শনিবার, ১২-জুন ২০২১, ০৫:১৬ অপরাহ্ন
  • মন্তব্য প্রতিবেদন
  • »
  • বর্তমান সমাজ "পারস্পরিক অশ্রদ্ধাবোধ ও নিজের ক্ষমতা জাহির" নামক অসুখে আক্রান্ত!

বর্তমান সমাজ "পারস্পরিক অশ্রদ্ধাবোধ ও নিজের ক্ষমতা জাহির" নামক অসুখে আক্রান্ত!

shershanews24.com

প্রকাশ : ২১ এপ্রিল, ২০২১ ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন

নিতীশ কুমার কুন্ডু: "মেধাবী হয়ে গর্ব করার কিছুই নেই। শয়তানও কিন্তু মেধাবী হয়। মনুষ্যত্ব ও সততা না থাকলে সে মেধা ঘৃণিত।" কিংবদন্তি তুল্য ভারতের বিখ্যাত রাষ্ট্রপতি এপিজে  আবদুল কালামের এই উক্তিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বহন করে। অতি সম্প্রতি  "ডাক্তার-ম্যাজিস্টেট-পুলিশ" কাণ্ডে কেউকে নিশ্চিতভাবে সমর্থন বা বিরোধিতা করছি না। কারণ আমি নিশ্চিতভাবে প্রকৃত ঘটনা জানি না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মিডিয়ার বদৌলতে যতটুকু বুঝতে পেরেছি। তাতে আমার মনে হয়েছে এই ঘটনাটি সমাজের ভিতর দ্রুত বেড়ে ওঠা "পারস্পারিক অশ্রদ্ধাবোধ ও নিজের ক্ষমতা জাহির" নামক অসুখের খণ্ড চিত্র মাত্র। 
আমরা যে যে পদেই চাকরি, ব্যবসা, কৃষিকাজ বা যাই করি না কেন সকলেরই আত্মমর্যাদা আছে বা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা সকলের কাছে জাহির করার কিছু নেই। সম্মান সবার কাছ থেকে যেমন আশা করা যায় না, আবার ছিনিয়ে নেওয়ারও মত নয়। সমাজের বিচারে পদ পদবীতে বড় হলেই তাকে সব স্থানে নিজের ক্ষমতা জাহির করে সম্মান নেওয়ার চেষ্টা করা বোকামি। কারণ সম্মান আসে হৃদয় থেকে, মনুষ্যত্ব ও শ্রদ্ধাবোধ থেকে। তবে সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্মান দেখানো সমাজের সকলের কর্তব্য। কিন্তু সমাজে যারা চিরকাল শ্রদ্ধার পাত্র তারা কখন সম্মান পাওয়া জন্য লালায়িত থেকেছে এমন উদাহরণ সচরাচর দেখা যায় না। পক্ষান্তরে তাদের অমায়িক ব্যবহার, মনুষ্যত্ব ও জীবনবোধ দেখে তাদের প্রতি অধিকাংশ মানুষের হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধাবোধ থেকে মাথা অবনত হয়ে যায়। 
গাড়ির স্টিকার (ভিভিআইপি ও ভিআইপি ব্যতিত) ও গায়ের ইউনিফর্ম সাধারণত কর্মক্ষেত্র ও জরুরি অত্যাবশ্যকীয় কাজে বাহিরে ব্যবহার ব্যতীত সর্বত্র প্রদর্শন ঠিক নয়। কারণ এই অযাচিত প্রদর্শনের মাধ্যমে অধিক সুবিধা নেওয়ার সংখ্যা আমাদের দেশে নেহাত কম না। তবে নিজের প্রতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র বা জাতীয় পরিচয় পত্র সবসময় কাছে রাখা উচিত। সেটা সকলের কাছে নিজেকে জাহির করে ক্ষমতা দেখানোর জন্য নয়, প্রয়োজনে প্রদর্শন করে নিজের পরিচয় প্রমাণের জন্য। 
মুখের ভাষা ও ব্যবহার মানুষের মনুষ্যত্বের পরিচায়ক। বড় বড় পদ-পদবি ছাড়াও শুধু  সুমিষ্ট ভাষা ও মার্জিত ব্যবহার ব্যক্তির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি করে। অপরিচিত মানুষের সাথে তুই তোকারি করা কোন সভ্যতার পরিচয় বহন করে না। একজন কর্তব্যরত কর্মকর্তাকে তার কাজে সাহায্য করা রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের অবশ্যই দায়িত্ব। রাষ্ট্রীয় কাজে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে সব ধরণের কাজে সাহায্য করা  সুনাগরিকের যেমন উচিত। একই ভাবে প্রজাতন্ত্রের সেবক হিসাবে নাগরিকরা যাতে কোন ধরণের হয়রানি না হয় সেটাও কর্তব্যরত কর্মকর্তার গুরুত্ব সহকারে  নিশ্চিত করা উচিত। 
আমাদের দেশে ইদানিং কার থেকে কে বড়, কার থেকে কে ক্ষমতাবান এটা নিয়ে এক ধরণের অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ক্ষমতা থাকলেই সেটি সবসময় ব্যবহার্য্য নাও হতে পারে। কারণ ক্ষমতা জাহির করার জন্য নয়, ক্ষমতা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে জনগণের সেবা করার জন্য। হয়ত আমরা ভুলেই যাচ্ছি মানুষ হিসাবে মানুষের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। কে বেশি ক্ষমতাবান, কার কি পদ-পদবি সেটা বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত নয়। নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে প্রয়োজনে আমাদের সবকিছুর জন্য প্রস্তুতি থাকা উচিত। কারণ যত ক্ষমতাবানই হয় না কেন কেউই আমরা রাষ্ট্রের আইনের ঊর্ধ্বে নই। 
সম্মানিত পেশার সদস্য হিসেবে অবশ্যই সম্মান প্রাপ্য কিন্তু সেটা আইনের মধ্যে থেকে। রাষ্ট্র কাছে সকল পেশার গুরুত্ব সমান। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনায় সকল পেশাই গুরুত্বপূর্ণ, সেটা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হোক আর প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা। তবে সকলের উচিত সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় জেষ্ঠ্যদের প্রতি অনুগত্য ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। সকল পেশার মধ্যে পারস্পরিক  শ্রদ্ধাবোধ পেশাদার সদস্য হিসেবে থাকা উচিত। তাহলে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য মঙ্গলজনক।
পরিশেষে সকলের উচিত বৈষম্য না করে মানুষ হিসাবে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। আর ক্ষমতা থাকলেই তা জাহির করে সাময়িক সম্মান পাওয়া গেলেও সেই সম্মান দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ সম্মান হৃদয় থেকে আসে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে। নিজে সম্মান পেতে চাইলে সবার আগে অন্যকে সম্মান দেওয়া শিখতে হবে। কবি হরিশচন্দ্র মিত্রের ভাষায়-
"আপনারে বড় বলে, বড় সেই নয়
লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়।
বড় হওয়া সংসারেতে কঠিন ব্যাপার
সংসারে সে বড় হয়, বড় গুণ যার।
গুণেতে হইলে বড়, বড় বলে সবে
বড় যদি হতে চাও, ছোট হও তবে।"
লেখকঃ নিতীশ কুমার কুন্ডু
সহকারী অধ্যাপক 
ফার্মেসী বিভাগ 
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় 
সন্তোষ, টাঙ্গাইল-১৯০২
ইমেইলঃ [email protected]