শনিবার, ৩০-মে ২০২০, ১১:১৭ পূর্বাহ্ন
  • অপরাধ
  • »
  • ধর্ষণ, হত্যা মামলায় জামিন পেয়ে ফোর মার্ডার

ধর্ষণ, হত্যা মামলায় জামিন পেয়ে ফোর মার্ডার

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল, ২০২০ ০৩:৩৬ অপরাহ্ন

শীর্ষ নিউজ, ঢাকা: ২০১৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি নীলিমা নামে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর মাথায় আঘাত ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে পারভেজ। ওই ঘটনায় পারভেজ গ্রেফতারও হয়। কিন্তু বয়সের কথা বিবেচনা করে হাইকোর্ট পারভেজকে জামিন দেয়। আর জামিন পেয়ে আরও  বেপরোয়া হয়ে ওঠে পারভেজ। এবার ঘটাল ফোর মার্ডারের মতো গুরুতর ঘটনা।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার আবদার গ্রামের জৈনাবাজার এলাকায় প্রবাসীর স্ত্রী ও তিন সন্তানকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় পারভেজ (২০) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেফতার পারভেজ আবদার গ্রামের কাজিম উদ্দিনের ছেলে। রবিবার রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানান গাজীপুর  জেলা পিবিআইয়ের পরিদর্শক হাফিজুর রহমান। এ সময় পারভেজের ঘর থেকে তার দেখানো রক্তমাখা কাপড় ও মাটির নিচে চাপা দেওয়া অবস্থায় মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।

আবদার এলাকার প্রবাসী রেদোয়ান হোসেন কাজলের স্ত্রী ও তিন সন্তানকে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার পারভেজ এলাকায় বখাটে হিসেবে পরিচিত। মাদক সেবন থেকে শুরু করে মাদকদ্রব্য বেচাকেনার সঙ্গেও সম্পৃক্ততা তার। মাদক সম্পৃক্ততা ও বখাটেপনা আচরণের কারণে স্থানীয়  লোকজন তাকে এড়িয়ে চলতো বলে জানান ওই এলাকার বাসিন্দা হারুন অর রশিদ।
পারভেজের চাচা আসাম উদ্দিন বলেন, পারভেজ অনেক আগে থেকেই মাদক সেবন ও বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ত।  টাকার জোরে একটি মার্ডার মামলা থেকে পারভেজ পার  পেয়ে যায়। তখন যদি সে ওই মামলায় পার না পেত তাহলে এমন রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড  আর ঘটানোর সাহস পেত না।

সিআইডি ও পিবিআই গাজীপুর ইউনিট ইনচার্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাসির আহমেদ শিকদার গতকাল সন্ধ্যায় নিজ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রবাসী কাজলের প্রতিবেশী শ্রীপুরের আবদার এলাকা হতে পারভেজকে আটক করে পিবিআই-এর একটি টিম। আটক পারভেজ পুলিশের কাছে দুই মেয়েকে ধর্ষণ এবং ওই চার খুনের স্বীকারোক্তি করে চাঞ্চল্যকর ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে। মোবাইল চুরি করতে গিয়ে সে একাই ওই চার খুন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে পারভেজ জানিয়েছে।

তিনি জানান, চাঞ্চল্যকর চার খুনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে পারভেজ জানায়, সে প্রতিবেশী প্রবাসী কাজলের স্ত্রী ও বড় মেয়ের টাচ মোবাইল চুরির উদ্দেশে ২৩ এপ্রিল রাত সাড়ে ১২টার দিকে পিছন দিক দিয়ে ইট বেয়ে কাজলের বাড়ির ছাদে ওঠে। পরে কাপড় শুকানোর রশি ছাদের গ্রিলে বেঁধে ওই রশি বেয়ে নিচে দ্বিতীয় তলার বাথরুম দিয়ে ঘরে ঢুকে কাজলের দু’মেয়ের খাটের নিচে প্রায় এক ঘণ্টা লুকিয়ে থাকে সে। বাড়ির সবাই ঘুমিয়েছে ধারণা করে সে খাটের নিচ থেকে বের হয়ে নিচ তলায় যায়।

সেখানে রান্না ঘর থেকে বটিদা নিয়ে মোবাইল নেওয়ার জন্য দোতলায় উঠে কাজলের স্ত্রী ফাতেমার কক্ষের দরজা খোলার চেষ্টা করে পারভেজ। দরজার শব্দে ফাতেমা ঘুম থেকে জেগে ওঠে পারভেজকে দেখতে পেয়ে চিৎকার দেয়। এ সময় পারভেজ তার হাতে থাকা বটি দিয়ে কাজলের স্ত্রীকে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়িভাবে কোপায়। এতে ফাতেমা জ্ঞান হারিয়ে  মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।

পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, মায়ের চিৎকার শুনে তার তিন সন্তান ঘুম থেকে জেগে উঠলে পারভেজ তাদেরকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। এ সময় ফাতেমার ছোট ছেলে আদিলকে গলা কেটে হত্যা করে লাশ খাটের নিচে রেখে দেয়। পরে সে গুরুতর আহত ফাতেমাকে ওড়না দিয়ে হাত-পা বেঁধে এবং তার দু’মেয়ে নূরা ও অর্ধমৃত হাওরিনকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পর তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করতে পারভেজ সবাইকে গলা কেটে হত্যা করে। এরপর নিহতদের গলার চেন, কানের দুল, নাক ফুল, আংটি, ফাতেমার দুটি মোবাইল এবং ডায়েরি নিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে পেছনের গেট খুলে নিজ বাড়ি চলে যায়। সে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টা হতে ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত প্রায় ৫ ঘণ্টা ওই বাড়িতে অবস্থান করেছে এবং এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে পুলিশকে জানিয়েছে।

গাজীপুর জেলা পিবিআইয়ের পরিদর্শক হাফিজুর রহমান বলেন, মামলার শুরুতেই ভিন্ন আঙ্গিকে তদন্ত শুরু করে পিবিআই। পূর্বের বিভিন্ন ধরনের ঘটনা পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা, এলাকার বখাটে, মাদক সেবনকারী ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন জনের তথ্য সংগ্রহ করে পিবিআই। এসব তথ্য পর্যালোচনা করে রবিবার রাতে পারভেজকে আবদার এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে সে। পরে তাকে নিয়ে অভিযানে বের হয় পিবিআই। এ সময় পারভেজের ঘর থেকে তার দেখানো মতে রক্তমাখা কাপড় ও মাটির নিচে চাপা দেওয়া অবস্থায় মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। এ সময় একটি পায়জামার ভিতর থেকে তিনটি গলার চেন, ফাতেমার কানের দুলসহ কিছু স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করা হয়েছে।

এলাকাবাসী জানায়, নীলিমা (৭) ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় পারভেজ জামিনে মুক্ত হওয়ার পর শিশু নীলিমার পরিবারকে মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দিতে থাকে। মামলা প্রত্যাহার না করা হলে তাদের মারপিট করে এলাকা ছাড়া করবে বলেও হুমকি দেয় পারভেজ ও তার পরিবারের সদস্যরা। এ বিষয়ে ২০১৮ সালে ২৮ আগস্ট নিরাপত্তা চেয়ে পারভেজ, তার বাবা কাজিম উদ্দিন, মা মোছা. কামরুন্নাহার ও আবুল কালামের নাম উল্লেখ করে শ্রীপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন শিশু নীলিমার বাবা হাসান ওরফে ফালান।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার বিকালে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার জৈনাবাজার এলাকার একটি বাড়ি থেকে মা ও তিন সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের ধারণা-বুধবার দিবাগত রাতের কোনো এক সময় দুর্বৃত্তরা চারজনকে গলাকেটে হত্যা করেছে। নিহতরা হলেন- আবদার এলাকার প্রবাসী রেদোয়ান হোসেন কাজলের স্ত্রী ইন্দোনেশিয়ান নাগরিক স্মৃতি আক্তার ফাতেমা (৪৫), তার বড় মেয়ে সাবরিনা সুলতানা নূরা (১৬), ছোট মেয়ে হাওরিন হাওয়া (১২) ও বাকপ্রতিবন্ধী ছেলে ফাদিল (৮)।
শীর্ষ নিউজ/এন