রবিবার, ২৮-ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৩:৩৪ পূর্বাহ্ন

বহুল আলোচিত বাড়ৈ আবারো আলোচনায় 

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ০৬:২৬ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: আবারো আলোচনায় এসেছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর এপিএস মন্মথ রঞ্জন বাড়ৈ ওরফে মনি। এককালের তুখোড় কমিউনিস্ট এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়া নেতা নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন দশ বছর। এরমধ্যে প্রথম সাড়ে সাত বছর বাড়ৈ এপিএস পদে থাকলেও ব্যাপক দুর্নীতির দায়ে সরকারের শীর্ষ মহলের নির্দেশে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু নাহিদ শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালে পুরো দশ বছরই বাড়ৈ ছিলেন গোটা শিক্ষাখাতে আলোচনার কেন্দ্রে। অবশ্য শুধু শিক্ষাখাত বললে ভুল হবে। কারণ তার আলোচনা শিক্ষাখাত ছাড়িয়ে দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছিল সিন্ডিকেট নেটওয়ার্কের কল্যাণে। অবস্থা এমন যে ‘বাড়ৈ’ শব্দ বললে যে কেউ চিনে যেতেন, কার কথা বলা হচ্ছে। সেই বাড়ৈ এবার আলোচনায় এসেছেন নিজের ‘চাকরি’ থাকা না থাকার ইস্যুতে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে চাকরিচ্যুত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। কর্মস্থলে অনুপস্থিতির দায়ে শো’কজ করা হয়েছে। এর জবাব না দেয়া হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। এতে কেউ কেউ বলছেন, ‘ফেসে যাচ্ছেন বাড়ৈ।’ কিন্তু বাড়ৈ কি আদৌ সত্যি সত্যিই ফেঁসে যাচ্ছেন? তিনি কি এ চাকরির থোড়াই কেয়ার করেন?
সংশ্লিষ্টদের মতে, তিনি তো চাকরি ছেড়েই দিয়েছেন আরো আগে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের আগেই সরকারের কোনো রকমের অনুমতি ছাড়া বাড়ৈ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। অবাক ব্যাপার হলো, সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের এতোদিন পরে কেন বোধোদয় হলো? বাড়ৈ কর্মস্থল থেকে অনুপস্থিত দীর্ঘ দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এতোদিন পরে কেন তার অনুপস্থিতির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে? যারা বাড়ৈ’র বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে এতো বিলম্ব করেছে এখন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত, শিক্ষাখাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।  
বস্তুত, বাড়ৈ চলে গেলেও তার প্রেতাত্মারা এখনো দেশের সর্বত্রই বিরাজমান। তারা এখনো বাড়ৈ’র প্রেমে মশগুল। গত বছরের ২৫ মার্চ মন্মথ রঞ্জন বাড়ৈকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে খুলনার বিএল কলেজে বদলি করা হয়। কিন্তু তখনই তিনি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছিলেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তিনি যে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন আর ফিরে আসেননি। সে বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে কেন তাকে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা অবস্থায়ই ২৫ মার্চ, ২০২০ খুলনার বিএল কলেজে বদলির আদেশ জারি করলো? তারও প্রায় নয় মাস পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন সবেমাত্র তাকে শো’কজ করলো। গত ২৪ জানুয়ারি ১৫ কর্মদিবসের সময় দিয়ে ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়ন’ এর অভিযোগ এনে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। এরপর আবারো নোটিস দেয়া হবে। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হবে। পিএসসিতে লিখতে হবে। তাকে চাকরিচ্যুতির জন্য এখনো অনেক পথ বাকি। এই সময়ের মধ্যে যদি বাড়ৈ এর অনুকূলে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তিনি ইচ্ছে করলে দেশে আসতেও পারেন, আবার নাও আসতে পারেন। তবে ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, দেশে ফিরে আসার তার আদৌ কোনো সম্ভাবনাই নেই।
গত দশ বছরে বাড়ৈ শ’ শ’ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এসব টাকা পুরোটাই বিদেশে পাচার করেছেন। তিনি জানেন, যা করেছেন এরপর আর দেশে থাকার কোনো প্রয়োজন হয় না। দেশে থাকলে যে কোনো সময় ফেঁসে যেতে পারেন। তাছাড়া দেশে থাকবেনই বা কেনো, সামান্য বেতনের এই চাকরির জন্য? এ চাকরি তো তার এখন আর করা সম্ভব নয়। বরং তিনি যে বিত্তের মালিক হয়েছেন তাতে এরকমের বেতনের শ’ শ’ কর্মচারী নিজেই পুষতে পারেন! 
সরকারের সর্বোচ্চ বাজেটের সবচেয়ে ব্যয়বহুল খাত শিক্ষা। নুরুল ইসলাম নাহিদ নরম বা দুর্বল প্রকৃতির মানুষ হিসেবেই পরিচিত। বলা হয়ে থাকে, তাঁর উপর পরিবারের প্রভাব অনেক বেশি। মন্মথ রঞ্জন বাড়ৈ এক সময় নাহিদের মেয়ের গৃহশিক্ষক ছিলেন। নুরুল ইসলাম নাহিদ ১৯৯৬-২০০১ সময়কালে জাতীয় সংসদের শিক্ষাবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি থাকাকালেও তিনি তাঁর এপিএস ছিলেন। এসবের সুবাদে নুরুল ইসলাম নাহিদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। আর এটিকে ব্যবহার করেই বাড়ৈ মন্ত্রীর এপিএস পদে বসে রাতারাতি অত্যন্ত ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন।
২০০৯ সালের পর থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে এমন দাঁড়ায় যে, মন্ত্রী-সচিবের চেয়েও এপিএস বাড়ৈ ক্ষমতাবান হিসেবে আবির্ভুত হন। এক পর্যায়ে দেখা যায়, মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-সচিব বললে যেটি বাস্তবায়িত হয় না, বাড়ৈ বললে সঙ্গে সঙ্গে হয়ে যায়! শিক্ষা প্রশাসন, মন্ত্রণালয়ের অধীন দফতর-অধিদফতর, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন প্রকল্প, শিক্ষা বোর্ড সর্বত্র বাড়ৈ’র ইচ্ছাই শুধুমাত্র বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়- সেটি সরকারের বা মন্ত্রণালয়ের আইন, বিধি-বিধানমতো হোক বা না হোক। নিয়োগ-বদলি, টেন্ডার ভাগ-বাটোয়ারা, শিক্ষা প্রশাসনের কোথায় কে বসবেন এগুলো সবই নির্ধারণ করতেন বাড়ৈ। তার ইচ্ছের বাইরে কারোই কিছু করা সম্ভব ছিল না। মন্ত্রণালয় এবং অধীন দফতর বা প্রকল্পগুলোয় প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তিনি নিজের পছন্দের লোক বসানোর ব্যবস্থা করেন। যার ফলে গোটা শিক্ষা খাতে ‘বাড়ৈ সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠে। এই সিন্ডিকেটকে ঘুষ না দিয়ে বা পাশ কাটিয়ে কোনো কিছুই করা সম্ভব ছিল না। ছোটখাটো কাজেও সিন্ডিকেটকে টাকা দিতে হতো। এসবের মাধ্যমে মহাজোট সরকারের প্রথম পাঁচ বছরেই মন্মথ রঞ্জন বাড়ৈ কয়েকশ’ কোটি টাকার মালিক বনে যান। যে কারণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের শেষের দিকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চলে যেতে চেয়েছিলেন। পুলিশ তাকে বিমানবন্দর থেকে আটক করে ফিরিয়ে আনে। এতে তার কপাল নতুন করে খুলে যায়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর নুরুল ইসলাম নাহিদ দ্বিতীয় দফায় শিক্ষামন্ত্রী পদ পেলে এপ্রিলে বাড়ৈ আবারো এপিএস হন। এবার তার সিন্ডিকেট আরো বিস্তারলাভ করে। তার দৌরাত্ম এতো বেড়ে যায় যে, এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরও তার কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। 


এর আগে এপিএস বাড়ৈ এর দুর্নীতি-লুটপাট, অপকর্মের বিষয়ে মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কাছে অসংখ্য সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। এমনকি মন্ত্রী-সচিবরা অভিযোগ করলেও আমলে নেননি। নিজের ব্যক্তিগত ইমেজ মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হচ্ছে দেখেও নুরুল ইসলাম নাহিদ সেইসব সমালোচনাকে গায়ে মাড়েননি। পরবর্তীতে যখন দফায় দফায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হলো, এমনকি এক পর্যায়ে এ ব্যাপারে রেড সিগন্যালও দেয়া হলো অবশেষে তিনি ২০১৫ সালের ২১ জুলাই এপিএস পদ থেকে সরালেন বাড়ৈ-কে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে উল্টো এই সহকারী অধ্যাপক (সংস্কৃত)কে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের উপকলেজ পরিদর্শক পদে পদায়ন করছেন। আর সেখানে বসেই বাড়ৈ মন্ত্রণালয়সহ পুরো শিক্ষাখাত নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন নিজের সিন্ডিকেটের সদস্যদের মাধ্যমে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সম্মতিতেই চলে এসব। শুধু তাই নয়, বাড়ৈ ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে বসার পর এসএসসি,্ এইচএসসিসহ বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় একের পর এক প্রশ্নফাঁস কেলেংকারি ঘটতে থাকে। মারাত্মকহারে প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় গোটা সরকারই এক পর্যায়ে বিপর্যয়-বেকায়দায় পড়ে যায়। নুরুল ইসলাম নাহিদকে মন্ত্রীপদ থেকে অপসারণের দাবি উঠতে থাকে সারাদেশে। পরে এক পর্যায়ে গোটা সরকার প্রশ্নফাঁস রোধে নিয়োজিত হয়। যার ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।  


ধুরন্দর বাড়ৈ বুঝতে পারেন ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বহাল থাকলেও নাহিদ আর মন্ত্রীত্ব ফিরে পাবেন না। এতে তার জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই নির্বাচনের আগেই বাড়ৈ সুদুর আমেরিকায় পাড়ি জমান, যেখানে তিনি ইতিমধ্যে শ’ শ’ কোটি টাকা পাচার করেছেন।
 (সাপ্তাহিক কাগজে ১ফেব্রুয়ারি ২০২১ প্রকাশিত)