রবিবার, ২৮-ফেব্রুয়ারী ২০২১, ১২:৪৪ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ এমডির নিয়োগ, পদোন্নতিতে ব্যাপক জাল-জালিয়াতি 
আবেদনের যোগ্যতা ছিল না, আবেদন নেই, নিয়োগপত্র নেই পদোন্নতি-পদায়নে বিএসইসি বোর্ডের অনুমোদন নেই

প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ এমডির নিয়োগ, পদোন্নতিতে ব্যাপক জাল-জালিয়াতি 

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ০৯:১৩ পূর্বাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড একটি সম্পূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল কর্পোরেশন (বিএসইসি) এর অধীন গাড়ি সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত। কিন্তু এই সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে বর্তমানে যিনি নিয়োজিত আছেন মো. তৌহিদুজ্জামান, চাকরিতে তার প্রবেশের মূল যে পদ- বিএসইসি’র অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, তাতে আবেদনের যোগ্যতাই তার ছিল না। এ পদের জন্য আবেদনও তিনি করেননি। এমনকি এই পদে তাকে নিয়োগের জন্য বিএসইসি থেকে কখনো নিয়োগপত্রও জারি হয়নি। অর্থাৎ বিএসইসিতে মো. তৌহিদুজ্জামানের চাকরিতে প্রবেশের পুরোটাই ভুয়া! সম্প্রতি খতিয়ে দেখতে গিয়ে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। আর এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক তোলপাড় চলছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বরাতে ২০১১ সালের ২৯ মার্চ মো. তৌহিদুজ্জামান বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল কর্পোরেশনের ‘মহাব্যবস্থাপক(পুর)’ পদে নিয়োগ পাবার জন্য আবেদন করেন। স্বহস্তে তিনি এ আবেদনপত্র লিখেন। কিন্তু যেহেতু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ‘মহাব্যবস্থাপক’ পদের জন্য অভিজ্ঞতার যেসব শর্ত দেয়া ছিল সেগুলো তিনি পূরণ করেন নি, এ কারণে তার ওই আবেদন সরাসরি বাতিল হয়ে যায়। পরবর্তীতে তাকে ‘মহাব্যবস্থাপক’ এর নি¤œপদ- অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেখানো হয় জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে। যদিও এই পদে তাকে নিয়োগের কোনো নিয়োগপত্র কখনোই ইস্যু হয়নি। এছাড়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুসারে এই পদেও তার আবেদন বা নিয়োগ পাবার কোনো যোগ্যতা ছিল না। কারণ, এই পদে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়স দেয়া ছিল ৪২ বছর। কিন্তু আবেদনের সময় তার বয়স ছিল ৪৪ বছর। তাছাড়া অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে আবেদন বা চাকরির অভিজ্ঞতার যে শর্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিল সেটি তার ছিল না।  
শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে তাকে পদোন্নতি-পদায়নেও আরো অনেক জাল-জালিয়াতি, দুর্নীতি-অনিয়মের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। বিএসইসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী থেকে মহাব্যবস্থাপক পদে তৌহিদুজ্জামানের যে পদোন্নতি দেখানো হচ্ছে তাতে বিএসইসি বোর্ডের অনুমোদন নেই, যদিও অনুমোদন নেয়া বাধ্যতামূলক। বিএসইসির ‘মহাব্যবস্থাপক’ এর সমমপদ প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে তাকে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে পদায়নের বিষয়েও সংস্থাটির বোর্ডসভার কোনো অনুমোদন নেই। যদিও এ ধরনের নিয়োগ-পদায়নে বোর্ডসভার অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। বোর্ড সভার অনুমোদন ছাড়াই বিএসইসির তৎকালীন চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ হোসেন চৌধুরী শিল্পমন্ত্রী আমুর মৌখিক নির্দেশে সরাসরি এ পদায়ন দেন। সংশ্লিষ্ট নথিতেই এ কথা উল্লেখ আছে।
এসকল তথ্য জানা গেছে খোদ মো. তৌহিদুজ্জামানের নিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল কর্পোরেশন অর্থাৎ বিএসইসির কাছ থেকে। বিএসইসি কর্তৃপক্ষ তৌহিদুজ্জমানের চাকরিতে ভুয়া অনুপ্রবেশ বা ভুয়া নিয়োগ, পদোন্নতি-পদায়নে ঘাপলা, দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়কে চিঠি লিখেছে।
গত ১৭ ডিসেম্বর, ২০২০ ইং তারিখে বিএসইসির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আশিকুর রহমান স্বাক্ষরিত উক্ত চিঠিতে বলা হয়, “পত্রিকায় প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি (সংযুক্ত পাতা নং: ৩-৪) অনুসারে মহাব্যবস্থাপক পদে আবেদনের জন্য আবশ্যকীয় অভিজ্ঞতা, ‘...সরকারি/ আধাসরকারি/ স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান/ সংস্থা/ শিল্প প্রতিষ্ঠানে প্রথম শ্রেণীর সমমর্যাদাসম্পন্ন ক্রমউন্নত দায়িত্বশীল পদে ১৮ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা। —...সরকারি/ আধাসরকারি/ স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান/ সুপ্রতিষ্ঠিত সংস্থায় ন্যূনতম উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন/ বাণিজ্য) /সমমান পদে ৫ বছরের অভিজ্ঞতা’ তার কোনোটিই ছিল না বা পূরণ করে না। তিনি মহাব্যবস্থাপক পদে ২৩/০৩/২০১১ তারিখ স্বাক্ষরিত আবেদন করেন (সংযুক্ত পাতা নং: ৫-৯)। শর্তাবলী/ যোগ্যতা পূরণ না করায়, তার আবেদনপত্র সরাসরি বাতিল বলে গণ্য হবে মর্মে বিজ্ঞপ্তির ১৫ নং শর্ত থাকে।”
বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল কর্পোরেশনের ওই চিঠিতে আরো বলা হয়, “অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে ০১/০১/২০১১ তারিখে বয়সসীমা ৪২ বছর ও আবশ্যকীয় অভিজ্ঞতা ‘...সংস্থায় প্রকৌশলী পেশায় ক্রমউন্নত দায়িত্বশীল পদে ১২ বছরের সরকারি/ আধাসরকারি/ স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান/ সুপ্রতিষ্ঠিত সংস্থায় ন্যূনতম উপ-প্রধান প্রকৌশলী /সমমান পদে ৫ বছরের অভিজ্ঞতা...’ কোনোটিই জনাব মো. তৌহিদুজ্জামানের পূরণ করে না। সে কারণেই তিনি কোনো আবেদন দাখিল করেননি। যেহেতু, তার জন্ম ০১/০১/২০৬৭, কাজেই ০১/০১/২০১১ তারিখে তার বয়স হয় ৪৪ বছর। সরকারি/ আধাসরকারি/ স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান/ সুপ্রতিষ্ঠিত সংস্থার পদে তিনি কখনোই নিয়োগ পাননি, ফলে তার অভিজ্ঞতা থাকার আদৌ কোনো সুযোগ ছিল না। অথচ তিনি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ নেন (সংযুক্ত পাতা নং-৯)। যদিও এ বিষয়ে কোনো নিয়োগ আদেশ কখনোই জারি হয়নি। উল্লেখ্য যে, অননুমোদিত ‘রিট্রোএকটিভ ফাইন্যান্সিং প্রকল্প’ এ সম্পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে গ্রেড-৬ সমমানে সাকুল্য বেতনে প্রকল্প বাস্তবায়নকালীন মেয়াদের জন্য নিয়োগ পান তিনি। প্রযোজ্য বিধিমালা অনুসারে প্রকল্প মেয়াদ শেষে চাকরি হতে অব্যাহতি পেয়ে যান। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের পদে কখনো নিয়োগ হয়নি বা স্থানান্তরিত হয়নি।”
অনুসন্ধানকালে বিএসইসি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক স্বীকার করা এবং শীর্ষকাগজের হাতে আসা প্রাপ্ত ডকুমেন্ট ও তথ্যে দেখা যায়, প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেল মোতাবেক এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সরকার বা বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল কর্পোরেশন (বিএসইসি)। কিন্তু বিএসইসির কোনো বোর্ডসভায় মো. তৌহিদুজ্জামানকে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয়নি। ২০১৭ সালের ৯ আগস্ট শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর মৌখিক নির্দেশে বিএসইসির তৎকালীন চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ হোসেন চৌধুরী বিএসইসি বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই মো. তৌহিদুজ্জামানকে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ এর এমডি পদে পদায়ন করেন। ইমতিয়াজ হোসেন চৌধুরী ফাইলের নোটে এটি উল্লেখও করেছেন। এ সংক্রান্ত নোটে তিনি লিখেন, ‘১৫ নং অনুচ্ছেদের (১) ও (২) ক্রমিকের বদলী মাননীয় শিল্পমন্ত্রী মৌখিক নির্দেশ দিয়েছেন। যাহোক- প্রস্তাব অনুমোদন।’
সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের অনুসন্ধানকালে প্রাপ্ত তথ্য ও ডকুমেন্টে আরো দেখা যাচ্ছে যে, মো. তৌহিদুজ্জামানের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী থেকে মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতির বিষয়ে বিএসইসির কোনো বোর্ডসভায় সিদ্ধান্ত বা আলোচনাই হয়নি। ফলে মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতির দাবিও সম্পূর্ণ অবৈধ। অর্থাৎ মো. তৌহিদুজ্জামান বর্তমানে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের যে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে আছেন সেটি অবৈধ, তার আগে বিএসইসির ‘মহাব্যবস্থাপক’ পদে পদোন্নতি অবৈধ, এমনকি বিএসইসি-তে তার চাকরিতে প্রবেশের পদ, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী- সেটিতো পুরোপুরিই অবৈধ!
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ প্রকাশিত)