সোমবার, ০৮-মার্চ ২০২১, ০৭:১১ অপরাহ্ন

এই কিশোর এতো ভয়ঙ্কর!

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারী, ২০২১ ১০:০৩ অপরাহ্ন

শীর্ষ নিউজ, বগুড়া : বগুড়ার ১৬ বছরের কিশোর কৌশিক (ছদ্মনাম)। ব্যবসায়ী বাবার একমাত্র ছেলে সে। সুদর্শন, মেধাবী, চতুর এই কিশোর স্কুলে যেমন ছিল ভালো শিক্ষার্থী, তেমনি বিজ্ঞানের প্রতিও ছিল তার ব্যাপক আগ্রহ। কিন্তু আলোর নিচেই যেন অন্ধকার! স্কাউটে রাষ্ট্রপতি পদকপ্রাপ্ত এই কিশোরের নেশা ছিল কথিত অ্যাডভেঞ্চারের নামে ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধে জড়ানো।


যে কারণে নিষিদ্ধ ‘ডার্কওয়েব’ জগতে বিচরণের মাধ্যমে কৌশিক নামে ব্যাংক ডাকাতির কাজে। ঘটনার ১৮ দিন পর পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে সে জানিয়েছে তার অপরাধ জগতে বিচরণের নানা ভয়ঙ্কর তথ্য। বিস্ময়কর সেসব তথ্য জেনে শুধু অবাকই নন বিস্মিত হয়েছেন পুলিশের অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

ডার্কনেট বা ডার্কওয়েব হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির গোপন জগৎ বা ডিপ ওয়েবের এমন একটি অংশ, যেখানে সব রকম অবৈধ কার্যকলাপ সংঘটিত হয়। যেখানে কোনো সার্চ ইঞ্জিন, সাধারণ ব্রাউজার অ্যাকসেস নিতে পারে না। ডার্কওয়েবে নিজের পরিচয় সম্পূর্ণভাবে লুকিয়ে প্রবেশ করা যায় বিধায় এখানে অনায়াসেই সর্বোচ্চ অপরাধমূলক ও নিষিদ্ধ কাজ করা যায়।

তাকে পাকড়াও করার পর পুলিশের সংশ্লিষ্টরা জানান, কিশোর কৌশিক ডার্কওয়েব ব্রাউজিংয়ে দ্রুত পারদর্শী হয়ে ওঠে। সেখানকার অপরাধ জগতে তার দাপুটে বিচরণ ছিল। ‘হোয়াইট ডেভিল’ নামের একটি হ্যাকিং গ্রুপের মেম্বার ছিল সে। ৫২টি ফেক ফেসবুক আইডি ও ২২টি ফেক ই-মেইল আইডির মাধ্যমে সে যুক্ত ছিল সারা দুনিয়ার সাইবার অপরাধীদের সঙ্গে।

শৈশব থেকেই তার আগ্রহ এ সাইবার অপরাধ নিয়ে। বয়স যখন ১৪ বছর, তখন ২০১৬ সালে ডার্কওয়েবে প্রাপ্ত একটি লিংকের মাধ্যমে কৌশিক বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি মোবাইল ফোনের প্রধান সার্ভার হ্যাক করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সে দাবি করে, হ্যাকিংয়ের শিকার হয়ে ওই ফোন কোম্পানির সার্ভিস আট ঘণ্টা তার নিয়ন্ত্রণে ছিল।

কৌশিক জানায়, ডাকাতি ছিল তার অ্যাডভেঞ্চারের একটি অংশ। এ কারণে অত্যাধুনিক ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট ব্যবহার করে নির্মাণ করা বলিউড মুভি ‘ধুম-থ্রি’ সে ১৫৪ বার দেখে নিজেকে প্রস্তুত করে। যদিও ‘ধুম-থ্রি’র দৃশ্যতে ঝুঁকি থাকায় ছবির শুরুতেই সতর্কবাণী জুড়ে দেয় সেন্সর বোর্ড।

সেখানে সতর্কবাণীতে বলা হয়েছে, ‘ছবিটিতে যেসব স্টান্ট দেখানো হয়েছে, তা পেশাদার লোকদের দিয়ে করানো হয়েছে। দয়া করে ঝুঁকিপূর্ণ এসব স্টান্ট নকল করার চেষ্টা করবেন না।’

ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস (ভিএফএক্স) হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে চিত্রগ্রহণটি চলচ্চিত্র তৈরির একটি লাইভ-অ্যাকশন শটের প্রেক্ষাপটের বাইরে তৈরি করা হয়। এই দৃশ্যমান প্রভাবগুলো (ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস) বেশিরভাগ বিনোদনের শিল্পে, সিনেমায়, টিভি শো এবং গেমে ব্যবহার করা হয়।

‘ধুম-থ্রি’ ছবিতে সর্বাধুনিক ভিএফএক্সের মাধ্যমে দুঃসাহসিক সব ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যে অভিনয় করেন মিস্টার পারফেকশনিস্ট আমির খান। এখানে ই’বাইক ব্যবহার করে ডাকাতির দুঃসাহসিক দৃশ্য তুলে ধরা হয়। মূলত এ ছবি দেখে এবং সাইবার অপরাধে বিচরণ করে বেড়ানো কৌশিক নামে ব্যাংক ডাকাতির ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাডভেঞ্চারে।

গত ৫ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় ছুরিকাঘাত ও দাহ্য পদার্থ ছুড়ে দুই নিরাপত্তারক্ষীকে আহত করে রূপালী ব্যাংকের একটি শাখায় ডাকাতির চেষ্টা করে কিশোর কৌশিক। মুখোশ পরা অবস্থায় তার নিক্ষিপ্ত দাহ্য পদার্থে ও ছুরিকাঘাতে আহত হন হাবিবুর রহমান (২৪) ও মাসুদ রানা (২৭) নামের দুই আনসার সদস্য।

ভোরে সে মুখে মুখোশ ও হাতে বিশেষ রুফটপ গ্লাভস পরে প্রথমে ছাদে ওঠে। এই গ্লাভস ব্যবহার করলে দেয়ালে উঠতে মই ব্যবহার করতে হয় না। স্পাইডারম্যানের মতো করে দেয়ালে ওঠা যায়। এরপর কাটার দিয়ে ছাদের সিঁড়ি ঘরের তালা কেটে ভেতরে প্রবেশ করে। শেষে ব্যাংকের ভেতরের ভল্ট ভাঙার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ঘটনার ১৮ দিন পর বগুড়া পুলিশের একটি বিশেষ টিম গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় কৌশিকের চাচার বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করে।

কৌশিক জানায়, সে ডার্কওয়েবের মাধ্যমে নেয়া অভিজ্ঞতা অনুসারে ব্যাংক ডাকাতির সময় পাহারারত আনসার সদস্যদের গায়ে নাইট্রোজেন সলিউশন ছুড়ে মারে। এটি গা পুড়িয়ে ফেলার পাশাপাশি প্রচণ্ড ধোঁয়ার সৃষ্টি করে। কাঁদানেগ্যাস ধরনের এই পদার্থ কৌশিকের নিজস্ব ল্যাবে তৈরি করা। সে ব্যাংকের দেয়াল ও মেঝের ওপর অ্যাসেটোন ও অ্যালকালিন সলিউশন ঢেলে দেয়। যাতে সেগুলো পিচ্ছিল হয়ে যায়।

ডার্কওয়েবে ‘হোয়াইট ডেভিল’ নামের একটি হ্যাকিং গ্রুপের মাধ্যমে কৌশিকের ইচ্ছা ছিল পৃথিবীর শীর্ষ অপরাধীদের খাতায় নাম লেখানো। এ কারণে সে একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে রাশিয়া থেকে অর্ডার করে এনেছিল পারক্লোরিক এসিড, ক্লোরোফর্ম, এডিনল ইথানল ও পটাশিয়াম ডাইক্রোমেট নামের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পদার্থ। নিজের বাড়িতে বসে সে তার ব্যক্তিগত ল্যাবে এসব নিয়ে গবেষণা চালাত।

এছাড়া ‘ধুম-থ্রি’ ছবিতে ব্যবহৃত ই-বাইক (যা মাটি ও পানিতে সমানভাবে চলে), অত্যাধুনিক সার্ভেলেন্স টুলস চীন থেকে অর্ডার করেছিল আন্তর্জাতিক অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে। বাংলাদেশের কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স না পাওয়ায় সেগুলো তার হাতে এসে পৌঁছায়নি।

কৌশিকের সংরক্ষণে ছিল বিভিন্ন সার্ভেলেন্স ইকুপমেন্ট, নাইফ, ভেস্ট। এগুলো পুলিশের বিশেষ টিম ও সেনাবাহিনী ব্যবহার করে। এছাড়া সে বাংলাদেশি একটি ই-কমার্স সাইট থেকে কিনে নেয় ট্রেসার গান। হাইভোল্টেজ এই গান ব্যবহার করে যে কোনো মানুষকে প্রতিহত করা সম্ভব। কৌশিকের আরও একটি অন্ধকার দিক ছিল নিউক্লিয়ার সায়েন্স (পরমাণু বিজ্ঞান) নিয়ে পড়াশোনা। অনলাইনের ডার্কওয়েবের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত নিষিদ্ধ বই সংগ্রহ করে।

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে কিশোর কৌশিক জানায়, নিউক্লিয়ার সায়েন্সের ওপর পড়াশোনা করতে গিয়ে তাকে রাশিয়ান ভাষা শিখতে হয়েছে। একইসঙ্গে নিউক্লিয়ার বোমা তৈরির জন্য সে থিসিস নোট লিখে ডার্কওয়েবের মাধ্যমে জমা দিত। তার একটি ২৩ পাতার আর্টিকেল ও তিন পাতার নকশা ডার্কওয়েবের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে আট হাজার ডলারে বিক্রি হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি। দেশের একটি বেসরকারি ব্যাংকে তার মায়ের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কৌশিক এই টাকা তুলে নেয়। এরপর ডার্কওয়েবের মাধ্যমেই তার কাছে আরও কিছু থিসিস ম্যাটার নেয়ার অর্ডার আসে।

ডার্কওয়েবের প্রাপ্ত টাকার পুরোটাই ব্যয় করে কৌশিক তার অন্ধকার জগতের অ্যাডভেঞ্চার নামক ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। নতুন কিছু জানতে সাইবার অপরাধীদের সঙ্গে কাটাতে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

কৌশিকের দেয়া তথ্য অনুসারে, সে সেনা কমান্ডোর মতোই নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম। সে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে এসির কনভার্টার রিম দিয়ে তৈরি করতে পারে বিপজ্জনক দোনলা বন্দুক। একইসঙ্গে এসির কমপ্রেশারের গ্যাস দিয়ে তৈরি করতে পারে চেতনানাশক গ্যাস। এটি স্প্রে করলে যে কেউ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চেতনা হারাবে।

কৌশিকের আরও একটি আবিষ্কার হলো বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশ্রিত ইনস্ট্যান্ট ফায়ার। এটি এমন এক তরল পদার্থ, যা দিয়ে মাটি, বালি, পানি, কংক্রিটসহ যে কোনো বস্তুর ওপর আগুন জ্বালানো সম্ভব। এই ইনস্ট্যান্ট ফায়ার ব্যবহার করে একই ব্যাংকে সে ২-৩ মাস আগেও আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করেছিল।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঞা জানান, একজন কিশোর এতো ভয়াবহ অপরাধের পরিকল্পনা নিয়ে চলতে পারে তা ভেবে তারা অবাক হয়েছেন।

তিনি বলেন, চতুর এই কিশোরকে ধরতে বগুড়া পুলিশের বিশেষ টিমকে রীতিমতো ঘাম ঝরাতে হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলী হায়দার চৌধুরীর নেতৃত্বে গাবতলী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন ১৮ দিন ধরে চেষ্টার পর তাকে শনাক্ত করতে সক্ষম হন।

পুলিশ জানায়, একজন পেশাদার অপরাধীর চেয়েও কৌশিক অনেক বেশি চতুর। ডাকাতিতে ব্যর্থ হয়ে সে বগুড়া শহরে এসে তার এক বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসতালে গিয়ে ছদ্মনাম ব্যবহার করে চিকিৎসা নেয়। এরপর বাসে করে পালিয়ে চলে যায় গাজীপুরের টঙ্গীতে তার চাচার বাসায়। সেখানে সে তার সব অনলাইন যোগাযোগ বন্ধ রেখে গোপনে ই-পাসপোর্ট করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।

কিন্তু প্রতি রাতেই এক বান্ধবীর সঙ্গে চ্যাটিং তার জন্য কাল হয়ে যায়। শুধু এই একটি সূত্র ধরে পুলিশ এই ভয়ঙ্কর কিশোরকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।

পুলিশ জানায়, গ্রেফতার হওয়ার পর তার পরিবারের কোনো সদস্যই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। শুক্রবার ভোরে গ্রেফতারের পর সন্ধ্যায় কৌশিককে হাজির করা হয় বগুড়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসমা মাহমুদের আদালতে। সেখানে সব ঘটনা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় সে। পরে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়। পুলিশ জানিয়েছে, বয়সের কারণে কৌশিককে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৌশিকের বাবা বগুড়া শহরের নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী। বাড়ি শহরতলির মাটিডালি এলাকায়। তার বড় বোনের বিয়ে হয়েছে গাবতলী উপজেলায়। সেই সূত্রে কৌশিক প্রায়ই গাবতলী যেত। ঠিক একই কারণে সেখানকার ব্যাংকে ডাকাতির চিন্তা মাথায় আসে তার।

এ ব্যাপারে কৌশিকের বাবা ও মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, ছেলে মেধাবী হলেও বখে গেছে। তাদের কথা শোনে না। তবে ছেলের অপরাধের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তারা।

শীর্ষনিউজ/এসএফ