজির কক্ষ ছেড়ে এডিজির কক্ষে বসার জন্য অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি তা শুনেননি।
অবশ্য, এডিজির কক্ষটিও এ পর্যন্ত ডিরেক্টর এমবিডিসি ও লাইন ডিরেক্টর টিবি-লেপ্রোসি এবং এইচআইভি-এসটিডি ডা. সামিউল ইসলাম সাদী দখল করে রেখেছেন। টিবি গেটস্থ স্বাস্থ্য অধিদফতর ভবনের পাশে টিবি-লেপ্রোসির আলাদা ভবন এবং কার্যালয় আছে। এদিকে মহাখালীস্থ পুরাতন স্বাস্থ্য অধিদফতর ভবনেও ৫ম তলায় এইচআইভি-এসটিডি ওপি’র কার্যালয় আছে। তারপরও এ ভবনের তৃতীয় তলার এডিজি (প্রশাসন) এর কক্ষটিতে নেমপ্লেট লাগিয়ে দীর্ঘদিন দখল করে রেখেছেন ডা. সামিউল ইসলাম সাদী। যদিও তিনি এটি কখনো অফিসিয়াল কাজে ব্যবহার করেন না বা করার প্রয়োজনও হয় না। তবে ডা. সাদী তার বিভিন্ন দুর্নীতির সহযোগী এবং ঠিকাদার পার্টির সঙ্গে গোপন বৈঠক ও লেনদেনের কাজে এ কক্ষটি ব্যবহার করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। উল্লেখ্য, সামিউল ইসলাম সাদী ইতিপূর্বে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) পদে ছিলেন। একজন জুনিয়র ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও অন্যদের ডিঙিয়ে মোহাম্মদ নাসিম নিজের এলাকার ডা. সাদীকে পরিচালক (হাসপাতাল)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেন। ডা. সাদী পদে বসেই গডফাদার মিঠু সিন্ডিকেটের সদস্য হয়ে যান এবং ব্যাপক লুটপাটে জড়িয়ে পড়েন। ডা. সাদীর সময়কালে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অধীনে বিভিন্ন হাসপাতাল, সিভিল সার্জন কার্যালয়সহ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোয় অর্থ বরাদ্দের গোপন কমিশন ৫% থেকে ১৫%-এ গিয়ে দাঁড়ায়। ওই সময় ডা. সাদীর দুর্নীতি ও লুটপাট প্রবণতা চরমে গিয়ে পৌঁছে। মন্ত্রীর সঙ্গে অর্থের ভাগবাটোয়ারাসহ বিভিন্ন ঘটনায় কেলেঙ্কারি কাণ্ড বাধিয়ে ফেলেন তিনি। ফলে এক পর্যায়ে তাকে এখান থেকে মুগদা হাসপাতালে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। কিন্তু গডফাদার মিঠুর আশীর্বাদে তিনি সেখান থেকে আবারো ডিজি অফিসে টিবি-লেপ্রোসি এবং একই সঙ্গে এসটিডি-এইডস’রও লাইন ডিরেক্টরের আকর্ষণীয় পদ বাগিয়ে নেন। 
জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দু’টি বিভাগ করা হয়। ওই সময়ই স্বাস্থ্য অধিদফতর ভেঙে দুটি অধিদফতর করার কথা ছিল। এ ব্যাপারে প্রক্রিয়া এবং তোড়জোড়ও শুরু হয়েছিল। কিন্তু সম্ভব হয়নি। অদৃশ্য কারণে সেই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়েও থেমে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর নেপথ্যে কাজ করেছে খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতরেরই মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদের কারসাজি। অধিদফতর ভাগ হয়ে গেলে নিজের কর্তৃত্ব-ক্ষমতা, অর্থ বিলি-বণ্টন এবং লুটপাটের সুযোগও কমে যাবে, তাই তিনি পেছন থেকে নানা তৎপরতায় অধিদফতর ভাগ হওয়ার প্রক্রিয়া থামিয়ে রাখেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বিভাগ দু’টি, কিন্তু অধিদফতর একটি- এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিস্থিতিতে স্থাস্থ্য খাতের নানা কর্মকাণ্ডে দেখা দিচ্ছিলো বিশৃঙ্খলা, অর্থের অপচয় এবং অনিয়মও হচ্ছিলো ব্যাপকহারে। ফলে অবশেষে দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছর পর গত বছরের শেষের দিকে সরকার স্বাস্থ্য অধিদফতরকে দুটি অধিদফতরে বিভক্ত করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর নতুন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের অর্গানোগ্রাম তৈরি হয়। তবে ওই অর্গানোগ্রামেও কারসাজি করে নানা ভুলভ্রান্তি, অসামঞ্জস্য রেখে দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এর পেছনেও কাজ করেছে ডা. আবুল কালাম আজাদের কূটকৌশল। ভুলভ্রান্তি পরে সংশোধন করা হবে- এই বিবেচনায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে নবগঠিত স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের ডিজি, এডিজি, ডিরেক্টর নিয়োগ দেয় সরকার। 
কিন্তু, ডিজি আবুল কালাম আজাদের কারসাজি এবং উদ্ভুত সংকটের এখানেই শেষ নয়। সরকারের নতুন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের কার্যক্রম যাতে মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয় সেই চেষ্টা তিনি প্রাণান্ত চালিয়ে যাচ্ছেন। যেহেতু বিগত সময়ে নানা প্রতারণা ও কূটকৌশলের মধ্য দিয়ে নিজের ‘ভুয়া ক্লিন ইমেজ’ এবং সরকারের শীর্ষমহলে গ্রহণযোগ্যতা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন সেটিকে কাজে লাগিয়ে তারপক্ষে এসব অপতৎপরতা চালানো সহজ হচ্ছে। তবে তার এসব অপকর্মে সরকার এবং জনগণের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, গত ২৪ নভেম্বর নতুন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর পরই স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডা. নাসিমা সুলতানাকে নতুন এই অধিদফতরের মহাপরিচালক পদে নিয়োগদানের জন্য ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেন ডা. আবুল কালাম আজাদ। এক্ষেত্রে তিনি ডা. নাসিমা সুলতানার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডকে বিভিন্ন মহলে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। কারণ, নাসিমা সুলতানা ইতিপূর্বে বরাবর ডা. আবুল কালাম আজাদের প্রতি আনুগত্যের পরিচয় দিয়ে এসেছেন। ডা. আবুল কালাম এটা ভালো করেই জানেন, নাসিমা সুলতানাকে নতুন অধিদফতরের ডিজি পদে বসানো মানেই সেটিকে নিজের করায়ত্বে রাখা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডিজির অতিরিক্ত হিসেবে তিনিই বস্তুত স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর চালাবেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন সফল হলো না। কারণ সরকার ভালো করেই জানে, ডা. নাসিমা সুলতানা ডিজি পদের যোগ্য নন। তাই এ পদের জন্য সবদিক দিয়ে যোগ্য, সাবেক অধিদফতরের এডিজি ডা. এএইচএম এনায়েত হোসনকেই স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের ডিজি পদে নিয়োগ দেয় সরকার। 
সূত্রমতে, ডা. এএইচএম এনায়েত হোসেনকে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের ডিজি পদে নিয়োগের সরকারি এই আদেশকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি ডা. আবুল কালাম আজাদ, যদিও এটি তার স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ কোনোভাবেই এই দুটি প্রতিষ্ঠান একটি অন্যটির উপর নির্ভরশীল বা সংশ্লিষ্ট নয়। তারপরও ডা. আবুল কালাম আজাদ পুরো স্বাস্থ্যখাতের উপর নিজের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা এবং লুটপাটের বড় একটা সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে দেখে অত্যন্ত বেপরোয়া হয়ে উঠেন। তিনি ডা. এনায়েতের এই নিয়োগ বাতিলের জন্য নানাভাবে ব্যাপক তদবির চালান এবং বিএমএ নেতাদের দিয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টিরও চেষ্টা করেন। অবশেষে তাতে সফল না হয়ে নতুন অধিদফতরের ডিজি, এডিজি ও ডিরেক্টরদের বসতে বা কাজকর্ম শুরু করতে না দেয়ার কৌশল অবলম্বন করেন। 
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন অধিদফতরের এডিজি আবুল হাসেন খান স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডিজি ডা. আবুল কালাম আজাদের অত্যন্ত অনুগত। ডা. নাসিমাকে ডিজি করতে না পেরে এক পর্যায়ে ডা. আবুল হাসেম খানকে ডিজি করার চেষ্টাও করেছিলেন ডা. আবুল কালাম আজাদ। কিন্তু তাতেও সফল হননি। হাসেম খান এখন ডিজির কক্ষটি যে ছাড়ছেন না এর পেছনেও ডা. আবুল কালাম আজাদের ইন্ধন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন। এদিকে ডা. সামিউল ইসলাম সাদীও ডা. আজাদের সিন্ডিকেটের সদস্য। আর সেই কারণে তিনিও অবৈধভাবে দখল করে রাখা রুমটি ছাড়তে বিলম্ব করছেন। মন্ত্রণালয়ের যে দুই অতিরিক্ত সচিব নতুন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের স্থান সংকুলানের ব্যাপারে গত মাসে ভবনগুলো পরিদর্শন করে গেছেন তাদের তৎপরতাও অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। এমনকি এর পেছনেও ডা. আবুল কালাম আজাদের অপতৎপরতা কাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।  
মহাখালীস্থ স্বাস্থ্য অধিদফতরের পুরাতন ভবনের কম্পাউন্ডের সঙ্গেই রয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। এখানে আইইডিসিআর-এর পুরাতন ভবনের সঙ্গে নতুন একটি বহুতলা ভবন নির্র্মিত হয়েছে। সেই ভবনেই আইইডিসিআর কার্যালয় স্থানান্তরিত হবে। কিন্তু এ স্থানান্তরের কাজটিও বিলম্বিত করা হচ্ছে। আইইডিসিআর কার্যালয় সেখানে স্থানান্তরিত হলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পুরাতন ভবনের প্রকল্প এবং ওপি অফিসগুলো আইইডিসিআর-এর পুরাতন ভবনে স্থানান্তর করা সম্ভব হতো। কিন্তু তা করা যাচ্ছে না। এতেও ডা. আবুল কালাম আজাদের প্রভাব কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। 
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের টিবি গেটস্থ নতুন ভবনের দোতলার অর্ধেক ফ্লোরে করা হয়েছে হেলথ ক্লাব, যা আদৌ একেবারেই অযৌক্তিক এবং অপ্রয়োজনীয়, সংশ্লিষ্টরা বলছেন। কারণ, এখানে কারোই ব্যায়াম করার প্রয়োজন হয় না এবং কেউ ব্যায়াম করতে আসেনও না। তাছাড়া অফিস স্পেস-এর ভেতরে হেলথ ক্লাব রাখার নজির দেশের কোথাও নেই, এমনকি এতোবড়ো কর্মযজ্ঞের স্থান- বাংলাদেশ সচিবালয়েও নেই। স্বাস্থ্য অধিদফতরের নতুন ভবনের ৩ তলার অর্ধেক ফ্লোর খালি রাখা হয়েছে মন্ত্রী-সচিব এবং তাদের পিএস-এপিএসদের জন্য, যদিও তাদের এখানে বসে অফিস করার কখনো প্রয়োজন হয় না। কখনো মন্ত্রী-সচিব কোনো কাজে এখানে এলেও তাদের বসার জন্য ডিজির বিশাল বিলাসবহুল কক্ষ রয়েছে। তাছাড়া আলাদা একাধিক সভাকক্ষ তো রয়েছেই। কিন্তু যেখানে একটি নতুন অধিদফতরের শীর্ষ কর্মকর্তারা রাস্তায়, গাড়িতে বসে অফিস করছেন সেক্ষেত্রে ডা. আবুল কালাম আজাদ সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে নতুন ভবনের এই বিরাট স্পেস অব্যবহৃত রেখে দিয়েছেন, যা চরম স্বেচ্ছাচারিতামূলক কর্মকাণ্ড ছাড়া কিছুই নয়। 
জানা গেছে, আগের স্বাস্থ্য অধিদফতরের তিনজন কর্মকর্তা, ডা. আবুল হাসেম খান, ডা. আহসান হাবিব এবং ডা. নাজমুল ইসলাম নতুন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরে কর্মকর্তা পর্যায়ে নিয়োগ পেয়েছেন। হাসেম খান ছিলেন কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার-এর লাইন ডিরেক্টর, তিনি এখন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের এডিজি (প্রশাসন)। এছাড়া ডা. একেএম আহসান হাবিব এবং নাজমুল ইসলাম আগের পদেই অর্থাৎ যথাক্রমে পরিচালক, মেডিকেল এডুকেশন ও লাইন ডিরেক্টর, মেডিকেল এডুকেশন পদে পদায়ন পেয়েছেন। হাসেম খানের বসার স্থান নিয়ে ইতিমধ্যেই এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অন্য দু’জনেরও যেহেতু অধিদফতরের পুরাতন ভবনে আগের বসার কক্ষ ছিল, কাজেই তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এরা আগের মতোই কাজ চালিয়ে যেতে পারছেন। কিন্তু ডিজি এনায়েত হোসেন ছাড়াও এডিজি অধ্যাপক আবু ইউসুফ ফকির এবং নতুন আরো ৫ জন পরিচালকের এখন পর্যন্ত কোনো বসার স্থান নেই। এমনকি এরা গাড়িও পাননি যে, রাস্তায় গাড়িতে বসে অফিস করবেন। আবু ইউসুফ ফকির ইতিপূর্বে ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইএনটি বিভাগের অধ্যাপক। তাকে দেয়া হয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের এডিজি (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) পদে। গত ২৬ ডিসেম্বর তাকে এই পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর গত ৮ জানুয়ারি নিয়োগ দেয়া হয় ৫ জন পরিচালক। রংপুরের বিভাগীয় পরিচালক ডা. মোস্তফা খালেদ আহমদকে নতুন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) পদে, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের উপপরিচালক ডা. কুতুবউদ্দীন মুহাম্মদ আজাদকে পরিচালক (শৃঙ্খলা), গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আমীর হোসাইনকে পরিচালক (মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা), স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (ওএসডি) ডা. এবিএম আব্দুল লতিফকে পরিচালক (হোমিও ও দেশজ চিকিৎসা) এবং জামালপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রকল্পের পরিচালক ডা. সত্যকাম চক্রবর্তীকে পরিচালক (গবেষণা, প্রকাশনা ও কারিকুলাম উন্নয়ন) পদে নিয়োগ দেয়া হয়। অতিরিক্ত মহাপরিচালক আবু ইউসুফ ফকির এবং এই ৫ পরিচালকের বসার কোনো স্থান সংকুলান করা হয়নি এখনো। এমনকি কোনো গাড়িও বরাদ্দ দেয়া হয়নি। ব্যক্তিগত যানবাহন না থাকলে পাবলিক বাসে চলাচল করা ছাড়া তাদের উপায় নেই। এদিকে অফিসে এসেও বসার কোনো স্থান না পেয়ে ঘুরেফিরে সময় কাটাতে হচ্ছে। এতে সরকারের নতুন অধিদফতর গঠনের গোটা উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হচ্ছে। তবে তাতে লাভবান হচ্ছেন ডা. আবুল কালাম আজাদ। এখন পর্যন্ত তিনি পুরো স্বাস্থ্য খাতের উপরই কর্তৃত্ব-ক্ষমতা খাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ প্রকাশিত)